বিবিধ লেখকের দেওয়া লেখার নিয়ম-কানুন

অর্থনীতির ৩০ দিন ডেস্ক :
ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৬ সালে। ব্রিটেনের চেলথেনহাম বইমেলাতে। সেখানে এসেছিলেন অনেক লেখক। একজন ওদের কাছ থেকে লেখার ‘টিপস’ সংগ্রহ করে সেগুলো ছাপায়। আমার বেশ লেগেছে। আমি সমকালের পাঠকের সঙ্গে আমার উপলব্ধিকে ভাগ করতে চাই (বলা ভালো, এগুলো আমার উপদেশ নয়। প্লিজ রিলাক্স)। লেখকের নাম দিলাম না।
১. সবকিছু শুরু হয় একটি বিন্দু থেকে। এই শুরুটা চিন্তায় ফেলতে পারে। কোথা থেকে শুরু করব? শুরুটা মহান কিছু, বড় কোনো চরিত্র বা ঘটনা দিয়ে শুরু করতে হবে, তার কোনো মানে নেই। খুব সাধারণ মানুষ, তুচ্ছ ঘটনা দিয়ে শুরু হতে পারে (যেমন মোজাফফর হোসেনের ভ্যাদা কবি বা চক্কর খাওয়া জকি। শরৎচন্দ্রের মহেশ, সেলিনা হোসেনের বেড়াল)।
২. লিখতে বসে ভুলে যেতে হবে বর্তমানে কোন স্টাইলে লেখা চলছে বা আমি এর বাইরে নতুন কিছু করব। এসব বড় চিন্তা ভুলে গিয়ে ভাবা ভালো, কোনভাবে লিখলে লেখাটি আমার মনের মতো হবে। সবাইকে চমকে দেব? এমন কোনো বিরাট উদ্দেশ্য সবসময় কার্যকরী নয়। নিজের কাছে কোন নিয়ম ভালো? এটা যদি অন্য কারও নিয়ম না হয়, তবু তা আমার নিয়ম।
৩. সে গল্পে যেন বাস্তব জীবন থাকে। কারণ, আমরা এখন আর কেউ পরীর গল্প লিখছি না। যত বড় লেখকই কেউ একজন হোন না কেন, সবসময় মনে রাখা ভালো, লেখায় একটি নীতিগত দিক থাকে। সোচ্চারে নয় অলক্ষ্যে। জানার ভেতরে অজানার কথায় পৃথিবী হয়ে যায় আরেক পৃথিবী। লেখাই তো পারে পৃথিবীকে বদলাতে। চার্লস ডিকেন্সের আগের আর পরের ব্রিটেন কি এক?
৪. শব্দগুলো যেন ঠাণ্ডা হিমঘরে আগুনের মতো গনগনে হয়। শব্দের অহেতুক অপচয় নয়। হিসাব করে সেই গনগনে শব্দগুলো ব্যবহার করতে হবে। কেউ কেউ বলেন, টাঁকশাল থেকে বেরিয়ে আসা চকচকে টাকার মতো শব্দ।
৫. যখন লিখতে গিয়ে মনে হবে চরিত্রগুলো কেমন চুপ হয়ে গেছে, ওদের বেড়াতে নিয়ে যেতে হবে। দেখাতে হবে প্রকৃতি বা পছন্দের চায়ের দোকান। না হলে ব্রিজের তলা দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী। ফিরে এসে মনে হতে পারে, ওরা তো আবার প্রাণ পেয়েছে।
৬. মনে মনে হিসাব করা, একদিনে কতটুকু লেখা যায়। কৌশলে লেখার একটি সময় ও সংখ্যা ঠিক করা। অনুবাদ হলে কতটা, মৌলিক হলে কতটা (আমি নিজে চার পাতার বেশি অনুবাদ করি না। এক হাজার শব্দের বেশি মৌলিক লেখা লিখি না)। হেমিংওয়ে বলেছেন- টাইপরাইটারের সামনে বসো আর রক্তাক্ত হও। ‘ সিট অ্যান্ড ব্লিড’।
৭. নভেলের বা গল্পের প্রথম খসড়া মনের মতো নয়? এরপরের খসড়া ভালো হবে, তার পরেরটা আরও ভালো। হেমিংওয়ে একটা খসড়া ৯১ বার বদলে ছিলেন (একটু বাড়াবাড়ি মনে হয় নাকি)।
৮. লেখার জগতে যাওয়ার আগে পড়ো পড়ো আর পড়ো। পড়তে পড়তে মনের ভেতর লেখার জগৎ তৈরি হয়ে যায়। তার পরেও পড়ো।
৯. লেখার আর এক নাম ‘রোলপ্লে’। ওই মা আমি, ওই নায়িকা আমি। আমিই ওই জন। কী যায়-আসে, কার কত বয়স?
