বীমা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বিআইএ নাকি আইডিআরএ, এজেন্ট লাইসেন্স থাকছে না

খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
আমাদের একটা প্রবাদে আছে, গন্ডারকে কাতুকুতু দিলে নাকি ১ সপ্তাহ পরে হাসে। গন্ডারের চামড়া ভারি বলে কাতুকুতু অনুভব করতে গন্ডারের এক সপ্তাহ সময় লাগে। কথাটা বলতে হল এ কারনে, নন-লাইফ বীমা প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তি এজেন্ট কমিশন ০% (শূন্য শতাংশ) নির্ধারন করা প্রসঙ্গে। সুদীর্ঘ অতীত থেকে, ০% অর্থ্যাৎ শূন্য শতাংশ কমিশন নিয়ে অর্থনীতির ৩০ দিন পত্রিকায় এবং অর্থনীতির ৩০ দিনবিডি ডটকম, ও সময়ের অর্থনীতি পত্রিকায় ধারাবাহিক ৪/৫টি প্রতিবেদন উঠার পরও বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)’র টনক নড়ে নাই। আর নড়বেইবা কি ভাবে, আইডিআরএ তো বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণের দিকে না তাকিয়ে নিজেদের উন্নয়ন ও পুঁজিকরনের দিকেই তাকিয়েছেন বেশি। অনেকে আবার প্রতিষ্ঠানটিকে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ না বলে বীমা নিয়ন্ত্রণ ও অবনমিতকরন প্রতিষ্ঠান হিসাবে আখ্যায়ীত করেছেন। আসলে প্রশ্ন জাগে, আমাদের বীমাখাতের কর্তৃপক্ষ কি বিআইএ না কি আইডিআরএ ??
নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীগুলির দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, অনৈতিক কর্মকান্ডসহ কমিশন প্রতিযোগিতায় এখন প্রায় শীর্ষস্থান ছুঁইছুঁই। আর এসবের সাথে জড়িত কোম্পানীর চেয়ারম্যান, পরিচালক ও মুখ্যনির্বাহী কর্মকর্তাদের নিয়ে এবং তাদের সহযোগিতা ও অনৈতিক প্রতিযোগিতায় পুরো ইস্যুরেন্স সেক্টর এখন টালমাটাল অবস্থার দিকে দ্রুতগতিতে ধাবিত হইতে যাইতেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইন্স্যুরেন্স ডেভলাপমেন্ট এন্ড রেগুলেটরি অথোরেটি (আইডিআরএ) নখদন্তহীন কাগুজে বাগের ভূমিকায় অবতীর্ণ।
ইন্স্যুরেন্স ডেভলাপমেন্ট এন্ড রেগুলেটরি অথোরেটিকে (আইডিআরএ)সহ অর্থমন্ত্রণালয়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে (লাইফ-ননলাইফ) বীমা কোম্পানীগুলি বেশকিছু দুর্নীতিবাজ ব্যবস্থাপনা পরিচালক(এমডি), চেয়ারম্যান এবং পরিচালকরা এহেন দুর্নীতি, এবং লুটপাটের মহা উৎসবে নেমে পড়েছেন। বীমা খাতের অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট, কমিশন প্রতিযোগিতা ও মিথ্যাতথ্য দিয়ে তহবিল আত্মসাৎ’, কোন রকম বিজ্ঞপ্তি না দিয়ে বা কোন রকম নিয়ম নীতি বা রিক্রুটমেন্ট পলিসির অনুসরন ছাড়াই ভুয়া নিয়োগ দেখানোর মধ্যদিয়ে বেতন ভাতার নামে বিশাল অঙ্কের টাকা উত্তলন করে নেওয়া, অবৈধ পথে জনগণের জামানো অর্থ বিদেশে পাচার করা, সরকারের কর ফাকি দেওয়া, আইডিআরএ’র বেঁধে দেয়া আইন ভঙ্গকরে অতিরিক্ত কমিশনে ব্যবসা করা, অতিরিক্ত কমিশনকে জায়েজ করার জন্য ডামি কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে অনৈতিক ভাবে পলিসি/ কাভারনোট বাতিল করে প্রিমিয়ামের টাকা গোপন করে মালিকদের বাসায় ব্যাগ ভর্তি টাকা পাঠানো, অনৈতিক মনোভাব নিয়ে স্বীয় স্বার্থ হাসিলের জন্য কোন কোন ক্ষেত্রে যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও পরিচালনা পর্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সম্মতি ছাড়া নিজের পছন্দসই (ব্যবস্থাপনা পরিচালক) এমডি/সিইইউ/ মুখ্য নির্বহী কর্মকর্তা চলতি দায়িত্বে নিয়োগ দেয়ার মাধ্যমে একই সিন্ডিকেট, কোম্পানী গুলিকে ঠিক পূর্বের লাগামহীন অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে। এতদ সত্বেও আইডিআরএ নির্বিকার থাকা মানে, “ডাল মে কুছ কালা হে” যা খাত সংশ্লিষ্টদের বুঝার বাকি রয় নাই।
