সোনালী লাইফের ৫ শীষের্র বরখাস্ত,অনিয়ম ও দেউলিয়াত্ব ঠেকাতে প্রশাসক নিয়োগ আইডিআরএ-র সঠিকপদক্ষেপ… (পর্ব-২)

খোন্দকার জিল্লুর রহমান:
নেতিবাচক হলেও সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স এখন দেশের লাইফ বীমা খাত সংক্রান্ত সংবাদের শীর্ষে। দেশের চতুর্থ প্রজন্মের দেশীয় জীবন বীমা কোম্পানী সোনালী লাইফ এর ৫ জন শীর্ষ বিপণন বা ব্যবসা উন্নয়ন কর্মকর্তাকে বরখাস্তের কারণে মঙ্গলবার ০৯ জুলাই সকালে বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত ও হেড অফিস বিল্ডিংয়ে অবস্থিত মেট্রো প্রজেক্ট এর বেশ কিছু কমিশন ভিত্তিক মাঠকর্মী-কর্মকর্তা প্রথমে কোম্পানীর হেড অফিসের ৩ টি ফ্লোরে জমায়েত হয়। এরপর কয়েকজন বিপণন কর্মকর্তা, ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ও কোম্পানীর বেতনভুক্ত অথচ বরখাস্তকৃত বোর্ডের “লালিত” ও লালায়িত কিছু কর্মচারী-কর্মকর্তা উস্কানি ও চাপ দিয়ে কোম্পানীর প্রধান কার্যালয়ের সকল কর্মচারীকে নিয়ে অফিসের নিচে ক্যাফেতে অবস্থান নেয়। কোম্পানীর প্রধান হিসাব কর্মকর্তা (সিএফও) মহাম্মদ হান্নান, আইটির গোলাম মোস্তফা জুয়েল, অবলিখনের আব্দুল মালেক, দাবী বিভাগের শাহিদুর রহমান প্রমুখ কে হেড অফিসের নিয়মিত বেতনভুক্ত কর্মচারী-কর্মকর্তাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে জানা গেছে। ক্যাফেটেরিয়াতে বরখাস্ত কৃত ৫ কর্মকর্তাদের পুনর্বহাল ও অন্যান্য দাবীর পক্ষে বক্তব্য রাখেন বরখাস্তকৃত কর্মকর্তাদের মাঠ পর্যায়ের ও প্রধান কার্যালয় ভিত্তিক কিছু বিপণন কর্মকর্তা এবং পূর্বে উল্লেখিত হেড অফিসের কয়েকজন কর্মচারী-কর্মকর্তা। যারা বক্তব্য রাখেন বা নেপথ্যে থেকে এই কর্মসুচীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন এরা প্রত্যেকেই প্রাক্তন চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস, তাঁর কন্যা ফৌজিয়া কাম্রুন তানিয়া, ও জামাতা মোহাম্মাদ ড্যানিয়েলের মদদে ও সরাসরি নির্দেশনায় এসব করছেন বলে জানা যায়। এরপর আনুমানিক দুপুর ১২টার দিকে আন্দোলন এর নেতাদের নির্দেশে হেড অফিসের কর্মচারীরা কাজে ফিরে না গিয়ে বাসায় চলে যায়। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, এই আন্দোলনকারীরা এমনকি আইডিআরএ নিয়োজিত অডিট ফার্ম এর কর্মীরা যারা দ্রুততম সময়ে অডিট সম্পন্ন করার কাজে হেড অফিসে কাজ করছিল তাঁদেরকেও জোর করে অফিস থেকে বের করে দেয়া হয়। অডিট কাজ সময়মত সম্পন্ন না করতে দেওয়া সহ বর্তমান প্রশাসকের কাজে ব্যাঘাত ঘটানোই এই কর্মবিরতির আপাতঃ উদ্দেশ্য বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। আর এর পিছনে সুদূর প্রসারী উদ্দ্যেশ্য হলো পুনরায় কতৃত্ব ও ক্ষমতায় ফিরে আসার জন্য প্রাক্তন চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস এর দুরবীসন্ধি।
