

খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
হেসেলের কাজটা একটু তাড়াতাড়ি সেরে ফেলেছে আজ অন্য দিনের চেয়ে ভিন্ন রকমের খাবার। দুই মেয়েই মায়ের হাতে রান্না করা বিরানি খাবে, বড় মেয়ে ডাক্তারি ৩য় বর্ষ পাস করেছে, ছোট মেয়ে এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়ে পাস করে কলেজে ভর্তি হয়েছে, মেয়েদের কোন আবদার কখনোই মিশ করত না তেমন আজও নয় নিজ হাতে খাইয়ে দিয়ে আমার অপেক্ষায়। প্রায় ২৭ বছর দাম্পত্য জীবনে দিনের যেকোন সময়ে আমি তার নাম ধরে ডাক দেয়ার সাথে সাথে আমার কি দরকার বা আমি কি চাই সে বুঝে যেত। আন্তরিকতার প্রতিযোগিতায় আমি সব সময় তার নিকট হেরে যেতাম। টেবিলে খাওয়া শেষ হওয়া পর্যন্ত আমার পাশে দাঁড়িয়ে না থেকে শান্তি পেত না, দুএক সময় বেশি আবেগের সুরে আমাকে বলত, একটু বাইরের খাবারের অভ্যাস করলেইতো পার, আমি না থাকলে তখন কি করবে? আসলে ভালোবাসা ওজনে মেপে দেওয়া যায় কিনা বুঝি না কিন্তু এই অন্তরঙ্গ মুহূর্তের কোন উত্তর আমার জানা ছিল না অন্তরে স্থান দেওয়া ছাড়া। প্রিয় মানুষের এসব কথাগুলি আমার খুব ভালো লাগত এবং মনে মনে আনন্দ পেতাম।
খাবার টেবিলে আমার খাবারের অতৃপ্ততাটাকে বুঝতে একটুও অসুবিধা হতো না, কখনোই নিজের অসুস্থতা, অসুবিধার কথা আমাকে প্রকাশ করে দেখাতে চেষ্টা করত না। রান্নাঘরে কাজে আমার একটু সহায়তা তাকে ভিষণ আনন্দিত করত, নিজের হৃদয়ের মাধুরী দিয়ে নিজেকে সর্বদিক দিয়ে জীবন বাজি রেখে তিলতিল করে নিঃস্বার্থভাবে সব চেয়ে তৃপ্তির রান্নাটুকু করে আমার জন্য টেবিলে পরিবেশন করার স্বার্থকতাটা যে কি তার দিকে একবার তাকাতেই বুঝতে পারতাম। বাইরের খাবার দাবার বা অন্য কারো রান্না কখনোই আমাকে আকৃষ্ট করতে পারেনি, তা সে খুব ভালো করেই জানত এবং বুঝত। তাই জীবনের মূল্যবোধকে এত উপলব্দি করে নিজের জীবনের সব শৃষ্টিশীলতাকে আমার জন্য উজাড় করে দেওয়ার বিরল দৃষ্টান্তের অধিকারী এক অসমাপ্ত স্মিতির কিঞ্চিত প্রকাশ করাই এই লেখাটির মাধ্যমে।
একটা অসমাপ্ত হৃদয়ের আর্তনাদ বা আর্তচিৎকার করার শব্দটা প্রকাশ্যে হয়তো কেউ শোনেনি, গগন বিদারী এই শব্দটি মাঝেমাঝে অনেককেই বধীর বানিয়ে দেয় যার কোন চিকিৎসা সমাধান আজও তৈরি হয় নাই চিকিৎসা বিজ্ঞানে। এসব শব্দ কখনো কখনো কারো জীবনকে সব চাওয়া পাওয়ার ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়। এমন একটা হৃদয়ের শব্দ বা আওআজ জুগল জীবনের শুরু থেকেই অন্য একটা জীবনকে স¤পূর্ণ সুন্দর সৎ ও সফল আলোকিত মানুষ রূপে তৈরি করে দিয়েছে। সেই আলোকিত জীবন যখন একটা সময়ের গন্ডি পেরিয়ে একটা অগ্রযাত্রার প্রতীক হিসাবে স্বার্থক হতে যাইতেছিল ঠিক সেই মুহূর্তে আলোকিত করা মানুষটাকে মাঝ নদীতে একটা কান্ডারিবিহীন ভেলায় রেখে নিজের অসমাপ্ত স্বপ্নকে বুকে জিয়িয়ে চির বিদায় নেয়ার যে একটা কষ্ট তা একমাত্র ভুক্তভুগি ছাড়া পৃথিবীর কেউ অনুভব করতে পারেনা যা আমি না বুঝতেই সব শেষ হয়ে যাওয়া। আমার পরাজিত মনের ভাষা প্রকাশের দুটি পংক্তি কিভাবে সকলকে বুঝাব জানিনা তবুও মৃদুস্বরে বলতে থাকি
পাথর ভাঙ্গার শব্দ শুনেছ, শুনেছ কি পেতে কান..
