
খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
দেশের জিডিপিতে অংশীদারিত্বের দাবীদার বীমা শিল্প। এই বীমা শিল্পের উন্নয়নে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)’র নিকট নন-লাইফ বীমা কোম্পানীর প্রায় শতভাগ ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দাবী ০% কমিশন। অপরদিকে একইভাবে নন-লাইফ বীমা কোম্পানীর মালিকপক্ষ চাহিদা তার উল্টো। কারন ব্যবসায়ীরা সর্বত্রই ব্যবসা খুঁজে, ব্যবসা! তাদের কাছে নীতি নৈতিকতা মূল্যহীন। বীমা কোম্পানীর মালিকগণ যদি সত্যিকারভাবেই ভাব-আদর্শের অনুসারী হতেন তবে বীমা শিল্পের আজ এই বেহাল দশা হতো না। শুধু মালিকপক্ষই নয় এই পেশার যথেচ্ছা ব্যবহারে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)ও এগিয়ে আছে, আর না থাকবেই বা কেন? আইডিআরএ এখন জ্ঞান বর্জিত নখদন্তহীন কাগুজে বাঘ শুধু তর্জন গর্জনে আছে। যারা নীতি আদর্শ নিয়ে কাজ করেন তাদের জন্য না হলেও যারা নিয়মের ভিতরে ভিতরে অনিয়মের জন্ম দেন তাদের সাথে সবসময় সখ্যতায় তৈরিতে ব্যস্ত, তাদের জন্য।
বীমা শিল্পের বিকাশে আইডিআরএ এখন বড় বাধা বা সমস্যা বলে প্রায় আশিভাগ সিইও প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও সত্য এবং খাত সংশ্লিষ্টরা এমনটিই মনে করছেন। আইডিআরএ’র অফিসে বর্তমানে প্রশাসনিক কোন শৃংখলা নেই বললেও একরকম ভুল হবেনা। সদস্যদের বদলে নির্বাহীরাই অফিস নিয়ন্ত্রণ করেন। কোন কোন সদস্য আবার নিজেরাই বিতর্কিত। আর তাই নির্বাহীরা দাপটের সাথে আইডিআরএ’র চেয়ারম্যানকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে চেষ্টা করেন, যার কারনে অতি সম্প্রতি রাজনৈতিকভাবে সদস্যপদ পাওয়া (লাইফ,নন-লাইফ) সদস্যদের চাপের মুখে কালিমা নিয়ে বিদায় নিতে হয়েছে। ফ্যাসিবাদি সরকারের পতন এবং পলায়নের পর নতুন সদস্য (লাইফ,নন-লাইফ) যারা নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন, তারা কতটুকু কি করতে পারবেন এর উপরও অনেকে নির্ভর করতে পারছেন না বলে মতামত প্রকাশ করেন। অতীত নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে কেহ কেহ বলেন, ঘরপোড়া গরু সিদুরে চাঁদ দেখলেও ভয় পায়,আমাদের অবস্থা সেই। আবার নিকট অতীতে কলঙ্কেরও বোঝা মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জয়নুল বারিকেও। তিনি নিজের অযোগ্যতার কারণে নির্বাহীদের অসত্য ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারনে বেশ বিতর্কিত হয়েছেন। সাবেক এই চেয়ারম্যান কারো চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারতেন না, কারণ তার বীমা বিষয় জ্ঞানের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে, এটা গত ১৪/০৬/২০২২শে তার চেয়ারম্যান হিসাবে আইডিআরএ যোগ দেওয়ার কদিন পর থেকেই সবার জানা হয়ে যায়। তার কথা ও কাজে কোন মিল ছিল না। অবসরকালীন সময়ে যাদের কৃপায় আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান হয়েছেন, তাদের তুষ্ট করতে করতে সত্যটাকে তলিয়ে না দেখে তাদের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করতে বাধ্য হয়ে বিভিন্ন বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছেন। তাই তিনি তার নির্বাহী পরিচালকের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করছেন।
