
খোন্দকার জিল্লুর রহমান
কুড়িটি বৎসর একটা ছবিকে সকালে একবার সন্ধায় একবার নিজে শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে পরিস্কার করে বক্স খাটের সামনের অংশে মাথার পার্শ্বে ষ্টেন্ড করে করে রাখতেন। সব সময়ই ছেলেটা ঘুমিয়ে গেলেও ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে মোশারিটা ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে আসত, এটা তার নিত্য একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। দুয়েক সময় ছেলে লেখাপড়া করতে করতে বিছানায় ঘুমিয়ে পড়লেও মা নিজের বিছানায় যাওয়ার আগে ছেলের রুমে গিয়ে ছেলেকে একবার দেখে না আসলে নিজের ঘুমটাও ভাল হয় না। মায়ের হাতের স্নেহের স্পর্শ টের পেলে মাঝে মাঝে মাকে বলত মা আমি তো বড় হয়েছি, আসলে ছেলে মেয়ে বৃদ্ধ্য হলেও মা বাবার চোখে বা মা বাবার স্নেহের কাছে কখনো বড় হয় না। এতগুলি বছর নিলিমা ছেলের দিকে তাকিয়ে এই ছবিটাকে সঙ্গী করে মনের ভিতর চেপে রাখা সব রকম দুক্ষ কষ্ট আর ক্লান্তি অবসাদ সবকিছুকে ভুলে গিয়ে নির্দিষ্ট একটা লক্ষ মাত্রা অর্জনের জন্য অনেক ত্যাগ স্বিকার করেই বেঁচে আছে নিলিমা। কখনো কখনো নিজেকে অনেক অসহায় বলে মনে হলেও ছেলেকে ভুলক্রমেও বুঝতে দেয় নাই নিলিমা তার নিজের অসহায়ত্তের কষ্ট ও অনুভুতিটাকে। ছেলে মায়ের ব্যক্তিত্ব আর স্নেহের কাছে দুর্বল এবং শ্রদ্ধাশিল ছিল কারন নিলিমাইতো তার সবকিছুর প্রতি খুব স্বজাগ দৃষ্টিতে খেয়াল রাখত, কারণ বাবা হলেও সে, মা হলেও সেতো একজনই। ঘরের কাজ বাইরের কাজ সেরে অনেক সময় হাঁপিয়ে উঠলেও লক্ষ উদ্দেশ্য এবং ছেলের লেখাপড়ার প্রতি কোন অবহেলা তার ছিলনা, নিজেকে সব সময় সফল নারী হিসেবেই ভাবতেন। ভোরে উঠে নামাজ শেষে কোরান তিলাওয়াত নিলিমার স্কুল কলেজ জীবন থেকেই অভ্যাসে পরিনত হয়। সব সেরে সকালের নাস্তা নিজের হাতে তৈরি করে ছেলেকে খাওয়াতেন এবং নিজে খেতেন। কাজের মেয়ের রান্না নিলিমা বেশি একটা পছন্দ করতেন না, তাই শুধু ধোয়া মোছা, টেবিল পরিস্কার, খাওয়া দাওয়া টেবিলে এনে দেওয়াই ছিল জরিনার কাজ। কাজের মেয়ে বললেও ভুল হবে, জরিনা নিলিমার এক গরিব নিকট আত্মিয়ের মেয়ে, বাবা মা অন্যের জমি ও বাড়ীতে কাজ করে সংসার চালায়। অভাবের কারনে জরিনাকে স্কুলে পাঠানো সম্ভব হয় নাই সে আশা বাদ দিয়ে অন্যের বাসায় কাজের জন্য দিয়ে দেয়। ছোট্ট মেয়ে শহরে বদ্ধ বাসায় কাজ করতে করতে বেহাল, তার উপর গৃহকর্তির অত্যাচার ও খাবার কম দেয়ায় মেয়েটা কঙ্কালসার হয়ে যায়, সুযোগ বুঝে এক দিন পালিয়ে বাড়ীতে বাবা মার কাছে চলে আসে।

নিজ মা বাবা ও একমাত্র ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ একটু কম থাকলেও একই শহরের থাকার কারনে ছোট বোনের সাথে নিলিমার যোগাযোগ এবং আসা যাওয়া ঠিকই আছে। ছোট বোনটি বড়বোন নিলিমাকে মায়ের মতই শ্রদ্বা করে কারণ স্কুল থেকে শুরু করে কলেজ ভার্সিটি লেখাপড়া শেষ করা পর্যন্ত নিলিমাই তাকে নিজের কাছে রেখে সবরকম দেখভাল করেছে তাই ছোট বোনের সাথে সম্পর্কটা অটুট বন্দনেই আছে নিলিমার। বোনের কাছে জরিনার বাবা মার কষ্টের কথা শুনে জরিনাকে নিজের কাছে নিয়ে আসে। কাজ কর্মের চাপ বেশি