অর্থপাচার কারিরা কি সরকারের ছেয়েও শক্তিশালী?

খোন্দকার জিল্লুর রহমান
দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে আর্থিক খাত বারবার হোচোট খেলেও এসবের কোন তোয়াক্কা না করে এক শ্রেণীর দেশ প্রেমিক দায়ীত্তশীল লোক দেশের আর্থিক খাতের সুশাসন এবং মানি লন্ডারিন আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একটা বহুমুখি উন্নয়নশীল দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্থকরে অর্থ পাচার, দুর্নীতি ও অপশাসনের মাধ্যমে নিজেদের রামরাজ্য প্রতিষ্টা করে চলছে। দেশের উন্নয়ন ও দেশপ্রেমের কথা মুখে মুখে বললেও তাদের অন্তরের ক্ষুধা বিভিন্ন অবৈধ পথে অর্থ উপার্জন করা। উন্নয়নের ঢামাঢোল পিটিয়ে সরকারে ভিতর তারা আরেক অদৃশ্য সরকার গঠন করে নিজেরা একটা দৃশ্যমান সরকারকে ঢালস্বরূপ ব্যাবহার করে যা”েছ। বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে এসব অর্থ পাচার ও দুর্নীতি খবর উৎগাটিত হলে দুধক ও সরকারের বিভিন্ন মহলসহ জনগনের মুখে মুখে বেশ কিছুদিন খুবই সরব ভুমিকা পালন করলেও নিদৃষ্ট সময়ের পর অদৃশ্য কারনে তা আবার নিরব হয়ে যায় এবং চাপা পড়ে যায় এসব কর্মকান্ড। এসব অর্থপাচার ও দুর্নীতির সাথে জড়িত ব্যাক্তিরা কদিন নিজেদেরকে লাইম লাইট থেকে আড়াল করে ভিতরে ভিতরে দুদক ও সরকারের প্রশাসনিক কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সাথে তৎপরতা চালিয়ে অল্প কিছুদিনের ভিতরে আবার সব ম্যানেজ করে স্ব-অবস্থানে ফিরে আসে এবং পুনরায় একই কর্মকান্ড চালাতে থাকে। গত ২৫ জুন ২০২০ বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড-২০১৯’ নামে সে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন দেশের নামে পাওনা ও দ্বায় এর তথ্যসহ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটিতে দেখা যায়, সে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের নামে মোট দায় ৬০ কোটি ৩০ লাখ সুইস ফ্রাঁ, ৯০টাকা করে ধরে যা দেশিয় মুদ্রায় ৫,৪২৭ কোটি টাকা প্রায়। এর সঙ্গে সম্পদ ব্যবস্থাপকের মাধ্যমে আরও ১ কোটি সুইস ফ্রাঁ বিনিয়োগ হিসেবে রয়েছে। মোট দায়ের মধ্যে গ্রাহকের সরাসরি আমানত রয়েছে প্রায় ২ কোটি ফ্রাঁ বা ১৮০ কোটি টাকা প্রায়। এর বাইরে সে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় বাংলাদেশের পাওনা অর্থ্যাৎ তাদের দ্বায়ের পরিমাণ ৫৮ কোটি ৩২ লাখ ফ্রাঁ।
সম্প্রতি বিভিন্ন পত্র পত্রিকাতে উঠে এসেছে বিশ্বের সুরক্ষিত ও নিরাপদ ব্যাংক হিসাবে সুইস ব্যাংকে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশীদের টাকা জমানোর হিড়িক বেশি। ২০১৮ সালে বাংলাদেশিদের জমা প্রায় ১,৩০০ কোটিসহ মোটজমার পরিমান দাড়ায় ৫,৩৪৩ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে এই আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা। জমা ও উঠানোর সর্বশেষ হিসাবে ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কার নাগরিকদের গ”িছত অর্থ অর্ধেক কমলেও বাংলাদেশের কমেছে মাত্র ১৩০ কোটি টাকা। দেশে কালোটাকা সাদা করার ঘোষনাসহ আরো অন্যান্য সুযোগ সুবিদা দিয়ে আসলেও এসব লোকেরা দেশীয় বিনিয়োগ, দেশীয় উন্নয়ন এবং দেশের অগ্রযাত্রার দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে দেশে অনিশ্চিত জীবন, অনিশ্চিত বিনিয়োগ এবং নিজেদের সরকারের উপর আস্তাহীনতা ও দেশের রাজনৈতিক অবস্থার উপর তারা নির্ভর করতে পারছেনা।
ধারাবাহিক ভাবে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশিদের মোট জমা ২,৯৮১ কোটি টাকা, ১৪ সাল পর্যন্ত ৪,০৫৮ কোটি, ১৫ সাল পর্যন্ত ৪,৪১৭ কোটি, ১৬ সাল পর্যন্ত ৫,৫৬৬ কোটি, ১৭ সালে সামান্ন কমে ৪,০৬৯ কোটি,ও ১৮ সালে ৫,৩৪৩ কোটি টাকা। অর্থপাচারের বিভিন্ন পদ্দতি হিসাবে সুইস ব্যাংকে জমা ছাড়াও আর্থিক খাতের লুটেরাচক্র সুকৌশলে দেশের ব্যাংক (বিশেষ করে চার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক) ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নিজস্ব শিল্প ও কারখানার নামে বিপুল পরিমান ঋণ নিয়ে উদ্দেশ্যমুলক ভাবে সুদুরপ্রসারী পরিকল্পনার মাধ্যমে সময় ও সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সেই