তরুণ উদ্যোক্তাদের চাহিদা পূরণে গুরুত্ব দিতে হবে

অর্থনীতির ৩০ দিন ডেস্ক :
প্রাক-বাজেট আলোচনা
তরুণ উদ্যোক্তাদের চাহিদা মাথায় রেখে আগামী বাজেট তৈরির পরামর্শ এসেছে এক প্রাক-বাজেট আলোচনায়।
বক্তারা বলেছেন, তরুণদের উদ্যোগগুলো এগিয়ে নেওয়া না হলে বাংলাদেশের উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্ন পূরণ সহজ হবে না। এ জন্য তরুণদের উদ্যোগে অর্থায়নের জন্য বাজেটে বিশেষ তহবিল গঠন এবং ব্যাংক ঋণের সুদহার ও জামানতের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন আলোচকরা।
একইসঙ্গে ব্যবসা শুরু করার খরচ কমানো, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়ানো ও করপোরেট করহার কমানোর প্রস্তাব করেছেন তারা।
সমকাল ও জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল (জেসিআই) বাংলাদেশ আয়োজিত ‘তারুণ্যের বাজেট’ শীর্ষক প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে দেশের বিভিন্ন খাতের তরুণ উদ্যোক্তা, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী ও গবেষকরা এমন মতামত দিয়েছেন।
মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর ওয়েস্টিন হোটেলে আয়োজিত এ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন সমকালের নির্বাহী সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি।
এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য ছিল তরুণ উদ্যোক্তারা বাজেটে কি প্রত্যাশা করেন, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে কি কি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার তা তুলে ধরা।
বক্তাদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে একমত পোষণ করে অর্থ প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামী বাজেট হবে ন্যায্যতাভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিমূলক। দেশের সকল নাগরিক যাতে সমান সুযোগ পায় সে ব্যবস্থা থাকবে বাজেটে। সুশাসনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। কারণ উন্নয়নে সুশাসন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার বড় বাজেট করে বলে অভিযোগ আছে। তবে ইদানীং আর বাজেটকে বড় বলা হচ্ছে না।
সঞ্চয়পত্রের সুদহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে এ বিষয়ে সরকারকে ভাবতে হবে। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে কাঠামো ও আইনগত সংস্কার জরুরি। কারণ, সরকার আইনের চাপে জর্জরিত। অনেক ক্ষেত্রেই আইনের বাধাগুলো চলে আসে। কর কাঠামোতে ব্যাপক সংস্কার দরকার বলে মনে করেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এনবিআর এবং দুদকের মধ্যে সমন্বয় দরকার। সকলেই যে অপরাধী তা নয়। বিনিয়োগকারীদের সম্মান দিতে হবে। কোনো অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় সমাধান করতে হবে। সামাজিক সুরক্ষা খাতের ব্যয়ে সমালোচনা আছে। অনেকে বলেন, এতে অলস মানুষ বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু সরকার তা মনে করে না। এতে সমাজে ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে যৌথ উদ্যোগে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল গঠন করে তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন করার পরামর্শ দেন।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম বলেন, ব্যবসা শুরু করতে খরচের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। ব্যবসার ব্যয় এখনও বেশি। এ অবস্থার পরিবর্তন দরকার। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য তিনি ধাপে ধাপে করপোরেট করহার কমানোর সুপারিশ করেন।
আইডিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ খান বলেন, বিভিন্নভাবে বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। কিন্তু ব্যবসা করার ক্ষেত্রে এখনও পদে পদে বাধা। দেশ যে লক্ষ্যে এগোচ্ছে তা অর্জন করতে অবকাঠামো খাতে বছরে ২৫০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ দরকার। দেশ থেকে এই পরিমাণ বিনিয়োগ সম্ভব নয়। বিদেশ থেকে বিনিয়োগ অবশ্যই আসতে হবে। নীতিগত বিভিন্ন সমস্যার কারণে বিদেশিরা বিনিয়োগ নিয়ে আসছে না।
তিনি বলেন, তরুণ উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ ব্যবস্থা যদি সহজ না হয় তাহলে কোনো দেশই এগোতে পারবে না। কিন্তু বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা ব্যাংকে গেলেই জামানত চাওয়া হয়। উদ্যোক্তাদের তো ব্যবসায়িক আইডিয়া ছাড়া আর কিছু নেই। তাহলে তারা তহবিল পাবে কোথায়। এদিকে সঞ্চয়পত্রের উচ্চ সুদহারের কারণে ঋণের সুদহারও কমানো যাচ্ছে না। কারণ আমানতকারীরা নিরাপদে অনেক সুদে বিনিয়োগ করতে পারছেন। সঞ্চয়পত্রের সুদহার না কমানো হলে উদ্যোক্তারা ১৬ শতাংশ সুদের কমে ঋণ পাবে না।