১০. যা লিখতে মন চায়, লিখে যেতে হবে। গ্রহণ-বর্জন পরের ব্যাপার। তারপর কতটুকু থাকবে, মাথার ভেতরে যে এডিটর আছেন, তিনি ঠিক করবেন।
১১. চরিত্রগুলো কেবল পছন্দের একজন হবে, তার কোনো মানে নেই। কে যে কখন প্রিয়জন হয়ে যায়। সব নির্ভর করে লেখার কৌশলের ওপর।
১২. আর যিনি লেখেন, গান শোনা, কবিতা পড়া, ছবি দেখা, প্রকৃতির সঙ্গে ভাব করে ফেলা জরুরি। এগুলো লিখতে সাহায্য করে আর মানুষ সম্বন্ধে যাদের অপার কৌতূহল।
১৩. ভণ্ডামি বাদ দিয়ে ভাবতে হবে সত্যিকারের আনন্দ-বেদনার কথা। আমার লেখা আমার আনন্দ-বেদনায় ভরে যাক। আরোপিত আনন্দ-বেদনা নয়। আমার যা ভালো লাগে।
১৪. লেখা আসলে খোঁজা। খুঁজে বের করা। তারপর দেখতে হবে ওখানে আমার কতটুকু সায় আছে বা ব্যবধান আছে।
১৫. কেবল যা জানা তা নিয়ে লেখা নয়। ‘এক্সপ্লোর’ ব্রন্টিদের মতো। বছরে ওরা চারজন পুরুষ দেখত- বাবা, দুধওয়ালা, কাগজওয়ালা, চিঠির ডাকপিয়ন। কিন্তু ওরাই সৃষ্টি করেছে এমন সব চরিত্র, যারা কল্পনার নৌকা সাঁতরে ওদের চিন্তা ও ভাবনায় জালের মাছের মতো ধরা দিয়েছে। ওদের জগতে কোথা থেকে এসব নেমে এসেছে কে বলবে। ‘প্রেম ও প্যাশনে’ পরিপূর্ণ লেখা।
১৬. লেখার কতগুলো পরত বা লেয়ার থাকে। প্রথম পরত হালকা। পরতের পর সরালে বেরিয়ে আসে গভীরতা।
১৭. হাল ছাড়া নয়। লেগে থাকা। জে কি রওলিংকে অনেকবার প্রকাশক ফিরিয়ে দিয়েছেন। এখন? এমনি করে কোনো অভাবনীয় ব্যাপার সবার জীবনে ঘটে যেতে পারে। খ্যাতিমান না হতে চাইলেও।
১৮. ডিগ্রিধারীরা যে কেবল লিখবেন, তা নয়। সবাই লিখতে পারেন। সমালোচক ডিগ্রিধারী হলেই ভালো সমালোচক হতে পারেন, এমন ধারণা ভুল।
১৯. ছোটদের জন্য লিখতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে দশ বছর বয়সে। যার ছোটবেলা মনে নেই, তার পক্ষে ছোটদের বই লেখায় সমস্যা।
২০. লিখতে লিখতে বিনয়ী হয়ে এর-ওর মতামত না নেওয়াই ভালো। সবার মতের সঙ্গে যিনি লিখছেন, তার মতের মিল হবে এমন গ্যারান্টি কোথায়? যার ভুল তিনি নিজেই শোধরাবেন। আর সেটা না পারলে ভাবনার বিষয়। অন্যের মতামত লেখার নিজস্ব গতিকে থামিয়ে দিতে পারে। লিটারিরি এডিটর সবসময় ভালো হচ্ছেন, এ সত্য নয়।
২১. লেখ! কারণ তুমি লিখতে ভালোবাসো। আর কোনো কারণ নেই। তুমিই সেই জন লেখার ভেতরে ডুবে এমন কিছু দেখতে পাও, যা অন্যরা পায় না। অন্তর্দৃষ্টি সবার থাকে না। আর সবাই কি পারে নানা সব চরিত্র সৃষ্টি করতে?
