পোশাক রপ্তানিকারকরা বলছেন এখন টিকে থাকাই দায়

অর্থনীতির ৩০ দিন ডেস্ক :
ঢাকা ইপিজেডের ফ্যাশন ডটকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খান মনিরুল আলম শুভ বললেন, ‘হাবুডুবু খাচ্ছি’। চট্টগ্রামের এরিয়ন ড্রেস কারখানার মালিক মোহাম্মদ আতিক জানালেন, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি টেনেটুনে চালালেও মার্চে কোনো রপ্তানি আদেশ নেই তার হাতে। ঢাকার তেজগাঁওয়ের পস গার্মেন্টসের পরিচালক ওয়াসিম জাকারিয়ার ভাষায়, রপ্তানিতে এমন খরা আগে কখনও দেখেননি তিনি।
পোশাক শিল্পের এই তিন উদ্যোক্তার কথায় ফুটে উঠল দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাতে করোনাভাইরাস মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাব কতটা গুরুতর হয়ে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক, কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগকারীর এই খাতে নতুন করে অচলাবস্থা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা উঠেছে।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক থেকে, ফলে এই শিল্প দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত।
গত বছরের মার্চে বাংলাদেশ ও এশিয়া অঞ্চলে যখন কোভিড-১৯ সংক্রমণ শুরু হয়, তার পরের মাসেই দেশের পোশাক খাত মুখ থুবড়ে পড়ে। গড় রপ্তানি দুই-তৃতীয়াংশ কমে এক বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যায়।
বেতন বকেয়া, আকস্মিক ছাঁটাই ও কর্মহীনতার মুখে পড়ে ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জের শ্রমঘন এলাকায় শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ঋণ নিয়ে শ্রমিকদের বেতন চালিয়েছিল পোশাক শিল্প মালিকরা। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত রপ্তানি বাড়ায় তারা আশাবাদী হলেও নতুন বছরের শুরুতে নেমে এসেছে হতাশা।
১৯৮৮ সাল থেকে ঢাকার তেজগাঁও শিল্প এলাকায় পস গার্মেন্টস চালিয়ে আসা ওয়াসিম জাকারিয়া বলেন, এখন পিক সিজন থাকার কথা, অর্থাৎ ১০ থেকে ১১ ঘণ্টা ব্যস্ত থাকার কথা।
সাধারণত ৯০ দিন আগে থেকেই সব অর্ডার বুক করা হয়। অথচ এখন আট ঘণ্টা করে কাজ করলেও ফেব্রুয়ারির মধ্যে সব অর্ডার শেষ হয়ে যাবে। মার্চের পরে কোনো অর্ডারই নেই। মার্চের কাজ কবে আসবে সেটা বলা যাচ্ছে না।
১২০০ শ্রমিকের এই কারখানায় উৎপাদিত লেডিস গার্মেন্টস ইউরোপের ১২টি দেশ, মেক্সিকো, তুরস্ক, সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়।
ওয়াসিম বলেন, সাধারণত লাভ করতে হলে দৈনিক ১০ ঘণ্টা করে চালাতে হয়। এখন ৮ ঘণ্টা করে চলছে, তাতে খরচ কিছুটা পোষাচ্ছে।
চট্টগ্রামের চকবাজারের এরিয়ন ড্রেস কারখানার মালিক মোহাম্মদ আতিক বলেন, আমি মূলত ইউরোপে রপ্তানি করে থাকি। উভেন ও নিট সেক্টর মিলিয়ে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে সক্ষমতার ৬৫ শতাংশে কাজ চলছে। মার্চ মাসের জন্য আগাম কোনো অর্ডার নেই।
২০০৩ সাল থেকে সাড়ে তিনশ শ্রমিক ও কর্মকর্তা নিয়ে ছোট পরিসরে পোশাক রপ্তানি করে আসছে এরিয়ন ড্রেস। এমন সঙ্কট আগে দেখেননি বলে জানান এর মালিক আতিক।
ঢাকা ইপিজেডের সফটটেক্স সোয়েটারের মাসে ১০ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি সক্ষমতা রয়েছে। এই কারখানারও মার্চের কোনো রপ্তানি আদেশ নেই।
সফটটেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজওয়ান সেলিম বলেন, জানুয়ারিতে ৪৪ শতাংশ সক্ষমতায় চলছিল। ফেব্রুয়ারিতে ২০ শতাংশে নেমে যাবে।
সাধারণত অর্ডারগুলো তিন মাস আগেই আসে। মার্চ মাসের জন্য কোনো অর্ডারই নেই। শ্রমিক সংখ্যা ১৩০০ থেকে সাড়ে আটশতে নামিয়ে আনা হয়েছে।
তিনি বলেন, ইউরোপে এখন সব দেশেই লকডাউন। দোকানপাট সব বন্ধ। অর্ডার কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে। খুবই খারাপ অবস্থা, এই পরিস্থিতিতে সামনে কীভাবে সার্ভাইব করব, সেটা এখনই বলা কঠিন।
আরেক কারখানা ফ্যাশন ডটকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খান মনিরুল আলম শুভ বলেন, গত মাসে উভেনে তার কারখানার রপ্তানি আদেশ ১৮ শতাংশ কমেছে। বর্তমানে তার উভেন শাখায় ৪৫ দিনের ও নিট শাখায় ৩৫ দিনের কাজ আছে। সাধারণত ১০ ঘণ্টা করে কাজ চললেও সেটা এখন আট ঘণ্টায় নামিয়ে এনেছেন।
নতুন অর্ডার নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় থাকার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, একদিকে সুতার দাম বেড়েছে, অন্যদিকে নতুন অর্ডারগুলোতে পণ্যের দাম কমেছে। এখন সামান্য লোকসান নিশ্চিত জেনেও শুধু কারখানা সচল রাখার স্বার্থে অর্ডারগুলো নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি।
তিনি বলেন, উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে তুলার দাম বেড়েছে। তাই প্রতি কেজি সুতার দাম ২ দশমিক ৬ ডলার থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৬ কেজি হয়েছে।
শুভ বলেন, নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ হচ্ছে গার্মেন্টের বিশেষ পিক সিজন। এই সময় ১০-১১ ঘণ্টা কাজ করেও শেষ করা যায় না। নিঃশ্বাস ফেলার সময় থাকত না।
মার্চ-এপ্রিলের দিকে ইউরোপে সামার শুরু হয়। তাই এই সময়ে টি-শার্টগুলোর অর্ডার পড়ার কথা। কিন্তু সেটা এখন নেই। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিদেশি ক্রেতারা দামও কমিয়ে দিচ্ছেন বলে জানান তিনি।
বায়াররা যে দাম অফার করছে, তাতে কাপড়ের দাম পোশাকের দামকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বায়াররা সুবিধা নিচ্ছে, যেহেতু কারখানায় অর্ডার নেই। পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠনের নেতারা বলছেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ে উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিপর্যস্ত হওয়ায় দেশের পোশাক খাত বড় ধাক্কা খাবে।
বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ মনে করেন, দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কা আগের চেয়েও বেশি উদ্বেগের।
তিনি বলেন, ইউকে, জার্মান, ফ্রান্সের অবস্থা খারাপ। আমেরিকার অবস্থাও ভাল না। আমাদের যেহেতু ফ্যাশন ওয়ার্ল্ডের জিনিসপত্র, বড়দিনের বিক্রিও খারাপ হয়েছে। বিক্রি বন্ধ করে দিতে হয়েছে ওদের।
প্রথম ঢেউয়ে কিন্তু এতটা ছিল না, এখন অবস্থা খুবই খারাপ। সবাই টার্গেট করেছিল, ক্রিসমাসে ক্ষতিটা পুষিয়ে উঠবে। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। বড়দিনকে সামনে রেখেই ইউরোপ-আমেরিকায় সারা বছরের ৫০ শতাংশের মতো বিক্রি হয়। সেটা যখন ড্রপ করে তখন তাদের সবাই ক্ষতির সম্মুখীন হয়। অনেকে অর্ডার বুকিং দিয়েও পরে সেগুলো ইস্যু করেনি। ইভেন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান পারভেজ বলেন, অর্ডার পাওয়া এখন ভাগ্যের খেলায় রূপ নিয়েছে।
বিডিনিউজ