মালিক পক্ষের দুই গ্রুপের দ্বন্দ্ব সেইসাথে কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিভাজন, গ্রাহকের দাবি পরিশোধে ব্যর্থতা, সিইও (সিসি) জহিরউদ্দিন নাকি আজাদি চতুর্মুখী ঝামেলায় কোম্পনিটির বেহাল অবস্থা…

খোন্দকার জিল্লুর রহমান:
ঢুকেই হোঁচট খেতে হলো অভ্যর্থনাকারীর মিথ্যা কথার কারনে, স্কাউট ভবনের আট তলায় প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে ঢুকে অভ্যর্থনাকারীর ডেস্কে বসা মহিলাকে এমডি(সিসি) জহির উদ্দিনের উপস্থিতি জিজ্ঞেস করতেই চটপট বলে ফেললেন, উনিতো নাই এবং উনিতো অফিসে আসেন না, বাইরে থেকে কাজ করেন। সাক্ষাতের সময় দিনক্ষন দিয়ে উপস্থিত না থাকাটা একটু অপ্রস্তুত মনে হলেও ফোন করে জানতেই তিনি অফিসে আছেন বলে জানান এবং পিএসকে পাঠিয়ে রুমে নিয়ে যান।
পরিচালকদের মতবিরোধের দ্বন্দ্ব অনিয়ম-দুর্নীতি-আর্থিক সেচ্ছাচারিতায় দিনে দিনে সক্ষমতা হারিয়ে দেউলিয়াত্বের দিকে অগ্রসর হচ্ছে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, বর্তমানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির লাইফ ফান্ড ১২৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকা, গ্রাহকের পাওনা ১১৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।
বর্তমানে কোম্পানিটির মোট সম্পদের পরিমাণ ২৭৮ কোটি ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা, পুঁজিবাজারে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে। ২০২০ সাল থেকে বার্ষিক সাধারণ সভা করতে না পারা, বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিতকরাসহ বেশকিছু অনিয়মের কারনে ‘এ’ ক্যাটাগরি থেকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে আসার ৪৫ দিনের ভিতর কোম্পানিটির পর্ষদ পুনর্গঠনের নির্দেশ দিয়েছে বিএসইসি।
গ্রাহক দাবির সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে লাইফ ফান্ডের বেহাল অবস্থা, প্রিমিয়ামের মাত্রা, বিনিয়োগ আয় কম হওয়ায় লাইফ ফান্ডে যোগ হচ্ছে না নতুন টাকা,যার ফলে গ্রাহকদাবি পরিশোধে দিনদিন সক্ষমতা হারাচ্ছে কোম্পানিটি। এহেন পরিস্থিতিতে পরিচালকদের দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব একদিকে কোম্পানিটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও প্রভাব ফেলছে অপরদিকে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধেও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
কোম্পানিটির ত্রৈমাসিক তথ্য পর্যালোচনা অনুসারে, ২০২৩ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৩৩ হাজার ২৯৭ গ্রাহকের বীমা দাবি বকেয়া রয়েছে। এসব গ্রাহকের বকেয়া বীমা দাবির পরিমাণ ১১৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা প্রায়। কোম্পানিটিতে ৫৮০টি মৃত্যুদাবি বাবদ গ্রাহকদের পাওনা ১ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, মেয়াদ উত্তীর্ণ পলিসির সংখ্যা ৩১ হাজার ৩৩১টি, গ্রাহকদের পাওনা ১১০ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, এ ছাড়াও সারেন্ডার, এসবি ও অন্যান্য ২ হাজার ৮৬টি বীমা দাবির বকেয়া প্রায় ২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে নতুন করে আরো ৮ হাজার ৮৭৮টি বীমা দাবি উত্থাপন হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২৫ কোটি টাকা।
