এই বর্বরতা পরিহার হউক
সন্তানের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় বাবা-মা
খোন্দকার জিল্লুর রহমান:-

পৃথিবীতে সন্তানের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় বাবা মায়ের কোল বা বাবা মায়ের আশ্রয়। প্রায় এক বছর ঝঠর জন্ত্রনা ভোগ করে বিকল্পহীন প্রসব বেদনার পর সন্তান যখন ভূমিষ্ঠ হয় মায়েদের তখন অতিশয় অবস্থা থাকে জ্ঞান-অজ্ঞান অবস্থায় চোখ মেলে মা যখন ভূমিষ্ঠ সন্তানকে দেখেআর সাথে সাথে দুনিয়ার সব কষ্ট যন্ত্রনা নিমিশেই ভুলে গিয়ে সন্তাকে বুকে তুলে নেয়। অনুভব করে মাতৃত্বের অধিকারিনী হিসাবে। আবার অতি আবেগি অনেকের মুখে শোনা যায় যে আমার মত সুখি এবং সফল মা দুনীয়াতে আর কেইবা আছে! এটাই তৃপ্ততা, এটাই শান্তি, প্রকৃতিগত ভাবেও এটাই নিয়ম। স্নেহ আর মায়া-মমতার পরশেই মাতৃত্ব জেগে উঠে, প্রথাগত ভাবে বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, যেভাবেই ধরা হউক না কেন তাদের স্নেহের পরশ আর আনন্দের ফসল সন্তান, ঠিক সন্তান জন্মের পর প্রত্যেক বাবা-মা নিজের জীবনের চেয়েও বেশী ভালবাসেন নিজের সন্তনকে। বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকাতেও আমরা দেখতে পাই সন্তানের জন্য বাবা-মাকে জীবন দিতে হয়েছে বা সন্তনকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেকে আর বাঁচাতে পারেন নাই। এমনই কঠিন বাস্তবতায় বাবা মায়েরাই যখন নিজ সন্তানের খুনি তার প্রকৃত জবাব কি?
ভুমিষ্ঠ হয়ে সন্তান প্রথমে মাকে ও পরে বাবাকে চিনে এবং আস্তে আস্তে পরিবারের সবাইকে চিনে এবং পারিবারিক বলয়ে বড় হয়ে উঠে। অতি সম্প্রতি রাজধাণীসহ সারা দেশে বেশ কিছু ঘটনায় ঝুকিপূর্ণ ও অনিরাপদ হয়ে পড়েছে শিশুদের বেঁচে থাকা ও বড় হওয়ার স্বপ্ন। যেখানে নিয়ম তান্ত্রীকভাবে বড় হওয়া ও কিছু বুঝে উঠার আগেই সন্তান আপনা আপনিতেই খুঁজে নেয় তার বাবা-মায়ের কোল এবং নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু সেই নিতান্ত আপন জন বাবা মায়ের হাতেই নির্মম ভাবে খুন হচ্ছে সন্তান। খুন হওয়া বা খুন করার কারণ হিসাবে অনেকেই পারিবারিক কলহ, স্বামী-স্ত্রী বনিবনা না হওয়া, অবৈধ প্রেম, অনৈতিক সম্পর্ক, লোভ-লালসা, শত্রুতা, গুম, খুন, জমিজমা সংক্রন্ত বিরোধ, রাজনৈতিক সংঘাত, আর্থীক লেনদেন, অর্থনৈতিক সংকট, দ্রব্যমুল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে পেরে উঠতে না পারা, টাকার অবমুল্যায়ন, সামাজিক অবক্ষয়, সন্তানের ভবিষ্যত অনিশ্বয়তা, শিক্ষা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া, রাজনৈতিক অস্থিরতায় নিজেদের জীবনকেও অনিরাপদ বোধ করা, অশিক্ষা ও কুসংস্কার থেকে নিজেদেরকে মুক্ত রাখতে না পারা, কু-সংস্কার মেনে চলা, নৈতিক শিক্ষার অভাব এবং মানষিক বিকারগ্রস্থতাকেই দায়ী করেছেন। হঠাৎ করেই শিশু খুন হওয়ার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় দেশের শিশু অধীকার ফোরাম সহ দায়ীত্বশীল অনেক কর্তাব্যক্তি ও সুশীল সমাজের অনেকেই ঊদ্যেগ প্রকাশ করেছেন।