২২. কেউ যদি সমালোচনায় রাগিয়ে দেয়, মনের ভেতর আগুন জ্বালিয়ে দেয়, কাজে লাগাতে হবে সেই আগুনকে (ইমদাদুল হক মিলনের বিশাল উপন্যাস নূরজাহান তো তেমনি কোনো আগুন থেকে সৃষ্টি)।
২৩. তোমার চরিত্রগুলোর সঙ্গে প্রেমে পড়ে যাও। বারবার। ক্ষতি নেই কোনো। এরপর কী হবে তুমি তা জানো। তবে টলস্টয় বলেন- আনা কারেনিনা রেলগাড়ির তলায় চাপা পড়তই। ওখানে আমার আর কোনো হাত ছিল না। ওকে বাধা দিলে ও শুনত না। কখনও চরিত্র চলে নিজের গতিতে। ভাবতে হয়।
২৪. যেসব ভাবনা মনে আসে, টুকে রাখা ভালো। একটা নোটবুক সবসময় সঙ্গে রাখা ভালো। চলতে চলতে একটা কিছু মনে পড়ে গেল, টুকে রাখা। পরে তা কাজে লাগে।
২৫. পারফেকশন? কিছুতেই মন ভরছে না। না হোক পারফেক্ট। পৃথিবীর কোন জিনিসটি পারফেক্ট বলো। ঈশ্বরের এত বড় পৃথিবীটা কি পারফেক্ট?
২৬. যখন প্রকৃতির সঙ্গে বসবাস সেসব অনুভূতি লেখা থাক কোথাও। কখন যে গাছ আর ঘাস কথা বলতে শুরু করে কে জানে? মনের ভাব বদলায়। তাই যেসব নতুন ভাবনা চলে আসছে, আসতে দাও। পরে তা কাজে লাগবে।
২৭. যেসব জিনিস মন বিক্ষিপ্ত করে, সেসব থেকে দূরে থাকা। চারপাশের জগৎ থেকে খুঁজে নেওয়া কি আমাকে নাড়া দেয়। কোন বেদনা বা কোন আনন্দ। সেসবই ঘুরে ঘুরে আসে লেখায়। তাই বলে চারপাশের জগৎ থেকে সরে গিয়ে হিমালয়ের চুড়োয় গিয়ে লিখব? তাহলে তো সে হবে পলায়নপর সাহিত্য।
২৮. লিখতে বসলে মনে করতে হবে আমার চারপাশে আর কিছু নেই। কেবল আমি আর কম্পিউটার বা টাইপরাইটার না হলে খাতা-কলম। হেমিংওয়ে যেমন বলেন- সিট অ্যাট দি টাইপরাইটার, অ্যান্ড ব্লিড (ব্লিস বললেও পারতেন)।
২৯. অন্য লেখক বা লেখা আমাকে অনুপ্রেরণা দিতে পারে। একে কপি করা বলে না। গোগলের ‘ওভারকোট’ থেকে বেরিয়ে এসেছে অসংখ্য ছোট গল্প। তার পরও আমার একটা নিজস্বতা থাকে। ইডিপাস কি একা সফোক্লিস লিখেছেন?
