সংকটে বিকল্প অর্থায়ন খুঁজছে বারাকা পাওয়ার

অর্থনীতির ৩০ দিন ডেস্ক :
ঋণ বৃদ্ধির পাশাপাশি বেড়েছে সুদ ব্যয়। অর্থ যোগানে পরিচালনা খরচের সঙ্গে বেড়েছে স্বল্পমেয়াদি ঋণ। অর্থবছরের প্রথম দিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় কমেছে মুনাফা। প্রেফারেন্স শেয়ার ছেড়ে মূলধন জোগানোয় কোম্পানির সিদ্ধান্তে বিএসইসির নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় চরম অর্থসংকটে পড়েছে। অপরদিকে ব্যবসা সম্প্রসারণে সহযোগী কোম্পানিতে চার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করে বিপাকে পড়েছে বারাকা পাওয়ার লিমিটেড। ফলে পাঁচ বছর ধরে মুনাফার প্রবৃদ্ধিতে হোঁচট খেয়ে বিকল্প অর্থায়নের উৎস খুঁজতে শুরু করেছে বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিটি।
তালিকাভুক্তির আগে ও পরে ভালো অবস্থানে থাকায় গত এক বছরে অভিহিত মূল্য থেকে কোম্পানিটির শেয়ারদর ৫২ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। সেই শেয়ার এখন হাতবদল হচ্ছে ২৮ টাকার ওপরে। এভাবে প্রতি শেয়ারে ২৪ টাকা পর্যন্ত মূলধন হারিয়েছেন কয়েক লাখ বিনিয়োগকারী।
জানা গেছে, পুঁজিবাজারের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানি বারাকা পাওয়ার। চলতি অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত মুনাফা কমেছে কোম্পানিটির। মূলধন সংগ্রহ ও নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য প্রেফারেন্স শেয়ার ছেড়ে ৮০ কোটি টাকা সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেয় কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ। কিন্তু পরিচালকরা নির্দিষ্ট সংখ্যক শেয়ার ধারণ না করায় এ প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। আরও শর্ত দেয় উদ্যোক্তা পরিচালকরা ন্যূনতম শেয়ার ধারণ না করায় আগামী তিন বছর পর্যন্ত কোনো ধরনের প্রেফারেন্স শেয়ার ছাড়তে পারবে না বারাকা পাওয়ার।
ফলে তারল্য সংকটে নতুন দুটি পাওয়ার প্লান্ট নির্মাণে দেড় হাজার কোটি টাকার জোগান নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। সংকটের প্রভাবে চলতি অর্থবছরে ধারাবাহিক মুনাফা কমছে পাঁচ বছর ধরে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিয়ে আসা কোম্পানিটির।
জানা গেছে, ২০১১ সালে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত হয় বারাকা পাওয়ার। তখন কোম্পানিটির মোট শেয়ারের ৩০ শতাংশ ছিল উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে। কিন্তু বিধিমালা পরিবর্তিত হওয়ায় বিএসইসি শর্ত দেয় ন্যূনতম দুই শতাংশ শেয়ারধারী কোম্পানির পরিচালক হতে পারবেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত মানতে গিয়ে অনেক পরিচালককেই পরিচালনা পর্ষদ থেকে বাদ দিতে হয়। এজন্য পরিচালকদের শেয়ার ধারণ কমে গিয়ে বর্তমানে ১৮ দশমিক ৯৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এ বিষয়ে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়, কোনো পরিচালকই শেয়ার বিক্রি করেননি। বিধিমালা পরিবর্তিত হওয়ায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, বারাকা গ্রুপের কোম্পানি বারাকা পাওয়ারসহ বিদ্যুৎ খাতে চারটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অন্যগুলো হচ্ছে বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার লিমিটেড, কর্ণফুলি পাওয়ার ও শিকলবাহা লিমিটেড। এর মধ্যে কর্ণফুলি পাওয়ার ও শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সরকারের কাছ থেকে অনুমোদন পেয়েছে বারাকা গ্রুপ। বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটি নির্মাণে ঠিকাদারি কাজের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত বারাকা পাওয়ার। এ দুটি কেন্দ্র নির্মাণে ঠিকাদারি ব্যয় হবে প্রায় ৪৯২ কোটি টাকা। মোট ব্যয়ের তিন শতাংশ মার্জিন হিসেবে মুনাফা নেওয়ার কথা বারাকা পাওয়ারের।
