কম্পিউটার শিক্ষক নেই ৪ হাজার বিদ্যালয়ে

মাধ্যমিক পর্যায়ে আইসিটি শিক্ষা
অর্থনীতির ৩০ দিন প্রতিবেদক
দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০১৪ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে সরকার। আইসিটি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের হাতেকলমে পাঠদানের জন্য কম্পিউটারও পৌঁছে দেয়া হয় অধিকাংশ বিদ্যালয়ে। যদিও পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে কম্পিউটার শিক্ষার পাঠদান।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে ১৯ হাজার ৮৪৮টি। এর মধ্যে ১৫ হাজার ৬৩৪টি বিদ্যালয়ে কম্পিউটার শিক্ষক রয়েছে। সে হিসাবে চার হাজারের অধিক বিদ্যালয়ে এখনো কম্পিউটার শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়নি। অর্থাৎ বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক ছাড়াই তথ্যপ্রযুক্তির পাঠদান হচ্ছে এসব বিদ্যালয়ে।
ব্যানবেইসের ‘বাংলাদেশ এডুকেশন স্ট্যাটিসটিকস-২০১৭’ প্রতিবেদনে বিদ্যালয়গুলোকে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে কম্পিউটার শিক্ষকের সংখ্যা দেখানো হয়েছে। ক্যাটাগরিগুলো হলো— নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক এবং স্কুল অ্যান্ড কলেজ (স্কুল শাখা)। এর মধ্যে ২ হাজার ৫৩৩টি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে কম্পিউটার শিক্ষক রয়েছেন ১ হাজার ৩১৬টিতে। অর্থাৎ ৪৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কম্পিউটার শিক্ষক ছাড়াই আইসিটি পাঠদান চলছে। আর ১৬ হাজার ৮১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে কম্পিউটার শিক্ষক রয়েছেন ১৩ হাজার ৩৫১টিতে। সে হিসাবে ১৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কম্পিউটার শিক্ষক নিয়োগ দেয়া সম্ভব হয়নি। এছাড়া ১ হাজার ২৩৪টি স্কুল অ্যান্ড কলেজের (স্কুল শাখা) মধ্যে ৯৬৭টিতে কম্পিউটার শিক্ষক রয়েছেন। অর্থাৎ ২১ দশমিক ৬৪ শতাংশ বিদ্যালয়েই কম্পিউটার শিক্ষক ছাড়াই আইসিটি পাঠদান চলছে।
আইসিটি পাঠদান বিষয়ে কাজ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী। তিনি বলেন, আইসিটি একটি টেকনিক্যাল সাবজেক্ট। অন্য কোনো বিষয়ের শিক্ষক আইসিটি পড়াতে গেলে কাঙ্ক্ষিত মান অর্জন না হওয়াটাই স্বাভাবিক। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকার প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীর ফলাফলেও। গত কয়েক বছরের এসএসসি ও এইচএসসি ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, আইসিটিতে ফেল করার হার অনেক বেশি। তাই প্রতিটি বিদ্যালয়েই আইসিটির জন্য বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আইসিটি বা কম্পিউটার বিষয়ে স্থায়ী শিক্ষক না থাকায় চুক্তিভিত্তিক বা খণ্ডকালীন কম্পিউটার অপারেটর দিয়ে দায়সারাভাবে আইসিটি বিষয়ে পাঠদান চলছে অনেক বিদ্যালয়ে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানে বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞানের শিক্ষকরা আইসিটি বিষয়ের ক্লাস নিচ্ছেন। তবে সরকারি উদ্যোগে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ নিলেও অষ্টম ও নবম শ্রেণীর আইসিটি পড়াতে পারছেন না সাধারণ শিক্ষকরা।
এ বিষয়ে একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক বলেন, আইসিটি বিষয়ে পড়ানোর জন্য কয়েকজন শিক্ষক এক সপ্তাহ ও দুই সপ্তাহের ট্রেনিং পেয়েছে, যা মোটেই যথেষ্ট নয়। প্রশিক্ষণ পাওয়া শিক্ষকরা অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণীর কম্পিউটার বিষয় পড়াতে পারছেন না। তাদের দীর্ঘমেয়াদি ট্রেনিং প্রয়োজন।
ব্যানবেইসের ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ে কম্পিউটার ল্যাব রয়েছে ৩০ দশমিক ৭৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ৮৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ বিদ্যালয়ে কম্পিউটার সুবিধা রয়েছে। এর মধ্যে ৭৩ দশমিক ১২ শতাংশ কম্পিউটার একাডেমিক ও দাপ্তরিক কাজে ব্যবহার হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অন্যান্য সুবিধার মধ্যে মাল্টিমিডিয়া সুবিধা রয়েছে ৭৭ দশমিক ২৬ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। ইন্টারনেট সুবিধা রয়েছে ৭৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ বিদ্যালয়ে।
সার্বিক বিষয়ে শিক্ষক-কর্মচারী ফ্রন্টের প্রধান সমন্বয়কারী ও শিক্ষানীতি-২০১০ প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ বলেন, দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত আইসিটি। আমাদের তরুণ প্রজন্ম এ খাতটিকে যেভাবে রপ্ত করছে, তা খুবই আশাব্যঞ্জক। কিন্তু বিদ্যালয়গুলোয় আইসিটির শিক্ষক নিয়োগ না দিয়ে ওই বিষয়টি শিক্ষার্থীদের ওপর বাধ্যতামূলক করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। একটি বিষয় শুধু বাধ্যতামূলক ঘোষণা করলেই হবে না, এর যথার্থ বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে।