মেধাস্বত্ব সুরক্ষার অভাব
অর্থনীতির ৩০ দিন ডেস্ক :
মেধাস্বত্ব রক্ষার সূচকে বিশ্বে ৯১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৬২তম। ব্যবসা-বাণিজ্যে মেধাসম্পদ অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ায় প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। এ বিষয়ে নজর দিয়ে বাংলাদেশের জিডিপিতে ৫০ হাজার কোটি টাকা যোগ করা সম্ভব। ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশ (আইসিএসবি) আয়োজিত পেশাগত উন্নয়ন কর্মসূচিতে বক্তারা এসব কথা বলেন।
রাজধানীর ঢাকা ক্লাবের স্যামসন এইচ চৌধুরী হলে আয়োজিত ‘ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মোহাম্মদ আবদুল হালিম। তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে মেধাসম্পদ সুরক্ষার বিষয়গুলো যথাযথভাবে সন্নিবেশিত হয়নি। তবে আইনি কাঠামোর সংশোধন চলছে।
মেধাসম্পদ সুরক্ষা নতুনত্ব উত্সাহিত করে, ভালো ব্যবসায় পরিবেশ তৈরিতে অবদান রাখে ও বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ায়। বাজার বৈচিত্র্য ও পণ্যের মান উন্নয়নেও মেধাস্বত্ব অপরিহার্য।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে মেধাস্বত্ব সম্পর্কে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও পেটেন্ট ডিজাইন অ্যান্ড ট্রেডমার্কস বিভাগের রেজিস্ট্রার মো. সানোয়ার হোসেন। অনুষ্ঠানে মেধাসম্পদ সুরক্ষায় নিজ বিভাগের অবস্থান, আইনি কাঠামো, প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি।
আরেকটি নিবন্ধ উপস্থাপনকালে বাংলাদেশে মেধাস্বত্ব পরিস্থিতি তুলে ধরেন ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের মহাপরিচালক, আইসিএসবির কাউন্সিল সদস্য ও ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশের কোম্পানি সচিব মো. আজিজুর রহমান। তিনি বলেন, বাউল সংগীত, জামদানির মতো বিষয়গুলোর মেধাস্বত্ব বাংলাদেশ পেয়েছে। যথাসময়ে পদক্ষেপ নিয়ে এমন অনেক মেধাসম্পদের অধিকার আমরা ধরে রাখতে পারি।
বেসরকারি খাতে মেধাস্বত্ব অমান্য করার নানা দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, সচেতনতার অভাব ও আইনি দুর্বলতায় আমাদের দেশে নকল ও নিম্নমানের পণ্য খুবই সহজলভ্য। এখানে ব্র্যান্ড, লোগো, ডিজাইন ইত্যাদি নকল করে প্রকাশ্যেই অনেক নিম্নমানের পণ্য বিক্রি হচ্ছে। মেধাস্বত্ব অমান্যের এসব উদাহরণের পাশাপাশি চোরাচালান ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমেও বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নকল খাদ্য, ওষুধ ও প্রসাধনসামগ্রী জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার বই, চলচ্চিত্র, গান, শিল্পকর্মসহ সব ধরনের সৃষ্টিশীল কাজেরও মেধাস্বত্ব থাকছে না। মেধাসম্পদ সুরক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ৬২ নম্বরে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে মধ্য আয়ের এবং উন্নত দেশের কাতারে যেতে হলে আমাদের এদিকে নজর দিতে হবে। মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ নিশ্চিত হলে স্থানীয় শিল্প উপকৃত হবে, বাংলাদেশের ওপর বিশ্বের বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। ক্রেতা-ভোক্তারা আসল পণ্যের সুফল পাবেন। ক্রেতা-ভোক্তার সচেতনতা, যথাযথ আইন ও তার কঠোর প্রয়োগ, সর্বোপরি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া এ পরিস্থিতি উত্তরণ সম্ভব হবে না।
মেধাসম্পদ সম্পর্কিত বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও হিসাব-নিকাশ তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রতি বছর বাংলাদেশ সরকার গড়ে অন্তত ৭ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিষয়গুলোর সুরাহা হলে দেশের জিডিপিতে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা যোগ হতে পারে।
আইসিএসবির সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. ফিরোজ ইকবাল ফারুকী বলেন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি আর মেধাসম্পদের সুরক্ষা দুটো একযোগে এগিয়ে নিতে হবে। চীন বিশ্বের অর্থনৈতিক মঞ্চে খুবই শক্তিশালী দেশ। কিন্তু মেধাস্বত্ব অমান্যে তারা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। নাইজেরিয়া অর্থনৈতিকভাবে খুব শক্তিশালী দেশ নয়, তবে সেখানে নকল পণ্যের এত ছড়াছড়ি দেখা যায় না। তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো মেধাসম্পদের প্রতি তুলনামূলক যতœবান।
স্বাগত বক্তব্যে সেমিনারের সভাপতি, আইসিএসবির সাবেক প্রেসিডেন্ট ও প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট সাব কমিটির বর্তমান সভাপতি মো. আসাদ উল্লাহ বলেন, বর্তমান বাজার অর্থনীতি বস্তুগত সম্পদ, উদ্ভাবন এবং জ্ঞান দ্বারা চালিত। সৃজনশীল ধারণার ওপর ভিত্তি করে একটি উদ্ভাবনী সমাজ গড়তে মেধাসম্পদগুলোর সুরক্ষা প্রয়োজন। নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে আইসিএসবির সদস্যরা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
সমাপনী বক্তব্যে ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট মো. সানাউল্লাহ বলেন, আধুনিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু বস্তুগত পণ্য নিয়েই নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করছে না। মেধাসম্পদ সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ভারতের মতো দেশের চার্টার্ড সেক্রেটারিদেরও পেটেন্ট ডিজাইন, কপিরাইট নিবন্ধন, ট্রেডমার্ক নিবন্ধনের ক্ষমতা দেয়া যেতে পারে। অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চার্টার্ড সেক্রেটারিরা উপস্থিত ছিলেন।
তথ্য সূত্র : বণিক বার্তা










