অনেক দেরিতে হলেও দুর্নীতির অভিযোগে আইডিআরএ’র সদস্য কামরুল অর্থমন্ত্রণালয়ের আর্থিকপ্রতিষ্ঠান বিভাগের তদন্তের বেড়াজালে

খোন্দকার জিল্লুর রহমান
একের পর এক ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় পরে হলেও দেশের বীমা খাতের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর সদস্য (লাইফ) কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে তদন্তে নেমেছে খোদ অর্থ মন্ত্রণালয় এর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। দীর্ঘদিন ধরে কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মো. আজিমুদ্দিন বিশ্বাস, এনডিসিকে কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতি ও অনিয়ম তদন্ত সম্পন্ন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে গত ১৮ জুলাই। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপসচিব মো. মামুনুর রশীদ স্বাক্ষরিত পত্রে (নম্বর-৫৩.০০.০০০০.২৩১.৯৯.০০১.২৪.৮৩) বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. আজিমুদ্দিন বিশ্বাস, এনডিসির কক্ষে (নং-৩১৮, চতুর্থ তলা,ভবন-০৭, বাংলাদেশ সচিবালয়) গত ২৫ জুলাই দুপুরে প্রথম শুনানী অনুষ্ঠিত হয়। তবে দেশে বিদ্যমান অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সচিবালয়ের এ শুনানীতে এ দিন ৩ জন সাক্ষীর কেউ উপস্থিত থাকতে পারেননি বলে জানা গেছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সংশ্লিষ্ট পদস্থ একজন কর্মকর্তা জানান, লাইফ সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির বেশ কিছু কাগজপত্র বিভাগে জমা পড়েছে। এ ব্যাপারে অভিযোগকারী ও সাক্ষীদের উপস্থিতিতে একাধিক শুনানী অনুষ্ঠিত হবে। আগামীকাল (২৮ জুলাই, ২০২৪) দুপুর বারোটায় মো. আজিমুদ্দিন বিশ্বাস, এনডিসির কক্ষে অভিযুক্ত সদস্য এবং সাক্ষীর বক্তব্য নিয়ে শুনানী হবে। একাধিক শুনানীর ওপর ভিত্তি করে উভয় পক্ষের মতামত গ্রহণ ছাড়াও কাগজপত্রের সত্যতা প্রমাণের পর তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করবেন। এরপর বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর সদস্য (লাইফ) কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জানা গেছে, দেশের জীবন বীমা পেশায় কামরুল হাসান দীর্ঘ ২০ বছরের ওপরে সংপৃক্ত। চট্টগ্রামের পটিয়ার সন্তান কামরুল হাসান আমেরিকান লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে (আলীকো) বর্তমান মেটলাইফ এ ম্যানেজমেন্ট এসোসিয়েট হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। ৬ বছর কাজ করেন এখানে তিনি। সর্বশেষ এখানে তিনি দাবী বিভাগের প্রধান ছিলেন। কিন্তু ঘন ঘন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া আসার কারণে মেটলাইফ এ চাকরি করার ক্ষেত্রে তার সমস্যা তৈরি হয়। ফলে মেটলাইফ থেকে চাকরি ছেড়ে তিনি ন্যাশনাল লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এ উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে যোগদান করেন। ৩ বছর চাকরি করার পর তিনি দুবাই চলে যান । এক বছর পর দেশে ফিরে প্রগতি লাইফে উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে যুক্ত হন তিনি। বিশিষ্ট বীমাবিদ জাফর হালিম (প্রয়াত), একচ্যুয়ারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ থেকে চলে গেলে তিনি এখানে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে তার স্থলাভিষিক্ত হন। প্রগতি লাইফে ডিএমডি ও ভারপ্রাপ্ত এমডি পদে মোট ৬ বছর কাজ করে চার্টার্ড লাইফে এমডি পদে ৭ মাস এবং প্রোটেক্টিভ লাইফে একই পদে দেড় বছর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপর কাজ না পেয়ে ৬/৭ মাস বসে থাকেন তিনি। এরপর কিছুদিন পর বায়রা লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা পদে কাজ করে সেখান থেকে ইস্তফা দেন কামরুল। তারপর পদ্মা ইসলামী লাইফে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (চঃ দাঃ) পদে ৬ মাস তিনি কর্মকান্ড পরিচালনা করেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এ সিআইবি (ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো) প্রতিবেদনে ক্রেডিট কার্ড সংক্রান্ত ঋণখেলাপী হওয়ায় পদ্মা ইসলামী লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) নিয়মিত পদে তিনি অযোগ্য হন। ফলে বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক তার নিয়োগ অনুমোদন বাতিল করে।
