ছোট গল্প :”সুখের ভাবনা” (দুষ্টি কলম)

খোন্দকার জিল্লুর রহমান
দিনগুলি আজ বড় বেশি মনে পড়ে। কারণে অকারণেও মনের মাঝে উঁকি ঝুঁকি মারে। কোন অবস্থাতেই মন থেকে সরাতে পারি না। হাজার বার প্রশ্ন করেও মনের কাছে কোন উত্তর খুঁজে পাই না। নিজেকে সামলে নেওয়ার হাজার চেষ্টা কেবল বৃথাই যায়। মাঝে মাঝে একা একাই চোখের জল ফেলি।কিন্তু এর কোন সমাধান পাই না। বুকের ভিতর হাজারও কষ্ট চেপে রেখে নিজেকে নিজে প্রশ্ন করি সুখ পাবো কিনা। নিজেকে নিজেরই অনেক সময় সন্ত¡Íনা দেই। সুখের কল্পনা করতে করতে হঠাৎ গুনগুনিয়ে গান এসে গেল“হাজার নদী বাংলাদেশে…. সুখের খেয়ায় ভেসে ভেসে…. দুঃখ সুখের ঘাটে ঘাটে এসে দেখি কতো জোয়ার ভাটা….। আমার বাউল মনের একতারাটা….।” ব্রেক করার কারণে বুঝতে আর দেরি হয় নাই যে নিজের গন্তব্যে এসে গেছি,কিন্তু রাতের গন্তব্য তো শেষ হয় নাই। পূর্ব আকাশে ভোরের আলো উঠি উঠি করেও অন্ধকার কাটাতে পারছে না। গাড়ি থেকে নেমেই দেখি একটু একটু গা চমচম করছে। নিজের এলাকা মনে ভয় না থাকলেও কোন লোকাল পরিবহন ও জনশূন্য হওয়াতে রাস্তার মোড়েই দোকানে লম্বা টুল পড়ে আছে দেখে সেখানে গিয়ে বসলাম। শীত বেশি না হলেও একেবারে কমও নয়। তাই সকাল ৮টা বা ৯টার সময়েও লোকের অতো সমাগম হয় না। মোটামুটি আলো হতেই দেখি একটু দূরে পাশের চা দোকানের টুলে খোন্দকার চাচা বসে আছে। চোখে মুখে উদ্বিগ্নতার ছাপ। কি হয়েছে চাচা বলতেই…..!
সারাজীবন কেরসিনের বাতির নিচে থাকতে থাকতে জীবনটাই অন্ধকার হয়ে গেল। তাই কিছুদিন আগে বিদ্যুতের বাতি লাগালাম।কিন্তু ক’দিন যেতে না যেতেই সরকার আবার বিদ্যুতের দাম বাড়াইছে। নিজের আয় না বাড়ালেও ব্যয় তো বেড়েছে। মনের কল্পনার ছোট ছোট সুখগুলি কুড়ালের আঘাতে গাছের গুলির টুকরার মতো দু’চোখের ফোটা ফোটা অশ্রুবিন্দু হয়ে গড়িয়ে পড়ছে। আসলে সুখ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না মানুষের জীবনে আমারও তাই। আমার গতির চেয়েও সুখ বেশি গতিতে দৌড়ায়।
চাচাকে ব্যাপারটা আরেকটু বুঝিয়ে বলার জন্য বলাতে চাচা বললেন, সুখ জিনিসটা যে কি, মনে হয় কান খাড়া খরগোশের মত একটু স্পর্শ পেতেই দৌড়ে পালায়। আমি যেভাবে দৌড়াই সুখ আমার চেয়ে বেশি গতিতে দৌড়ায়। ছোটকালে গাছের পাতা দিয়ে ঘর তৈরি করে খেলতে গিয়ে বাতাসের এক ঝাপটায় সব উড়িয়ে নিয়ে গেল, তখনি বুঝেছি শখ আর পূরণ হবে না। পরবর্তীতে বাবা মায়ের আদরে থেকে লেখাপড়া করে মনে করেছি ভালো একটা কিছু করবো। তবেই সুখ আসবে। কিন্তু কোথায় কার সুখ। বাবা মারা গিয়ে নিজের সুখের সাথে সাথে পরিবারের সুখ ও চলে গেল যেন সাপ গোটা ব্যাঙ ধরে গিলে ফেলার মতো সাপের পেটে। নিজে নিজেই ধারণা করলাম হয়তো জীবনে আর সুখ পাবো না। মাঝে মাঝে মনের দুঃখে পিনপিন করে গানের লাইন দুটো করুণ সুরে গাইতে থাকি…. “সুখ তুমি কি…. বল জানতে ইচ্ছে করে….শুধু জানতে ইচ্ছে করে…।” কিন্তু কোনো দিন আর জানা হয় না।