একদিকে অনিষ্পন্ন বীমা দাবির পরিমাণ বাড়লেও ক্রমান্ময়ে প্রিমিয়াম আয় ও বিনিয়োগ আয় কমে যাওয়ায় একই হারে বর্তমানে কোম্পানিটির লাইফ ফান্ড দাড়িয়েছে ১২৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। নিয়মানুযায়ী বীমা মেয়াদ ফুর্তির পরদিনই দাবি পরিশোধ করতে হয়, মেয়াদ উত্তীর্ণ বীমা দাবি বকেয়া রাখার কোন সুযোগ নাই। সেহিসাবে মেয়াদ উত্তীর্ণ ১১৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকার বীমা দাবি পরিশোধ করলে কোম্পানিটির লাইফ ফান্ড থাকে মাত্র ১৪ কোটি ২১ লাখ টাকা, যা নতুন দাবি পরিশোধে কোম্পানির সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ব।

কোম্পানির ২০২২সালের আইডিআরএ দেয়া তথ্য অনুযায়ী মোট মেয়াদ উত্তীণ দাবি আসে ৫৯,৯৩৭টি, নিষ্পন্ন হয় ৩১,৭৮৭টি, অনিষ্পন্ন থাকে ২৮,১৫০টি, অর্থ্যাৎ শতকরা হিসাবে ৫৩.০৩ ভাগ, যা দেশের জীবনবীমা খাতের জন্য ভীষন হতাশা ব্যঞ্জক বলে সংশ্লিষ্টদের ধারনা, তারা আরো বলেন এভাবে চলতে থাকলে কোম্পানিগুলি দেউলিয়া হতে বেশী সময় লাগবেনা। আবার ২০২৩ সালের প্রথম প্রান্তিকের তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের প্রথম ৩ মাসেই প্রগ্রেসিভ লাইফের লাইফ ফান্ড কমেছে ১৭ কোটি ১১ লাখ টাকা। অথচ আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটি বীমা দাবি পরিশোধ করেছে ১১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। অর্থাৎ শুধু বীমা দাবি পরিশোধ-ই নয়, লাইফ ফান্ড ভেঙে অন্যান্য খাতেও খরচ করছে কোম্পানিটি। ফলে লাইফ বীমা কোম্পানির ‘প্রাণ’ হিসেবে পরিচিত ‘লাইফ ফান্ড’ কমে যাওয়ায় গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধে প্রতিনিয়তই সক্ষমতা হারাচ্ছে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স। আবার ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দু’বছরের ব্যবধানে কোম্পানির প্রিমিয়াম আয় কমেছে ২০ শতাংশ, ২০২১ সালের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানিটির গ্রস প্রিমিয়াম আয় ছিল ১১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, যা ২০২৩ সালের প্রথম প্রান্তিকে এসে দাঁড়িয়েছে ৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা, ঠিক একই সময়ে কোম্পানির বিনিয়োগ আয় কমেছে ১৮ শতাংশ। ২০২১ সালের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানির বিনিয়োগ আয় ছিল ৫ কোটি ৬ লাখ টাকা, যা ২০২৩ সালের প্রথম প্রান্তিকে এসে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা।
মালিকপক্ষের প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব বা বিভক্তিতে গ্রাহকের আস্থাহীনতা
মালিকপক্ষের প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব বা বিভক্তিতে গ্রাহকের আস্থাহীনতা আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মালিকপক্ষের প্রকাশ্য দ্বিধাবিভক্তি সম্প্রতি প্রকাশ্যে এসেছে। কোম্পানি পরিচালনায় উভয় পক্ষ তাদের নিজেদের পছন্দ মতো দু’জনকে ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী ঘোষণা করেছেন, একজন জহির উদ্দিন অন্যজন মোহাম্মদ আজাদি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’র পক্ষ থেকেও এসংক্রান্ত একাধিক চিঠি ইস্যু করা হয়েছে। মালিকপক্ষের এই বিভক্তি ছড়িয়ে পড়েছে কোম্পানিটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে যা কোম্পনির জন্য অশনি সঙ্কেত। অতি সম্প্রতি কেম্পানির প্রায় শ’খানেক কর্মকর্তা-কর্মচারী পল্টন মডেল থানায় গিয়ে কোম্পানি সচিব জহির উদ্দিনের বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি করেন এবং পরে তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’র কাছে কোম্পানির কমপক্ষে ৬০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী স্বাক্ষর সম্বলিত কোম্পানি সচিব জহির উদ্দিনের অপসারণ চেয়ে লিখিত আবেদন জমা করেন বলে জানা যায়। অপর দিকে জহির উদ্দিনও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অফিসিয়াল ডেকোরাম বা শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ এনে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পল্টন থানায় পাল্টাপাল্টি লিখিত আবেদন করেন।
