আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন রাখা সবসময় দরকার

খোন্দকার জিল্লুর রহমান
নিজেকে প্রচার ও প্রসার করে দেখাতে কার না ভালো লাগে! আর এ প্রচার ও প্রসার যদি জনসাধারণের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তার জন্য দায়ী কে? এ কথা একবারও কি কেউ ভেবে দেখেছেন?
সম্প্রতি রাজধানীতে থাকা অনুমোদনহীন পোস্টার, ব্যানার, তোরণ, দেয়াল লিখন ও অন্যান্য প্রচারসামগ্রী গত ২২ আগস্ট ২০১৬-এর মধ্যে অপসারণের জন্য ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে এ নির্দেশনা কার্যকর করতে বলা হয়েছে। একই সাথে ওই তিন সিটি করপোরেশনকে আইনজীবীর মাধ্যমে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
বিচারপতি মো: রেজাউল হক ও মোহাম্মদ খুরশিদ আলম সরকারের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। গত ১৪ আগস্ট দেয়া এই আদেশের অনুলিপি পাওয়ার পর সিটি করপোরেশনের আইনজীবী মো: শাজাহান তা নিশ্চিত করেন। ২০১২ সালে এই রিট করা হয়েছিল। তখন সিটি করপোরেশনের প্রশাসকদের পোস্টার, ব্যানার, তোরণ ইত্যাদি সরানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। সেই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে উভয় সিটি করপোরেশনের ৯০ শতাংশের বেশি অবৈধ প্রচারসামগ্রী অপসারণ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদন দাখিল করেন। এই প্রতিবেদনের ওপর শুনানির সময় রিটকারীদের পক্ষ থেকে বলা হয়, নতুন করে ঢাকা শহরে পোস্টার, ব্যানারসহ হরেকরকম প্রচার সামগ্রীতে ছেয়ে গেছে; যা নাগরিকদের স্বাভাবিক কার্য সম্পাদনে নানা রকম সমস্যা সৃষ্টি করছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে আবারো এসব অবৈধ প্রচারসামগ্রী সরানোর নির্দেশ দেন এবং ২২ আগস্টের মধ্যে উন্নয়ন প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়। যদিও বর্তমানে ঢাকা শহরের অলিগলিসহ সারা দেশে সরকারি দল আওয়ামী লীগের অখ্যাত, কুখ্যাত ও নামসর্বস্ব সংগঠনের নেতা কর্মীদের ছবি সংবলিত পোস্টার, ব্যানার, বিলবোর্ডসহ অবৈধ প্রচারসামগ্রী ছাড়া অন্য কোনো দলের কোনো পোস্টার, ব্যানার কিছুই দেখা যায় না। অনেক সময় হাটবাজার বা বিভিন্ন আড্ডাখানায় অনেককে বলতে শোনা যায়Ñ কার ঘাড়ে মাথা ক’টা আছে যে, অন্য কোনো দলের পোস্টার, ব্যানার বা কোনো প্রচারসামগ্রী লাগাবে। আবার অনেকে বলেন, আওয়ামী লীগ বলে কথা। আদালত তো তাদেরই। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। বর্তমানে ঢাকা শহরের বিভিন্ন থানা ও সিটি করপোরেশনের আশপাশসহ সারা দেশের থানাগুলোতেই এসব পোস্টার, ব্যানারসামগ্রীর প্রাচুর্যতা লক্ষ করা যায় বেশি।
দ্বিতীয়ত, হাইকোর্টের নির্দেশনায় আরো বলা হয়েছে, কোনো আটকাদেশ দেয়ার জন্য বা ডিটেনশন দেয়ার জন্য কোনো নাগরিককে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করতে পারবে না। কোনো নাগরিককে গ্রেফতার করার সময় পুলিশ ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় তার আইডি কার্ড দেখাতে বাধ্য থাকবেন এবং গ্রেফতারের তিন ঘণ্টার মধ্যে তার (গ্রেফতারকৃতের) কারণ জানাতে হবে। এগুলো ছাড়াও সম্প্রতি বিভিন্ন মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের আপিল শুনানিতে আপিল বিভাগ ইউনিফর্ম না পরে সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাউকে গ্রেফতারের ঘটনা খুবই ভয়াবহ বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করেন। এর পরও সাদা পোশাকে গ্রেফতার বা আটক কোনোটাই থেমে নেই। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমান ও বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে সাদা পোশাকে আটক করে নিয়ে যাওয়াই তা প্রমাণ করে। দেশের জনগণ মনে করেন, এটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অদূরদর্শিতা ও সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন ছাড়া কিছুই নয়।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্রের কোনো নাগরিকের নাগরিক অধিকার হরণ করা বা অধিকারে বাধা দেয়া, রাস্তাঘাট, ফুটপাথ, প্রাকৃতিক পানির প্রবাহ ইত্যাদি বন্ধ করা অবৈধ। কিন্তু তার সব ক’টাই বর্তমানে ঢাকা শহরে বিরাজমান। রাজধানী শহর ঢাকা, যাকে তিলোত্তমা শহর হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। আর সেই তিলোত্তমা শহরে ফুটপাথে সাধারণ নাগরিকদের চলাচলের কোনো সুবিধাই নেই। সবটুকু দখল করে আছে অবৈধ দখলদার দোকানদার, ফেরিওয়ালা ও তৃণমূল হকাররা। আর এগুলোর সহযোগিতা করে যাচ্ছেন স্বীয় স্বার্থ হাসিলের জন্য সরকারদলীয় নামধারী কিছু সন্ত্রাসী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারী। গত কোরবানির ঈদের সময় রাজধানী সুন্দর, যানজটবিহীন ফুটপাথ ও নাগরিকদের চলাচলের জন্য ফ্রি ছিল। কিন্তু অফিস-আদালত খোলার এক থেকে দেড় সপ্তাহ পর থেকেই তা আবার আগের রূপ ধারণ করছে। আসলে এটা দেখার দায়িত্ব কার?
চতুর্থত, ব্যক্তিগতভাবে একটা কথা না বলে পারছি না। গত ২৪ সেপ্টেম্বর শনিবার সন্ধ্যার একটু পর আমার দাফতরিক কাজ সেরে হেঁটে রাজারবাগ ১ নম্বর গেটের পূর্ব পাশের মোড় অতিক্রম করছি। ট্রাফিক জ্যাম তেমন একটা লক্ষ্য করা না গেলেও কয়েকজন হোন্ডাচালকের সাথে একজন পুলিশ কর্মকর্তাও উল্টো পথে হোন্ডা চালিয়ে আসছেন। আমি কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশকে বললাম, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর লোকও উল্টো পথে আসে, ডিউটিরত ট্রাফিক পুলিশ আমাকে বললেন, এটাই নিয়ম। একটু থমকে রাস্তা পেরিয়ে এলাম, আবার মনে মনে ভাবলাম, আসলে এটাই বোধ হয় নিয়ম। কারণ পুলিশের নিয়ম তো আর আমার জানা নেই। আর এ রকম দায়িত্বশীল কর্তাব্যক্তিদের অনেক নিয়মই মাঝে মধ্যে চোখে পড়ে।
পোস্টার, ব্যানার ও তোরণ অপসারণে ২২ আগস্টের হাইকোর্টের নির্দেশনা পালন করা হয়নি। ফুটপাথে মোটর সাইকেল চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও যেখানে সেখানে ফুটপাথে মোটরসাইকেল চালাতে দেখা যায়, তবে ফুটপাথে লোহার পাইপ ও বেষ্টনি দেয়ার পর থেকে সাধারন জনগনের হাটাচলায় কিছুটা ব্যঘাত হলেও মোটরসাইকেল চলাটা মোটামোটি কমেছে। বিধি অনুযায়ী আসামিদের ডান্ডাবেড়ি পরানো; নোটবই, গাইডবই বিক্রি বন্ধ করা; ফলমূল, তরিতরকারিতে রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার বন্ধ; ফুটপাথে অবৈধ দোকানপাট না বসানো; হাটবাজারে রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার বন্ধে পরীক্ষাগার বা পরীক্ষা সেল স্থাপনসহ প্রায় অর্ধশত রায় এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
উচ্চ আদালতের রায় দেয়ার এক যুগ পেরিয়ে গেলেও এসব রায় বাস্তবায়নের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে চোখে পড়েনি। কখনো কখনো এর আংশিক কার্যকারিতাদেখা গেলেও কিছুদিন পর তা আবার পুর্বের অবস্থায় চলে আসে। এসব রায় বাস্তবায়নের দায়িত্ব আসলে কার?
লেখক : দফতর সম্পাদক,বাংলাদেশ মুসলিম লীগ। সম্পাদক ও প্রকাশক- অর্থনীতির ৩০ দিন।