সোনালী লাইফের অপেক্ষিত ১৩ কর্মকর্তাও বরখাস্ত, তদন্তে বাধাসৃষ্টির নেপথ্যে সাবেক চেয়ারম্যান, দুদকের মামলা (পর্ব – ৩)

খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
অবৈধ আর্থিক সুবিধার দাবিতে আন্দোলন এবং দুর্নীতির তদন্ত বাধাগ্রস্ত করতে প্রশাসকের কর্মকান্ডে বাধা দেয়ায় সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রধান কার্যালয়ের তালিকায় অপেক্ষিত ১৩ কর্মকর্তাকেও বরখাস্ত করা হয়েছে। গত ১১ জুলাই ২০২৪ বৃহস্পতিবার কোম্পানিটির প্রশাসক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম ফেরদৌস স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত পৃথক পৃথক চিঠি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানা যায়।
এর আগে ৭ জুলাই ২০২৪ আর্থিক অনিয়ম, শৃঙ্খলা ভঙ্গ, সনদ জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে সোনালী লাইফের উর্ধ্বতন ৫ কর্মকর্তাকে বরখাস্তকরা হয় এই প্রেক্ষিতে গত ৯ জুলাই থেকে কোম্পানিটির প্রধান কার্যালয়ে জমায়েত হয়ে বরখাস্তকৃত কর্মকর্তাদের পুনর্বহালসহ কোম্পানির আগের সুযোগ-সুবিধা বহাল রাখার দাবি করে আসছেন কোম্পানিটির কর্মকর্তা ও মাঠকর্মীর
সোনালী লাইফের বরখাস্ত হওয়া ১৩ কর্মকর্তা হলেন- কোম্পানিটির সিনিয়র ম্যানেজার সাহিদুর রহমান, সিনিয়র ম্যানেজার সঞ্জয় চক্রবর্তী, এসিসটেন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মৌসুমী রায়, ম্যানেজার আবদুল মালিক, এসিসটেন্ট ম্যানেজার আহমেদ সরোয়ার জনি, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার মৌসুমী দাসগুপ্ত, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার কাউসার আহমেদ রাসেল, এক্সিকিউটিভ অফিসার সাব্বির হোসেন, সিনিয়র অফিসার নাইমুর রহমান, সিনিয়র অফিসার পলি রানী সরকার, সিনিয়র অফিসার মিলন মাহমুদ, সিনিয়র অফিসার মাহবুবা জিন্নাত এবং অফিসার মিজানুর রহমান।
বরখাস্তকৃত এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্পিত দায়িত্ব পালন না করে নিয়োগের শর্তাবলী লঙ্ঘন এবং গ্রাহকসেবা বন্ধসহ কোম্পানিকে কোনরূপ সার্ভিস প্রদান না করার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়াও সাধারণ এমপ্লয়িদের কর্মবিরতি পালনসহ আন্দোলনে যেতে উস্কানি দেয়া এবং রীতিমত আন্দোলনে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে উল্লেখিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
একইসঙ্গে বরখাস্তকৃত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে কোম্পানি কোন পাওনা থাকলে তা কোম্পানিকে ফেরত প্রদান করে তাদের দেনা-পাওনা ব্যাপারে এইচআর এবং একাউন্টস বিভাগের সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়াও তাদের দ্বারা সংগঠিত কোন কার্যের জন্য ভবিষ্যতে কোম্পানি ও কোম্পানি সংশ্লিষ্ট কোন ব্যক্তি ক্ষতির সম্মুখীন হলে বা কোন সম্পদের ক্ষতি হলে তার দায়ভার তাদের ওপর বর্তাবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্দোলনকারিরা গত ৭ জুলাই ২০২৪ রোববার দাবি করেন, কোম্পানি তাদের কমিশন দিচ্ছে ব্যবসার বিপরীতে। এই কমিশনের টাকা তাদের নিজেদের ন্যায্য পাওনা। কিন্তু ব্যবসা হওয়ার জন্য ফিল্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যালাওন্স প্রয়োজন তাদের জন্য সেই অ্যালাওন্স কে দিবে! মাঠ পর্যায়ে যারা কাজ করবেন তাদেরকে ইনসেনটিভ-অ্যালাওন্স কেন দেয়া হবে না।
সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির প্রশাসক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম ফেরদৌস গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নিয়মের মধ্যে যা যা পাওনা সেটা দিয়ে দেয়া হয়েছে। কর্মীদের কোন পাওনা বকেয়া নেই। কিন্তু বেআইনিভাবে যে আর্থিক সুবিধা চাওয়া হয়েছে সেটা আইনগতভাবে দেয়ার কোন সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, বিভিন্ন বোনাস, ইনসেনটিভ, মার্কেটিং এক্সপেন্সসহ বিভিন্ন নামে পলিসি খুলে রেখেছে কোম্পানি; যা সরকারী বা আইডিআরএ’র পলিসির সাথে সাংঘর্ষিক- সেটা আমি দিতে পারি না।