আইডিআরএ বেশ কয়েক বছর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য পদগুলো শূন্য ছিল। অর্থ মন্ত্রণালয় এর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলে সদস্য (লাইফ) পদে তিনি চাকরির জন্য আবেদন করে পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন। ২০২২ সালের ২৩ জুন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর সদস্য (লাইফ) পদে অভিজ্ঞ বীমা নির্বাহী কামরুল হাসানকে ৩ বছরের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ নিয়োগ প্রদান করে। নিয়োগ পাওয়ার কিছুদিনের মধ্যে তার বিরুদ্ধে দেশের জীবন বীমা কোম্পানি থেকে অনিয়মের অভিযোগ আসতে শুরু করে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে- বীমা দাবীর চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে কোম্পানির কাছ থেকে ‘প্যাকেট’ গ্রহণ, কোম্পানির অর্থে দেশ-বিদেশে আনন্দ ভ্রমণ, ‘বিশেষ ব্যবস্থার বিনিময়ে’ ভূয়া শিক্ষা সনদ, অভিজ্ঞতা ও বয়স সময়কালের অযোগ্য প্রধান নির্বাহীদের সুবিধা দেওয়ার সুপারিশ করা, বছরের পর বছর অবৈধভাবে চলতি দায়িত্বে সিইওদের টিকিয়ে রাখা, যোগ্যদের ফাইল আটকে রাখা, অন্য কোম্পানির ছাড়পত্রবিহীন সিইওদের নতুন কোম্পানিতে যোগদানের ক্ষেত্রে ‘আর্থিক’ সুবিধায় তাদের ছাড় দেওয়া। শোনা যায় আইডিআরএ’র বিতর্কিত সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোশাররফ হোসেনের সময়ে চেয়ারম্যান, সদস্য (লাইফ) ও পরিচালককে (লাইফ) কুরবানীর উপহারস্বরূপ প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ষাঁড় কিনে পাঠিয়েছিলেন সোনালী লাইফের সাবেক সিইও।
দুর্নীতি ও অনিয়মে অভিযুক্ত আইডিআরএ সদস্য কামরুল হাসানের জন্য বিব্রত লাইফ কোম্পানির মালিক ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। ভয়ে তারা কিছুই বলতে পারেন না। একের পর এক ‘সুবিধা’ দিতে গিয়ে কোম্পানির বার্ষিক ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেড়ে যায়। ‘সুবিধার এ খরচ’ কোম্পানির হিসাবের খাতায় অন্য ‘হেডে’ হিসাবরক্ষকগণ যুক্ত করে বার্ষিক হিসাব ও উদ্বৃত্তপত্র (ব্যালেন্সশীট) প্রস্তুত করেন। কোম্পানিগুলো এ ধরনের অনিয়মের কারণে বেশ সমস্যায় পড়ে যেমন, তেমনি অনিয়ম করার সুযোগও পায় তারা! এতে করে বীমা কোম্পানিগুলো উন্নতি করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

আইডিআরএ’র একটি নির্ভরযোগ্য জানায়, সদস্য (লাইফ) কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ থাকায় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জয়নুল বারী তাকে অপছন্দ করেন। কোম্পানি পরিচালনায় পারতপক্ষে তিনি সদস্যকে (লাইফ) ফাইল দেন না । বরং নিচের পদের কর্মকর্তাকে কাজ সম্পাদনের জন্য চেয়ারম্যান দায়িত্ব দিয়ে থাকেন।
গত বছর অনৈতিক পথ অবলম্বন করে অর্থ দাবীর অভিযোগ ওঠে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এর (আইডিআরএ) সদস্য (লাইফ) কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে। এ অভিযোগ ওঠে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড থেকে। গত ২০ জুলাই ২০২৩ অর্থনীতির৩০দিনবিডিডটকম অনলাইনে, “কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির অভিযোগ প্রগ্রেসিভ লাইফের ভারপ্রাপ্ত সিইও জহির উদ্দিনের” শিরোনামে নিউজ প্রকাশিত হলেও তখন কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে এর কোন তদন্ত বা কোন রকম ব্যাবস্থা নেওয়া হয় নাই, তবে দেরিতে হলেও বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর বোধোদয় হয়, এবং তদন্তে যায়।
