জীবন বিমা করপোরেশনে ৫০২টি পদে নিয়োগে ৪০ কোটি টাকা ঘুষ লেনদেন প্রমাণ দুদকের হাতে

অর্থনীতির ৩০ দিন ডেস্ক :
রাষ্ট্রায়ত্ত জীবন বিমা করপোরেশনে (জেবিসি) ৫০২ পদে জনবল নিয়োগে বড় ধরনের জালিয়াতি ও আর্থিক লেনদেন হয়েছে। প্রতিটি পদের জন্য অন্তত ৮ লাখ টাকা করে প্রায় ৪০ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই অনিয়মে জড়িত ছিলেন জেবিসির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রশাসন বিভাগের একজন সহকারী মহাব্যবস্থাপক। কিন্তু তদন্তে অনিয়মে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ার পর মামলা ও চার্জশিট দাখিল হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়নি জেবিসি পরিচালনা পর্ষদ বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
জানা গেছে, দেশের বিমা খাতে রাষ্ট্রীয় দুই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম জীবন বিমা করপোরেশন (জেবিসি)। প্রতিষ্ঠানটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বিমাসহ বেসরকারি বিমা কোম্পানির পক্ষে পুনঃবিমা চুক্তি করে থাকে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এখানে যেমন নিয়োগ পেতে অনেকেরই আশা থাকে, তেমনি তাদের সেই আশাকে পুঁজি করে আরেকটি শ্রেণি আবার নিজস্ব ফায়দা লোটে। ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রের ক্ষতি করে নিজেরা হাতিয়ে নেয় কোটি কোটি টাকা। অথচ এরপরও রাষ্ট্র যেন তাদের কাছে অসহায়। নিতে পারে না কোনো ব্যবস্থা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জানুয়ারি ২০২০ থেকে ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্ত সময়কালে জীবন বিমা করপোরেশনে উচ্চমান সহকারী, অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক ও অফিস সহায়ক পদসহ মোট ৫০২টি পদে নিয়োগ প্রদানে অনিয়ম করা হয়। প্রতিটি পদের বিপরীতে আট লাখ টাকা করে অন্তত ৪০ কোটি টাকার লেনদেন হয়, যেখানে সরাসরি জড়িত ছিলেন জেবিসির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জহুরুল হক এবং সহকারী মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে এসব বিষয় উঠে আসলে সংস্থাটির সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১ এর উপসহকারী পরিচালক এস এম আনিসুজ্জামান বাদী হয়ে ২০২২ সালের ২০ জানুয়ারি মামলা করেন।
মামলা দায়েরের দীর্ঘ ৩ বছর পর চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি আদালতে চার্জশিট দাখিল হয়। ইতোমধ্যে চার্জশিটের ১নম্বর আসামি জহুরুল হক চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। অপর আসামি মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে জেবিসিতে শীর্ষ পদে কাজ করে যাচ্ছেন। দুদকে মামলা হওয়ার পরও আসামিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বেসরকারি খাতের বিমা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এরফলে অনিয়মকেই উৎসাহিত করা হচ্ছে। এমনকি জীবন বিমা করপোরেশনের ওপর আইডিআরএর নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত বলেও মনে করছেন তারা।
প্রগতি লাইফ কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, সাধারণত সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে আদালতের কোনো রায়ের আগে শাস্তিযোগ্য ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। তবে কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হলে প্রতিষ্ঠান কমিটি গঠন করে তদন্তের মাধ্যমে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। আবার প্রতিষ্ঠান যদি মনে করে তাকে চাকরিতে বহাল রেখে তদন্ত করা যাবে না, তাহলে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেও তদন্ত চলমান রাখতে পারে। এরপর তদন্ত করে অনিয়ম পেলে তাকে স্থায়ী বহিষ্কারসহ আত্মসাৎকৃত অর্থ ফেরতে পুনরায় আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে। অর্থাৎ অভিযোগ উত্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। না হলে তার দেখাদেখি অন্য যারা ভালো কর্মকর্তা আছেন তারাও নষ্ট হয়ে যেতে পারেন। তবে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী কর্মকর্তা জড়িত থাকায় যদি বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে পরিচালনা পর্ষদ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের তখন দায়িত্ব হয়ে পড়ে পদক্ষেপ নেওয়ার। তারা পদক্ষেপ নিয়েছে কিনা, সেটা দেখতে হবে।