হৃদয় ভাঙ্গার কষ্টযে কত, তার নেই কোন সমাধান…।
মানুষ যখন তার জীবনের শেষ আশ্রয় বা শেষ অবস্থানটুকু হারাতে বসে তখন তার হিতাহিত জ্ঞান থাক না। ২০১৭ সালের ২৬শে জুলাই,ভোর সাড়ে ৪টা বা ৫টা, ভোরের আজানের শব্দ আর হৃদয় ভাঙ্গার শব্দ সব আমার একাকার হয়ে যাওয়ায় আমিও কিছু বুঝার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলি। আমি নির্বাক, আমার জুগল জীবনের সময়টা যখন শুরু করি তখন আমি আমার আবেগ উৎফুল্যতা দিয়ে গাড়ি থেকে যাকে দুহাতে হালকা করে উঠিয়ে নিয়ে এসে আমার ঘরে সাজানো খাটে বসিয়ে দেই, আমার বাড়িতে আসা সমস্ত মেহমান আত্মিয় স্বজন সকলে আমাকে নিয়ে হাসা হাসি আর আনন্দে মাতোয়ারা ছিল, অনেককেই বলতে শুনেছি আমি নাকি বাংলা ফিল্মের নায়ক নায়িকাকেও হার মানিয়েছি। আর বিদায় নেয়ার সময় সেই আমিই তাকে বাসার ভিতরের রুম থেকে কোলে উঠিয়ে হাসপাতালের পথে গাড়িতে বসিয়ে দিয়েছি। শত কষ্টের মাঝেও সততার জীবন এত সুন্দর আমাকে বুঝিয়ে দিয়ে হাসপাতালে তার এই অভিমানি চলে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তের দৃশ্য তখনতো দূরের কথা এখনো ভাঙ্গা কাঁচের গুঁড়ার মত আমার মন চিন্তা শরীর সব কিছুকে ক্ষতবিক্ষত করে চলছে, যে ক্ষতটা ক্রমান্বয়ে ক্যানসারে পরিণত হয়ে আমার বাকি জীবনটাকে তাড়িত করছে। আমি সৃষ্টিকর্তার নিকট শুকরিয়া আদায় করতে পারি নাই বললেও কম হবে, সৃষ্টিকর্তা এমন একজন মহতী নারিকে আমার জন্য বরাধ্য করে রেখেছিলেন যাকে নিয়ে আমি পৃথিবীর শ্রেষ্ট সুখি ব্যাক্তি ছিলাম, যার মুখে আমাকে সুখি দেখা ব্যতীত আমার প্রতি মান অভিমান রাগবিরাগ বা কোন অভিযোগ কখনো শুনতে পাই নাই আমাকে পৃথীবির শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসাবে দেখানো ছাড়া। মানুষের জন্য গড়ে দেয়া আল্লার সৃষ্ট পৃথীবিটা এত সুন্দর ও সৃষ্টিশীল আনন্দের এটা সে আমাকে বুঝিয়ে দিয়ে গেল।
আমাদের ঘর আলোকিত করে জন্ম নেয় আমাদের দুই মেয়ে, ১৯৯৪ সালে বড় মেয়ে এবং ২০০০ সালে ছোট মেয়ে। আমাদের দুই মেয়ের জন্মে আমরা একটুও মন থেকে বিচলিত হই নাই। আমরা সবসময় বলতাম ছেলেদের ছেয়ে মেয়েরাই মা বাবার দিকে বেশি খেয়াল রাখে। দুই মেয়ের প্রতি দুর্বলতা আমার সব সময়ই ছিল, আমি জানতাম সব স্বামীর নিকট তার স্ত্রী রাজরানী