সূত্র মতে, গত ২ জুলাই সোনালী লাইফ কর্মকর্তাদের নিয়ম বহির্ভুতভাবে নেয়া আর্থিক সুবিধা বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর ৭ জুলাই নিয়মবহির্ভূতভাবে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের জন্য কোম্পানির উর্ধ্বতন ৫ কর্মকর্তাকে বরখাস্তকরা হয়। এরপর ৯ জুলাই দাবি-দাওয়া আদায়ে জমায়েত হন সোনালী লাইফের কর্মকর্তারা।
এ সময় তারা বরখাস্তকৃত ৫ কর্মকর্তাকে পুনর্বহালসহ অনিয়ম ও দুর্নীতির দায়ে সাসপেন্ড পরিচালনা পর্ষদের হাতে সোনালী লাইফের দায়িত্ব তুলে দেয়ার দাবি জানান সেই সাথে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)’র নিযুক্ত কোম্পানির প্রশাসককে অপসারণের দাবি জানান। আন্দোলন এবং অরাজকতা সৃষ্টির জন্য সোনালী লাইফের প্রধান কার্যালয়ে জমায়েত হয়ে দাবি-দাওয়া আদায়ে অংশ নেয়া এসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একদিকে যেমন কোম্পানিটির সুষ্ঠু তদন্তে বাধাগ্রস্তকরার অভিযোগ রয়েছে, এ ছাড়াও অপরদিকে এসব কর্মকর্তার নেপথ্যে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত সাসপেন্ড পরিচালনা পর্ষদেরও মদদ রয়েছে বলে অভিযোগ আছে। এর আগে গত ২১ এপ্রিল সোনালী লাইফের ১৮৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদকে সাসপেন্ড করে প্রশাসক নিয়োগ করে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)।
সোনালী লাইফের আর্থিক অনিয়ম খতিয়ে দেখতে গত ১০ বছরের ব্যবসায়িক কর্মকান্ড অধিকতর তদন্তের জন্য গত জুন মাসে হুদাভাসী এন্ড কোম্পানিকে নিরীক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। নিরীক্ষার জন্য সময় দেয়া হয় ৩ মাস। কিন্তু নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের চাহিদা মোতাবেক তথ্য প্রদানে নানাভাবেই বাধাগ্রস্তকরার অভিযোগ ওঠে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। এ ছাড়াও কোম্পানি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে প্রশাসককে নানাভাবে বাধাগ্রস্তকরারও অভিযোগ রয়েছে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
এই সকল ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের ও মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের পরিবারের দুর্নীতি প্রকাশ হয়ে পড়ায় এবং প্রশাসকের ব্যবস্থা গ্রহণের কারণে সোনালী লাইফের সঞ্চিত অর্থ অনৈতিকভাবে ভোগ করতে না পেরে আন্দোলনকারীরা এমনিতেই ক্ষিপ্ত। আর অজিত চন্দ্র আইচ সিওও হিসাবে যোগদানের পর তাদের মদদ না করে বরং আইন তথা প্রশাসক এর সাথে সহায়তা করে চলেছেন এই বিষয়টি আন্দোলনকারীদের পছন্দ হয়নি বিধায় অজিত আইচের উপর তাঁরা রাগান্বিত হয় এবং তাঁকে অফিস থেকে মারধর করে বের করে দেয়। এর আগের সপ্তাহে অবশ্য তাঁকে চাপ দিয়ে পারিবারিক অসুস্থতা কারণ হিসাবে দেখিয়ে জনাব কুদ্দুস তাঁকে অফিস থেকে বাইরে রেখেছিলেন। রফিকুল ইসলাম এবং অন্যান্য ৪ জনকে বরখাস্ত করে যে চিঠি ইস্যু করা হয়েছে সেগুলি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় শুধুমাত্র জনাব অজিত আইচকেই নয়, অন্ততঃ আরও একজন হেডঅফিস কর্মকর্তা কে প্রশাসককে সহায়তা করার অপরাধে জনাব কুদ্দুসের নির্দেশে রফিক গং জীবন নাশের হুমকি দিয়ে ছুটিতে যেতে বাধ্য করে। অজিত চন্দ্র আইচ এই ব্যাপারে সবুজবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন যেখানে তাঁর উপর হামলাকারী দুইজন ব্রাঞ্চ ম্যানেজার এর নাম উল্লেখ রয়েছে। তবে, সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণকৃত ছবি থেকে অন্যদেরকে চিহ্নিত করা যাবে।