তিনি তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব দিয়ে বলেন, প্রত্যেকটি ব্যাংক ২০০ কোটি টাকা আলাদা রেখে তরুণদের অর্থায়ন করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, হলমার্কের মতো প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংকের পাঁচ হাজার কোটি টাকা আটকে যাওয়ার চেয়ে শত শত তরুণ উদ্যোক্তার কাছে যদি আটকেও যায়, তাতে দেশের ক্ষতির চেয়ে বরং উন্নতি হবে। তিনি বড় বিনিয়োগের জন্য পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটকে শক্তিশালী করার প্রস্তাব করেন।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, বর্তমানে দেশে তরুণ সমাজ, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর আকার বড় হচ্ছে। আগামী ১৫ বছর এ অবস্থা থাকবে। যে কারণে তরুণদের চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়ার এখনই সময়।
তিনি বলেন, আগামী বাজেটের পরপরই জাতীয় নির্বাচন। কিন্তু নির্বাচনের জন্য কর কাঠামোতে এমন কোনো পরিবর্তন আনা ঠিক হবে না, যাতে পরে চাপ তৈরি হয়। বিশেষ করে করপোরেট কর কমানোর চাপ থাকলেও বিষয়টি পর্যালোচনা করতে হবে, প্রয়োজনে ধাপে ধাপে কমানো যেতে পারে। এ ছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
কনফিডেন্স গ্রুপের স্টিল উৎপাদন বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান করিম বলেন, সম্প্রতি অনেক অপ্রচলিত খাতে রফতানি হচ্ছে। বিশ্বের উন্নত দেশের প্রতিযোগীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে ওই খাতে প্রণোদনা দরকার।
শাশা ডেনিমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ বলেন, অর্থায়নের খরচ কমানো না গেলে বড় বিনিয়োগ হবে না। তিনি প্রণোদনায় নগদ সহায়তার পরিবর্তে বিদ্যুৎ বিলে ছাড় দেওয়ার মতো পদ্ধতিতে যাওয়ার প্রস্তাব করে বলেন, নগদ সহায়তার অনেক অপব্যবহার হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ বিলের মতো বিষয়ে প্রণোদনা দিলে সেখানে অপব্যবহার যেমন কমবে, তেমনি তরুণ উদ্যোক্তারাও সুবিধা পাবেন।
বেসিস সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবির বলেন, সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ায় কাজ করে যাচ্ছে; কিন্তু সাইবার নিরাপত্তা, নেটওয়ার্ক নিরাপত্তার ফায়ার ওয়াল ও অন্যান্য মালপত্র আমদানিতে শুল্ক্ক ৬৯ শতাংশ। আবার ইন্টারনেটে ১৫ শতাংশ ভ্যাট রয়েছে। এগুলো ডিজিটাল বাংলাদেশের ম্যান্ডেটের সঙ্গে যায় না। আবার আইটি খাত জামানতের অভাবে ঋণ পায় না, এ জন্য এই খাতের মেধাস্বত্ব বা বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদকে জামানত নেওয়ার প্রস্তাব করেন।
কেপিএমজির সিনিয়র পার্টনার আদিব খান বলেন, করের হয়রানি কমানো না গেলে এফডিআই আসবে না। তিনি রাজস্ব আয় বাড়াতে করের আওতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন। এ ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ব্যবসা করার পদ্ধতি সহজ করার প্রস্তাব করেন।
গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের এমডি ফারজানা চৌধুরীও করবিষয়ক হয়রানি কমানোর প্রস্তাব করেন। একইসঙ্গে বীমা খাতের সম্প্রসারণে সচেতনতা বাড়াতে সরকারকে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান। তিনি তরুণদের জন্য বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব করেন।
ইস্টার্ন ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান ও রশিদ বলেন, রাজস্ব ও খেলাপি ঋণ-সংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।
আহমেদ, জোনায়েদ অ্যান্ড পার্টনার্সের অংশীদার ব্যারিস্টার সাজিদ সামি আহম্মদ কর আইন সহজ করার প্রস্তাব করেন। এ আইন সহজ হলে রাজস্ব আয় বাড়বে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আইপে সিস্টেমের উপদেষ্টা মোহাম্মদ নূরুল আমিন বলেন, বড় বিনিয়োগের জন্য পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটকে ব্যবহার করার ব্যবস্থা নিতে হবে। ওষুধ ও আইটি খাতের রফতানি আয় বাড়ানো, এফডিআই নীতি সহজ করার প্রস্তাব করেন তিনি।
ভ্যানগার্ড এএমএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াকার এ চৌধুরী বলেন, দেশের উন্নয়নের মূল হাতিয়ার যুব সমাজ। এ জন্য দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা বাধ্যতামূলক করা দরকার। তিনি অবকাঠামো উন্নয়নে বিদেশ থেকে ঋণ না নিয়ে দেশে একটি বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব করেন।
তিনি বলেন, সরকার যদি এই তহবিলে অর্থদাতাদের কর ছাড় দেয় তাহলে সহজেই বড় তহবিল পাওয়া যাবে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে সমকালের নির্বাহী সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি বলেন, তরুণরাই দেশকে এগিয়ে নিচ্ছে। এ জন্য বাজেটেও তরুণ সমাজের দাবির প্রতিফলন থাকতে হবে। তরুণ উদ্যোক্তাসহ সবার জন্য বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির পদক্ষেপ থাকতে হবে বাজেটে। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে তরুণ সমাজকে গুরুত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে। বাজেটের মতো রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারেও তরুণ সমাজের উন্নয়নের বিষয়গুলো থাকা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।