খোন্দকার জিল্লুর রহমান সকালে আশেপাশের লোকজনের চিৎকার আর কান্নাকাটির শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল। রাত ১০টার দিকে বাসায় আসার পর সারাদিনের ক্লান্তি আর অবসন্নতা এসে ভর করে শরীরে, তারপরও বাসার রুটিন মাফিক খাওয়াদাওয়া ও কাজকর্ম সেরে একটু লেখালেখি করে ঘুমোতে অনেক দেরি হয়ে যায়। অফিসের কাজটা একটু দেরিতে আরম্ভ করতে পারার কারণে নিশ্চিন্ত থাকতে পারি বলে সকালে ঘুম থেকে উঠতেও দেরি হয়। সঙ্গতকারণেই বিরক্তবোধ করি, প্রকৃত ঘটনাটা জানার পরই নিজেকে গুটিয়ে নেই। মনের কষ্টকে চেপে রেখে একটু সান্ত¡না দিতে এগিয়ে যাই,কিন্তু সান্তনা দেওয়ার ভাষা আমার জানা নেই বেচারি শেষ পর্যন্ত মৃত্যুকেই আলিঙ্গন করে নিল। জীবনের সব চাওয়া-পাওয়া অপবাদ লজ্জা ও গ্লানি মুছে দিয়ে মৃত্যুকে বরণ করে সমস্তকিছুর পথকে সুগম করে দিল সেই নেশাখোর কর্মহীন লোকটাকে। আর আত্মাহুতির মাধ্যমে নিজে চলে গেল সবকিছুর ঊর্ধ্বে। জীবন চলার কাহিনী শুনতে গিয়ে অবলীলায় চোখের পানি দুচোখ বেয়ে নেমে আসে, নিজেকে সামলিয়ে নেই। সমাজটাও এতই নিষ্ঠুর, কাউকে ন্যূনতম সুন্দরভাবে বাঁচে থাকতে দেয় না কেন? হঠাৎ মনে হল নির্বাসিত কবি দাউদ হায়দারের কথা, “জন্মই আমার আজন্ম পাপ” কবিতা লিখে আজ প্রয় ৩৮ বছর নীর্বাসন থেকে জন্মভূমির মাঠিতে পা রাখতে পারছেন না। শুনতে শুনতে নিজের অনেক কথা না বলাই রয়ে গেল, নিজের মনে কবিতার পংক্তি দুটি ভেসে উঠল, অনেক কথা বলার ছিল কোন কথা না বলা. তোমার আখির আবেগ দেখে নিভে গেল সব জ্বালা…। শালা লাফাঙ্ঘা, লোপার , বারবার আমার দিকে ওভাবে তাকাস কেন…? ভাগ শালা! বলতে বলতে বস্তির পাশ কেটে নিজের দেরাজে ডুকে যায় জমিলা, মাটির দেয়ালে লাগানো ভাঙ্গা আয়নার টুকরায় ব্লাউজবিহীন শরীরে নিজেকে দেখে নিজেই আঁতকে উঠে! মনে মনে ভাবে একোন আমি? কেন আজ তার একাজ। বদমাশটা তাকাবেনাইবা কেন, আমিতো এখন একটা…। বস্তির ভাড়াকরা দেরাজে ৪ ফিট বাই ৬ ফিট চকিতে আধো আধো পরিষ্কার একটা চাদর বিছানো বিছনায় বালিশে মাথা রেখে নিজের কথাই ভাবে… আত্মহত্যা মহাপাপ বেঁচে থাকতে হবে কিন্তু বাঁচাটাকি এতই জরুরি? কোন উত্তর নাই, তিন বছরের সন্তান জরিনা, ইতো আটকে দিয়েছে সব, গর্ভের সন্তান কাকে দোষ দেব, নাইলে কবেই গলায় দড়ি দিয়ে ইতি টানতাম। পোকায় কিলবিল করা ড্রেনের পাশে ছেঁড়া কাপড় টাঙ্গানো গোসলখানায় গতরে পানি ঢালতে ঢালতে নিজেকে অন্যভাবে দেখে। লাজলজ্জার মাথা খেয়ে সমজকে উপেক্ষা করে নিজেকে এ কাজে লিপ্তকরা যে কি তা একমাএ বিধাতাই জানেন। নিজের প্রতি নিজের ঘৃণাটা দিন দিন বেড়েই চলছে, এ থেকে মনের ভিতর পুষিয়ে রাখা ক্ষোভ হঠাৎ হঠাৎ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে আবার দিনের পথচলা শুরু করি, কবিতার কথা মনে পড়ে “বিপদে মোরে রক্ষা কর এনহে মোর প্রার্থনা, বিপদে আমি না যেন করি ভয়, দুঃখতাপে ব্যথিত চিত্তে নাইবা দিলে সান্ত¡না। দুঃখ যেন করিতে পারি জয়…”। কিন্তু বাস্তবতা স¤পূর্ণ ভিন্ন। অভাবের কষাঘাত কাউকে ছাড় দেয় না, আমাকেও নয়। সমুদ্রের জোয়ার ভাটা, চাঁদের আমাবস্যা পুর্ণির সাথে সাথে নিজের মনেও জোয়ারভাটা দেখা দেয়। কিন্তু সংযত কারনে নিজেকে নিয়ে আর অনুভূতি প্রবণ কিছু করা যায় না। এটা এমন এক প্রতিবন্ধকতা যা সমাজের অপবাদ, কুসংস্কার, ঘৃণা লজ্জা সবকিছুকে হার মানায়। এছাড়া নিজের নিছক কর্মের কারণে মানুষ এখন ঘৃণাভরে দেখে। কোনভাবে আর বেরিয়ে আসার পথ দেখিনা, সমাজও আমাকে বেরিয়ে আসতে দেয় না। জীবনের অক্ষমতা আমাকে কুঁকড়ে কুঁকড়ে খায়। বুজতে বাকি নাইযে অভাব অনেক সময় মানুষকে ভিন্ন পথে যেতে বাধ্য করে। এরই দুর্বলতার কারণে আশ-পাশের চিচ্কে লোকগুলি নিজেদের চরিতার্থ করে তোলে। এটা কোন কাল্পনিক গল্পকথা নয়, রুঢ় বাস্তবতা। বাবা মায়ের আদর বঞ্ছিত হয়ে নিকটআত্মীয়ের কাছে থেকে বড় হতে গেলে কেউ কেউ সে সুযোগগুলি কাজে লাগায়, আর কারো ঘাটের মড়া হলেতো কথাই থাকে না। নৈতিকতার মূল্যবোধ দিনে দিনে নষ্ট হয়ে যায় সমাজ, দাঁড়ায় বীরূপ প্রতিক্রিয়া নিয়ে। কোনকিছুই ঠিকমত মতো বুঝতে পারি নাই। কখনযে কি হয়ে গেল, সব কিছু বুঝার আগেই জীবনের সব শেষ হয়ে গেল। রাস্তায় কুড়ানো শিশুর আবার পরিচয়! মাতৃগর্ভ থেকে জন্ম নেয়ার পর যদি রাতের অন্ধকারে ডাস্টবিনে জায়গা হয়, তার আবার জাত পরিচয়, এখানে বড়লোক, ছোটলোক, বস্তিবাসী, নিম্নবর্ণ, উচ্চবর্ণ, কোন প্রার্থক্য বা কোন পরিচয় থাকে না। তখন একটাই পরিচয় হয়, লাওয়ারিশ বা বেওয়ারিশ বাচ্ছা, আর এই পরিচয় নিয়েই বাঁচতে হয়, আমারও তাই। মা আমাকে জন্ম দিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে যায়, আর রাস্তার বেওয়ারিশ কুকুরের মত বেড়ে উঠি, এটা কি…। লুইচ্ছা বদমাইশ আর কুত্তাদের কাছে সম্ভ্রম বিক্রি করা বা নিজেকে সপে দেওয়া দিনের পর দিন রাতের পর রাত এভাবে চলতে থাকা-। পারিশ্রমিক হাতে পাওয়ার পর অনেক কিছুই ভুলে যাই, গুনগুনিয়ে গান গাই, খেলাঘর বারেবারে কেন ভেঙ্গে যায়.., স্বপ্নের সব তারা কেন নিভে যায়…। শিক্ষিত হয়েও চাকরি না পাওয়া নেশাগ্রস্ত স্বামির অক্ষমতার যন্ত্রণাতো আছেই, তার উপর অসুস্থ বাচ্ছার চিকিৎসা করাতে না পারার যে কি যন্ত্রণা তা একমাত্র ভুক্ত ভুগিই জানেন। কাজকর্ম না থাকাটাও একটা পাপ, কারণ এতে নিজের মর্জাদাটাও রক্ষা করার যায় না