কোম্পানীর বিশ্বস্ত একটি সূত্র জানায়, গত ৮ জুলাই তহবিল তছরূপ ও অসদাচরনের কারণে ৫ জন শীর্ষ উন্নয়ন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়। এর আগে সোনালী লাইফের এ ৫ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বর্তমান প্রশাসক ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) এস. এম. ফেরদৌসের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন সহ অর্থ মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দাখিল, নিয়ম বহির্ভূত ভাবে প্রত্যেকে ৩০ লাখ করে মোট ১.৫ কোটি টাকা আত্মসাত, শিক্ষা সনদ জালিয়াতি ইত্যাদির জবাব চেয়ে শোকজ করা হয় এই কর্মকর্তাদেরকে। অথচ আন্দোলনকারীরা সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে জানান, মার্কেটিং এক্সপেন্স ও বোনাস বিল অনুমোদনের জন্য বর্তমান প্রশাসককে চাপ প্রয়োগ করতে যেয়ে ঐ কর্মকর্তারা কারণ দর্শানোর (শোকজ) সম্মুখীন হন। যাহোক, শোকজের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় প্রশাসক তাদেরকে ০৭ জুলাই হতে চূড়ান্তভাবে চাকরিচ্যূত করেন। চাকরিচ্যূতরা হলেন এএমডি রফিকুল ইসলাম, ডিএমডি আব্দুল্লাহিল কাফি, গোলাম মোস্তফা, সৈয়দ মোহাম্মদ আজিম ও মোহাম্মদ মনজুর মোর্শেদ। সকলের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ ছাড়াও রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে কোম্পানীতে জাল শিক্ষা সনদ জমার মাধ্যমে জালিয়াতি ও গত ১৭ এপ্রিল ২০২৪ তারিখে ইন্টারনাল অডিট ও সিএফও’র অনুমোদন ছাড়াই কোম্পানীর তহবিল থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা উত্তোলনের মাধ্যমে তছরুপের অভিযোগ রয়েছে।

তথ্য স্ক্যন ছবি
নির্ভরযোগ্য সূত্রে আরও জানা গেছে ৭ জুলাই বিকেলে সোনালী লাইফের শাখা ব্যবস্থাপক (বিএম)রা তাদের বিগত মাসগুলোর বোনাস-ভাতা না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে সিওও (প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা) ও কোম্পানীর প্রতিষ্ঠাতা মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা অজিত চন্দ্র আইচকে জোরপূর্বক রাজধানীর মালিবাগ চৌধুরী পাড়াস্থ কোম্পানীর প্রধান কার্যালয়ের অফিস থেকে বের করে দেয়। এক পর্যায়ে তাঁকে নিচে এনে রিক্সায় তুলে দেয়া হয় এবং রিকশায় বসা অবস্থায় তাঁকে সামনের দিক থেকে ও রিকশার পিছনে লাথি মারা হয়। এরপর অফিসে এলে তাঁকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়। অজিত চন্দ্র আইচ এই ব্যাপারে সবুজবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন যেখানে তাঁর উপর হামলাকারী দুইজন ব্রাঞ্চ ম্যানেজার এর নাম উল্লেখ রয়েছে। তবে, সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণকৃত ছবি থেকে অন্যদেরকে চিহ্নিত করা যাবে।

(সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণকৃত স্টিল ছবি)