এদিকে আইডিআরএ’র বর্তমান চেয়ারম্যান ড.আসলাম আলমও অভ্যন্তরীন ভাবে সমালোচিত না হলেও বাহিৃকভাবে সমালোচনার উর্ধে উঠে আসতে পারেন নাই। গত ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান হিসাবে যোগদানের পর ২/৩ দিন অফিসিয়ালি মতবিনিময়ের পর বেশকদিন অসুস্থতার পর অফিসিয়ালি কার্যক্রম শুরু করে সাংবাদিকসহ সাক্ষাৎ প্রার্থীদের উপর নিয়ন্ত্রন আরোপ করেন। আর এতেকরে বিভিন্ন কোম্পানীর এমডি/ সিইওসহ অফিসিয়াল অনেকের পক্ষে মতবিনিময় কঠিন হয়ে পড়ে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান হওয়ার কারনে ও চাকুরি নিরাপত্তাহীনতার ভয়ে বেশিরভাগ ব্যবস্থাপনা পরিচালক ০% কমিশন নিয়ে কথা বলাতো দুরের কথা এমনকি অন্য কোন প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়েও প্রকাশ্যে কিছু বলেন না।
বীমাখাত সংশ্লিষ্ট অনেকে মন্তব্য করে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি এখন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষ না হয়ে নিজেদের স্বার্থ উন্নয়ন ও হাসিলের কর্তৃপক্ষে পরিনত হয়েছে। তাঁরা আইডিআরএ কে ডুবিয়ে নিজেদেরকে ভাসাচ্ছেন, তাঁরা আইডিআরএ’র ভিতর সুকৌশলে আরেক অদৃশ্য সিন্ডিকেট তৈরি করে নিজেদের দৌরাত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছেন। তাঁদের দুএকজন আবার এনএসআই এবং সরকারের উচ্চমহলের কারোর নাম ব্যবহার করে অফিসের অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরকে কর্তৃত্বের মাধ্যমে দাপিয়ে বেড়ান, বীমা উন্নয়নে তাদের জ্ঞান সীমিত থাকলেও কিছু কোম্পানির প্রভাবশালী মালিকদের সন্তানদের এমডি/সিইও বানানোর স্বার্থে আইডিআরএ’র জুতসই আইন পরিবর্তনে বীমাখাত ধ্বংসে তাঁরা পাকা খেলোয়াড় হিসাবে কাজ করছেন।
মালিক পক্ষগণ কোম্পানীর সিইওদের নিয়োগ দিয়ে আইডিআরএ’র নিকট অনুমোদনের জন্য পাঠান। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আইডিআরএ তাদের অনুমোদন না দিয়ে ভাগড়া বসান, যারা এই অবস্থা থেকে উত্তীর্ণ হয়ে কাজ করছেন এবং কর্মক্ষেত্র চলমান তারা কাজ করতে করতে নবায়নের জন্য পাঠাবেন এইটাতো নিয়ম। এদের অনেকের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন পর নানা অজুহাতে নবায়ন প্রক্রিয়া ব্যাহত করা হচ্ছে। আইডিআরএ’র নবায়ন অনুমোদন না হওয়ার জন্য কে, আবার দীর্ঘদিন পর আইডিআরএ কর্তৃক কোন সিইওকে নবায়ন না দিয়ে বিনা অযুহাতে সময় ক্ষেপন করে, তাইলে উল্লেখিত সময়ে কোম্পানীর আর্থিক ক্ষতির জন্য দায়ী কে ?
একজন সিইও’র অবর্তমানে কোম্পানীর সকল কার্যক্রম প্রায় স্থবির থাকে এবং স্টেকহোল্ডারগণ ক্ষতিগ্রস্ত হন, মালিক ও কর্মচারীদের কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়। একজন সিইও-এর অবর্তমানে কোম্পানীগুলোতে একরকম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং সে সাথে ব্যবসায়ও ধ্বংস নামে, এগুলো আইডিআরএ’র কর্তা ব্যক্তিপক্ষ কি বোঝেন না? তারা কি কেবল চলমান কোম্পানীকে অচল করার কাজে কর্তৃত্ব খাটাতেই সাচ্ছন্দ বোধ করেন। তাঁদের চিন্তা করা উচিৎ যে, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীগুলো বেঁচে থাকলেই আমরা আইডিআরএ। কিন্তু আইডিআরএ‘র বর্তমান অবস্থা দেখলে তার উল্টোটাই মনে হয়, তারা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার পরিবর্তে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার দিকেই অধিক মনযোগী থাকেন সবসময় যেনো আপনি বাঁচলে বাবার নাম। আইডিআরএ‘র দুর্নীতির খবর এখন দেশের সতের কোটি লোকের মুখে মুখে,তাদের দুর্নীতি নাকি দেশের পুলিশ বাহিনীকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে।
