“টালমাটাল নিত্যপণ্যের বাজার, ক্রেতাদের নাবিশ্বাস, নিম্নআয়ের লোকেদের ত্রাহী অবস্থা”

খোন্দকার জিল্লুর রহমান:
টালমাটাল নিত্যপণ্যের বাজার, চাল,ডাল,লবন,চিনি আটাসহ নুন্যতম কাঁচা বাজার করতে গিয়েই মধ্যবিত্ত থেক নিম্ন আয়ের এক প্রকার ত্রাহী ত্রাহী অবস্থা, করোনার তাণ্ডব কমলেও স্বস্তি নেই জনজীবনে। করোনা শেষ না হতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মুল্য। সেইসাথে পাল্লাদিয়ে বাংলাদেশেও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যায়ে কোথাও যেন স্বস্তি নেই। ব্যবসায়ীদের দাবি, পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকা ও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির কারণে দেশে দ্রব্য মুল্যের এই লাগামহীন অবস্থা। তবে ক্রেতাদের দাবি সরকারের যথাযথ তদারকির অভাবকে। তাদের মতে, সরকারের তদন্তকারী সংস্থাগুলোর নজরদারি না থাকায় ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো দাম বাড়াচ্ছেন।
শনিবার ২১ মে ঢাকার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে সবপ্রকার মাছে দাম বেড়েছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। ডালের দাম কেজিতে বেড়েছে ১২ থেকে ১৫ টাকা, ফার্মের মুরগির ডিম প্রতি ডজনে ২০ টাকা বেড়েছে ,তাছাড়া দেশি, লেয়ার, সোনালী, সাদা কক মুরগি কেজিতে বেড়েছে ৩০ থেকে ৪৫ টাকা।
রাজধানির খিলগাঁও বাজারের একজন আটা বিক্রেতা বলেন, খোলা ও প্যাকেট আটা ৪৫ থেকে ৫০ টাকা কেজি হয়েছে। এভাবে বাড়তে থাকলে দুই সপ্তাহের মধ্যেই চালের দাম ও আটার দাম প্রায় সমান হয়ে যাবে।
মুদি ও ষ্টেসনারি দোকানদার (সব ছদ্ধনাম ব্যবহার করা হয়েছে) বলেন, দেশি মসুর ডাল সপ্তাহের ব্যবধানে ১২০ টাকা থেকে বেড়ে ১৪০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া মসুর ডাল (মোটা দানা) ১১০ টাকা কেজি, মাসকলাই ৯০ টাকা, ভাঙা মাসকলাই ১৩০ টাকা, অ্যাংকর ১০ টাকা বেড়ে ৭০, বুটের ডাল ১০ টাকা বেড়ে ৯০, মুগডাল ১৪০ টকা, খেসারি ডাল ১০ টাকা বেড়ে ৮০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে সাদাটা ৮০ টাকা এবং দেশীয় তৈরি চিনি ১১৫ টাকা ।
মাছসহ পরিবারের অন্যান্য নিত্যপণ্য কিনতে বাজারে আসেন মনির হাসান সাহেব, কথা হয় তার সাথে, এক পর্যায়ে তিনি বলেন, তবে দামের হঠাৎ উর্ধগতিতে বাজেট মেলাতে না পেরে মাছ না কিনেই ফিরে যান। তিনি আরো জানান গত সপ্তাহে খেসারি ডাল কিনেছি ৭০ টাকা আর এই সপ্তাহেই কিনতে হচ্ছে ৮০ টাকা। বাজারে মাছ কিনতে গিয়ে দেখি আকাশছোঁয়া দাম। মাছ কিনলে প্রয়োজনীয় অন্য পণ্য কিনতে পারবো না। তাই মাছ না কিনেই চলে আসছি। বাধ্য হয়েই ডাল আর সবজি কিনে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে।
একজন তৈল ক্রেতা বলেন, সরকার তেলের দাম নির্ধারণ করে দিলেও বাজারে তার প্রতিফলন নেই। আজ খোলা সয়াবিন তেল ২১০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। প্রধান পামতৈল উৎপাদনকারী দেশ ইন্দোনেশিয়া রপ্তানী নিেষদাগ্যা উঠিয়ে নিলেও পাম তেল ১৮৫ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। তবে বোতলজাত সয়াবিন সরকার নির্ধারিত ১৯৮ টাকা লিটার বিক্রি হচ্ছে।