প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড এর ভারপ্রাপ্ত সিইও মো. জহির উদ্দিনকে সদস্য (লাইফ) কামরুল হাসান বলেন, ‘তোমার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান বলেছেন, তোমার বিষয়টি চেয়ারম্যান নিজে দেখছেন, মন্ত্রণালয় দেখছে, এটা আমার হাতে নাই, ওপরে চলে গেছে, তুমি এখানে (আইডিআরএ) আসলে শুধু আমার সাথে দেখা করবা। অন্য কারো সাথে দেখা করবা না বলে প্রগ্রেসিভ লাইফের ভারপ্রাপ্ত সিইওকে ভয় দেখান কামরুল হাসান।
দেশের শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত বীমা খাতের জীবন বীমা কোম্পানি প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড এর কোম্পানি সচিব ও ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহির উদ্দিনকে প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে কোম্পানির এমডি বানিয়ে দিবেন বলে সদস্য (লাইফ) কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে তখন অভিযোগ ওঠে।
সে সময় জানা যায়, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এর (আইডিআরএ) সদস্য (লাইফ) প্রগ্রেসিভ লাইফের হুমায়ুন নামের সাবেক এক মাঠ নির্বাহী কর্মকর্তা, যিনি কামরুল হাসানের ঘনিষ্ঠ ও পূর্ব পরিচিত; তার মাধ্যমে জহির উদ্দিনকে ডেকে পাঠান এই কামরুল হাসান। কামরুল হাসান তার অফিস কক্ষে জহির উদ্দিনকে তখন বলেন, ‘আমার স্ত্রী ও মেয়ে দেশের বাহিরে থাকে; তাদের টাকা পাঠাতে হয়। আমি খুব কম টাকা বেতন পাই, তাতে আমার চলে না। গাড়ির ২০০ লিটার জ্বালানি সরকার দেয়, তাতেও চলে না, গুলশান যেতে আসতে অর্থ শেষ হয়ে যায়। প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা এবং আমাকে নিয়ে বীমা দাবী পরিশোধের মিটিং করবা। প্রতিটি সভায় ২ লাখ টাকা করে সম্মানী দিবা।’
প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড এর ‘বিতর্কিত’ ও ক্ষমতাবান কোম্পানি সচিব এবং ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহির উদ্দিন (বর্তমানে সাবেক) সে সময় কামরুল হাসানের অনৈতিক এ আবদার নিয়ে গোটা বীমা পাড়ায় তোলপাড় শুরু করে দেন। বিক্ষুদ্ধ মো. জহির উদ্দিন কামরুল হাসানের বিষয়টি মিডিয়াসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে তখন অবহিত করেন।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপসচিব মো. মামুনুর রশীদ স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তি পত্রে প্রাপক হিসেবে মো. জহির উদ্দিনের নাম উল্লেখ রয়েছে। তাতে ঠিকানা রয়েছে -৮৫, সেন্ট্রাল বাসাবো, সবুজবাগ, ঢাকা। বিজ্ঞপ্তি পত্রের প্রেরক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপসচিব মো. মামুনুর রশীদের সঙ্গে প্রগ্রেসিভ লাইফের সাবেক কর্মকর্তা মো. জহির উদ্দিনের কথা হয়েছে বলে তিনি জানান।
উল্লেখ্য, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর সদস্য (লাইফ) কামরুল হাসান অভিজ্ঞ বীমা নির্বাহী হওয়া সত্ত্বেও সাংবাদিকদের সব সময় এড়িয়ে চলেন। ফোন করা হলে তিনি কল গ্রহণ করেন না। কথা বলতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন না। রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে বেশ উচ্চাবিলাসী কামরুল হাসান পৈত্রিক বাড়ীতে বসবাস করেন। ঘন ঘন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান তিনি। তার একমাত্র কন্যা ও সহধর্মিণী বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রবাসী।
২০ জুলাই ২০২৩ প্রকাশিত অর্থনীতির৩০দিনবিডিডটকম অনলাইনের প্রতিবেদনটি নিম্নরুপ..

কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির অভিযোগ প্রগ্রেসিভ লাইফের ভারপ্রাপ্ত সিইও জহির উদ্দিনের

জুলাই 20, 2023

অর্থনীতির ৩০ দিন ডেস্ক :
শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত বীমা খাতের কোম্পানি প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. জহির উদ্দিনের কাছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সদস্য (লাইফ) কামরুল হাসান ঘুষ দাবি করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গত ১২ জুলাই ২০২৩ অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব বরাবর পাঠানো এক আবেদনে জহির উদ্দিন এ অভিযোগ করেন।
অভিযোগপত্রে জহির উদ্দিন বলেন, কর্তৃপক্ষের সম্মানিত সদস্য (লাইফ) ও প্রগ্রেসিভের লুটেরা গোষ্ঠীর পারস্পরিক যোগসাজসে ও প্ররোচনায় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষের বে-আইনি ও রাগ-অনুরাগে গৃহীত সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে পেশাগত ক্ষতি, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, সামাজিকভাবে হেয়, চাকরি রক্ষা ও জীবনহানী থেকে বাঁচার জন্য সদয় হস্তক্ষেপের প্রার্থনার করছি।
জানা গেছে, গত ৩০ জুন প্রগ্রেসিভ লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা অজিত চন্দ্র আইচের চাকরির মেয়াদ শেষ হয়। তার আগে নতুন সিইও নিয়োগ দিতে কাজ শুরু করে পরিচালনা পর্ষদ। তার ধারাবাহিকতায় ১৮ জুন পরিচালনা পর্ষদের সংখ্যা গরিষ্ঠের ভোটে সিইও পদে জহির উদ্দিনকে দায়িত্ব দেওয়া দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।
কোম্পানির একটি সূত্র জানায়, বোর্ডের এই সিদ্ধান্ত একটি পক্ষ মেনে নিতে পারেনি। এ জন্য জহির উদ্দিনের বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্র’ শুরু করে। এতে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন আইডিআরএ সদস্য (লাইফ) কামরুল হাসান। এর অংশ হিসেবে তিনি অর্থ দাবি করেন।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব বরাবর দেওয়া আবেদনে জহির উদ্দিন বলেন, আইডিআরএর সদস্য কামরুল হাসান নিষ্পত্তি হওয়া কিছু অভিযোগের বিষয়ে পুনরায় চিঠি ইস্যু করে অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করে অর্থ দাবি করেন। অর্থ না দেওয়ায় হয়রানি করা হচ্ছে।
আবেদনে জহির উদ্দিন লিখেছেন, কামরুল হাসান আমাকে ডেকে নিয়ে বলেছেন, তোমার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে চেয়ারম্যান (আইডিআরএ) বলেছে। তোমার বিষয়টি চেয়ারম্যান নিজে দেখছেন, মন্ত্রণালয় দেখছে, এটা আমার হাতে নাই, উপরে চলে গেছে, তুমি এখানে (আইডিআরএ) আসলে শুধু আমার সাথে দেখা করবা। অন্য কারো সাথে দেখা করবা না বলে ভয় দেখান। এছাড়া আমাকে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বানিয়ে দিবেন বলে প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন।
উল্লেখ, বীমা কোম্পানির জনবল নিয়োগবিধি অনুসারে সর্বোচ্চ পদ মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে কোনো পদ নেই।
আবেদনে জহির উদ্দিন আরও লিখেছেন, আইডিআরএ) সদস্য (লাইফ) প্রগ্রেসিভ লাইফের সাবেক এক মাঠ নির্বাহী কর্মকর্তা হুমায়ুনের (যিনি কামরুল হাসানের ঘনিষ্ঠ ও পূর্ব পরিচিত) মাধ্যমে আমাকে ডেকে পাঠান।
হুমায়ুনের সামনে কামরুল হাসান আমাকে বলেন, ‘তোমার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে চেয়ারম্যান (আইডিআরএ) বলেছে, তোমার বিষয়টি চেয়ারম্যান নিজে দেখছে, মন্ত্রণালয় হতে দেখছে, এটা আমার হাতে নাই, উপরে চলে গেছে’ তালুকদারের (হোমল্যান্ড লাইফের সাবেক সিইও) সাথে আমি ন্যাশনাল লাইফে চাকরি করেছিলাম, তালুকদার তোমাকে ইন্স্যুরেন্স খাত থেকে বের করে দিতে বলেছে। তোমার অনেক শত্রু, তুমি এখানে (আইডিআরএ) আসলে শুধু আমার সাথে দেখা করবা। অন্য কারো সাথে দেখা করবা না। হুমায়ূন তোমাকে ভাল ও দক্ষ বলেছে, তাই তোমাকে আমি তার মাধ্যমে ডেকেছি। তুমি আমাকে প্রতিমাসে ৫০ হাজার টাকা করে দিবা। আমি তোমাকে এমডি করে দিব।