তার উপর নেশায় বোঁধ হয়ে থাকা, প্রতিদিন ২০০ টাকায় হয় না, অভাবের চেয়ে নেশার কারণে মুখের সচেতনতা বগবগ করে জানান দেয় বেশি। চাহিদা ২০০ টাকার, এর ব্যবস্থা হলেই আর কে পায়। কাজ না থাকেতো সেদিন শুরু করে দেয় অকাজ। নেশার টাকা জোগাতে গিয়ে অনেকের নিকট অপমানিত হয় শুধু তাই নয় পকেটমার না হয়েও পকেটমারের অপবাদে পুলিশের হাতে অনেকবারই পেদানি খেয়েছে, স্বজনরা কেউ পরিচয় দিতে চায় না। কেউকেউ এগিয়ে এসে সাহায্য করতে গেলে বংশ মর্জাদার অজুহাতে বলে বন্ধুবান্ধব স্বজনদের থেকে টাকা পয়সা নিতে হয়না টাকা পয়সা নিলে ছোট হয়ে যাবনা, জানেন না আমি কোন বংশের ছেলে, একবার যখন বলেছি ভাল হয়ে যাব তখন মনে করেন ভাল হয়েই গেছি। নেশাখোরের আবার বংশ মর্জাদা কে শোনে কার কথা, নেশার ঘোরে অনেক কথাই বলে। স্বাভাবিকতা আসলেই সেই আগের অবস্থানে ফিরে যাওয়া, প্রবাদে আছে কামার বাড়ির লোহা যতই পিটাও যেইসেই..। পাশের রুমের দাদির বয়সি মহিলা, চুল পেকে দবদবে সাদা হয়ে গেছে, সেই জোয়ান বয়সের শারীরিক আকর্ষণ আর নেই, এখন শুধু অন্যদের কসরত উপভোগ করা এবং খদ্দেরের জোগান দেওয়া ছাড়া নিজের কিছু করার সময় নাই। প্রায়ই আমার ঘরে এসে গল্পগুজব করে সুখ দুঃখের কথা বলে অনেক সময় পার করে। এটা যেন একটা সম্পর্ক, সহযোগিতা ও সহমর্মিতা। বাচ্ছার অসুস্থতার অবস্থা দেখে আমাকে বলে, সবইতো পারবি কি নেই তোর? সবইতো আছে। আমি যা বলি শোন, হাসপতালের দালাল এলাকার চিছকে মস্তান গালকাটা কাল্লুর কাছে পাঠায়, গালকাটা বললেই সবাই চিনে, সে আরেক কাহিনী একবার এক অকাজ করতে গিয়ে চাপাতির কোপে গালের বিরাট একটা অংশ কাটা পড়ে, সেই থেকেই গালকাটা কাকাল্লু নামে পরিচিত হয়ে উঠে। এখন গালকাটা বল্লেই কে না চিনে তাকে, এক সময় নিজের কাজে লাগায় হরদম, এখন আর আমাকে পছন্দ করে না, বয়সের প্রার্থক্যতো অনেক। একটা জাত হারামজাদা আর লুইচ্ছা, কোনক্রমেই দুর্বলতার সুযোগ ছাড়ে না। নিজের বউ পোলাপান থাকলে কি অইব সেদিকে মনোযোগ নাই টেরাচোখে অন্যের দিকে তাকানোর অভ্যাসটাই বেশি। হাসপাতালের ডাক্তার নার্সরাও তাকে কিছু বলে না আত্মসম্মান রক্ষার কারণে। কোন কথা না শুনলে নেশাগ্রস্ত লোকের দলবল নিয়ে সে নাস্তানাবোধ করে তাই। নিজের অসহায়ত্তের সুযোগে বাচ্ছার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিয়ে সুযোগটা আমার উপর নিয়ে নেয়, এটা যেন আবার নিত্যদিনের কাজে পরিণত হয়ে গেছে। মাঝেমাঝে আসতে খাওয়া দাওয়া নিয়ে আসে, সাথে আবার কাগজ দিয়ে মুড়িয়ে একটা বোতল আনতে ভুল করে না। অনেক অসহ্য হয়ে থানা পুলিশের দ্বারস্ত হতে গেলে কিছুকিছু লম্পট চরিত্রহীন পুলিশের হাতে