উদীয়মান বাজারগুলোর কেমন কাটবে ২০২০ সাল

শেয়ারবাজারের ৩ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যনির্ধারণ, পাঁচ বছরের সর্বনিম্ন মুদ্রা বিনিময় হার এবং প্রায় দুই বছরের সবচেয়ে কম বন্ড স্প্রেড নিয়ে ২০১৯ শেষ করেছে উদীয়মান অর্থনীতিগুলো। কিন্তু কেমন যাবে ২০২০। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ, সুদহার, মার্কিন নির্বাচন, রাজনৈতিক অস্থিরতা বাজারগুলোর ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে একনজরে দেখে নেয়া যাক—

বাণিজ্যযুদ্ধ: নতুন বছরে উদীয়মান বাজারগুলোর বিনিয়োগকারীদের নজর থাকবে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের পালাবদলের দিকে। ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত ‘ফেজ ওয়ান’ বাণিজ্য চুক্তি বাজারগুলো চাঙ্গা হতে সহায়তা করলেও অনেক বিনিয়োগকারীর এর ওপর ভরসা নেই। চুক্তিটি বেইজিংয়ের বিপুল শিল্প ভর্তুকির মতো গভীর সমস্যা সমাধানে সাফল্য আনতে পারবে না বলে তাদের ধারণা। যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের আরো অবনতির আভাসেই কেবল চীনের ইউয়ানই নয়, সবগুলো উন্নয়নশীল দেশের মুদ্রা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ফেড ও ডলার: অন্তত ২০২১ সাল পর্যন্ত সুদহার বাড়ানো হবে না বলে সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল। তার এ ঘোষণা উদীয়মান বাজারগুলোর মুদ্রাবাজার চাঙ্গা রাখতে সহায়তা করেছে। পাওয়েলের ঘোষণা বাস্তবায়িত হলে একদিকে ডলার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, অন্যদিকে উদীয়মান বাজারের দিকে বিপুল মূলধন প্রবাহ নিশ্চিত হবে। কিন্তু যদি মার্কিন মূল্যস্ফীতির অপ্রত্যাশিত পতনে ফেডের পরিকল্পনা বদল হয় বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক আকস্মিকভাবে নীতি কঠোর করে, তাহলে সুদহার বৃদ্ধির পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশের বন্ডগুলোর স্প্রেড সংকুচিত হয়ে পড়বে।

মন্থর প্রবৃদ্ধি: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবে ২০২০ সালে উদীয়মান অর্থনীতিগুলো ৪ দশমিক ৬ শতাংশ সম্প্রসারিত হবে, যা উন্নত দেশগুলোর চেয়ে প্রায় তিন গুণ দ্রুত। কিন্তু চীন ও ভারতের অব্যাহত মন্থর প্রবৃদ্ধি সামগ্রিকভাবে উদীয়মান অর্থনীতিগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে মনে করছে সিটিগ্রুপ ইনকরপোরেশন। উদীয়মান বাজারগুলোর নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধি সম্পদমূল্য ও বিশেষভাবে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। তবে ব্রাজিল, মেক্সিকো, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও অন্যান্য দেশের অন্তত স্বল্পমেয়াদে হলেও মুদ্রানীতি শিথিলের যথেষ্ট সুযোগকে ভালো খবর বলে মনে করছে গোল্ডম্যান স্যাকস।

নিম্নমুখী ক্যারি ট্রেড: উন্নত দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখনো শিথিল অবস্থায় থাকার ফলে ২০২০ সালেও উচ্চ ইল্ড অনুসন্ধান অব্যাহত থাকতে পারে। কিন্তু ২০১৯ সালে স্থানীয় মুদ্রানির্ভর বন্ডগুলোর মান পতনের অর্থ হলো, উদীয়মান বাজারগুলোর ক্যারি ট্রেডের আবেদন কমতে শুরু করতে পারে। ব্লুমবার্গ বার্কলেস ইনডেক্সেসের তথ্য অনুসারে, গত বছর উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্থানীয় বন্ড ইল্ড কমে গড়ে ৪ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন।

হোয়াইট হাউজের দৌড়: ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রাইমারি নির্বাচন ও ২০২০ সালের ৩ নভেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচন বৈশ্বিক বাজারকে বড় ধাক্কা দিতে পারে। অধিকাংশ বিশ্লেষকের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ বা নতুন কারো হোয়াইট হাউজে আগমনে উদীয়মান বাজারের সম্পদ বাড়বে কিনা তা এখনই বলা যাচ্ছে না। এছাড়া চলতি সপ্তাহে অভিশংসনের পর নির্বাচনের আগেই ট্রাম্পকে ক্ষমতাচ্যুত করার সম্ভাবনা বিনিয়োগকারীদের জন্য আরো জটিলতা হাজির করেছে। কিছু বিশ্লেষক জানিয়েছেন, ট্রাম্প চীনের সঙ্গে একটি উদ্বেগজনক বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করলেও ইকুইটি বাজারে ৪৫ শতাংশ অর্জন দেখা গেছে।

অস্থিতিশীল লাতিন আমেরিকা: ২০১৯ সালজুড়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল ছিল লাতিন আমেরিকা। চিলি, একুয়েডর, বলিভিয়া ও কলম্বিয়ায় বৈষম্য থেকে শুরু করে দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভে কেঁপে উঠেছে পুরো অঞ্চলটি। এর মধ্যে ডিসেম্বরের শুরু থেকে অঞ্চলটির ইউরোবন্ড ঊর্ধ্বগতি অর্জন করলেও এখনো তা অন্যান্য উদীয়মান বাজারের চেয়ে ছয় মাস পিছিয়ে রয়েছে। ২০২০ সালেও সরকারগুলোর প্রতি ক্ষোভ বহাল থাকবে। অধিকাংশ এলাকায় রাজনীতি গুরুত্ব পাবে এবং বাণিজ্যের পেছনে প্রধান চালিকা শক্তি হবে।        সূত্র: ব্লুমবার্গ