স্বীকৃতি মিলছে না প্রাথমিক শিক্ষকদের উচ্চতর সনদের

কামরান সিদ্দিকী

ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শারমিন। চাকরিতে যোগদানের সময় তিনি স্নাতক (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। একাদশ শ্রেণির সনদপত্র দিয়েই তার শিক্ষকতা শুরু হয়। তিন বছর পর স্নাতক পাস করেন তিনি। তবে চাকরিবিধি অনুসারে নিয়মিত কোর্সের শিক্ষার্থী হওয়ার সুযোগ না থাকায় তার স্নাতকের সনদ জমা দিতে পারছেন না। ফলে কাগজ-কলমে এখনও এইচএসসি পাসই রয়ে গেছেন তিনি।
উচ্চতর ডিগ্রি থাকলেও শারমিনের (ছদ্মনাম) মতো অনেক শিক্ষকের সনদের স্বীকৃতি মিলছে না। এ ব্যাপারে ওই শিক্ষক সমকালকে বলেন, চাকরিরত অবস্থায়ও তো পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি রয়েছে। তাহলে যারা চাকরিতে যোগদানের আগে স্নাতক (সম্মান) চার বছরের মধ্যে একাধিক বর্ষের পড়া শেষ করেছেন, তাদের অনুমতি দেওয়া হবে না কেন। তিনি বলেন, যেহেতু অনুমতি চাইলেও পাওয়া যায় না, এ কারণে অধিকাংশ শিক্ষক অনুমতি না নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেন। এ ক্ষেত্রে তারা চাকরিকালীন প্রাপ্য নৈমিত্তিক ছুটিগুলো কাজে লাগান।
একইভাবে স্নাতকোত্তর সনদের মূল্যায়ন পাননি রাজধানীর খিলগাঁও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক কাজী ফাহিমা আক্তার। ১৯৮৫ সালে ডিগ্রি পাস করে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন তিনি। ২০১১ সালে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হওয়ার অনুমতির জন্য জেলা শিক্ষা অফিসে আবেদন করেন। ছুটির দিনে ক্লাস-পরীক্ষা হবে- এমন শর্তের বিষয়টিও আবেদনে উল্লেখ করা হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে সনদ গৃহীত হবে না- এই যুক্তিতে তার আবেদনও মঞ্জুর করা হয়নি। তবে তিনি পড়ালেখা চালিয়ে যান। ২০১৩ সালে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ৩ দশমিক ৮৫ লাভ
করেন। এরপর যোগাযোগ করলেও তার সনদ গ্রহণ করা হচ্ছে না। তাই সার্ভিস বুকে এখনও ডিগ্রি পাস হিসেবে রয়ে গেছেন এই শিক্ষক। তার দুই সহকর্মী একইভাবে পাস করলেও তা অনুমোদন পাচ্ছে না।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিকার সুরক্ষা ফোরামের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, দেশের প্রতিটি বিদ্যালয়ের ৮০ ভাগ শিক্ষক এ সমস্যা মোকাবেলা করছেন। অথচ তাদের সনদ মূল্যায়নে আইনি কোনো সমস্যা নেই। একটি অন্যায্য নীতিমালা করে এসব শিক্ষককে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এটা বড় ধরনের বৈষম্য। অবিলম্বে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের এ নির্দেশনা শিথিল করা উচিত। তাহলে শত শত শিক্ষক উচ্চশিক্ষিত হিসেবে সার্ভিস বুকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাবেন।
প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামছুদ্দীন বলেন, যারা পাস করে নতুন সনদ পেয়েছেন, তাদের মূল্যায়ন করতে হবে। একজন উচ্চতর ডিগ্রিধারী শিক্ষক তার প্রাপ্য স্বীকৃতি না পেলে তা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যই নেতিবাচক।
তবে এসব ক্ষেত্রে চাকরিপ্রার্থীদের সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে এই শিক্ষক নেতা বলেন, তারা কোন শ্রেণিতে অধ্যয়ন করছেন সেটি আবেদনপত্রে উল্লেখ করা উচিত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আবেদনকারীরা ভুল করে তা উল্লেখ করেন না। এ কারণে পরে পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি পেতে তাদের সমস্যা হয়।
এ প্রসঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় উপপরিচালক তাহমিনা খাতুন বলেন, সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী চাকরিরত অবস্থায় কেউ নিয়মিত শিক্ষার্থী হতে পারেন না। তবে তারা উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিতে পারবেন।
ঢাকা বিভাগীয় উপপরিচালক ইন্দ্র ভূষণ ভৌমিক বলেন, এ-সংক্রান্ত নীতিমালায় অনুমতি সাপেক্ষে যারা পরীক্ষায় অংশ নেবেন তাদের সনদ গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে। যেসব শিক্ষক অনুমতি না নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন, তাদের সনদের ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে। তিনি বলেন, সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদের ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য থাকার কথা নয়। তবে যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন নিয়ে জটিলতা আছে, সেগুলোর সনদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, যে কোনো সরকারি চাকরিজীবীর নিয়মিত শিক্ষা কোর্সে অংশ নিতে পূর্বানুমতি লাগবে। প্রাথমিক শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। অনুমতি চাইলে দেওয়া হয় না- এ রকম কোনো নজির তার জানা নেই।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ আসিফ-উজ-জামান বলেন, ‘কেউ যদি প্রমাণ করতে পারেন যে চাকরিতে প্রবেশের সময় তিনি অধ্যয়নরত ছিলেন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিয়ে আবেদন করেন, তাহলে আমরা সেটা বিবেচনায় নেব। প্রয়োজনে আমার কাছে সরাসরি আবেদন করতে পারেন।’