স্বর্ণের মত মূল্যবান হয়ে উঠছে ‘কোবাল্ট’

অর্থনীতির ৩০ দিন ডেস্ক :
একসময় স্বর্ণের খোঁজে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পশ্চিম আমেরিকায় ছুটে যেতেন খনিজ সম্পদ আহরণকারীরা। মাঝখানে বেশ কয়েক দশক বিরতি দিয়ে সেখানে ফের ভিড় শুরু করেছেন তারা। এবার আর স্বর্ণ নয়, নিকেল জাতীয় ধাতু কোবাল্টের কারণে।
যুক্তরাষ্ট্রে গত কয়েক দশক আগে কোবাল্ট খননে তেমন কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি। কিন্তু ইদানীং কিছু খনি কোম্পানি দেশটির আইদাহো, মনতানা ও আলাস্কাতে সিলভার-নীল রঙের এ আকরিক খনিজের অনুসন্ধানের জোর দাবি জানিয়েছে। তারা এ খনিজ আহরণের প্রয়োজনীয়তা হিসেবে বলেছে, কোবাল্ট খনিজ ব্যাটারি তৈরির মূল উপাদান লিথিয়াম-আয়নের যোগান দেয়। যেগুলো ইলেকট্রিক ডিভাইস ও ইলেকট্রিক গাড়িরও মূল শক্তি।
লন্ডনের গবেষণা সংস্থা সিআরইউ গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক জর্জ হ্যাপেল বলেন, অতীতে কোবাল্টের সরবরাহ তামা ও নিকেলের বাজারের উপর নির্ভর করত। কারণ এই দুই মূল্যবান খনিজের পাশাপাশি কোবাল্ট উত্তোলন করা হত। কিন্তু পরিস্থিতি বর্তমানে পরির্তন হয়েছে। প্রতি বছর কোবাল্টের মূল্য এবং এর ব্যবহার ৮ থেকে ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, একইসঙ্গে এটাকে উপজাতক পণ্য হিসেবে উৎপাদনের যে ধারণা ছিল সেটাও বদলে গেছে।
গবেষণা সংস্থা সিআরইউ অনুমান করছে, বর্তমানে সারাবিশ্বে প্রায় ৩০০ কোম্পানি কোবাল্ট খনিজের অনুসন্ধান চালাচ্ছে।
গ্লেনকোরের মত খনিজ উৎপাদনকারী জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানও কঙ্গোতে এ কোবাল্টের উৎপাদন বাড়িয়েছে। বিশ্বের অধিকাংশ কোবাল্টই এ দেশ থেকে উৎপাদন করা হয়। অন্যদিকে গত চার দশকের মধ্যে ২০১৪ সালে প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সীমিত আকারে কোবাল্ট উৎপাদন শুরু হয়েছে। এ বসন্তে কানাডাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ফাস্ট কোবাল্ট কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের আইদাহোতে একটি কোবাল্টের খনি কিনেছে এবং আশা করা হচ্ছে আগামী তিন বছরের মধ্যে এর আরও উন্নতি হবে।
ফাস্ট কোবাল্ট কোম্পানির প্রধান কার্যনির্বাহী ট্রেন্ট মেল বলেন, তামা কিংবা অন্য যেকোনো ধাতুর চেয়ে কোবাল্টের খনি এখন সবার নজরের প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। আসলে আমাদের মত খনিজীবীরা আগে কখনো কোবাল্ট অনুসন্ধান করেনি। পৃথিবীতে প্রচুর কোবাল্ট রয়েছে। খনিজীবী হিসেবে আমরা এখন এর পিছনে ছুটছি।
সিআরইউ-এর মতে, ২০১১ সালে মোট ৭৫ হাজার টন কোবাল্টের ব্যবহার হয়েছে। তবে এ বছর এর ব্যবহার পূর্বানুমান করা এক লাখ ২২ হাজার টনও ছাড়িয়ে যাবে।
বর্তমানে প্রতি পাউন্ড কোবাল্টের মূল্য ৩২ ডলার। ধারণা করা হচ্ছে, এ বছর এর মূল্য ৪০ ডলারে ছাড়িয়ে যাবে। যেখানে ২০১১ সালে প্রতি পাউন্ড কোবাল্টের মূল্য ছিল মাত্র ২০ ডলার। যদিও আগামী কয়েক বছর এর উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং এর যে চাহিদা তার যোগানও দেওয়া সম্ভব হবে। তব বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছে, ২০২২ সালের দিকে এর ঘটাতি দেখা দিতে পারে।
ই-কোবাল্ট কোম্পানির ফিয়োনা গ্রান্ট লেডিয়ার বলেন, কোবাল্টের গতিশীল বাজার আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করেছে। ১৯৯০ দশকে নানা তর্কবিতর্কের পর অবশেষে বর্তমানে আইদাহোর নিজস্ব কোবাল্ট খনি আবারও পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এমনকি আগামী বছরের শেষের দিকে এখান থেকে উৎপাদনও শুরু হবে।
তিনি আরও বলেন, কোবাল্টের বাজার এখন যেরকম শক্তিশালী সেটা আগে কখনোই ছিল না। বিনিয়োগকারী, সম্ভব্য অংশীদার ও সম্ভাব্য কর্মীদের কাছ থেকে আমরা এই বিষয়ে ইতোমধ্যে অনেক ইতিবাচক সাড়া পেয়েছি।
সাধারণত খনিতে বিস্ফোরক ব্যবহার করে কোবাল্ট সংগ্রহ করা হয়। এরপর পরিশোধন করে ধাতু, মিশ্রন দ্রব্য কিংবা রাসায়নিকভাবে সেটা জমাট করে রাখা হয়। এরপর সেটা জেট ইঞ্জিন, ড্রোন ও ব্যাটারির মত বিভিন্ন পণ্যে ব্যবহার করা হয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মেডিসনের মিসৌরিতে এ গরমেই পুরনো সিসার খনি থেকে কোবাল্ট উৎপাদন শুরু করবে বলে জানিয়েছে মিসৌরি কোবাল্ট কোম্পানি। ধারণা করা হচ্ছে, ওই খনিতে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন পাউন্ড কোবাল্ট মজুদ রয়েছে। বাজারের দিকে থেকে উত্তর আমেরিকায় এটাই সবচেয়ে বেশি কোবাল্টের মজুদ।
বিশ্বে ৬০ শতাংশেরও বেশি কোবাল্ট কঙ্গোর খনিতে রয়েছে। তবে চিন বিশ্বের প্রধান দেশ হিসেবে পরিশোধিত কোবাল্টের যোগান দেয়। চীন আশা করছে, পরিশোধিত কোবাল্ট যোগানোর ক্ষেত্রে সব সময়ই তারা প্রধান থাকবে। আর সে লক্ষ্যে তারা ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এমনকি এশিয়াতেও পরিশোধন কারখানা নির্মাণের কাজ শুরু করেছে।
সূত্র : বিবিসি।