
খোন্দকার জিল্লুর রহমান

হঠাৎ একটা ঝাটকা হাওয়া বারান্দায় বসে থাকা মুনিরা ইসলামের শাড়ির আঁচলটায় নিজের মুখটা ঢাকনা দিয়ে দেয়। চিন্তিত আর আনমনা অবস্তায় ব্যাপারটা বুঝতে পারেনাই মুনিরা ইসলাম। বুকের উপর ঢাকনা দেওয়া শাড়ির আঁচলটাই মুখটাকে ঢেকে দেয় বাতাসের ঝাটকায়। স্তম্ভি ফিরে পেয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে দেখে বুঝতে আর বাকি রইলনা যে আমি একজন ‘মা’। মা ব্যপারটা একটু অন্যরকম। দীর্ঘ দিন আগের একটা স্মৃতি মাঝে মাঝে তার চোখের সামনে ভেসে উঠে, কোন অবস্তাতেই দৃশ্যটা মন থেকে সরাতে পারে না। একটা মা কিভাবে সন্তানের জন্য জীবন দিতে পারে? খুবই স্বল্প আয়ের প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা মুনিরা ইসলাম, জীবনের গতিকে সবসময় সাদাসিদা করে চালাতে অভ্যস্ত সে। সরল এবং সৎ মানুষ হিসাবে এলাকাতে সকলেই তাকে চিনে, স্থৈতিক জ্ঞানটাও তার বেশ ভাল যার কারনে আশ-পাশের মহিলা এবং মেয়েরা তার কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে বিভিন্ন কাজে অগ্রসর হত। একদিন স্কুল ডিউটি সেরে বাড়ী ফেরার পথে স্বচক্ষে দেখার ঘটনাটা আজও তাকে তাড়া করে। রেল লাইনের পাশের বাড়ীর একজন মহিলা তার ৪/৫ বছরের বাচ্ছা ছেলেটাকে ঘরে রেখে রেল লাইনের ওপারে দোকানে একটা সদাই কিনতে যায়, দোকান থেকে সদাই কিনেনিয়ে ফিরতেই দেখে তার ছেলেটা হাঁটতে হাঁটতে রেল রাইনের উপর চলে আসে কিন্তু উল্টোদিক থেকে দ্রুত গতিতে ট্রেন আসতেছিল, কিছুই বুঝে উঠার আগেই দৌড়ে এসে ছেলেটাকে ধাক্কামেরে সরিয়ে দিয়ে রক্ষা করতে পারলেও নিজেকে আর রক্ষা করতে পারেন নাই। ট্রেনের চাকায় তার দেহটাকে দ্বিখন্ডিত করে ফেলে। ট্রেনটা চলে যাওয়ার পর জড়ো হওয়া মানুষের আহাজারি সহ চোখের সামনে ঘটে যাওয়া দৃশ্যটা মুনিরা ইসলামের মাতৃত্ববোধকে আরো বেশি জাগ্রত করে তুলেছে। অনেক সময় মুনিরা ইসলাম পত্র পত্রিকায় দেখেছে, সন্তানের জন্য বাবা-মা প্রাণ দিয়েছে, চোখের সামনের এই ঘটনাটা যেন নিজের জীবনটাকে পাল্টে দিয়েছে। নিজের চোখকে তো আর অবিস্বাস করা যায়না, কিšু‘ বাবা-মায়ের জন্য সন্তান জীবন দিয়েছে এমন নজির তার জীবনে বিশেষ একটা মনে পড়েনা বা পত্র পত্রিকাতেও তেমন একটা চোখে পড়েনাই।
বয়স, স্কুলের নিয়মিত ডিউটি, জীবনের একগেয়েমিতা এ সময়ে এসে চেহারাটা মলিন হয়ে গেছে, তবুও স্বামীর ভালবাসায় শিক্ত এক সন্তানের জননী মুনিরা ইসলাম নিজের আদর্শ ও সফলতায় প্রাউড ফিল করেন। স্বামীর নাম প্রকাশ্য না বলে নামের অংশটা নিজের নামের সাথে লিখতে (মুনিরা+ইসলাম) মুনিরার খুবই ভাল লাগত এবং মনে মনে একটু সূখ অনুভব করত। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অধ্যাপক দক্ষিণা রন্জন মিত্র মজুমদারের লেখা বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’তে পড়েছিলেন ‘বিশেষনের সবিশেষ কহিবারে পারি, যাননি স্বমীর নাম নাহি লয়ে নারী’। তাই স্বামীর পুরু নাম মুখে না বলে নামের শেষ অংশটা নিজের নামের সাথে লিখে স্বামীর প্রতি মমত্ববোধ ও নিজের গৌরবে গর্বিত ছিলেন। ছেলেকে সফল মানুষ হিসাবে তৈরি করার জন্য সকল প্রকার ত্যাগ স্বিকার করলেও কোন উগ্রতা অসম্মান বা কোন নীতি হীনতার কাছে মাথা নত করেন নাই। দূরদর্শিতা ও তিক্ষè বুদ্ধিতে সে ছিল আপোষহীন। ছেলের আয় উপার্জন কম হওয়াতে মা ছেলের বাসায় তেমন একটা যাওয়া আসা করতে চাইতেন না, বাসায় খুব সাধারন আসবাবপত্র, সাদামাটা জীবন, নীতিগতভাবে চাকুরি ছেলেটাকে বেশ ভালোই লাগছিল কিন্তু…।
জীবনের একটা পর্যায়ে এসে মুনিরা ইসলাম নিজেকে একটু অসহায় মনে করেন, তার একটা কারণ হল ¯া^ামীর অপ্রত্যাসিত মৃত্যু। মৃত্যু কারোই কখনো কাম্য নয়, যদিও বার্ধক্যজনিত কারণ, তবুও এ মৃত্যু মুনিরা ইসলামকে অসহায় ও নিরাপত্তাহীন অবস্থানে নিয়ে গেছে। যৌবন থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত জীবনের দীর্ঘ ৪৫টি বছর একসাথে পার করে দেওয়া কোনো কিছু মনে না করলেও এখন মনে একটু ভয় করে একা একা স্বামীর ভিটায় থাকতে। ছেলে ইতিপুর্বে ২/১ বার শহরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও মুনিরা ইসলাম

যাননাই, স্বামীর ভালবাসাকে অবমুল্যায়ন করে এবং স্বামীর একা থাকার কথা চিন্তা করে কখনো বাড়ী
ছেড়ে যান নাই। আবার এটাও অস্বিকার করার কোন অবকাশ নাই যে মনের দিক থেকে কখন যে স্বামীকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশী ভালবেসে ফেলেছেন। সুখ সমৃদ্ধি ও দাস্পত্ব জীবনে কখনো কোন সন্দেহ বা কোন রকম সঙ্কির্ণতা তাদের স্পর্শ করতে পারেনাই তার প্রমান এত বয়সেও মুনিরা ইসলামকে দেখেই বুঝা যেত।
চাকুরিতে ছেলের প্রমোশনে মা খুব খুশি, ছেলের ও মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, সন্মান এবং খোজ-খবর নেওয়া কোনটার প্রতি কোনটার কমতি ছিলনা। কোন একটা মেয়ের সাথে পরিচিতির পর থেকে ছেলেটা কেমনযানি একটু উদাসিন হয়ে যায়। মাকে কখনো কিছু না বললেও সন্তানের সবরকম অবস্তা অবস্থান থেকে মায়ের চোখ এড়ায় নাই, মা ঠিকই বুঝতে পারতেন কিন্তুু ছেলেকে কিছুই বলতেন না। এরই মাঝে অনেক সময় গড়িয়ে যায়, ছেলে তার পছন্দ করা সেই মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে তোলে। তাদেরও একটা ছেলে সন্তান হয়, এদিকে ছেলের অবস্তাও ভালই পরিবর্তন হয়। শহরের আধুনিক বললে কমই হবে অত্যাধুনিক পরিবারের সভ্যতা ও বাস্তবতা বিবর্জিত ছেলের বউ শাশুড়ির প্রতি ছিলনা তার কোন সম্মান বা শ্রদ্ধাবোধ। নিজের বিলাসিতা আর অনিয়ত্রিত চলা ফেরাকেই প্রাধান্য দিত বেশী, যার কারনে বাধ্য হয়েই ছেলেটা একটু ভিন্ন আয় রোজগারের দিকে মনোনিবেশ করে, অল্পদিনের মধ্যেই শহরের ভাল জায়গায় সুন্দর দেখে ফ্লাট কিনে এবং বউয়ের পরামর্শে মনমত করে সাজিয়ে বসবাস শুরু করে।