ফুফুর অসুস্থতার সময় হাসপাতালে ডিউটি করতে গিয়ে রোগীকে দেখতে আসা ছোটবোনের বান্ধবী নার্গিসের প্রেমে হাবুডুবু খেতে খেতে সুখ খোঁজার চেষ্টা করি। প্রেমের নৌকা পাহাড় দিয়ে চলার মতো সুখ অনুভব করি। সুখের মাস্তানি হাসপাতালে দেখাতে গিয়ে নিজের পিঠ রক্ষা পায় নাই। সেই সাথে নার্গিসও বিদায়। কলেজে পড়া অবস্থায় বড়বোনের বাড়ি বেড়াতে গিয়ে মর্জিনার প্রেম আমাকে ছাড় দেয় নাই। বড় কষ্ট করে মর্জিনাকে আয়ত্বে আনি। কালো মেয়ে, চোখের সুখ কি আর কালো সুন্দর, ভালো মন্দ বুঝে? লজ্জার মাথা খেয়ে কদিন পরপর বোনের বাড়ি বেড়াতে যাই মর্জিনাকে দেখার জন্য। তার পেছনে দৌড়াতে গিয়ে উষ্ঠা খেয়ে নিচের মাড়ির একটা দাঁত হারাই, কি আর করি… শেষ পর্যন্ত সবার আপত্তি আর ঝামটার মুখে সুখের ঘরে লাগে আগুন। আর সে আগুন আজও নিবে নিবে জ্বলে। মনের অন্তর্নিহিত কষ্ট মনেই রয়ে গেল। বুঝলাম বর্গা গরু দিয়ে আর কদিন হাল চাষ করবো। এতে সুখ পাওয়া যায় না। মনে মনে স্থির করলাম বিয়ে করে ঘরের বউকে নিয়েই সুখ অর্জন করবো। কারণ আপন বউ তো ! যা কথা তাই কাজ। ঠিক দেখতে গিয়ে বিয়েটা সেরেই আসলাম। সকলের পেদানি খেয়েও শেষ পর্যন্ত বউকে নিয়ে সুখেই ছিলাম। দুই কন্যার জনক হয়েও বউকে নিয়ে সুখকে আটকে রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সুখ জালে আটকা পড়া মাছের মত লাফালাফি করে চলে যেতে চায়। কিন্তু বিধি বাম শেয়ার বাজার ধসে দিনের সুখ রাতের সুখ সবই চলে যায় অদৃশ্য হাতে। চিন্তায় চিন্তায় রোগে শোকে ঘরের বউ একদিন খুব ভোরে আমাকে ছেড়ে চিরতরে বিদায় নেয়। মনে হলো সুখের লাগিয়া এ ঘর বাধিনোÑঅনলে পুড়িয়া গেল? বুঝলাম একাকিত্তে আনন্দ। শতভাগ লোককে খুশি করে যেমন কোন কাজ সফল করা যায় না ঠিক তেমনি সবদুঃখ যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকা যায় না নিজেকেও শেয়ার করতে হয়। একাকিত্ত আমাকে দিনদিন অসুস্থ আর মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাচ্ছে, সত্যিই কপালে সুখ সয় না। শুরু হলো কুমার জীবন। ভাবলাম মেয়েদের বিয়ে দিয়ে তাদেরও সুখে সুখী হবো, তাও আবার নির্ভর করতে পারি না, মনে মনে ভাবি “ঘর পোড়া গরু সিদুরে চাঁদ দেখলে ভয় পায়”।
শেষ পর্যন্ত রাগ ক্ষোভে সিদ্ধান্ত নিলাম আবার বিয়ে করে সন্তান জন্ম দিয়ে সুখি হবো। আবার মনে মনে ভয় হয়,এ বয়সে সন্তান যদি বাবা না ডেকে দাদা ডাকতে চায়। আসলে ভাতিজা আমার কপালে কি সুখ নাই ?
আমি বললাম চাচা সুখের জন্য আরেকটা বিয়ে কর। তারপর একটা ছেলে হলে তাকে মানুষের মতো মানুষ করে একটা বিয়ে করিয়ে সুখ পাবা। কারণ নিজের ছেলেতো ! চাচা এবার রেগেমেগে বললেন এই বয়সে বিয়ে করে নাতির বয়সী সন্তান জন্ম দিয়ে লালন পালন করে সন্তানকে বিয়ে করিয়ে সুখি হতে হতে তার পূর্বে আমাকেই পরকালে বিদায় নিতে হবে সব কিছুর ইতি টেনে।