এই সকল ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের ও মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের পরিবারের দুর্নীতি প্রকাশ হয়ে পড়ায় এবং প্রশাসকের ব্যবস্থা গ্রহণের কারণে সোনালী লাইফের সঞ্চিত অর্থ অনৈতিকভাবে ভোগ করতে না পেরে আন্দোলনকারীরা এমনিতেই ক্ষিপ্ত। আর অজিত চন্দ্র আইচ সিওও হিসাবে যোগদানের পর তাঁদের মদদ না করে বরং আইন তথা প্রশাসক এর সাথে সহায়তা করে চলেছেন এই বিষয়টি আন্দোলনকারীদের পছন্দ হয়নি বিধায় অজিত আইচের উপর তাঁরা রাগান্বিত হয় এবং তাঁকে অফিস থেকে মারধর করে বের করে দেয়। এর আগের সপ্তাহে অবশ্য তাঁকে চাপ দিয়ে পারিবারিক অসুস্থতা কারণ হিসাবে দেখিয়ে জনাব কুদ্দুস তাঁকে অফিস থেকে বাইরে রেখেছিলেন। রফিকুল ইসলাম এবং অন্যান্য ৪ জনকে বরখাস্ত করে যে চিঠি ইস্যু করা হয়েছে সেগুলি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় শুধুমাত্র জনাব অজিত আইচকেই নয়, অন্ততঃ আরও একজন হেড অফিস কর্মকর্তা কে প্রশাসককে সহায়তা করার অপরাধে জনাব কুদ্দুসের নির্দেশে রফিক গং জীবন নাশের হুমকি দিয়ে ছুটিতে যেতে বাধ্য করে।

আমাদের অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে যে, বীমা উন্নয়ন এবং নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) নিযুক্ত প্রশাসকের বিরুদ্ধে মাঠকর্মীদের বেতন-ভাতা না দেয়ার যে অভিযোগ এসেছে তা’ সত্য নয়। আসলে, বীমা আইন অনুযায়ী মাঠকর্মীরা শুধু কমিশন ও আইডিআরএ সার্কুলার অনুযায়ী বছর শেষে কিছু বোনাস পাওয়ার কথা। হাইকোর্টে দাখিল করা এক রিট পিটিশনে আন্দোলনকারীরা স্বীকার করেছেন যে প্রশাসক আসার পরও তাঁরা তাঁদের কমিশন পেয়ে যাচ্ছেন কিন্তু “কোয়ার্টার বোনাস” পাচ্ছেন না। এই “কোয়ার্টার বোনাস” বলতে যদি তাঁরা আইডিআরএ সার্কুলার অনুযায়ী প্রদেয় বোনাস বুঝিয়ে থাকেন তাহলে সেগুলি বছর শেষে প্রাপ্য। কোন একটি বোনাস আবার পলিসি ইস্যুর মাস থেকে চালু থাকার শর্তে ২৫তম মাসে প্রদেয়! তবুও সম্প্রতি আইডিআরএ নিয়োজিত একজন বীমা বিশেষজ্ঞ (কনসালটেন্ট) এবং আইডিআরএ লিগ্যাল শাখা এগুলির অংশ বিশেষ এডভান্স হিসাবে বছর
শেষের আগেই প্রদান করা যায় কি-না সেটি দেখছেন। কিন্তু এই কাজের জন্য সময় প্রয়োজন যা আন্দোলনকারীরা দিচ্ছেন না! এদিকে প্রতিষ্ঠাকালীন সিইও এবং বরখাস্তকৃত সিইও (যথাক্রমে অজিত আইচ ও রাশেদ বিন আমান) কর্তৃক ইস্যু করা কিছু আভ্যন্তরীণ কিন্তু বীমা আইন ও আইডিআরএ সার্কুলার লঙ্ঘনকারী কিছু সেলস পলিসির মাধ্যমে এবং অন্যান্য কিছু অফিস আদেশের বলে উন্নয়ন কর্মকর্তাদের কিছু অনৈতিক বেতন, মার্কেটিং এক্সপেন্স, এবং বোনাস দেওয়া হচ্ছিল। প্রশাসক দায়িত্ব গ্রহণ করার পর সেগুলির হাতিয়ে নেয়ার কাজ বন্ধ হয়ে যায়। অথচ বীমা আইন ও আইডিআরএ‘র বেধে দেয়া আইন/রুল অনুযায়ী, নৈতিকতার সাথে ব্যবসা না করার মানসিকতা