না দিয়ে মেয়েটাকে লেখাপড়া করানো সহ নিজের মত করে রাখতে চেষ্টাকরে নিলিমা। অফিসের কাজ ঘরের কাজ কেনাকেটা সহ সামাজিক অবস্থান ঠিক রেখে সকল ফরমালিটি সেরে মাঝেমাঝে হাঁপিয়ে উঠতেন নিলিমা, হাসির ছলে বলতেন ‘আমি টায়ার্ড হলেও এখনো রিটায়ার্ড হই নাই, আমি ভালো আছি। এভাবে চলতে চলতে সময়ের আবর্তে অনেক বেলা গড়িয়ে গিয়েছে, পার হয়ে গেছে জীবনের কুড়িটি বসন্ত। প্রথম জীবনের একটা বসন্তের কথা মনে হলেই নিলিমা একটু কেমন জানি হয়ে যায়, ছেলেটাকেও নিজের কাছ থেকে ছাড়াতে চায়না, কি করা বিশেষ করে এরকম বয়সে ছেলে মেয়েরা বসন্তের এই দিনে ঘরে থাকতে চায় না। নিজের আদর্ষে গড়ে তুলতে গিয়ে ছেলের কোন স্বাধ আজও অপূর্ণ রাখেনাই মা। ছেলের কথা ভাবতে ভাবতে নিজের জীবনের সেই স্বরনীয় বসন্তের কথা তার চোখের সামনে ভেসে উঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কালে নিয়াজের সাথে পরিচয় হয় নিলিমার, মেধাবি ছাত্র নিয়াজ সব ক্লাসেই ভাল রেজাল্ট মিশুক এবং ভদ্র ছেলে, নিলিমাই কম কিসে লেখাপড়ায়ও অসম্বভ ভালো, যেমন লম্বা তেমন সুন্দর শারিরিক ঘঠন, টানা টানা চোখ আর শৈল্পিক মন নিয়াজকে চির জীবনের জন্য আকৃষ্ট করে ফেলে। সঞ্চিত অনুভুতি দুজন দুজনকে অনেকদুর নিয়ে যায়।
নিয়াজের বাবা মা রাগি মানুষ, কিছুতেই নিজেদের ইচ্ছা বা মতের বাইরে কোন মতামত বা কোন কিছুকেই ছাড় দেন না, এমনকি নিজের ছেলে মেয়েদের কোন আপদার বা যুক্তি যুক্তক কোন মতামতকে ও কখনো প্রাধান্য দিতনা। নিজেদের প্রভাব আর প্রতিপত্বির অহংকারে অহংকারি ছিলেন। তাতে কি আসে যায় নিয়াজের, সেতো ঐ বাবা মায়েরই সন্তান। বিশ্ববিদ্যালয় লেখাপড়া শেষ করে দুজনেই ভাল চাকুরিতে ডুকে যায় কিন্তু দুজনের যোগাযোগ ঠিকই থাকে। নিজেদের পরিকল্পনায় এক বসন্তের প্রথম দিনে নিয়াজ নিলিমাকে কাঁচা ফুলে সাজিয়ে নিজের জীবন সঙ্গী করে নিয়ে বাড়ীতে এসে বাবা মার সামনে হাজির। নিজেদের জীবনে বসন্ত বরন থাকলেও নিয়াজ নিলিমার বসন্ত বরন গ্রহণ করতে পারেন নাই
নিয়াজের বাবা মা, দরজা থেকেই বের করে দেন নিয়াজ নিলিমাকে। বাবা মায়ের এরকম ক্ষুদ্ধ প্রতিত্রিুয়ায় নিয়াজ একটু
ভেঙ্গে পড়লেও নিলিমার প্রেরনায় দুজনে ঠিকই পরিস্থিতি সামলে নেয়। নিয়াজ নিলিমাকে নিয়ে কর্মস্থলে হাজির, বন্ধুর বাসায় উঠে সল্প সময়ের মধ্যে বাসা ভাড়ানেয় পরবর্তিতে ফ্লাট কিনে নিজেদের ফ্লাটে উঠে। দাম্পত্য জীবনে বছর দুয়েকের মাথায় তাদের ঘরে আসে নতুন মেহমান, তারা হয়ে যায় এক পুত্র সন্তানের জনক-জননি, দুজনের নামের সাথে মিল করে আদরের সন্তানের নাম রাখেন ‘নিল’। নিলিমাকে শশুর শাশুড়ির গ্রহণ না করার দহন তার মনে একটা সুপ্ত যন্ত্রনা স্থান করে রয়েছে যা বাহ্যিক ভাবে সে কাউকে দেখায় নাই। নিজের বাবা মাকে ছেড়ে শশুর বাড়ী এসে শশুর শাশুড়িকে নিজের মায়ের মত আপন করে নিতে চেয়েছিল তা নিলিমার ভাগ্যে জুটে নাই।

