জ্বালানি খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পরিকল্পনা সৌদি আরবের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলনকারী দেশগুলোর তালিকায় সৌদি আরবের অবস্থান বিশ্বে প্রথম। একই সঙ্গে দেশটি জ্বালানি পণ্যটির রফতানিকারকদের বৈশ্বিক তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় আয়ের বড় একটা অংশ জোগান দেয় জ্বালানি তেল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির প্রশাসন। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে অন্যান্য খাতে উন্নয়নের পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানি হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে সৌদি আরব। বিশেষত অর্থনৈতিক বিকাশের স্বার্থে জ্বালানি তেলনির্ভর বিদ্যুৎকন্দ্রগুলোয় প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা শুরু করেছে দেশটি। এজন্য আগামী ১০ বছরের মধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাসের (বিশেষত পাথুরে ভূমি থেকে উত্তোলন করা শেল গ্যাসের) অভ্যন্তরীণ উত্তোলন বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশটির এ উদ্যোগকে শেল গ্যাস খাতে ‘নয়া সৌদি বিপ্লব’ বলে চিহ্নিত করেছেন বিশ্লেষকরা।
প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনকারীদের বৈশ্বিক তালিকায় সৌদি আরবের অবস্থান অষ্টম। দেশটিতে বেশ কয়েকটি বড় গ্যাসক্ষেত্র আছে। ওয়ার্ল্ড এনার্জি কাউন্সিলের (ডব্লিউইসি) সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে বর্তমানে ৭৪৯ কোটি টন প্রাকৃতিক গ্যাস (প্রচলিত উৎস থেকে প্রাপ্ত) মজুদ আছে। অন্যদিকে দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের পর থেকে সৌদি আরবে প্রাকৃতিক গ্যাসের (অপ্রচলিত উৎস থেকে প্রাপ্ত শেলসহ) মজুদ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৪৮ হাজার ৯০০ কোটি ঘনমিটারের বেশি। মজুদ থাকা এ বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস কাজে লাগাতে চাইছে সৌদি প্রশাসন। এ কারণে আগামী ১০ বছরের মধ্যে জ্বালানি পণ্যটির উত্তোলন বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকো। প্রতিষ্ঠানটির অপ্রচলিত সম্পদ (আনকনভেনশনাল রিসোর্স) বিভাগের প্রধান খালিদ আল আবদুল কাদের বলেন, সৌদি আরবে শেল গ্যাসের বিপুল মজুদ রয়েছে। এটা আমাদের জ্বালানি খাতের সামনে অনেক বড় একটি সম্ভাবনা। আগামী দিনগুলোয় বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ অভ্যন্তরীণ নানা খাতে জ্বালানি তেলের ব্যবহার কমিয়ে আনার সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কার্যকর বিকল্প হিসেবে শেল গ্যাস ব্যবহারের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।
তিনি জানান, আগামী ১ দশকের মধ্যে শেল গ্যাসের উত্তোলন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য এ খাতে ৩০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সৌদি আরামকো। এ সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ২ হাজার ৩০০ কোটি ঘনফুট শেল গ্যাস উত্তোলন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এজন্য সৌদি আরবের জাফুরাহ উপত্যকার কূপগুলোয় নতুন করে খননকাজ শুরু করা হয়েছে। এ উপত্যকার গ্যাস কূপগুলোর পরিধি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস উপকূলের ঈগল ফোর্ড উপত্যকার সমান। এমনকি অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ২০২৮ সালের মধ্যে প্রচলিত ও অপ্রচলিত— দুই ধরনের উৎস থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যটি রফতানির পরিকল্পনা রয়েছে সৌদি আরামকোর।
সৌদি আরবের জ্বালানি বিশ্লেষক ওমর ফিতোল্লি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের তুলনামূলক কম দাম সৌদি অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে দেশটি আয়ের বিকল্প উৎস খুঁজতে শুরু করেছে। এ প্রক্রিয়াকে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংস্কার হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবেই প্রাকৃতিক গ্যাস খাতে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে সৌদি প্রশাসন। এর মধ্য দিয়ে একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে জ্বালানি তেলের কার্যকর বিকল্পের সন্ধান মিলবে। কমে আসবে অভ্যন্তরীণ ব্যয়। অন্যদিকে প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি আরবের রফতানি পণ্যের তালিকায় যুক্ত হবে নতুন জ্বালানি পণ্যের নাম। বাড়বে রফতানি আয়। সব মিলিয়ে সৌদি অর্থনীতির অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করবে আরামকোর এ উদ্যোগ। আর এক্ষেত্রে শেল গ্যাস খাতে বিনিয়োগ বৈশ্বিক জ্বালানি খাতে সৌদি আরবের অবস্থানকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নেবে। এজন্য এ পরিকল্পনাকে সৌদি আরবের জ্বালানি খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের নতুন সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।