জহির উদ্দিন বলেন, ‘কামরুল হাসানকে প্রথমবারের মত দেখার কারণে আমি তাকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। তাকে প্রথম দেখাতে মনে হয়েছিল, তিনি কোনো বিচক্ষণ ব্যক্তি নন। তখন আমি বিনয়ের সাথে বললাম, ‘আমি সততার সাথে আইন, বিধি ও পরিচালনা পর্যদের সিদ্ধান্ত ও কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা এবং মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা অজিৎ চন্দ্র অইচের (সদ্য বিদায়ী সিইও) নির্দেশে গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থে কাজ করেছি। আমি নিরলসভাবে কাজ করছি বলে যড়যন্ত্রমূলকভাবে আমাকে হয়রানি করা হচ্ছে। আমি তো সিইও নই। আমাকে কেন কর্তৃপক্ষ এভাবে হয়রানি করবে, কাজ করলে আলোচনা/সমালোচনা হতে পারে, এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সরেজমিন তদন্ত হয়ে অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে।’
তিনি জানান, ‘কামরুল হাসান তার অফিস কক্ষে বলেন, চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর করা নোট আমি ধরে রেখেছি, ছিঁড়ে ফেলব। এটা বলার পর তিনি তার ব্যক্তিগত সহকারীকে নথি তার কক্ষে আনতে বলেন এবং তার নিকট রাখেন, আমাকে এবং হুমায়ুনকে দেখান এবং বলতে থাকেন যে, আমার স্ত্রী ও মেয়ে বাহিরে থাকে তাদের টাকা পাঠাতে হয়। আমি খুব কম টাকা বেতন পাই তাই আমার চলে না। গাড়ির ২০০ লিটার জ্বালানি সরকার দেয়, তাতে চলে না, গুলশান যেতে আসতে শেষ হয়ে যায়। প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা এবং আমাকে নিয়ে বীমা দাবি পরিশোধে মিটিং করে প্রতিটি মিটিং-এ ২ লাখ করে সম্মানী দিবা।’
এছাড়া আমার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগগুলো নিষ্পত্তির বিষয়ে যাতে পত্র জারি না হয়, এজন্য অদৃশ্য বোঝাপোড়া করতে হুমায়ুনকে বলেন। তখন হুমায়ুন বলেন, ‘সে আপনার কাছে এসেছে, তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ ও যড়যন্ত্র হচ্ছে, আপনাকে খুশী করবে। আপনি আর চিঠি দিবেন না, সে কোম্পানির চাকরি করে, তার চাকরির ক্ষতি হবে। আমাকে অন্য কোন কোম্পানিতে অথবা নতুন কোম্পানিতে এবং জহির সাহেবকে প্রগ্রেসিভে এমডি করে দিলে আপনার টাকার অভাব হবে না।’ আমি (জহির) বলি আমার এমডি হবার প্রয়োজন নেই। আমাকে অন্য কোম্পানিতে একটা ব্যবস্থা করে দিলে হবে। আমি জানি তিনি পারবেন না। তারপরও তাকে বলি।
আলোচনার এক পর্যায়ে কামরুল হাসান বলেন, হুমায়ুনের কোম্পানির নিকট পি.এফ ফান্ডসহ অন্যান্য পাওনা আছে, তার পাওনা দাও না কেন? আমি চিঠি ইস্যু করে দিচ্ছি, তুমি তার চেকটা আমাকে দিবা।
জহির উদ্দিন জানান, ‘সর্বশেষ গত ১১ জুন কামরুল হাসান আমাকে তার কক্ষে ডেকে পাঠান এবং আমি বাধ্য হয়ে যাই। তিনি বলেন, ঈদের জন্য তুমি আমাকে ১ লাখ টাকা দিবা। তুমি তো কথা শোনো না, লাইন মত চল না, বেলাল ও সোহরাওয়ার্দী তোমার পরিচালক বজলুর রশিদ ও মিজান সাহেবের সাথে আমাকে মিটিং করতে বলেছে, তুমি টাকা না দিলে আমি তাদের সাথে কথা বলে তোমাকে কোম্পানি থেকে বের করব। তারা পাঁচ লাখ দিবে। তোমার কাছে ১ লাখ চেয়েছি, দিলে তাদের সাথে কথা বলব না।
জহির উদ্দিন বলেন, সেখান থেকে আমি নিরবে চলে আসি, তবে তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাহী পরিচালক (আইন) যুগ্মসচিবকে অবহিত করি এবং অসুস্থ হয়ে পড়ি। কোথা থেকে এবং কীভাবে টাকা দেব। তিনি বলেন, আমার বাবা অসুস্থ, জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। তবে বিনয়ের সাথে উপেক্ষা করা অথবা মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তা দিয়ে কখনো আমি অফিসে নাই, মেয়ে অসুস্থ, নোয়াখালী ইত্যাদি বলে সময় ক্ষেপন করি। পরে আর তার সাথে দেখা করিনি।