সুন্দর জীবনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করে, চাকুরির পাকে দুজনে যার যার সুবিদা মত ছেলেকে স্কুল থেকে আনা নেয়া করে, এমনই এক বসন্তের দিনে নিয়াজ নিল কে স্কুলে পৌছে দিয়ে আসার পথে বেপরোয়া গতির ট্রাকের ধাক্কায় মোটর সাইকেল থেকে নিয়াজ ছিটকে পড়ে রাস্তার আইল্যন্ডের সাথে মাথা হোচট খায়, অচেতন অবস্থায় আস-পাসের মানুষ নিয়াজকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও তাকে আর ফেরানো সম্ভব হয় নাই, ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষনা করে। সে থেকেই নিয়াজ ছবি হয়ে বেঁচে আছে নিলিমার জীবনে, তাই ছেলের দিকে তাকিয়ে ভবিষ্যতের আর কোন ভিন্ন চিন্তা না করে নিয়াজের ছবিটাকে শাড়ির আঁচলে মুছে চোখের সামনে রাখতেন খুব সুন্দর করে। শোক বেদনা কাটিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে নিয়েছে নিলিমা,আজ আর কোন প্রতিকুলতায় সে নিজেকে পরাজিত মনে করেনা সব কিছু সহজ ভাবে গ্রহণ করে। ছেলেটা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সফল ভাবে শেষ করে একটা বিদেশি ফার্মে নিজেকে কর্পোরেট হিসেবে নিয়োজিত করেছে, আজ মার মনটাও একটা সফলতার আনন্দে আনন্দিত, একজন সফল নারী হিসাবে সে নিজেকে সফল করে নিয়েছে। মাঝে মাঝে খাবার টেবিলে বসে খাবার খেতে খেতে বাবা মার কথা,দাদা দাদির কথা সহ নিজের জীবনের অনেক কিছুই ছেলের সাথে শেয়ার করে, মনে মনে কিছু একটা ভাবতে যায়।
সকাল থেকেই মনটা কেমন জানি করছে, হাত থেকে যেন সবকিছু ফসকে পড়ে যায়, সব যেন তালগোল পাকিয়ে যায় নিলিমার। আজ থেকে ঠিক ২৫ বছর আগের এই দিনের একটা স্মৃতি নিলিমাকে তাড়া করছে। ছেলেটা কখন যে বেরিয়ে গেছে খেয়াল করে নাই, প্রতি বছর এই দিনে বন্ধুদের নিয়ে সে বেশ কিছু সময় কাটায়,তাই মা চিন্তিত নয়। নিয়াজের বিদায়ের পর অনেকবারই শশুর শাশুড়ি নিলিমাকে নিতে আসে নিলিমা যায়নাই। সময়ের কাজ সময়ে না হওয়া, প্রিয় মানুষ নিয়াজের চলে যাওয়া, পরবর্তিতে দীর্ঘ একাকিত্ব সময় কাটিয়ে উঠা সহ জীবনের অনেক গুলি স্মৃতি নিলিমাকে একটা ভাবনায় নিয়ে যায়। দুপুরে ছেলে সহ একসাথে খওয়া দাওয়া করবে বলে টেবিলে খাবার দাবার বেড়ে অপেক্ষা নিলের জন্য অপেক্ষা করতে করতে খাবার টেবিলে দুই বাহুর উপর মাথাটা নুইয়ে ঘুমিয়ে পড়ে । এদিকে বিকাল গড়িয়ে কখন যে সন্ধা নেমে আসে বুঝতে পারেনাই। দরজায় ছেলের কড়া নাড়ার শব্দে জেগে উঠে ঘুম ঘুম চোখে দরজা খুলতে যায় কেমন জানি একটা অজানা ভয়ে বুকটা ধড়ফড় করছে নিলিমার। দরজা খুলতেই চোখ দুটো চড়কগাছ। শ্রদ্ধা ও অবনত মাথায় নিল মাকে বলে ‘মা, ও শিখা’ অবিকল মায়ের চেহারা । নিলিমা একবার নিজের দিকে তাকায় একবার শিখার দিকে তাকায়। মনে হয়েছে ২৭ বছর আগের সেই নিলিমা আজ তার সামনে দাড়িয়ে সেই কাঁচা ফুলের সাজে! শিখা মা বলতেই নিলিমা অতিতের সব কষ্ট ভুলে আদরে আদরে হাসতে হাসতে হাত বাড়িয়ে দিয়ে মায়ের স্নেহে নিল-শিখাকে দুহাতে বরন করে নেয়। শিখার মনটা আনন্দে ভরে উঠে নিজের মাকে ছেড়ে শিখা একজন আসল ‘মা’ পেয়েছে। এরই মাঝে নিলিমার ছোট বোন একঝুড়ি কাঁচা ফুল নিয়ে বাসায় হাজির, অনাকাঙ্খিত এই আনন্দে সে নেচে উঠে বোনকে জড়িয়ে ধরে বলে দেখ্ দেখ্ এইতো “নিলিমার নিল-শিখা” কেমন মানিয়েছে ওদের,ওরা সুখি হবে.. আমি খাট সাজিয়ে দেবো…।
লেখক ঃ দফতর সম্পাদক, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, সম্পাদক ও প্রকাশক, অর্থনীতির ৩০ দিন।