বিভিন্ন কোম্পানীতে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে চাকুরীচ্যুত কিছু কর্মকর্তা এবং সুযোগ সন্ধনী সুবিধা আদায়কারী কেহ কেহ বিভিন্ন কোম্পানী ও ব্যক্তির নামে কুৎসা রটিয়ে আইডিআরএ’র কিছু সংখ্যক অসৎ কর্মকর্তার যোগসাজসে চিঠি-পত্রের মাধ্যমে বিভ্রান্তি করছে। আর আইডিআরএ ঐ সকল লোকেদের সোর্স বানিয়ে বিভিন্ন বেআইনী পদক্ষেপ নিচ্ছেন, যার প্রতিফল স্বরুপ গত কয়েকদিনে সাধারন ছুতা ধরে লাইফ নন-লাইফের বেশ কিছু কোম্পানীকে গড়পড়তা ৫ লাখ টাকা জরিমানা এবং নির্দিষ্ট সময়ে পরিশোধে ব্যর্থহলে ১০লাখ টাকা জরিমানা করা যেন একটা উৎসাহ উদ্দিপনায় পরিনত হয়েছে বলে খাত সংশ্লিষ্ট অনেকে আতঙ্ক বোধ করেন। অনেকে আবার নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যানকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যও করেন, তারা এও বলেন যে, আমরা বীমাখাতকে শিয়ালের মুখ থেকে বাঘের মুখে দিয়েছি বলে মনে হয়।
যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্ত দেওয়া উচিত, তা হলো যোগ্য এমডি/সিইও তৈরি এবং এমডি/সিইওদের চাকুরির নিরাপত্তা বিধান করা। কিন্তু আইডিআরএ এমডি/সিইও তৈরি এবং তাদের চাকুরির নিরাপত্তা বিধানে সম্পুর্ণ বিপুরীতমুখী ও বিনিময়ে ব্যতিব্যস্ত। প্রথমত একজন ডিএমডি এবং এএমডি পর্যন্ত চাকুরি পদ স্থায়ী অপরদিকে পরবর্তি এমডি/সিইও পদ অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক, যদিও পূর্ববর্তী পদের সাথে এমডি/সিইও পদে বেতন বৈষম্য অনেক বেশি, আর কোম্পানীর পরিচালনা পর্যদ তাদের ব্যবসা দেখেই এমডি/সিইও’র বেতন-ভাতা নির্ধারন করে থাকেন। কিন্তু আইডিআরএ ইচ্ছাকৃতভাবে কোন কোন সিইও’র অনুমোদনের সময় কোম্পানী কর্তৃক নির্ধারিত বেতন ভাতা কমিয়ে দিচ্ছে। মনে হয় সিইওদের বেতন ভাতাদি আইডিআরএ কর্তৃপক্ষ পরিশোধ করেন। একজন সিইওতো আর একদিনে তৈরী হয় না। দীর্ঘদিন কাজ করার পর তার কর্মদক্ষতা, কঠোর পরিশ্রম, দক্ষ বীমা কর্মী নিয়োগ ও সংযোজন এবং কোম্পানীকে লাভবান করেই বেতন ভাতা নিয়ে থাকেন। আইডিআরএ’র যদি স্বদিচ্ছা থাকে তবে প্রতিটি বীমা কোম্পানীর জন্য ০% কমিশনসহ এক ও অভিন্ন বেতন অবকাঠামোর নজির তৈরী করে দেখানো ক্ষমতার অপব্যবহার নয় সেইসাথে এমডি/সিইওদেও সরকারী চাকুরির মত নিশ্চয়তা বিধান বা স্থায়ীপদ তৈরি করে দেখানোই মুল ব্যাপার, আর এটা করে দেখানোই প্রকৃত প্রশাসনিক যোগ্যতা ও দুরদর্শিতা, যা বীমাখাতকে সুদুর প্রসারি অবকাঠামো তৈরি এবং জিডিপিতে অবদান রাখতে সহায়তা করবে। আসলে আইডিআরএ‘র অযোগ্যদের কারনে বহুপুর্বেই এ ক্ষমতা হারালেও বর্তমান চেয়ারম্যান অতীত চেয়ারম্যানের কলঙ্কিত অধ্যায়কে ওভারকাম করে একটা সুস্থ ধারাবাহিক নিয়মে ফিরিয়ে আনবেন বলে অনেকের ধারনা।
একজন সিইও’র উপর নির্ভর করে একটা কোম্পানী চলে তাই তাদের বেতন ভাতাদি নির্ধারণের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্যদের ভূমিকাই প্রাধান্য হওয়া উচিত। পরিচালনা পর্যদ কি ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে অধিক বেতন দেয়? যদি আইডিআরএ’র কর্মকর্তাগন নিজেদের সাথে তুলনা করে তাদের বেতন-ভাতা নির্ধরন করে, এটা ভুল, কারন তারা জানে না তাদের চেয়ে অনেক অনেক বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন লোক বীমা কোম্পানীতে চাকরি করেন।
আইডিআরএ গঠনের সময়ে প্রবীণ বীমা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি “এডভাইজরী বোর্ড” গঠনের কথা থাকলেও আজ পর্যন্ত তা পরিলক্ষিত হয় নাই। এখন এই দুর্যোগপূর্ণ পরিবেশে বীমা জ্ঞানে সমৃদ্ধ বীমা পেশাজীবিদের নিয়ে অতিসত্ত্বর বীমা “এডভাইজারী বোর্ড” গঠন করা উচিত। তাহলে আইডিআরএ’র অনৈতিক ও আইন অমান্যকারী সিদ্ধান্ত থেকে বীমা শিল্প কিছুটা রক্ষা পাবে এবং আইডিআরএ কিছুটা হলেও নিয়মতান্ত্রিকতায় আসবে, সেই সাথে কোম্পানীগুলো সঠিকপথে চলতে পারবে বলে খাত সংশ্লিষ্ট সকলের ধারনা।
চলবে…
শিগ্রই চোখ রাখুন, বিআইএ কি বীমা মালিকদের প্রতিষ্ঠান না মুখ্য নির্বাহি কর্মকর্তদের প্রতিষ্ঠান?