৩০. নিয়মিত লিখতে হবে। যত লেখা যাবে তত তা শানিত হবে। মরচে ধরবে না ভাবনায়।
৩১. খারাপ হতে পারে প্রথম খসড়া। এক খসড়ায় কোনো কিছু শেষ করা মোটেই কোনো কাজের কথা। তবে হেমিংওয়ের মতো ৯২ বার বদলানো সবাই পারবে না। তার পরও বারবার লেখায় খানিকটা ভালো হওয়ার সম্ভাবনা। লিখে ফেলা রাখা। তারপর আবার তাকে দেখা।
৩২. কেউ কোনো বিষয়ে লিখতে বলল আর আমি লিখতে শুরু করলাম, এ কোনো কাজের কথা নয়। মনের ভেতর একজন এডিটর থাকেন। তিনি বলবেন, কোন বিষয়ে আমি ভালো পারি। অনুরোধে ঢেঁকি গেলা সবসময় ঠিক নয়।
৩৩. যখন লিখছি না তখনও কিন্তু আমরা লিখছি। এই প্রক্রিয়া আমাদের মাথার ভেতরে চলতেই থাকে। তার মানে এই নয়, আমরা আর সব ভুলে যাই। ব্যাপারটি ঠিক তা নয়। সবকিছুর ভেতর একজন লেখক কিছু উপাদান পেয়ে থাকেন, যা অন্যদের চোখ এড়িয়ে যায়। আর যা লিখছেন বা লিখতে লিখতে ফেলে এসেছেন, তা মনের ভেতর গুনগুন করতে পারে। একেই বলে, যখন লিখছি না তখনও লিখছি।
৩৪. ছোট বাক্য, সহজ শব্দ, জটিল দীর্ঘ লেখা নয়, এক কথা বারবার বলা নয়, কোনো আজেবাজে শব্দ নয়, পারলে অ্যাকটিভ ভয়েসে বর্ণনা করা। প্যাসিভ ভয়েসের চেয়ে যা জোরালো। আন্তন চেকভ বলেন- আকাশে চাঁদ উঠেছে না বলে বলো, ভাঙা কাচের জানালায় চাঁদের আলো কেমন দেখতে লাগছে। একটা লক্ষ্য বা একটা কিছু বলব বলে লেখা। কোনো লক্ষ্য নেই, কোনো কিছু বলার নেই, তাহলে ব্যাপারটি হবে অসংলগ্ন। পথের বা যাত্রার তো একটা শেষ থাকে। তার পরও শেষ হয়ে শেষ হয় না, সেসব তো আছেই। অনুচ্ছেদগুলো যেন খুব বড় না হয়। যেন লেখার ভেতরে ‘স্পেস’ থাকে। কারণ চাপাচাপি লেখা দেখতে ক্লান্তিকর হতে পারে। পরিচ্ছদবিহীন বই ঘরবিহীন বাড়ির মতো। আর কেউ নয়, কেবল নিজের ভেতরের সেই এডিটরকে দিয়ে বারবার শোধরানো।
৩৫. এবার শেষ টিপস। এটা দিয়েছেন ব্রিটেনের বিখ্যাত নারীবাদী লেখক জার্মেন গিয়ার। একেই আমার সবচেয়ে মূল্যবান টিপস মনে হয়েছে।
৩৬. ওপরের সব টিপস ভুলে যাও। তোমার যেমন ভালো লাগে, তেমন লেখ। যেন সেটা হয় স্বতঃস্ম্ফূর্ত। একজন তার মতো করে লিখবে, সেখানে লেখার কোনো টিপস মনে থাকতেও পারে, নাও পারে।