লালনকারী মাঠকর্মীরা আইনানুগ পাওনা গ্রহণ না করে আন্দোলনের নামে এবং আইডিআরএ চেয়ারম্যান ও নিযুক্ত প্রশাসকের অপসারণের দাবী তোলে। বিগত ০৯ জুলাই থেকে শুরু করা কর্মবিরতি পালনের এক পর্যায়ে তাঁরা অফিসের কাঁচ ও আসবাবপত্রও ভাঙ্গচুর করে। আর এই সকল ঘটনার পিছনে কোম্পানীর বরখাস্তকৃত ৫ কর্মকর্তা, কিছু বিপথগামী মাঠকর্মী-কর্মকর্তা, কুচক্রী ও বহিরাগতদের মদদপুষ্ট হেড অফিসের কিছু কর্মী ও সর্বোপরি প্রাক্তন চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের হাত রয়েছে বলে গোপন সূত্র জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার তথা ১১ জুলাই পর্যন্ত চলমান কর্মবিরতিতে পিছে থেকে কুদ্দুস পরিবারের পক্ষ থেকে আরও নির্দেশনা দিচ্ছেন বরখাস্তকৃত সিইও
রাশেদ আমানের প্রাক্তন স্ত্রী, কুদ্দুস তনয়া ফৌজিয়া কামরুন তানিয়া, এবং কুদ্দুসের কনিষ্ঠ কন্যার স্বামী মোহাম্মাদ ড্যানিয়েল।

যেখানে বীমা খাত সংশ্লিষ্ট এবং সাধারণ বীমা গ্রাহকদের মতে অনেক দেরিতে হলেও সোনালী লাইফে যোগ্য প্রশাসক নিয়োগে আইডিআরএ সময়োপযোগী ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং তিনি বীমা আইন, বিধি, প্রবিধি, সার্কুলার ইত্যাদি অনুযায়ী সঠিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সোনালী লাইফ কে দেউলিয়াত্বের হাত থেকে বাঁচানো, বীমা গ্রাহকের সুরক্ষা ফান্ড এর সংরক্ষণ, এবং সর্বোপরি মাঠে এবং অফিসে কর্মরত সোনালী পরিবারের সকল সদস্যের নৈতিক উপার্জন ও দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন, সেখানে আন্দোলনকারীরা বলছে, তাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
আন্দোলনকারীদের পক্ষে ১১ জুলাই সকালে দুইজন বিপণন কর্মকর্তা এবং ৫ জন ব্রাঞ্চ ম্যানেজার প্রশাসককে ৮ দফা দাবী সম্বলিত একটি স্মারকলিপি দিয়েছে। উল্লেখ্য, স্মারকলিপিতে হেড অফিস এমপ্লয়ীদের পক্ষে কিছু দাবী দাওয়া থাকলেও এমপ্লয়ীদের কোন প্রতিনিধি স্মারকলিপি দেওয়া বা প্রশাসকের সাথে আলোচনার সময় উপস্থিত ছিলো না। নির্দেশ না মানার কারণে আটকে রাখা ৩০-৩৫ জন ড্রাইভারদের বেতন কিভাবে ঐদিনই ব্যাংকে পাঠানো যায় তা’ আলোচনার জন্য প্রশাসকের অফিসে ডেকে নিয়ে আসা সিএফও মোহাম্মাদ হান্নান সেই সময় উপস্থিত থাকলেও কিছুক্ষণ পর একফাঁকে তিনি সন্তর্পণে সেখান থেকে চলে যান। স্মারকলিপির শুরুতেই বলা হয় “আমরা গত ০৯/০৭/২০২৪ ইংরেজি তারিখ থেকে কর্মবিরতি পালন করে আসতেছি। আমাদের নিম্নের দাবিগুলি মেনে নিলে আমরা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করবো।“যাহোক, আন্দোলনকারীদের ৮টি দাবী হলো-
১। অতিঃ ব্যবস্থাপনা পরিচালক সহ পাঁচ (৫) জনের বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহারের জন্য অনুরোধ করা হলো।
২। কোন ধরণের নিয়োগ বিধি অনুসরণ না করে আপনার নিজের নিয়োগকৃত ব্যক্তিদের স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতদুষ্ট ভাবে নিয়ম বহির্ভূত ঈদ বোনাস প্রত্যাহার করা।