লাঞ্ছিত হই, অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে ছোট ছোট করে কমেন্ড করে, নষ্টার আবার বিচার। নিয়ম রক্ষার কারণে পরিদর্শনে এলেও বিচার পাইয়ে দেয়ার অজুহাতে আমার উপর সেই সুযোগটা আদায় করে নেয়, শালা পুলিশ জাতটাই খারাপ (দু’এক জনের খারাপ কাজের জন্য পুরো পুলিশ বাহিনীর বদনাম) জানি অসহায়রা এমনই বিচার পায়। দরজার নিকট আসতেই মোবাইলে রিংটোন বেজে উঠে “তুই পেলে এসেসিস মন মনরে আমার, তাই জনম গেল হেলায় খেলায়, মন মনরে আমার-। ফোনটা তাড়াতাড়ি রিসিব করে না, গানটা একটু বেশিক্ষণ শোনানোর জন্য। কারণ প্রতি মাসে রিংটোনের জন্য ৩৮/= টাকা কাটে, একটুতো শোনাতেই হবে।
খোলামনে ও খালিহাতে কি আর আকাশ ছোঁয়া যায়, ঘুরে ফিরে এসে একই বৃত্তে জড়িয়ে পড়ি, বের হয়ে আসার কোন পথ নাই। একটাই পথ খোলা জীবনের ইতি টানা। মরেও আবার শান্তি কোথায়, দাওয়াত খাওয়া ফতুয়াবাজ হুজুর, গুনেগুনে বড়নোট পকেটে টাকা গুঁজে দিলে এক রকম নাদিলে হয় অন্যরকম, নিজের মনমত ফতুয়া দেয়। এদের নাকি জানাজা দেয় না। মরার আবার জাত। দেহটা মেডিকেল কলেজ বা হাসপাতালে দিতে বলে যাব রিচার্সের জন্য, না তা হয় না, পুরুষ লাশ ছাড়া মহিলা লাশ নাকি মেডিকেল কলেজ বা হাসপাতালে রাখে না, ইয়াং ছেলে মেয়েরা মেডিকেলে ভর্তি হয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করে মরদেহের উপরে ক্লাস করতে গিয়ে, তাই লজ্জা ও রাগে গেন্না হয়। সুন্দরভাবে বাঁচার অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু পারি নাই। আমি হেরে গেছি আমি হেরে গেছি..। একটা কথায় আছে “সংসারে পুরুষ টললে নারীরা শক্তহাতে ধরে রাখতে পারে কিন্তু নারী টললে স্বয়ং ভগবানও সেটাকে রক্ষা করতে পারে না” জমিলা তা বুঝিয়ে দিয়ে গেল নিজের কবর নিজে রচনা করার মাধ্যমে। সন্ধ্যা থেকে স্বামীর অত্যাচারে জমিলার সমস্ত শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে আছে সেই ধকলটা কাটতে না কাটতেই কাল্লুর দরজার কড়া নাড়ার শব্দে বুজে গেলাম আমাকে আবার…। আর মনে মনে পরিকল্পনা করে আজ রাতটাই তার জীবনের শেষ রাত, যেই কথা সেই কাজ, অনেকদিন আগে নেশাখোর স্বামীর সাথে ঝগড়া করে সার ও কীটনাশক বিক্রেতার নিকট থেকে একটু কীটনাশক এনে নিজের ঘরের ছালার খুপরিতে লুকিয়ে রাখে জমিলা, তখন কাজে না লাগলেও নিজের বিচনায় শুয়ে শুয়ে বিড়বিড় করতে করতে হঠাৎ কীটনাশকটার দিকে চোখ পড়ে, আর বদমাসটা চলে যাওয়ার পর দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে কীটনাশকটা হাতে নিয়ে ঢগঢগ করে খেয়ে ক্লান্ত শরীরে বিচনায় লুটিয়ে পড়ে এবং এটাই তার জীবনের শেষ ঘুমে পরিণত হয়।