জহির উদ্দিনের দাবি, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় আনা অভিযোগ সরেজমিন তদন্ত করে সত্যতা খুঁজে না পাওয়ার পরও পেশাগত সুনাম নষ্ট এবং মানসিক নির্যাতন করছে। এসব হয়রানি থেকে প্রতিকার চেয়েছেন তিনি।
কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ সর্বসম্মতিক্রমে মো. জহির উদ্দিনকে সর্বশেষ উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে পদোন্নতি প্রদান করে। এর আগে তিনি এসইভিপি (সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট) পদ মর্যাদায় কোম্পানি সচিব, হেড অব এইচ.আর, লিগ্যাল এবং উন্নয়ন প্রশাসন বিভাগের দায়িত্ব পালন করেন। উপযুক্ত পদসমূহ পরিচালনা পর্ষদ সর্বসম্মতিক্রমে প্রদান করে। কোম্পানি সচিব আইনের বিধান মতে একটি সংবিধিবদ্ধ পদ, কোনো পদবী না।
সবশেষ মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা অজিৎ চন্দ্র আইচ বিদায় নেওয়ার পর বোর্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদনে জহির উদ্দিনকে ভারপ্রাপ্ত সিইও নিয়োগ দেওয়া হয়। তারপরও আইডিআরএ’র সদস্য (লাইফ) কামরুল হাসানের অন্যায়, বে-আইনি আবদার, দাবি এবং দাবিকৃত অর্থ দিতে না পারায় নিষ্পত্তিকৃত একই বিষয়ে অব্যাহতভাবে অন্যায় অত্যাচার করছে। যা বন্ধ করতে আইডিআরএসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে আইনানুগ হস্তক্ষেপ কামনা করেন জহির উদ্দিন।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে অভিযোগ দেওয়ার বিষয়ে জহির উদ্দিন বলেন, বোর্ড আমাকে ভারপ্রাপ্ত সিইও হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ায় একটি পক্ষ ক্ষুব্ধ। সত্যিকার অর্থে আমি কোম্পানিকে গতিশীল করতে বদ্ধ পরিকর। তবে আইডিআরএর একের পর এক চিঠিতে আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। কামরুল সাহেবকে টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় আমাকে হেনস্তা করা হচ্ছে।
তবে কোম্পানির স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে তিনি অন্যায়ের কাছে নতি স্বীকার করবেন না বলেও জানান।
অভিযোগোর বিষয়ে জানতে একাধিকবার বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সদস্য (লাইফ) কামরুল হাসানকে ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে এসএমএস দিয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি।
তবে অন্য একটি গণমাধ্যমে তিনি বলেন, কোম্পানিটি বিভিন্ন সমস্যায় রুগ্ন হয়ে পড়েছে। গ্রাহকের অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা বিভিন্ন চিঠি ইস্যু করে বিষয়গুলো সমাধানের জন্য কাজ করছি। তবে তাদের চেয়ারম্যান বিদেশে থাকে, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সিইও তার মনমত সব কাজ করছে। তার বিরুদ্ধে আমরা তদন্ত কমিটি করেছি যেগুলোর রিপোর্ট আসতে শুরু করেছে।
প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা দিলে এমডি বানিয়ে দেওয়ার বিষয়ে কামরুল হাসান বলেন, অর্থ চাওয়ার বিষয়টি হতে পারে না। আমরা গ্রাহকের স্বার্থে কাজ করি। আমাদের বোর্ডের সিদ্ধান্তে সব কাজ সম্পন্ন হয়। কাজ করতে গেলে যে কেউ অভিযোগের শিকার হতে পারে তবে এর কোনো ভিত্তি নেই।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জয়নুল বারী গণমাধ্যমে বলেন, এ বিষয়ে আমি অবগত নই। আর এমন কোন অভিযোগ আমার কাছে আসেনি। আর যে কোনো কাজ আমার পর্যন্ত আসার আগে যদি কেউ অবৈধ লেনদেন করে সেখানে আমার কিছু করার নেই, যতক্ষণ না কেউ অভিযোগ করে। যদি কোনো বিষয়ে অভিযোগ আসে তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।