৩। নামাজ ঘরের পাশে আনসার থাকার ব্যবস্থা করায় মহিলাদের নামাজ ও নিরাপত্তাজনিত অসুবিধা হচ্ছে। আনসার রুম প্রত্যাহার করা।
৪। ড্রাইভার ও এক্সিকিউটিভদের বেতন দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
৫। হাইকোর্টের আদেশের প্রতি সন্মান রেখে এজেন্টদের অ্যালাউন্স ও কোয়াটার বোনাস অবিলম্বে দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
৬। লিফট এর ৪ এর হোটেল রুম আমাদের এজেন্ট ও স্টাফদের ব্যবহার উপযোগী করা।
৭। লিফট এর ৭ এ এক্সিকিউটিভদের জন্য রক্ষিত রুম থেকে আপনার নিয়োগকৃত ব্যক্তিদের প্রত্যাহার করে এক্সিকিউটিভদের রুম ছেড়ে দেওয়া।
৮। এজেন্টদের পূর্বের সেলস পলিসি বহাল রাখা।

স্মারক লিপির ছবি……
এখানে বরখাস্তকৃত এবং আন্দোলনকারীদের নেপথ্যের নেতা ঐ পাঁচ (৫) জন কর্তৃক গ্রাহকের টাকা লুটপাটের প্রমাণ স্বরূপ একটি নোট শিটের কপি তুলে দেওয়া হলো। তাতে দেখা যায় সোনালীর ঢাকা মেট্রো প্রজেক্ট এর ৫ (পাঁচ) জন এক্সিকিউটিভের ইনসেন্টিভ সমহারে ৩০,০০,০০০/-(ত্রিশ লক্ষ) টাকা করে (যদিও সবার একই পরিমাণ হওয়ার কথা নয়,) ১,৫০,০০,০০০/- (এক কোটি পঞ্চাশ লক্ষ) টাকার একটি নথি উপস্থাপন করেন কে.এ. রাসেল। উক্ত নথিতে অভ্যন্তরীণ নিরিক্ষা বিভাগের কোন কর্মকর্তার বা সিএফও এর কোন অনুমোদন বা সুপারিশ নেই। তা’ সত্ত্বেও তৎকালীন এমডি (সিসি) রফিকুল ইসলাম (জাল সনদধারী) তা’তে স্বাক্ষর করে ভাইস চেয়ারম্যান ফৌজিয়া কামরুন তানিয়াকে দিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে নেন। যদিও উক্ত নথিতেই লুটপাঠের চিত্রমানিত, তবুও তথ্য বিচারে দেখা যায়, আইডিআরএ কুদ্দুসের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙ্গে দেন ১৮/০৪/২০২৪ ইং
তারিখে আর ঐ ১.৫ কোটি টাকা সরানো হয় তার একদিন আগে ১৭/০৪/২০২৪ ইং তারিখে । এখানে যে বিষয়টি আরও বেশি জানা-বোঝার দরকার তা’ হলো কে এই কে.এ. রাসেল যার স্বাক্ষরিত কোন নথি উপস্থাপন মাত্রই কোন অডিট কমিটির বা সিএফও’র যাচাইবাছাই ছাড়াই এমডি এবং চেয়ারম্যানরা নথি অনুমোদন করেন? অর্থ্যাৎ “ডাল মে কিয়া কুছ কালা হে?” অত্যন্তবিশ্বস্ত সূত্র থেকে জানা যায়, এই সেই কে.এ. রাসেল যার পুর্ণ নাম কাউসার আহমেদ রাসেল! যাকে সোনালী লাইফের সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস নিম্ন পদ থেকে ছয় (৬) ধাপ ডিঙিয়ে নথি উপস্থাপনকারী হিসেবে প্রমোশন দিয়ে নিজের ডান হাত হিসেবে ব্যবহার করতেন এবং এই কে.এ. রাসেলের মাধ্যমেই বিপণন ও মাঠ কর্মকর্তাদের বীমা আইন বহির্ভূত সেলস ইনসেন্টিভ, বোনাস, তথাকথিত বেতন-কমিশনসহ সবকিছুর উপর থেকে অনৈতিকভাবে শতকরা ৭৫ ভাগ বখরা নিজে নিতেন এবং ২৫ ভাগ এসব কর্মকর্তাদের ভাগ বাটোয়ারার ব্যবস্থা করতেন।
