
শেখ মোঃ সরফরাজ হোসেন, এসিএস :
শহর এবং গ্রামের অসম উন্নয়ন বাংলাদেশের সামগ্রীক উন্নয়নের একটি বড় বাধা। একটি গ্রামের আয়তন কত, সেখানে জনসংখ্যা কত, কৃষি জমি, পুকুর, খাল বিলের আয়তন কি পরিমান, কি কি ধরনের ফলমূল এবং তার গাছপালার সংখ্যা কত প্রভৃতি বিবেচনা করে, যেখানে মানুষের সাথে পরিবেশ এবং উপার্জনের সক্ষমতা কতটুকু তা হরাইজনটাল এবং ভারটিকাল বিশ্লেষন করতে হবে, যেন সেই এলাকার কোন জনসাধারনকে উপার্জনের জন্য তার এলাকা ছাড়তে না হয় অথবা অন্য এলাকায় মাইগ্রেট করতে না হয়। এতে সারা বাংলাদেশের সামগ্রীক জনসংখ্যার ঘনত্বের তারতম্য ঘটবে না এবং মানবসৃষ্ট কোন সমস্যা তৈরী হবে না এবং পরিবেশে কোন বিরুপ প্রভাব পড়বে না।
আমাদের দেশে গ্রাম এবং শহরের উন্নয়নে সমতা না থাকায় এবং গ্রামীন জনপদে উপার্জনের সক্ষমতা কমে যাওয়ায় প্রায় প্রতিদিনই ঢাকা শহরে মানুষের চাপ বাড়ছে। যেটি হতে পারে গ্রামীন উন্নয়নে বাধা এবং ঢাকা শহরের ছন্দপতনের মূল কারন। রিক্সা ঢাকা শহরের ছন্দপতনের অন্যতম প্রধান কারন। জীবন এবং জীবিকার তাগিদে শিক্ষিত এবং অল্প শিক্ষিত প্রায় সকল বেকার জনসাধারন ঢাকা শহরে চাকুরী এবং স¦াধীন পেশা বেছে নেয়ার জন্য প্রতিদিন ভিড় করছেন। কিছু কিছু শ্রমজীবি মানুষ কৃষিকাজের পাশাপাশি অবসর মৌসুমে উপার্জনের জন্য সাময়িকভাবে ঢাকায় রিক্সাচালকের পেশা বেছে নিচ্ছেন। অল্প শিক্ষিত জনসাধারন নগদ বা ত্বরিত উপার্জনের জন্য রিক্সাকে প্রধান এবং সহজ পেশা হিসেবে গ্রহন করছেন।
ঢাকা শহরের সড়ক এবং রাস্তায় যানজটের প্রধান কারন হচ্ছে রিক্সাবাহন। ভিআইপি এবং কিছু প্রধান সড়ক বাদে প্রায় প্রতিটি রাস্তায় রিক্সা চলমান। এই রিক্সাবাহনের আবার কয়েকটি শ্রেনী আছে, যেমন প্যাডেল চালিত রিক্সা, ব্যাটারীচালিত রিক্সা, ইজি বাইক প্রভৃতি। বেশিরভাগই রিক্সাচালক ট্রাফিক আইন বা সিগন্যাল বোঝেন না বা মানার চেষ্টা করেন না। এলোপাতাড়িভাবে রাস্তার সকল সাইড জুড়ে রিক্সা চালাচ্ছেন, সময় সুযোগ বুঝে ফ্লাইওভারেও উঠে যাচ্ছেন। সর্বোপরি মাত্রাতিরিক্ত রিক্সা থাকায় এবং তাদের মুভমেন্ট নির্দিষ্ট পরিসরে না হওয়ায় একজন বা দ’ুজন যাত্রী নিয়ে রাস্তার বিশাল আয়তন দখল করে নিচ্ছে। সাথে সাথে দেখা যায় যে, সড়কে দখলকৃত রিক্সাবাহনে, রিক্সার যাত্রী থেকে রিক্সাচালকের সংখ্যা বেশী। সর্বোপরি রিক্সা মোটরগাড়ির স্বাভাবিক গতিকে স্লথ করে দিয়ে সময় অতিরিক্ত ক্ষাপন করছে।

আসুন যাওয়া যাক রিক্সাচালকের থাকার স্থান বা আবাসন বিষয়ে। একজন রিক্সাচালক অল্প খরচে থাকার জন্য একটি নি¤œ উন্নত জায়গা বেছে নেন। সেখানে রিক্সাচালকগণ একত্রিত থাকা শুরু করলে সেটি বস্তিতে রূপান্তর হয়। আর একবার বস্তি গড়ে উঠলে, সেখানে রিক্সাচালকের পরিবার অথবা বহিরাগত যার দ্বারাই হউক না কেন একটি মাদক বা চোরাচালানের আখড়া বা বাজার তৈরী হচ্ছে। সেখানে সন্ত্রাস এবং অস্ত্রবাজীর বাহিরেও আরো কিছু কার্যকলাপ সংগঠিত হতে দেখা যায়। এবং সেখানে ময়লা বা আবর্জনা নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় পরিবেশ নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
এবার আসা যাক তাদের আনুষঙ্গিক প্রয়োজনের দিকে। রিক্সা মেরামতের জন্য একটি গ্যারেজ প্রয়োজন হয় এবং সেটি স্থাপন করা হয় ফুটপাতেই। আবার তাদের আহার এবং খাবারের জন্য ফুটপাতেই গড়ে ওঠে ভাসমান হোটেল। রিক্সাচালক ও তার পরিবারের পোশাক পরিচ্ছদ এবং ব্যবহৃত গৃহস্থালী প্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য ফুটপাতেই গড়ে ওঠে অসংখ্য বাজার বা দোকান। সর্বোপরি এই রিক্সা পার্কিং বা রাখার স্থানটাও নির্ধারন করা হয় এই ফুটপাতেই। সুতরাং ফুটপাত দখলে রিক্সার ভূমিকা অনস্বীকার্য। এই রিক্সাচালকগণ তারা আমাদেরই আত্মীয়-স্বজন। তারা তাদের কষ্টার্জিত উপার্জনের বিনিময়ে তাদের সন্তান-সন্ততী এবং উত্তরসূরীদের সুশিক্ষিত করে দেশে
প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হচ্ছেন। তাদের অবদান সমাজে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে পরিলক্ষিত হচ্ছে।
ঢাকার পরিবহন সমস্যা একটি বড় সমস্যা, এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। যাতে প্রত্যেকটি নাগরিক সাবলীলভাবে ঢাকার প্রতিটি রাস্তায় এবং অলিগলিতে চলাফেরা ও অফিস আদালত করতে পারে। এরপর যানজট এবং রিক্সাসৃষ্ট অন্যান্য সমস্যা সমাধানের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিটি রিক্সাচালক ভাইরা যেন এই কঠিন পরিশ্রম থেকে পরিত্রান পায় সেদিকে লক্ষ্য রেখে তাদেরকে তাদের এলাকায় বিভিন্ন শিল্প-কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে উপার্জন সক্ষমতা প্রদান করে নিজ নিজ এলাকায় প্রত্যাবসান করাতে হবে। এতে ঢাকা শহরের উপর চাপ যেমন কমবে ঠিক তেমনি গ্রামের উন্নয়নে একটি ভারসাম্য পরিবেশ বজায় থাকবে। সকল রিক্সাচালকের প্রতি আমার সম্মান রহিল এবং আমি তাদের ভবিষ্যৎ উন্নতি কামনা করছি।
লেখক : কোম্পানি সেক্রেটারি, পিপলস্ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড


