হতে না পারলেও সব মেয়েরা তার বাবার নিকট রাজকন্যা। তার সর্বসুখ আর আনন্দ আমাদের ৪ জনকে মিলিয়ে যেন আমরা স্বর্গসুখে সুখি ছিলাম, আচমকা একটা ঝড় আমাদের সব লন্ডভন্ড করে দিয়ে গেল কেন জানি না। জীবিত থাকাকালে আমার মা মাঝে মাঝে বলতেন সখের পিঠা মধ্যখানে কাঁচা থাকে। আসলে সুখ সবার কপালে সয় না এটাই সত্য। তার চলে যাওয়ার ৭/৮ ঘন্টা পূর্বেও দুই মেয়েকে রাতের খাবার নিজ হাতে খাইয়ে দিয়েছে সব সময়ের মত, তখনো একটুও মনে হয় নাই যে ৭/৮ ঘন্টা পর তার চিরবিদায় হয়ে যাবে। আর মেয়েদের নিয়ে আমার চোখের কান্না থামলেও মনের কান্না আজও থামাতে পারি নাই। মেয়েদের আলোকিত মানুষ হিসাবে গড়াতে গিয়ে নিজের আলোকিত স্বপ্ন এভাবে শেষ হয়ে যাবে এটা কল্পনারও বাইরে। শেয়ার বাজার ধস,ঔষধ ব্যবসায় লসসহ জীবনের অনেক কঠিন সময়ও যাকে আমার থেকে বিন্দুমাত্র ও দূরে সরাতে পারেনি, যার হাতে হাত রেখে ভোরের আলোতে ঘুম থেকে উঠে আনন্দে পথচলা শুরু করার কথা সেখানে তাকে নিজ হাতে কঠিন মাটির নিচে শুইয়ে দেয়ার কষ্ট আমার বুকের পাঁজর ভেঙ্গে সুনামির মত চোখের নোনাজলে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
একটা নির্দষ্ট লক্ষমাত্রার লালিত স্বপ্ন যাকে নিয়ে পূরণ করার দ্বারপ্রান্তে উপনীত ঠিক সে সময় নিজ হাতের উপর একজন সবচেয়ে নিকটতম প্রিয় মানুষের চিরবিদায় নেয়ার যে দৃশ্য কত হৃদয় বিদারক তা আমার চেয়ে ভাল বুঝার অবস্থা কারো আছে কিনা জানি না। মনে হয়েছে সৃষ্টিকর্তার নিকট আমি অনেক বড় অপরাধী। আমার বেঁচে থাকাটা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়েছে শুধু ভাবছি সৃষ্টিকর্তা কেন আমাকে না নিয়ে আমার প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে গেল? ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে প্রিয় মানুষটির চিকিৎসাসেবা আমার মনমত করতে না পারার দহন আমাকে কুঁকড়ে কুঁকড়ে খাচ্ছে। নির্বাক জীবনে এখন নিজে একটু অসুস্থ হলেও মেয়েদের না বলার চেষ্টা করি আর মনে মনে ভাবি আমারও চিকিৎসাহীনভাবে কষ্ট পেয়ে মরে যাওয়া উচিত। কেন যেন মনে হয় আমি নিজের জন্য নিজে ভাল থাকতে পারি না।