মুরগি বিক্রেতা মকবুল জানান, অনেক ব্যবসায়ী বেশি দাম পাওয়ার আশায় সোনালী মুরগিকে দেশি মুরগি বলে বিক্রি করছেন। তাছাড়া জোগান কম, চাহিদা অনেক বেশি। তাই মুরগির দাম বেড়েছে। সপ্তাহের ব্যবধানে সোনালী মুরগি ৪০ টাকা বেড়ে ৩৩০/৩৪০, ব্রয়লার ১৫৫/১৬৫ টাকা, লেয়ার ৩০ টাকা বেড়ে ৩৩০, সাদা কক ২০ টাকা বেড়ে ২৭০, দেশি মুরগি ৫০ টাকা বেড়ে ৫৫০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে এখন পেঁয়াজের দাম কিছুটা কমেছে। দেশি পেঁয়াজ ৩৫ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া দেশি রসুন ৮০ টাকা, আদা ৭০, আলু ২০ থেকে ২৫ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।
সবজির বাজার ঘুরে দেখা যায়, বাজারে শনিবার কচুর লতি বিক্রি হয় ৫০ টাকা কেজি। তাছাড়া ঢেঁড়স প্রতি কেজি ৩০ টাকা, চিচিঙ্গা ৩০ টাকা, করলা ৪০ টাকা, চাল কুমড়া ৫০ টাকা প্রতিটি, মিষ্টি কুমড়া ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি, বেগুন ৫০ টাকা প্রতি কেজি বিক্রি হয়। সপ্তাহের ব্যবধানে সবজিতেও দামের ছোয়ায় প্রায় ৮/১০ টাকা বেড়েছে। ধুন্দুল প্রতি কেজি ৩০ টাকা, ঝিঙ্গা ৪০, কাঁকরোল ৬০, পটল ৪৫, শসা ৩৫, টমেটো ৫০, কচুর মুখি ৬০/৭০, কাঁচা মরিচ ১০০ থেকে ১৪০, বরবটি ৮০, গাজর ১০০ টাকা কেজি বিক্রি হয়। এছাড়া কাঁচা কলার হালি ২৫ থেকে ৩০ টাকা, কাঁচা আম ৩০ টাকা কেজি, পেঁপে ৩০ টাকা কেজি, শজনে ডাঁটা ১২০ টাকা কেজি, লেবু ১৫ টাকা হালি, ডাঁটা শাক ১৫ টাকা, পুঁইশাক ২০ টাকা ও লাউ প্রতি পিস ৬০ থেকে ৭০ টাকায়।
গরু এবং খাসির মাংস এখন সাধারন ক্রেতাদের নাগালের বাহিরে, যেখানে খাসির মাংস ৯০০ টাকা কেজি এবং গরুর মাংস ৬৫০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। গরু ও খাসির মাংসের দামের অবস্থা জানতে এসে নাম না বলে একজন ক্রেতা বলেন, বাচ্চারা বেশ কদিন থেকে গরুর মাংস খাবার কথা বললেও বেশদিনপর আজ ৬৫০ টাকায় এক কেজি গরুর মাংস কিনি, কি করব বলেন ভাই বলে কাচুমাচু করে চলে যান।ফার্মের ডিম ৪০ টাকা হালি, হাঁসের ডিম ৫৫ টাকা ও দেশি মুরগির ডিম ৬০ টাকা হালি বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে দাম দর নিয়ে কথা বলতে ও ছবি উঠাতে উঠাতে দেখে সাংবাদিক মনেকরে কয়েকজন ক্রেতা জড়হয়ে বলেন, সরকারের প্রতিনিয়ত বাজার তদারকি করা প্রয়োজন।সরকারের বাজার তদারকি না থাকার ফলে অতি মুনাফার লোভে অসাধু ব্যাবসায়ীরা বিভিন্ন ছুতা ধরে বাজারের টালমাটাল অবস্থা তৈরি করে।সরকারের প্রতিনিয়ত বাজার তদারকি থাকলে হয়তো বাজারের ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের ওপর কিছুটা প্রভাব পড়তো। এর ফলে আমরা সাধারণ ক্রেতারা কিছুটা হলেও স্বস্তি পেতাম।
সবার সাথে পাল্লা দিয়ে মাছের বাজারও প্রায় টালমাটাল, প্রতিযোগিতায় কেউই কম নয়, মাছের দাম গত সপ্তাহের তুলনায় প্রকারভেদে ৩৫ থেকে ৫০ টাকা বা তারও বেশি বেড়েছে।জানতে চাইলে ব্যাবসায়ীরা গদবাধাঁ কারণ একটাই বলেন, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম।
দাম জিজ্ঞাসা করে জানা যায়, শিং মাছ ৩৫০ থেকে ৩৭০ টাকা কেজি বিক্রি হয়। এছাড়া পাঙ্গাস ১৬০/১৭০, তেলাপিয়া ১১৫০/১৮০, রুই ৩৫০/৪০০, সিলভার কার্প ১৮০, কাতল ২৮০, বাউশ ৩২০, গ্রাস কার্প ৩০০, কৈ ২৫০, টেংরা ৪৪০, পাবদা ছোট বড় ভেদে ৩৩০/৪৫০, গুতুম, বাইম ৫০০/৫৫০, বাতাসি ৬০০, মৃগেল ২০০, মাগুর ৬০০, দেশি চিংড়ি ৮০০, গলদা চিংড়ি প্রকার ভেদে এক হাজার, দেশি পুঁটি ২৫০, শোল ৭০০, টাকি ৪৫০ টাকা কেজি বিক্রিসহ বাজারে অন্যান্য সব মাছেরই দাম বেড়েছে।
বাজার তদারকির ব্যাপারে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরে কয়েকবার ফোন করে একবার আমরা নিয়মিত বাজার তদারকির আপ্রান চেষ্টা করছি, তদারকি আরও জোরদার করা হবে বলা ছাড়া আর কারো মতামত নেওয়া সমম্ভব হয়নাই।