বাংলাদেশ শিশু অধীকার ফোরামের ২০১৬ এর এক প্রতিবেদনে দেখা যায় আগের বছরের জানুযারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে মোট ১৬০ জন শিশু খুন হয়েছে। আর সবচেয়ে বেশী খুন হয়েছে জানুয়ারি মাসে মোট ২৯ জন। তাদের ২০১৫ সালের বার্ষীক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পারিবারিক কলহ, অনৈতি সম্পর্ক, শত্রুতা, অপহরন, ধর্ষণ, দাস্পত্য কলহ, লোভ-লালসা, অভাব, হতাশা, মানসিক যন্ত্রনা, জমি-জমার দন্দ, ইসলামের অপব্যখ্যা ও নিজেদেরকে ভুলপথে পরিচালনার কারনে এসব শিশু হত্যাকান্ডের মত ঘটনা ঘটেছে। বিশ্লেষকরা আরো তথ্য প্রকাশ করেছে ২০১৫ সালে অপহরনের পর ৩০ জনকে হত্যা করা হয়েছে, নিজের বাবা-মার হাতে খুন হয়েছে ৪০ জন শিশু, ১৪ জন শিশু খুন হয়েছে দুর্বৃত্যদের হাতে এবং ৯ জন শিশু খুন হয়েছে দেশের বিভিন্ন কর্মকান্ডে থাকা অবস্থায় নির্যাতনের কারনে।
নিকটতম অতিতে বিক্ষিপ্তভাবে বেশ কিছু শিশু হত্যার ঘটনা (২০১৬ সালের প্রথম পর্যন্ত) ঘটলে ও ২০১৬ সালে তা আসঙ্কাজনক হারে বেড়ে যায়। যেমন ৮ই ফেব্রুয়ারি ২০১৬ পারিবারিক কলহের জের ধরে সিরাজ গঞ্জের রত্তনকান্দি ইউনিয়নের শ্যমপুর গ্রামে এক মায়ের হাতে খুন হয় ১১ বৎসর বয়সী এক মাত্র সন্তান তানবিন হাসান এ ঘটনায় মা রুবিনা খাতুনকে আটক করে পুলিশ। একই মাসের ২৯শে ফেব্রুয়ারী রামপুরা বনশ্রিতে দুই সন্তানকে গলা টিপে হত্যা করে মা মাফুজা খাতুন, সন্তানদের লেখাপড়া ও অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে এ হত্যাকান্ড ঘটে। নিহত দুই জনের মধ্যে বড় জন নুসরাত আমান অরনী (১৪) ভিকারুন্নেসা নুন স্কুলের শিক্ষার্থী, আর ছোট জন আলভি আমান হলি ক্রিসেন্ট স্কুলের শিক্ষার্থী। এরপর ১২ই আগষ্ট ২০১৬ রাতে রাজধানির উত্তর বাসাবোর ১৫৭/২ ষড়ঋতু নামে একটি ৬ তলা ভবনের ছিলেকোটায় দুই ভাই বোনকে গলা কেঠে হত্যা করে মা তানজিনা খাতুন। দুই শিশু হল হুমায়ারা বিনতে মাহবুব তাকিয়া(৬) এবং মাসরাফি বিনতে মাহবুব আবরার(৭)। ঘটনার পরদিন রাতে বাসাবো ঝিলপাড় মসজিদের সামনে থেকে পুলিশ উক্ত মহিলাকে আটক করে। সিলেঠের ওসমানি নগরে বাবা ছাতির আলী তার দুই শিশুপুত্রকে হত্যা করে ডোবায় ফেলে আসে, পরে এলাকাবাসির সহায়তায় বাবাকে পুলিশে সোপর্দ করে এবং বাবা পুলিশের নিকট হত্যার দায় স্বিকার করে। রংপুরে শিশুকন্যা আলিফাকে তার বাবা গলা টিপে শ্বাসরোধে হত্যা করে এবং পুলিশের নিকঠ (গ্রেফতারের পর) দায় স্বীকার করে, রাজধানির মিরপুরে শামিমের স্ত্রী আনিকা তার তিন সন্তনকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করেন, গত ৮ই ফেব্রুয়ারি ২০১৯ইং শুক্রবার স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করে গাজিপুরের কাপাসিয়ার চাপাত গ্রামের নিজ বাড়িতে চলে যায় রফিকুল এবং ওই রাতে কন্যা সন্তানকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করার পরিকল্পনা নিয়ে শনিবার বিকেলে গিলারচালা ভাড়া বাড়িতে আসেন, ঐদিনই নিজ সন্তানকে হত্যার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে পরদিন রোববার বিকেল সোয়া চারটায় দিকে একমাত্র কন্যা মনিরাকে শ্বাস রোধে হত্যা করে মরদেহ ঘরের খাটের নিচে পাতিলের ভেতর রেখে পালিয়ে যান তিনি। পরে ১১ তারিখ সোমবার ভোররাতে গাজীপুর মহানগরের নীলের পাড়া এলাকা থেকে পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর এভাবে খুনের বর্ণনা দিচ্ছিলেন কন্যা হত্যার দায়ে অভিযুক্ত পাষণ্ড বাবা। সর্বশেষ সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের কেজাউরা গ্রামের আব্দুল বাছিরের ৫ বছরের শিশু তুহিন মিয়াকে জবাই করে দুই কানও পুরুষাঙ্গ কেটে দুটি লম্বা ছুরি পেটে ডুকিয়ে নৃশংসভাবে হত্যাকরে শিশুটির গলায় রশি বেধে কদমগাছের ডালে ঝুলিয়ে রেখেছে। বিভিন্ন সময়ের ঘঠিত ঘটনাগুলির জরিফে দেখা যায় শিশু হত্যায় বাবাদের (পুরুষের) চেয়ে মায়েরাই (নারীরা) বেশী সংখ্যক এগীয়ে আছে।
মনোবিজ্ঞানিরা বলেছেন, এসব হত্যার রহস্য বিভীন্ন রকম হতে পারে। এজন্য জানতে হবে অভিযুক্তদের সামাজিক, পারিবারিক, শৈসব, কৈশোর,ও দাম্পত্য জীবন ও অবস্থান সম্পর্কে। জগন্নাত বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড: নুর মোহাম্মদ বলেন, সন্তান হত্যার কারণগুলি হল, দাম্পত্য কলহ, মতের অমিল, সমঝোতার অভাব, শ্রদ্ধাবোধের ঘাটতি, পুরুষের আধিপত্য ও পরকীয়া, শারীরিক দুর্বলতা, প্রত্যাশা পূরণের অভাব, পরিবারের সদস্যদের অনধিকার চর্চা, কিংবা স্বামী শশুর শ্বাশুড়ী দ্বারা পারিবারিক নির্যতনের স্বিকার হওয়া, ধৈর্য ও সমজোতার অভাব, হিংসা, লোভ-লালসা, উচ্ছাভিলাসিতা, অনৈতিক স্বদিচ্ছা পুরণ, নিজেদের কূকর্ম ঢাকতে গিয়ে সন্তানের বলি দেয়া সহ ক্যারিয়ার নিয়ে সমস্যা হওয়া এবং বিক্রিত রুচির কারনেও এরকম ঘটনা ঘটাতে পারে। আবার দীর্ঘদিন ধরে মানষিক যন্ত্রনা এবং মনোকষ্টের কারনেও এসব হতে পারে। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজকর্ম বিভাগের চেয়ারম্যন ড: মো: আবুল হোসেন বলেন, সম্প্রতিকালে বাবা মার হাতে সন্তান খুন হওয়ার চিত্র বেশী লক্ষ করচি। এটা সামগ্রীক সামাজিক অস্থিরতা, সন্তান নিয়ে অতিমাত্রায় শঙ্কার প্রতিফলনে মানুষ দিন দিন অধৈর্য্য হয়ে উঠেছে। এইগুলো প্রাকৃতিক কিছু নয়, এগুলি মানুষের দ্বারাই সৃষ্টি। এজন্য আমাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক স্বচেতনতা ও পারিবারিক সম্প্রিতি বাড়িয়ে তুলতে হবে। শিক্ষা সাংস্কৃতিতে ধৈর্য ওনৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে, সন্তান যাতে বাবা-মা বা পারিবারিক কোন সদস্যদের অনৈতিকতার স্বাক্ষি হতে না পারে সেদিকে সজাগ থাকতে হবে। সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। জাতীয় পর্যায় এবং বিভীন্ন ইলেক্ট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়াতে পারিবারিক শান্তি সৃংঙ্খলার অনষ্ঠান বেশী বেশী প্রচার করতে হবে। কোন নেশা জাতীয় প্রচারনা বা খুন, গুম বা অন্যান্য আপত্ত্বিকর প্রচার-প্রচারনা একেবারেই বন্ধ করতে হবে। পারিবারিক স্নেহমমতা, স্বামী-স্ত্রীর নিবিড় সম্পর্ক, ধৈর্যধরে ও নৈতিকতার সাথে সন্তানদেরকে আদর যতন করা, সন্তান জন্মদানের স্বার্থকতাকে মাথায় রেখে সন্তানকে মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার জন্য কাজ করার মন মানষিকতাই এসব অবস্থা থেকে উত্তরনের উপায় হিসাবে শিশু মনোবিজ্ঞানি সহ সুশীল সমাজের লোকেরা মনে করেন।
লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, অর্থনীতির ৩০ দিন ও মানবাধিকার কর্মী।