দীর্ঘ সময় পরে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন(বিআইএ) ০% অর্থ্যাৎ শূন্য কমিশন প্রথা নিজেদের তাগিদে, এক কথায় যখন নন-লাইফ বীমা কোম্পানিগুলো সর্বোচ্ছ কমিশন দিতে দিতে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, এমন অবস্থা থেকে উত্তরনের জন্য নিজেরা নিতে যাওয়ার সিদ্ধান্তে উপনিত হওয়ায় আইডিআরএ এর টনক নড়ে এবং বিআইএ’র সিদ্ধান্তে একিভুত হয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ধার্য প্রায় ১৫% কমিশনসহ ব্যক্তি এজেন্টদের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর এতে প্রমানিত হয় বিআইএ এর নিকট আইডিআরএ অসহায় এবং জিম্মি, অর্থ্যাৎ বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)’র বীমা খাতে কোন উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কোনটাই নাই। মানে আইডিআরএ শুধু কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত ব্যায় বা সাধারন ছুতা ধরে কোম্পানিগুলোকে জরিমানা এবং নিজেদের আখের গুছানোতেই সীমাবদ্ধ।
অপরদিকে কোম্পানিগুলি এবং ব্যক্তি এজেন্টসহ ব্যাংকের সাথে বিপনন বা ব্যবসা করতে গিয়ে আইডিআরএ এর নির্ধারিত কমিশনসহ ব্যক্তি এজেন্টদের দেয় সর্বোচ্ছ কমিশনসহ যে হিসাব আসে, তা কোম্পানিগুলোর সাথে বিপনন করা ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তাদের পকেট পুরন করতে করতেই নিজেদের রুটি রুজির কোন উপায় থাকে না। উপরন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকও ব্যাংক ও কোম্পানিগুলোর এ ব্যাপারে সূক্ষ্ম মনিটরিং না থাকাতে সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমান রাজস্ব। এখানে আরো একটা ব্যাপার পরিলক্ষিত হয়, যা ব্যাংক এবং ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির সমঝোতায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ডামি একাউন্ট খোলা হয়, উদাহরন স্বরুপ, যেমন কোম্পানির নাম ‘দূর্নীতি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড‘ একাউন্ট খোলা হল দূর্নীতি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি . (ডট বা বিন্দু) লিমিটেড’ এখন ব্যাবসা শেষে পার্টি থেকে ‘দূনীতি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড’ নামে চেক বা পে অর্ডার এনে একটি . ডট বা বিন্দু বসিয়ে সম্পুর্ণ ক্যাশ টাকা উত্তোলন করে বাংলাদেশ ব্যাংকে হিসাবের তথ্য পাঠানোর পুর্বেই হিসেব ক্লোজ করে দিয়ে নিজেদের আখের গুটানোর মাধ্যমে বীমাখাতকে ধ্বংস করায় সিদ্ধহস্ত। আর এটা সম্ভব শুধু বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)’র এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্ময়হীনতার কারনে।