দুদক থেকে মামলার বিষয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং জীবন বিমা করপোরেশনের পর্ষদকে জানানো হয়েছে কিনা, জানতে চাওয়া হয় দুদকের মুখপাত্র ও জনসংযোগ কর্মকর্তা আখতার হোসেনের কাছে। তিনি মামলার বাদী ও দুদকের সহকারী পরিচালক নুর আলম সিদ্দিকীর বরাতে জনকণ্ঠকে বলেন, ২০২২ সালে যখন মামলা হয় তখন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এ বিষয়ে মামলা ও তদন্তের বিষয়ে জানানো হয়েছে। কিন্তু দুদকে তদন্তের চেয়ে মূল বিষয় হলো চার্জশিট। দুদকে অনেক তদন্ত হয়, সেটা বিবেচ্য না। কিন্তু চার্জশিট হলে অপরাধ হয়েছে বলে চিহ্নিত হয়। এরপর বিধি অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসহ এর সঙ্গে জড়িত অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বা মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়।
চার্জশিট হওয়ার পর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা জানতে চাওয়া হয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকের কাছে। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। আপনার কাছে যে ডুকমেন্টস আছে সেগুলো আমাকে দিলে আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পারি।’
পরবর্তীতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সাইয়েদ কুতুব জানান, জীবন বিমার এমডি বর্তমানে ছুটিতে আছেন। আমি সেখানে রুটিন দায়িত্ব পালন করছি। আমি যতটুক জানি, মামলা হলেই তাকে শাস্তি দেওয়া যায় না। জুন মাসে দুদক থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ হয়ে আমাদের কাছে যে চিঠি এসেছে আমরা সেটা জীবন বিমার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। জীবন বিমার বিধি অনুসারে কেউ পুলিশ কাস্টডিতে গেলে তাকে সাসপেন্ড করা যায়।
কিন্তু তিনি এখনো কাস্টডিতে যাননি, তাই কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। যেহেতু চার্জশিট হয়েছে এবং আদালতে তা গৃহীত হলে ওয়ারেন্ট জারি হবে। তখন তিনি আত্মসমর্পণ করলেও সাসপেন্ড করা যাবে, বা পুলিশ ধরে নিয়ে গেলেও ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। তিনি বলেন, ‘বিধি অনুসারে করপোরেশন চাইলে হয়তো ব্যবস্থা নিতে পারত। কিন্তু করপোরেশনের এমডি যিনি অতিরিক্ত সচিব, তার বিরুদ্ধেই মামলা, তাই কতটুকু ব্যবস্থা নিয়েছে তা আসলে আমি জানি না। এটা জীবন বিমা নয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় চাইলে ব্যবস্থা নিতে পারত। তবে মামলার কারণে তার পেনশন আটকে গেছে। তিনি অবসরোত্তর কোনো আর্থিক সুবিধা পাননি।’
অপরদিকে দুদকের মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি ও জেবিসির সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম, প্রশাসন) মো. মাহবুবুল আলমের কাছে ঘটনা ও মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেন, ‘এখানে আমার কোনো দায় ছিল না। আমি শুধুমাত্র দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করেছি। এই নিয়োগ হয়েছে বোর্ড কর্তৃক। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আমি মামলায় পড়েছি।’
তিনি বলেন, ‘আমি যদি অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকতাম তাহলে ম্যানেজমেন্ট থেকে আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতো। কিন্তু তারা সেটা করেনি। দুদকের মামলার পর শুধু আমার গত বছরের পদোন্নতি আটকে দিয়েছে। বরং সাবেক এমডি তার চাকরির শেষ সময়ে এসে ওইসব ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আমি আটকে দিয়েছি। এরপর পুনরায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করি আমরা।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মশিউর রহমান বলেন, ‘অনিয়মে জড়িত ব্যক্তির অপরাধ যদি প্রমাণিত হয় তাহলে তাকে রাষ্ট্রীয় বিধি বা প্রতিষ্ঠানের বিধি অনুযায়ী চাকরিচ্যুত করা যায়। এরপর রাষ্ট্রীয় আইন বা প্রতিষ্ঠানের বিধি অনুযায়ী তাকে শস্তি দেওয়া যায়।
তিনি বলেন, প্রমাণিত দুর্নীতিগ্রস্ত লোক পদে থাকা তো দূরের কথা, তার সমাজেই থাকা উচিত না। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো এসব পদে আসার আগে ও পরে যদি সম্পদের হিসাব দেওয়ার বিধিবিধান করা হয় এবং সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সর্বনিম্ন পর্যায় পর্যন্ত তা নিশ্চিত করা যায় তাহলেই এ জাতীয় অনিয়ম দুর্নীতি দূর করা সম্ভব।