কে. এ. রাসেল কান্ডের এখানেই শেষ নয়! আই ডি আর এ নিয়োজিত প্রশাসক এসে দায়িত্বভার গ্রহণের পর যখন তিনি উপরোক্ত ১.৫ কোটি টাকা তছরুপের ক্ষেত্রে রাসেলের সংশ্লিষ্টতা ধরে ফেলেন তখনই রাসেল অসুস্থতার দোহাই দিয়ে বাসায় অবস্থান করতে থাকে এবং নেপথ্যে থেকে মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের নির্দেশে সকলকে প্রশাসকের বিরুদ্ধে উস্কানি দিতে থাকে। পরবর্তীতে যখন সোনালী লাইফে দীর্ঘদিন থেকে চলতে থাকা অনিয়মকেই নিয়মে পরিণত করে (যা বীমা আইন বা আইডিআরএ’র নিয়ম মোতাবেক নয়) বিভিন্ন নামে বিল করে তহবিল তছরুফ এবং অন্যান্য প্রমাণিত অপরাধের কারণে কোম্পানীর প্রধান কার্যালয়ের উপরোক্ত ৫ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হলো তখন এই রাসেল এবং কুদ্দুসের লালন করা / লেলিয়ে দেওয়া অন্যান্যরা অন্যায় সুবিধাভোগীরা মাঠকর্মী ও কর্মকর্তা-কর্মচারিদেরকে আন্দোলনে সামিল হওয়ার উস্কানি ও ইন্ধন দেয় বলে জানা যায়। জুলাই মাসের ০৯ তারিখে অফিস শুরুর আগেই “অসুস্থতাজনিত ছুটি” তে থাকা এই রাসেল কে অফিসের বিশেষ করে ৭ম, ৮ম ও অন্যান্য যে সকল ফ্লোরে মাঠকর্মীরা অফিস করেন সেই সব ফ্লোরে এবং কর্মবিরতির সময়ে, পূর্বে এবং পরে ক্যাফেটেরিয়ায় হাজির ও তৎপর থাকতে দেখা যায়। বরখাস্তকৃত পাঁচ (৫) কর্মকর্তাকে পুনর্বহালসহ উপরে উল্লেখিত ৮ দফা দাবি প্রস্তুতের সময়ও সহযোগিতা করে এই রাসেল।

বর্তমানে আন্দোলনকারীরা প্রশাসক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) এস.এম. ফেরদৌস-এনডিসি এর বিরুদ্ধে একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে সবার মাঝে ভয় ছড়ানোতে ব্যস্ত হয়ে পড়ার, সারা দেশের প্রায় ২৭ হাজার বিমা কর্মীর “বেতন-বোনাস” আটকে রাখার, আইটিসহ বিভিন্ন বিভাগের নিবেদিত কর্মীদের নামে সহকর্মীদের দিয়ে জোর করে মামলা করানোর হুমকি দেওয়ার, কথায় কথায় কর্মকর্তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার, অতীতের সব রেওয়াজ ভেঙে নিজের বেতন ৫ লাখ সঙ্গে বোনাস বাবদ আরও ৩ লাখসহ ৮ লাখ টাকা নির্ধারণ করার, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন না দিয়েই ডিএমডি পদে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে চাকরি দেওয়ার, ১৭ জন শীর্ষ নির্বাহী এবং ৩৩ জন ড্রাইভারের জুন মাসের বেতন আটকে রাখার, ডিএমডি পদমর্যাদায় নিযুক্তসহ সেনাবাহিনীতে তার সাবেক ৪ সহকর্মীকে গড়ে ২ লাখ টাকা বেতনে সোনালী লাইফে নিয়োগের ১ মাসের পরই নিয়মের বাইরে গিয়ে উৎসব ভাতা প্রদান করার মতো মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করে এবং সেগুলির নিরসনে
কিছু অন্যায় দাবি মেটানোর ব্যাপারে অনড় অবস্থান নিয়েছে।