স্বামীর মৃত্যুর পর মুনিরা ইসলামের ইচ্ছে ছিল জীবনের বাকি কটাদিন স্বামীর বসত ভিটাতেই কাটিয়ে দিবেন, কিন্তুু টাকা পয়সার চিন্তা খুব একটা না থাকলেও আশ্রয়হীন ও একাকিত্ত জীবনের চিন্তা মনকে ভীষন তাড়িত করছে। শেষ চিন্তা করে একদিন শহরে ছেলের বাসায় আশ্রয় নেয়, মায়ের হঠাত করে আসাটা ছেলে মেনে নিলেও ছেলের বউ একবারের জন্যও মেনে নিতে পারেনাই, দিক পাছ না ভেবেই শাশুড়ির মুখের উপর বলে ফেলল আর কটাদিন পরে আসলে হতনা? অপ্রস্তুত ভাবে কথাটা শুনলেও একজন উপস্থিত বুদ্ধিসম্পন্না ও ধৈর্য্যশীল মা হিসাবে নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে হাঁসিমুখে রুমের দিকে চলে যান। ৩/৪ দিন পর নিজেদের বিবাহ বার্ষীকি ও ছেলের জন্মদিন একই তারিখ দিনটা ছুটির দিন পড়াতে ছেলে এবং ছেলে বউয়ের ইচ্ছে জমজমাট করে এবারের দিনটা পালন করবে, সেউপলক্ষে কদিন আগেই একটা ভাল হোটেল বুকিং দিয়ে রাখে, কিন্তুু বাসায় শাশুড়ি থাকায় একটু ঝামেলায় পড়ে যায় তারা। গাড়ি কেনাসহ ছেলের বাসায় সবকিছু আধুনিক সাজ সজ্যায় সাজানো অবস্থা মায়ের একটু অপ্রস্তুুত আর ব্যাতিক্রমিক মনে হলেও সকল পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার অসীম ক্ষমতার অধিকারি এক মা মুনিরা ইসলাম। দেখা নাদেখার ভান করে সবকিছু মেনে নিলেও ছেলেবউ মানিয়ে নিতে পারেনাই যে তাদের এই জমকালো অনুষ্ঠানে শাশুড়ি উপস্থিত থাকুক।
অনুষ্ঠানের কথাটা না বলে কি ভাবে মাকে বাসায় রেখে যাওয়া যাবে তার জন্য আগের দিন রাতে দুজনে ঠিক করে তারা হাসপাতালে নিজের এক বন্ধুকে দেখতে যাবে এবং যা কথা তাই কাজ। বিকালে শাশুড়িকে বাসায় রেখে নিজেরা বেরিয়ে যায়। এদিকে সন্ধা গনিয়ে আসে, মুনিরা ইসলাম সাদা খামে করে একটা চিঠি ও বাসার দরজাায় তালা লাগিয়ে ছাবিটাসহ দারোয়ানের হাতে দিয়ে বলে গেলেন আমার ছেলেটা আসলে ওর হাতে দিয়ে দিতে। রাত্রে বাসায় ফিরে এসেই দারোয়ান থেকে চাবিটা ও চিঠিটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে দরজা খুলে বাসায় ডোকে। চিঠিটা খুলে মায়ের হাতের লেখাটা দেখে নিজেই স্থির হয়ে যায়, “বাবা তোমাদের মাঝে আমাকে বড় বেমানান লাগে, গত কাল রাতে দরজার আড়ালে দাড়িয়ে আমি তোমাদের সব কথা শুনেছি। বাড়িতে বা অন্য কোথাও আমাকে আর খোঁজনা, আমি একাকি চলে গেলাম… তোমরা ভাল থাক”। সেদিন থেকে মুনিরা ইসলাম আর ফিরে আসেন নাই।
লেখক : দফতর সম্পাদক,বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, সম্পাদক ও প্রকাশক, অর্থনীতির ৩০ দিন।