তোমার সকল আশার প্রদীপ তুমি জ্বালিয়ে দিয়ে তা সুরক্ষার জন্য আমাকে যে দায়িত্ব দিয়ে চলে গেছ আমি সেটা কতটুকু সঠিকভাবে পালন করতে পেরেছি বা পারব আমার জানা নেই। তবুও চেষ্টা করে চলেছি বাকি সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা। অনেক সময় তার শরীর খারাপ দেখলে আল্লার নিকট ফরিয়াদ করে বলতাম আল্লাপাক যেন তাকে ভাল রেখে আমাকে নিয়ে যায় কিন্তু সে মানতে পারত না, সাথে সাথে বলত না তুমি নয় আল্লাপাক যেন আমাকে নিয়ে যায় কারণ তুমি মরে গেলে মেয়েদের নিয়ে কোথায় দাঁড়াব আমার কোন তো ইনকাম নাই আর আমি মরে গেলে তুমি মেয়েদের চালিয়ে রাখতে পারবে, আল্লা যেন তোমাকে সুস্থ রাখে। সৃষ্টিকর্তা হয়তো আমার ডাকে সাড়া না দিয়ে তার ডাকে সাড়া দিয়েছেন। আর আমি হয়ে গেলাম অসহায়। নিজের প্রতি নিজের কষ্ট হয় আমি তাকে ধরে রাখতে পারি নাই। সকল প্রকার চেষ্টা করে বড় মেয়েকে একটা লক্ষমাত্রায় নিয়ে আসার পরও মনে হয় আমি নিজের প্রতি নিজেই প্রতারণা করেছি। তার দেওয়া দায়িত্বটা হয়তো আমি সঠিকভাবে পালন করতে পারি নাই। কোথাও যেন কোন একটা ভুল হয়ে গেছে।
আসলে ভুল কার না হয়, ভুল সবারই হতে পারে কেহই ভুলের ঊর্ধ্বে নয় এটাকে মনে না রাখাই ভাল।
যেকারো প্রতি ভুল ধারণা আসতেই পারে বা আসাটা স্বাভাবিক কিন্তু ভুল ধারণাটা বয়ে বেড়ানো খুব কষ্টের, এথেকে যেমন পরিত্রাণ পাওয়া যায় না তেমনি বয়েও বেড়ানো যায় না এটাই প্রকৃতি। আসলে কিছু কিছু ভুল আছে যা একবার হয়ে গেলে আর কিছুই করার থাকে না । আবার অনেক ভাল কাজ করতে গিয়েও দুর্ভগ্যবসত ভুল হয়ে যায় আমারও তাই। তবুও মন থেকে দোয়া করি আল্লাপাক যেন তাদের ভাল এবং সুখী রাখেন। এখন সবসময় নিজের সুখ আর সুস্থতার কথা চিন্তা না করে চেষ্টা করি মেয়েদের ভাল রাখতে। নিজের একাকিত্ম নিয়ে একাই বিড় বিড় করি, প্রকৃত ভালোবাসা হারিয়ে নিসঙ্গ জীবনের গতি রক্ষায় কৃতিম ভালোবাসায় কতটুকু সুখী থাকতে পারব বুঝতে পারি না। নির্বাক জীবনের ছন্দপতন কোথায় তার অপেক্ষায় রবিঠাকুরের গানের মত..
যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বা টে
আমি বাই ব না আমি বাই ব না আ র খেয়া তরী এই ঘাটে…
মিঠিয়ে দেব লেনাদেনা বন্ধ হবে আনাগোনা এই হাটে
তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে তারার পানে চেয়ে চেয়ে,
নাইবা আমায় ডা ক লে ….. ।
আমিও ঘুমিয়ে পড়ার অপেক্ষায়।













