সুনীল অর্থনীতি কতদূর

৫ বছর পূর্বের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্ষোভ

৩১ জুলাইয়ের মধ্যে কর্মকৌশল ও প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ
অর্থনীতির ৩০ দিন ডেস্ক :
সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তি হয়েছে পাঁচ বছর আগে। নিষ্পত্তির পরপরই সমুদ্রসম্পদ আহরণে ব্লু ইকোনমির রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়। নেওয়া হয় বেশ কিছু সিদ্ধান্ত। কিন্তু পাঁচ বছরেও সিদ্ধান্তগুলো অধিকাংশ বাস্তবায়ন হয়নি। সরকারের উচ্চ পর্যায়ে এ নিয়ে অসন্তোষও রয়েছে।
সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ভারত ও মিয়ানমারের কাছ থেকে বিশাল সমুদ্রসীমা অর্জন করলেও সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনীতি বা ‘সুনীল অর্থনীতি’ ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ব্লু ইকোনমি বিষয়ে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাগুলোর নেওয়া কার্যক্রম এক প্রকার স্থবির হয়ে আছে। অর্জিত জলসীমায় সমুদ্রসম্পদ আহরণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং সিদ্ধান্ত নেয় ২০১৪ সালে। কিন্তু সিদ্ধান্তগুলোর দু-একটি ছাড়া কোনোটাই বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে সুনীল অর্থনীতিবিষয়ক সমুদ্রসম্পদ আহরণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাবিষয়ক সমন্বয় কমিটির চতুর্থ বৈঠকে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের কার্যবিবরণী সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
কার্যবিবরণী সূত্রে আরও জানা যায়, বৈঠকে মুখ্য সচিব বলেন, ২০১৪ সালের সিদ্ধান্তগুলো ২০১৮ সালেও বাস্তবায়িত হয়নি, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। সুনীল অর্থনীতি বিষয়ে কী কী পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন ছিল, এর মধ্যে কোনগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি এবং ভবিষ্যতে আর কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে, তা সবারই উপলব্ধি করা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে পাঁচ ধাপে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান তিনি। ধাপগুলো হলো- এক. আগে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো চিহ্নিত করা; দুই. প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন; তিন. কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে উপযুক্ত অংশীদার চিহ্নিত করা; চার. দ্রুতগতিতে বাস্তবায়নের জন্য ফাস্ট-ট্র্যাক বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নেওয়া এবং পাঁচ. কার্যক্রমের তদারকি ও মূল্যায়ন পরিকল্পনা নেওয়া।
এ ছাড়া ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে সুনীল অর্থনীতি উন্নয়নের বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের নেওয়া পদক্ষেপের বিষয়ে একটি অন্তর্র্বতীকালীন প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠাতে বলা হয়েছে। মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো স্ব্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অগ্রগতি প্রতিবেদনও একই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিটে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে তিন থেকে পাঁচ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কর্মকাণ্ড হচ্ছে সমুদ্র ঘিরে। বিশ্বের ৪৩০ কোটি মানুষের ১৫ শতাংশ প্রোটিনের জোগান দিচ্ছে সামুদ্রিক মাছ, উদ্ভিদ। ৩০ শতাংশ গ্যাস ও জ্বালানি তেল আসছে সাগর থেকে। সুনীল অর্থনীতি বাংলাদেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ঘটিয়ে জাতীয় অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা জানান, ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় অর্থনীতির সিংহভাগই সমুদ্রনির্ভর। সম্প্রতি দেশটি সুনীল অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যেগুলো বাস্তবায়িত হলে সমুদ্র থেকে আহরিত সম্পদের মূল্যমান ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় বাজেটের ১০ গুণ হবে। অস্ট্রেলিয়া সমুদ্রসম্পদ থেকে বর্তমানে প্রায় ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করছে। ২০২৫ সাল নাগাদ এ আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০০ বিলিয়ন ডলার।
প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার ও ভারত তাদের সমুদ্র এলাকা থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেল অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজ এরই মধ্যে শুরু করেছে। প্রতিবেশী এ দুই দেশ সমুদ্র থেকে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ শুরু করলেও বাংলাদেশ এখনও উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারেনি।
বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সমুদ্র-অর্থনীতি কাজে লাগাতে ব্যর্থতার কারণ হিসেবে আইনি কাঠামো না থাকা, প্রয়োজনীয় গবেষণার অভাব, সক্ষমতা তৈরিতে কার্যকর উদ্যোগ না থাকা এবং মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতাই মূলত দায়ী বলে মনে করছেন সংশ্নিষ্টরা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গবেষণাসহ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার ফল পেতেই লাগবে আরও ৫ থেকে ১০ বছর।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ব্লু ইকোনমি সেলের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সুনীল অর্থনীতি কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ কর্তৃপক্ষ থাকবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে। তবে তার আগে এ-সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করতে হবে। কবে নাগাদ আইনটি চূড়ান্ত হবে, তা বলা যাচ্ছে না। শুধু আইন নয়, ব্লু ইকোনমির সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে এমন ১৭টি মন্ত্রণালয় ও ১২ বিভাগের সমন্বয়ের কাজ করছে ব্লু ইকোনমি সেল। তবে আইনি কর্তৃত্ব না থাকায় সেলটির সিদ্ধান্ত মানায় সরকারের অন্যান্য সংস্থার বাধ্যবাধকতা না থাকায় বেশ কিছু ক্ষেত্রে সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। আবার অস্থায়ী সেলটির জন্য আর্থিক বরাদ্দ নেই। এ কারণে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
২০১২ সালে মিয়ানমার ও ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হয়। জাতিসংঘের সমুদ্রসীমা বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এক লাখ ৮২ হাজার ৮১৫ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র অর্জন করে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল ও চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশের সব প্রাণিজ-অপ্রাণিজ সম্পদে সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের। এ সমুদ্রসীমায় তেল, গ্যাস, মূল্যবান খনিজ সম্পদ, মৎস্য আহরণ এবং সমুদ্রসীমার নিরাপত্তার জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে কৌশলগত পরিকল্পনা নেওয়া হয় ২০১৪ সালে। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এবং সংশ্নিষ্ট সংস্থাভিত্তিক কর্মপরিকল্পনাও নেওয়া হয়। ওই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবকে সমন্বয়কারী ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব বা সচিবকে যুগ্ম সমন্বয়কারী করে সমুদ্রসম্পদ আহরণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাবিষয়ক সমন্বয় কমিটিও গঠন করা হয়।
সুনীল অর্থনীতিবিষয়ক সমুদ্রসম্পদ আহরণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাবিষয়ক সমন্বয় কমিটির চতুর্থ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান বলেন, সুনীল অর্থনীতি বিষয়ে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থারগুলোর কার্যক্রমের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। কিন্তু আগে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর আলোকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় কী কী কাজ করেছে এবং বর্তমানে কী পর্যায়ে আছে, তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কিন্তু অগ্রগতি প্রতিবেদন যথাযথভাবে না পাঠানোর কারণে এ বিষয়ে নেওয়া কার্যক্রমের মূল্যায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বৈঠকে আরও বলেন, এ বিষয়ে নেতৃত্বদানকারী জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করছে না। সুনীল অর্থনীতি বিষয়ে সব মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিটের সচিবকেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান তিনি।
মেরিটাইম ইউনিটের সচিব রিয়াল অ্যাডমিরাল (অব.) খুরশেদ আলম বৈঠকে বলেন, ২০১৪ সালের ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত সভাসহ এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সভায় মোট ৬০টি সিদ্ধান্তের কয়েকটি বাস্তবায়িত হলেও বেশির ভাগ এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি তার বক্তব্যে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের পাশাপাশি শিল্প মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে সমন্বিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন। এসব মন্ত্রণালয়কে সুনীল অর্থনীতি বিষয়ে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সহযোগিতা দেওয়া হবে বলে বৈঠকে জানান তিনি।