গত মার্চে বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটি নির্মাণের অনুমোদন পেয়েছে বারাকা গ্রুপ। অনুমোদনের পরে সর্বোচ্চ ৯ মাসের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটি নির্মাণ শেষে উৎপাদনে যাওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু অর্থসংকটে নির্মাণকাজে প্রায় স্থবিরতা নেমে এসেছে। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটি নির্মাণ করা সম্ভব হবে কি না, তা ভাবিয়ে তুলেছে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে। শেয়ার ছেড়ে ৮০ কোটি টাকার একটি অংশ ঠিকাদারি কাজে ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কোম্পানি কর্তৃপক্ষ।
সূত্র জানিয়েছে, চলমান দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অর্থ জোগান দেওয়া কষ্ট হচ্ছে বারাকা গ্রুপের। পুঁজিবাজার থেকে অর্থ নিতে হলে উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার ৩০ শতাংশ করতে হবে। এজন্য বর্তমান দরে বাজার থেকে শেয়ার কিনতে হবে তাদের। পরিচালকরা শেয়ার কিনতে বিনিয়োগ করবেন, না প্রজেক্টে বিনিয়োগ করবেন, তা ভাবিয়ে তুলেছে তাদের। দুই দিকেই অর্থ জোগানোর সহসা কোনো সমাধান দেখছেন না তারা। অপরদিকে হঠাৎ করেই দীর্ঘ মেয়াদের জন্য ব্যাংক ঋণ পাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠছে।
এ বিষয়ে বারাকা গ্রুপের পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) মোহাম্মাদ মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের বিকল্প পরিকল্পনা সবসময়ই ছিল। প্রেফারেন্স শেয়ার ছাড়তে না পারায় বিকল্প উৎস থেকে অর্থায়ন করা হবে। অর্থের কারণে প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে পড়বে না।’
আয় কমে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতার সবটুকু আমরা কাজে লাগাতে পারিনি বছরের প্রথম দিকে। এর প্রভাবে আয় কমেছে। এখন কোম্পানি স্বাভাবিক আয়ে ফিরেছে।’
কোম্পানির সর্বশেষ অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ ’১৮) শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ৩৬ পয়সা, গতবারের আলোচিত সময়ে যা ছিল ৭১ পয়সা। গতবারের তুলনায় এ বছরের আলোচিত সময়ে ইপিএস কমেছে ৩৫ পয়সা। এই সময়ে অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুনাফা হয়েছে মাত্র আট কোটি ৮৬ লাখ টাকা, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের এই সময়ে ছিল ১৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। তৃতীয় প্রান্তিকেই মুনাফা কমেছে ১০ কোটি টাকার বেশি।
অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তৃতীয় প্রান্তিক শেষে কোম্পানির কর-পরবর্তী মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৩৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের এই সময়ে ছিল ৫৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরের গত ৯ মাসে (জুলাই ’১৭Ñমার্চ ’১৮) ইপিএস হয়েছে এক টাকা ৫১ পয়সা। পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ে ছিল দুই টাকা ১৩ পয়সা। এ হিসেবে গত ৯ মাসে পূর্ববর্তী একই সময়ের চেয়ে ইপিএস কমেছে ৬২ পয়সা।
মুনাফা কমায় কোম্পানিটির স্বল্পমেয়াদি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৭৬ কোটি টাকা। একইসঙ্গে বেড়েছে অর্থসংগ্রহ বাবদ খরচ, যা পরিচালনা ব্যয়কে বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে এটি বছর শেষে মুনাফা আরও কমে যাওয়ার প্রবণতাকেই ইঙ্গিত দেয়।
অপরদিকে নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৭ সালে বারাকা পাওয়ার কর-পরবর্তী মুনাফা করেছে ৪৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। নগদ অর্থের জোগান কম হওয়ায় এ সময়ে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের পাঁচ শতাংশ নগদ ও ১৫ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছিল। এর আগে ২০১৬ সালে কর-পরবর্তী মুনাফা করেছিল ৪৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ওই বছরের জন্য বিনিয়োগকারীদের ১৫ শতাংশ নগদ ও পাঁচ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছিল।
বর্তমানে কোম্পানিটির ঋণ রয়েছে ৩৪৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। পরিশোধিত মূলধন ২০০ কোটি ও অনুমোদিত হচ্ছে ৩০০ কোটি টাকা।
গত এপ্রিল পর্যন্ত কোম্পানিটির মোট শেয়ারের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ২৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ৫৬ দশমিক ১৪ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।