টাকা বিদেশে পাচার করে অতিরিক্ত ব্যায় ও লসের খাত হিসাবে চিহ্নিত করে থাকেন ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করার স্বার্থে। অনেকে আবার নিজস্ব শিল্প কারখানার উন্নয়নের স্বার্থে বিনিযোগকৃত অর্থ ও সম্পদের মুল্য ২০/২৫ গুন বাড়িয়ে দেখিয়ে অর্থমন্ত্রণালয় ও শেয়ার বাজার বিনিযোগ কারি কতিৃপক্ষ বি এস ই সি এর কর্মকর্তাদের জোগসাজসে বাজার থেকে বড় অঙ্কের টাকা উত্তোলন করে নেন। প্রথম দু এক বছর বিনিয়োকারিদে সামান্ন লাভ দেখিয়ে পরবর্তিতে সুকৌশলে বিনিয়োগ কারিদের নিজস্ব পুঁজি থেকে বঞ্চিত করে সেসব টাকার বেশিরভাগ বিদেশে পাচার করে কোম্পানি গুলোকে লসের খাত হিসাবে উপস্থাপন করেন।
আর্থিক খাতের এই লুটেরাচক্রের সদস্যরা আর্থিক সমৃদ্ধ ও সুখী সুন্দর রাষ্ট্রের উন্নয়নের কথা চিন্তা না করে সরকারের পট পরিবর্তন, জীবনের নিরাপত্তা, পরিবারের নিরাপত্তা ও জনরোশের কথা চিন্তাকরে ই”ছকৃতভাবে ঋনখেলাফি সেজে পাচারের মাধ্যমে বিপুল অর্থ নিয়ে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে সেকেন্ডহোম গড়ে তুলেছেন নিরাপদে বসবাসের জন্য। আবার অনেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নাগরিকত্ত নিয়ে সেই দেশেই ফাঁধ পেতে বসেছেন শত শত কোটি টাকার বানিজ্য। কেউ কেউ আবার বিভিন্ন দেশে ব্যাংক ও ব্যাংকের শাখা পর্যন্ত খুলে বসেছেন টাকা পাচার করাকে ব্যাবসা হিসাবে নিয়ে হুন্ডি, আন্ডার+ওভার ইনভয়েস, এলসি, চেইনসপ ও চেইন রেষ্টুরেন্টের মত স্থয়ী পদ্দতি খুলে বসেছেন অর্থ পাচারের স্থয়ী পদ্দতি হিসাবে। দেশের কিছু ধুর্তচক্র বিদেশী প্রতারকদের সাথে মিলেমিশে এ টি এম কার্ড জালিয়াতি ও বিভিন্ন ব্যাংকের চেক জালিয়াতি সহ ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে লুটপাট ও পাচার করে নি”েছ ব্যাংকগুলোর বিপুল পরিমান অর্থ, যার প্রমান দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, ব্যাংকএশিয়া সহ আরো কিছু ব্যাংক, এ টি এম কার্ড ও ব্যাংকের চেক জালিয়াতি বর্তমানে অনেকটাই কন্ট্রোল।
অনেক বিশিষ্টজনরা মনে করেন সূশাসনের অভাব থেকেই একটার পর একটা আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটছে। এসব ক্ষেত্রে সরকারের দুর্বলতা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্ণর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, হলমার্ক থেকে শুরু করে ব্যাসিক ব্যাংক, বিসমিল্লাগ্রুপ, ডেসটিনিসহ বর্তমান শেয়ার বাজার পর্যন্ত সবকটিতেই সরকারের ঘনিষ্টজনরা জড়িত ছিল বলেই দীর্ঘ সময়েও এসবের ব্যাবস্থা নেয়া হয় নাই। অর্থ পাচার, শেয়ার বাজার লুট, হলমার্ক, ডেসটিনির বিচার নিয়ে সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মোহিত বলেছিলেন, শেয়ার বাজার লুট ও অর্থ পাচারকারিরা অনেক শক্তিশালী, তাদের বিচার করা যাবেনা। আসলেই কি পাচার কারিরা সরকারের ছেয়েও শক্তিশালী??
বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্তে দেশও এগিয়ে যা”েছ অদম্য গতিতে। এহেন লুটপাট, পাচারের পরও দেশের বহুমুখি উন্নয়ন ও অগ্রগতি অনেকটাই দৃশ্যমান এটা কোন ভাবেই অশ্বিকার করার মত নয় কিš‘ অদুর ভবিষ্যতে এভাবে পাচার ও দুর্ণীতি চলতে থাকলে রাষ্ট্রের উন্নয়ন ভিষন ভাবে বাধাগ্রস্থ হবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা এবং চিন্তার বিষয়।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের ক্ষমতাধর ব্যাক্তিদের একজন বলে সারাবিশ্বে যেভাবে সুনাম ছড়িয়েছে, যেভাবে মানবতা বিরোধী অপরাধীদের বিচার, দেশে জঙ্গিবাদ দমনে সফলতা অর্জন, কেসিনো হোতাদের গ্রেপ্তার করে জাতীর পিতা বঙ্গ বন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার যে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যাক্ত করেছেন ঠিক সেভাবেই সকল দুর্ণীতিবাজ, ঋণখেলাফি, অর্থপাচারকারি এবং দেশের আর্থিক অগ্রগতিতে অন্তরায় সৃষ্টিকারী মুলহোতা ও তাদের পোষ্যদের কঠিন হাতে বিচার করে দেশের আর্থিক অবকাঠামোকে মজবুত রেখে নিজেকে বিশ্বের ক্ষমতাধর ব্যাক্তি হিসাবে যে মর্জাদার আসন পেয়েছেন সে সুনাম অক্ষুন্ন রাখবেন বলে দেশের সতের কোটি মানুষ আশা করে।

লেখক : সম্পাদক প্রকাশক, অর্থনীতির ৩০ দিন ও মানবাধীকার কর্মী।