সর্বোপরি এসব অপকর্ম এবং দূর্নীতি হতে বীমাখাতকে দেশের জিডিপির অংশীদার হিসেবে টিকিয়ে রাখার জন্য বীমা মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) এর নিজস্ব উদ্যোগে নেয়া শূন্য % কমিশনে নন-লাইফ বীমা খাতে ব্যক্তি এজেন্টদের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। আগামী ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের সব নন-লাইফ বীমা প্রতিষ্ঠানকে তাদের ব্যক্তি এজেন্ট লাইসেন্স স্থগিত করার জন্য আইডিআরএ-তে প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়েছে। প্রস্তাবের ভিত্তিতে ওই খাতের ব্যক্তি এজেন্ট কমিশন শূন্য ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে যা ১জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর বলে গন্য। সোমবার (১ ডিসেম্বর) এই নির্দেশনা জারি করে আইডিআরএ। নির্দেশনায় স্বাক্ষর করেন সংস্থার উপ-পরিচালক (নন-লাইফ) মো. সোলায়মান। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রজ্ঞাপন জারির পর কোনো নন-লাইফ বীমা প্রতিষ্ঠান কমিশন সংক্রান্ত কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা লঙ্ঘন করছে কিনা তা মনিটরিং করা হবে। আইডিআরএ আরও জানিয়েছে, লোকবল সংকটের কারণে মনিটরিং কার্যক্রমে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ)-কে সহযোগিতা করতে হবে। এ লক্ষ্যে কর্তৃপক্ষ ও বিআইএ মিলিয়ে একটি ভিজিলেন্স টিম গঠন করা হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি এজেন্ট কমিশন শূন্য শতাংশ বাস্তবায়নে নির্দেশনা অমান্য করলে ভিজিলেন্স টিম তা আইডিআরএ-কে জানাবে। পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই করে বীমা আইন, ২০১০ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
গত ২৫ নভেম্বর আইডিআরএ, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন এবং বীমা কোম্পানিগুলোর মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভার সিদ্ধান্তের আলোকে দেশের সব নন-লাইফ বীমা কোম্পানিকে নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)‘র শীর্ষ কর্মকর্তার কথায় প্রমাণিত হল যে অতীতে তিনি বিআইএ, বিআইএফ, এবং নির্দিষ্ট কারো কারো চাপের নিকট অথবা কোন অদৃশ্য শক্তির নিকট ভীত হয়ে এ প্রবিধানমালার পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন। কমিশন নিয়ে বিআইএ’র কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সভার তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, যারা বাহ্যিক ভাবে কমিশন নিয়ে কথা বলেন, ভিতরগতভাবে তারাই সর্বোচ্ছ কমিশনে ব্যবসা করে যাচ্ছেন, আবার যারা অটোমেসন সফটওয়্যার বিক্রয় ব্যবসার মাধ্যমে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)‘কে বিশাল অঙ্কের খরচের মাধ্যমে কমিশন বন্ধে প্রলুদ্ধ হওয়ার উপদেশ দিচ্ছেন, অথচ দুঃখের বিষয় হলো তাদের কোম্পানিই আইডিআরএ’র প্রদত্ত কমিশনের বিধান লঙ্গন করে সর্বোচ্চ কমিশনে ব্যবসা করে যাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বিআইএ এর নব নির্বাচিত কমিটির সভাপতির মতে তিনি বীমাখাতকে অবৈধ কমিশন এবং অনিয়ম থেকে উদ্ধার করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। আবার খাত সংশ্লিষ্ট সকলের প্রত্যাশা, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)এবং বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ)এর যৌথ উদ্যোগে নেয়া ব্যক্তি এজেন্ট কমিশন শূন্য যাতে স্থায়ীভাবে বলবত থাকে…