অপর দিকে, বীমা আইনের আওতায় নিয়োজিত প্রশাসক বলছেন কোন অনৈতিকতাকে প্রশ্রয় না দিয়ে কোম্পানীতে নৈতিকতা, শুদ্ধাচার এবং হেড অফিসে আইনানুগ স্বাভাবিক কর্ম পরিবেশ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে তাঁর বিশেষজ্ঞ তিন (৩) জন সহযোগীকে নিয়ে আন্তরিকতার সাথে নিরলস কাজ করে চলেছেন। তবে বিভিন্ন তছরুপ, আত্মসাত, লুটপাট, অনাচার দূর করার জন্য যখনই তিনি কোন পদক্ষেপ নিচ্ছেন তখনই সেগুলির অপব্যাখ্যা সংশ্লিষ্টদের মাঝে ছড়ানো হচ্ছে আর পদে পদে তাঁকে এবং তাঁর টীম কে অসহযোগিতা করা হচ্ছে। নীরব অসহযোগিতার পাশাপাশি যারা নৈতিকতার সাথে চাকুরি করতে চাচ্ছেন তাঁদের কে ভয়ভীতি দেখিয়ে ছুটিতে যেতে বলা হচ্ছে।
এই সূত্রে আবারো স্মরণ করা যেতে পারে প্রতিষ্ঠাতা সিইও এবং বর্তমান সিওও অজিত আইচ এর বিষয়। তাঁকে প্রথমে ভয় দেখিয়ে এক সপ্তাহে অফিস থেকে দূরে রাখা হয়। তারপর যেদিন তিনি কাজে ফিরে আসেন সেদিনই তাঁকে জোর করে অফিস থেকে নীচে নামিয়ে মারধর করে রিকশায় উঠিয়ে দেওয়া হয়। প্রশাসক বাধ্য হয়ে ঐদিন সন্ধ্যায়ই কোম্পানীর সম্পদ ও সংশ্লিষ্টদের জীবনের নিরাপত্তার জন্য আনসার সদস্যদেরকে নিয়ে আসেন। প্রশাসক বীমা আইন ও আইডিআরএ’র সার্কুলার মোতাবেক মাঠকর্মীদের কমিশন নিয়মিত দিয়ে আসছেন। তবে আপাতঃ দৃষ্টিতে আইন বহির্ভূত বিশেষ করে মাঠকর্মী-কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছে না। বরং সার্বিক
ব্যবস্থাপনা ব্যয় যেন আইনের সীমার মধ্যে থাকে এবং সলভেন্সি মারজিন এর উপর যেন বিরূপ প্রভাব না পড়ে সেই জন্য সেলস পলিসি সমুহ বাতিল করা হয়েছে। তেত্রিশ (৩৩) জন ড্রাইভারের নিকট প্রতিটি গাড়ির মেন্টেনেন্স ও মাইলেজ হিসাব দেখাতে বললে তারা ব্যর্থ হয় এবং শোকজ নোটিশের জবাবে ধৃষ্টতা প্রকাশ করে। ফলে তাঁদের বেতন বন্ধ রাখা হয়েছিল (১১ জুলাই সকালে, আন্দোলনকারীরা প্রশাসকের অফিসে স্মারকলিপি নিয়ে আসার আগেই অবশ্য মানবিকতার দৃষ্টি থেকে ঐ সকল ড্রাইভার দের বেতন রিলিজ করার জন্য সিএফও কে নির্দেশ দেওয়া হয়)। যেহেতু নিয়োজিত অডিট ফার্মকে যত দ্রুত সম্ভব তাঁদের প্রতিবেদন জমা দিতে হবে সেহেতু তাঁদেরকে বিশেষ নিরাপত্তা প্রদান করা হচ্ছে এবং অ্যাকাউন্টস এর কর্মচারীদের কর্ম বিরতির মধ্যেই তাঁদের কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন। প্রশাসক জানিয়েছেন যে এই অচলাবস্থা সম্পর্কে আইডিআরএ অবগত আছে
এবং তিনি বিশ্বাস করেন যে অডিট প্রতিবেদন দাখিলে বিলম্ব হলে আইডিআরএ আইনজীবীরা আদালতে এটাও প্রমাণ করতে পারবেন যে কুদ্দুস পরিবারের নির্দেশেই সিএফও এবং অ্যাকাউন্টস এর কর্মচারীরা অডিটরদের কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছেন।
তবে সোনালী লাইফে চলমান আন্দোলনের ব্যাপারে সর্বশেষ যা জানা গেছে তা’ হলো ১১ জুলাই বৃহস্পতিবার কুচক্রী এস.