এদিকে অফিসিয়াল কার্যক্রম বিঘ ঘটায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়াসহ গত ২৫ জুলাই ২০২৩ কোম্পানিটির ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে এই অফিস আদেশে স্বাক্ষর করেন জহির উদ্দিন। এদিকে আবার জহির উদ্দিনের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগের শর্ত পুরনের ব্যপারে বিতর্ক রয়েছে। ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগের শর্ত পুরন করতে হলে তার নিম্ন পুর্ব পদে (এএমডি) কমপক্ষে তিন বছরের এবং তারও পুর্বপদে অর্থাৎ ডিএমডি পদে দুই থেকে তিন বছরের দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা ও কর্মঅভিজ্ঞতা প্রয়োজন, জহির উদ্দিনের তার কোনটাই নাই বলে তার প্রমান পাওয়া যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কোম্পানির দুএকজন কর্মকর্তা জানান, জহির উদ্দিন ইতিপুর্বে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে কোম্পনি সচিব হিসাবে দায়ীত্ব পালন করেন, তারপুর্বে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রামে শাখা কর্মকর্তা হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন, সে হিসাবে জহির উদ্দিন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) হিসাবে যোগ্য নন। এব্যপারে জহির উদ্দিনের সাথে কথা বলতে গেলে তিনি প্রসঙ্গ এড়িয়ে বলেন, তিনি কোম্পানিতে ৬৫,০০০ হাজার (পঁয়ষট্টি হাজার) টাকা বেতনে চাকুরি করেন এখানে। এবং একোম্পানিতে চাকুরি করায় আইন পেশায় অনুপস্থিত থাকার কারনে বারকাউন্সিল কর্তৃপক্ষ তার বারকাউন্সিল সনদ বাতিল করে। বর্তমান পরিচালনা পর্যদ (একাংশ) তার মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) পদে অনুমোদন করে এবং কাগজপত্র সাক্ষর করেন। মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) শাহজাহান আজাদির ব্যপারে জানতে চাইলে জহির উদ্দিন নাম উচ্চারন না করে বলেন, তার (শাহজাহান আজাদির) কাগজপত্র সাক্ষর করার কোন এখতিয়ার নাই।
কোম্পানির দাবি পরিশোধের সক্ষমতা ও আর্থিক অবস্থা নিয়ে জহির উদ্দিন বলেন, ২০১৪ সাল পর্যন্ত কোম্পানিতে ভালো ব্যবসা হয়েছে। তবে পরবর্তীতে কোম্পানির মাঠে আর কোন লোকবল তৈরি হয়নি। তিনি বলেন, কোম্পানিতে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে, এজেন্ট বা মাঠকর্মীদের একজনের কমিশন অন্যজনকে দেয়া হয়েছে, প্রকৃত ব্যবসা সংগ্রহ কারিরা কমিশন পাননি, ফলে মাঠকর্মীরা বিদায় নিয়েছে। তিনি আরো বলেন, ফান্ড সংকটে গ্রাহকদের মেয়াদোত্তর দাবি পরিশোধ করা যাচ্ছে না। পুনর্ভরণ করার মতো ব্যবসার পরিবেশও নেই। গত মাসে প্রথম বর্ষ ব্যবসা হয়েছে প্রায় ৫৭ লাখ টাকা। তবে এক টাকাও ব্যাংকে জমা হয়নি। কারণ, ফিক্সড খরচ দিতে গিয়ে কোম্পানি থেকে টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে।
তবে প্রগ্রেসিভ লাইফের এমন পরিস্থিতির জন্য জহির উদ্দিন কোম্পানির উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে থাকা কথিত সিন্ডিকেটকে দায়ী করে পরিচালনা পর্ষদের দু’একজন মদদ দেন বলে অভিযোগ করেন।
ধারাবাহিক চলবে….