“এলোমেলো করে দে মা লুটেপুটে খাই,” সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির কাজকর্ম ঠিক সেরকমই প্রতিয়মান বলে প্রমানিত হয়, নিজের ইচ্ছা আর সেচ্চা চারিতাই যেন নিয়মে পরিনত হয়েছিল।
মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসসহ পরিবারের সবাই যেভাবে টাকা না দিয়েই পরিচালক…
সোনালী লাইফের বর্তমানে চলতে থাকা বেহাল অবস্থার জন্য দায়ি একমাত্র কোম্পানিটির সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস। লোভ, লালসা, লুটপাট, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যাবহার এবং পারিবারিক বলয় সৃষ্টির মাধ্যমে একক ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার অপচেষ্টাই এর মুল কারন। সাবেক এই চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস কোনো টাকা না দিয়েই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির চেয়ারম্যান এবং পরিচালক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যা গত ০৩ ডিসেম্বর ২০২৩ অর্থনীতির ৩০ দিন বিডিডটকম এবং অর্থনীতির ৩০ দিন পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত হয়। প্রকাশ থাকে যে, পরিচালক হতে তিনি অসদুপায় অবলম্বনসহ বড় ধরনের কিছু অনৈতিকতার আশ্রয় নিয়েছেনকোম্পানির দুটি ব্যাংক হিসাব বন্ধক রেখে এর বিপরীতে ঋণ নিয়েছেন, সেই ঋণের টাকাই আবার পে-অর্ডার করেছেন তিনি। উপরন্ত মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস নিজের পরিবারের সদস্যদেরও একইভাবে সুবিধাভোগী বানিয়েছেন। এঁদের মধ্যে তাঁর স্ত্রী ফজলেতুন নেছা, ছেলে মোস্তফা কামরুস সোবহান, ছোট মেয়ে তাসনিয়া কামরুন আনিকাসহ আরও অনেক পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার রয়েছেন। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। সূত্র আরো জানায়, আমরা এখন সোনালী লাইফের বিনিয়োগের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছি। বিনিয়োগের সঙ্গে এমএলএম ব্যবসাসহ অন্য অনেক বিষয়ও উঠে আসছে। যার কারনে তথ্য চাওয়া হলেও কোম্পানিটি সব তথ্য দিতে গড়িমসি করছে।
বিমা আইন অনুযায়ী জীবনবিমা কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন হতে হয় কমপক্ষে ৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে উদ্যোক্তাদের অংশ ১৮ কোটি। বাকি ১২ কোটি টাকা পুঁজিবাজারের মাধ্যমে সংগ্রহের বিধান রয়েছে। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠাকালে সোনালী লাইফের উদ্যোক্তা পরিচালক ছিলেন ১২ জন, বর্তমানে ২০ জন হয়েছে। শুরুর দিকে মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের বড় মেয়ে ফৌজিয়া কামরুন সোবহান, বড় ছেলে মোস্তফা কামরুস সোবহানের স্ত্রী সাফিয়া সোবহান চৌধুরী এবং ছোট মেয়ে তাসনিয়া কামরুন আনিকার স্বামী শেখ মোহাম্মদ ড্যানিয়েল পরিচালক হন। পরে মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসসহ একে একে তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যরা পরিচালক হন।
আইডিআরএর মুখপাত্র ও পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম গত ২৭ ডিসেম্বর জানান, ‘আমরা এখন সোনালী লাইফের বিনিয়োগের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছি। বিনিয়োগের সঙ্গে অন্য অনেক বিষয়ও উঠে আসছে। তবে দুই দফায় তথ্য চাওয়া হলেও কোম্পানিটি সব তথ্য দিতে গড়িমসি করছে।’ পরিচালকদের পক্ষ থেকে পরিশোধিত মূলধনের টাকা পরিশোধ না করার বিষয়টি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ভালো বলতে পারবে বলে জানান জাহাঙ্গীর আলম।
আইডিআরএর প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, যেসব পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার টাকা জমা না দিয়ে সোনালী লাইফের পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার হয়েছেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস; তাঁর স্ত্রী ফজলেতুন নেছা; ছেলে মোস্তফা কামরুস সোবহান ও তাঁর স্ত্রী সাফিয়া সোবহান চৌধুরী; দুই মেয়ে ফৌজিয়া কামরুন তানিয়া ও তাসনিয়া কামরুন আনিকা; তাসনিয়া কামরুন আনিকার স্বামী শেখ মোহাম্মদ ড্যানিয়েল এবং নুরুন্নবী, আবদুল লতিফ মানিক, বোরহান উদ্দিন, ওয়াসের হোসাইন।
বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম বলেন, ‘পরিশোধিত মূলধনের অর্থ পরিশোধ না করা গুরুতর অন্যায়। সোনালী লাইফের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা যদি এ অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত থাকেন, আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। তবে এ ব্যাপারে যে কোনো ব্যবস্থার প্রায়োগিক দায়িত্ব হলো আইডিআরএর।’
তবে সোনালী লাইফে যেভাবে কারসাজি করা হয়েছে
২০১৮ সালের ১৫ মে উদ্যোক্তাদের অংশে ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধন বৃদ্ধির অনুমোদন দেয় আইডিআরএ। এরপর ওই বছরের ২৬ জুন ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকার শেয়ার ক্রয় দেখানো হয় ১০ জন উদ্যোক্তা পরিচালকের নামে। এটা নিয়েই উঠেছে মূল অভিযোগ। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের নতুন করে ছাড়া শেয়ারের মোট পরিমাণ হচ্ছে ১ কোটি ৫ লাখ।
আইডিআরএ সূত্রে জানা গেছে, মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস ও কয়েকজন পরিচালক নিজনিজ নামে আলাদা পে-অর্ডার করে কোম্পানির তহবিলে শেয়ারের মূল্য পরিশোধ করেছেন বলে দেখিয়েছেন। তবে পে-অর্ডারগুলো করা হয়েছিল সোনালী লাইফের স্থায়ী আমানত (এফডিআর) বন্ধক রেখে নেওয়া ঋণের টাকা তুলে। সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকে (এসবিএসি) সোনালী লাইফের এফডিআর ছিল ১০ কোটি টাকা। ওই এফডিআরের বিপরীতে এক চেকে ৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা তুলে নেওয়া হয়।
আরেকটি হিসাব থেকে ভিন্ন চেকে ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা তুলে নেওয়া হয়। কৌশলে এই তৎপরতার নেতৃত্ব দেন সোনালী লাইফের চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস। আলাদা পে-অর্ডারে ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা জমা দেখানো হয় এসবিএসিতে থাকা সোনালী লাইফের আরেকটি ব্যাংক হিসাবে। এর মধ্যে ছয়জন পরে শোধ করলেও মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসসহ তাঁর পরিবারের তিন সদস্যসহ অন্যান্য কয়েকজনও টাকা পরিশোধ করেননি।
এব্যাপারে সোনালী লাইফের চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস দাবি করেন, তিনি কোনো জালিয়াতি বা কোনরকম কারসাজির সঙ্গে যুক্ত নন। কোম্পানিটি ভালো করছে বলে একটি গোষ্ঠীর ঈর্ষার কারণ হয়েছে। এ কারণেই নানা কথা ছড়ানো হচ্ছে।
অপরদিকে আইডিআরএর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১ কোটি ৫ লাখ শেয়ারের মধ্যে ৭৩ লাখ ৯০ হাজার শেয়ার বিক্রি দেখানো হয় ফৌজিয়া কামরুন তানিয়া, শেখ মোহাম্মদ ড্যানিয়েল, সাফিয়া সোবহান চৌধুরী ও রূপালী ইনস্যুরেন্সের নামে। তাঁদের শেয়ার থেকে পরে আরও ছয়জনের নামে শেয়ার হস্তান্তর দেখানো হয়। এই ছয়জনের মধ্যে মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস, তাঁর স্ত্রী ফজলেতুন নেছা, ছেলে মোস্তফা কামরুস সোবহান ও মেয়ে তাসনিয়া কামরুন আনিকাও রয়েছেন। আরও আছেন সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের স্ত্রী হানুফা আক্তার রিক্তা ও নুরুন্নবী নামের একজন। নাম না বলার শর্তে খাত সংশ্লিষ্ট অনেকের মতামতসহ এ ব্যাপারে অতি সম্প্রতি কিছু পত্র পত্রিকা সংবাদ অনুযায়ী বীমা উন্নয়ন এবং নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জয়নুল বারী সোনালী লাইফ কোম্পানিটি খুব ভালো করতেছে বলে উল্লেখ করেন। এ প্রসঙ্গে খাত সংশ্লিষ্ট কারো কারো নিকট জানতে চাইলে কেউ মুখ খুলতে রাজি হননি।
মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসসহ সোনালী লাইফের ৮ পরিচালক-কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা
সোনালী লাইফের দুর্নীতি নিয়ে গত ২৫ জুলাই ২০২৪ বৃহস্পতিবার সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসসহ আট জনের নামে দুদক মামলা দায়ের করে, বীমা কোম্পানিটির ১৮৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এ মামলা দায়ের করা হয়।

আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস; তাঁর স্ত্রী ফজলেতুন নেছা, ছেলে মোস্তফা কামরুস সোবহান ও তাঁর স্ত্রী কোম্পানিটির পরিচালক সাফিয়া সোবহান চৌধুরী, দুই মেয়ে ফৌজিয়া কামরুন তানিয়া ও তাসনিয়া কামরুন আনিকা, পরিচালক নূর-ই-হাফজা এবং কোম্পানিটির সাবেক সিএফও এবং ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী মীর রাশেদ বিন আমান। দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আখতারুল ইসলাম জানিয়েছেন, দন্ডবিধি ১৮৬০ এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর ধারা ৪(২) ও (৩) এর অধীনে সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১ এ মামলাটি দায়ের করেন কমিশনের সহকারী পরিচালক রাকিবুল হায়াত। (ঢাকা ট্রিবিউন সুত্র এ সংবাদ প্রকাশ করেছে)। কিন্তু এখানে সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, কোন ক্যারিশম্যাটিক কারনে তাসনিয়া কামরুন আনিকার স্বামী শেখ মোহাম্মদ ড্যানিয়েল দুদকের করা মামলা থেকে বাদ পড়লেন, এ নিয়ে সোনালী লাইফের কর্মকর্তাবৃন্দতো আছেই সেইসাথে সোনালী লাইফের গ্রাহক থেকে শেয়ারহোল্ডার পর্যন্ত সকলেই উদ্যেগ প্রকাশ করেন। মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, নথিতে উল্লেখিত ব্যক্তিরা বেআইনিভাবে আর্থিক সুবিধা লাভের অভিপ্রায়ে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
দুদকের তদন্তে সোনালী লাইফের দুর্নীতি নিয়ে যা উঠে আসে, তাতে তারা প্রতারণা ও জালিয়াতি, মিথ্যা চুক্তিপত্র তৈরি এবং অপরাধমূলক বিশ্বাস ভঙ্গের সাথে জড়িত। এর মাধ্যমে তারা বিভিন্ন মেয়াদে বীমা কোম্পানিটির তহবিল থেকে অবৈধভাবে ১৮৭ কোটি ৮৪ লাখ ১৫ হাজার ৯৬৬ টাকা উত্তোলন করেন।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কোম্পানিটির এসব অর্থ তারা ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর এবং বিভিন্ন স্তরের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যক্তিগত সম্পদে রূপান্তর করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দুদক আলামত পর্যালোচনা করে এসব অপরাধের প্রাথমিক প্রমাণ পায় এবং আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা নথিভুক্ত করে।
কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, নূর ই হাফজা, কামরুন নাহার, মায়া রানী রায়, আহমেদ রাজিব সামদানি, হুদা আলী সেলিম ও হাজেরা হোসাইনসহ ছয়জন পরিচালক পরে শেয়ারের মূল্য পরিশোধ করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের শিক্ষক মো. মাইন উদ্দিন এর মতে, ‘টাকা পরিশোধ ছাড়া কেহ পরিচালক হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁদের পরিচালক পদ থেক বাদ দেওয়া উচিত, এবং আইডিআরএ ও বিএসইসি এ ব্যাপারে যথা সময়ে যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে এ অবহেলার খেসারত দিতে হতে পারে সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্সের বিমা গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারদের বলে জানিয়েছেন এই শিক্ষক।’

সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্সের দুর্নীতি নিয়ে ৪র্থ পর্বের জন্য চোখ রাখুন অর্থনীতির৩০দিনবিডি.কম অনলাইন ও মেগাজিনের পাতায়…
চলবে….