এ. রাসেল সহ আরও ১৩ জন হেড অফিস এমপ্লয়ী কে সোনালী লাইফের নিয়োগপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত Terms & Conditions এর ধারা ৪ (ফ) অনুযায়ী স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। সোনালী লাইফের বরখাস্ত হওয়া ১৩ কর্মকর্তা হলেন- কোম্পানিটির সিনিয়র ম্যানেজার সাহিদুর রহমান, সিনিয়র ম্যানেজার সঞ্জয় চক্রবর্তী, এসিসটেন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মৌসুমী রায়, ম্যানেজার আবদুল মালিক, এসিসটেন্ট ম্যানেজার আহমেদ সরোয়ার জনি, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার মৌসুমী দাসগুপ্ত, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার কাউসার আহমেদ রাসেল, এক্সিকিউটিভ অফিসার সাব্বির হোসেন, সিনিয়র অফিসার নাইমুর রহমান, সিনিয়র অফিসার পলি রানী সরকার, সিনিয়র অফিসার মিলন মাহমুদ, সিনিয়র অফিসার মাহবুবা জিন্নাত এবং অফিসার মিজানুর রহমান। সকল বরখাস্তপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভবিষ্যতে সোনালীতে তাঁর কর্মকালীন সময়ে তাঁর দ্বারা সংঘটিত কোন কাজের কারণে কোম্পানী বা কোম্পানী সংশ্লিষ্ট কোন ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার জন্য বরখাস্তকৃত কর্মচারী দায়ী থাকবে। এর পরপরই আর একটি বিজ্ঞপ্তিতে প্রশাসক সবাইকে রবিবার (১৪/০৭/২০২৪ তারিখ) থেকে যথারীতি কাজে যোগদানের নির্দেশ দিয়েছেন। আমাদের এই প্রতিবেদনে আগেই বলা হয়েছে যে আমাদের অনুসন্ধান বলে যে সোনালী লাইফে প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে আইডিআরএ তথা সরকার সঠিক কাজ করেছেন। প্রশাসক নিরাপত্তা বলয়ে থেকে অফিস পরিচালনা করে উন্নয়ন কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত ও অনৈতিক বেতন-ভাতা, কমিশন বন্ধ করেছেন। চেষ্টা চলছে কোম্পানিকে কুদ্দুস-রফিক-রাসেল গং থেকে মুক্ত করে গ্রাহক দাবি পুরন করতে। কিন্তু চলমান অনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে আদৌ কি তা সম্ভব?? তেরো (১৩) জন দুষ্ট সহকর্মী ছাঁটাই হওয়ার পর হুঁশ ফিরবে কি হেড অফিসের বাকি কর্মচারী-কর্মকর্তার? রবিবার কাজে ফিরবেন কি তাঁরা? নিজের ও পরিবারের রুটি-রুজির সংস্থান নিশ্চিত করবেন, না-কি মিথ্যা উস্কানির মধ্যে থেকে, গ্রাহক সেবা সহ চাকুরীর নৈতিক দায়িত্ব পালনে নিবেদিত হবেন আগের মতো?
এরপর কি করবেন মাঠকর্মী-কর্মকর্তাবৃন্দ? অপেক্ষা করবেন ৬০ দিন পর হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী কি করে আইডিআরএ বা প্রশাসক? না-কি তৃণমূলের এফএ / ইউএম দের ধোঁকার মধ্যে রেখে তাঁদের ব্যবসা ও রুটি-রুজি নষ্ট করতে থাকবেন? তৃনমূল গ্রাহক পর্যায়ে তথ্য নিয়ে জানা যায়, কোম্পানীর দুর্ণীতিবাজদের আন্দোলনের কারনে মাঠের বিপণন কার্যক্রম হুমকির মুখে। মাঠ পর্যায়েও সোনালী লাইফ কোম্পানীর প্রতি ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে যার ফলে ভালো অবস্থায় থাকা সোনালী লাইফের ব্যবসা বর্তমানে ক্রমাবনতির দিকে।

সোনালী লাইফের মালিকপক্ষ এবং দুর্ণীতিবাজ কর্মকর্তাদের দুর্ণীতির হিসাব নিয়ে পরবর্তী পর্বের দিকে চোখ রাখুন অর্থনীতির ৩০ দিন বিডি ডট কমএর পাতায়…
চলবে …