
রিন্টু আনোয়ার :
ধর্মপ্রাণদের কাছে রমজান মহাপবিত্র মাস। সংযম, আত্মশুদ্ধি ও সহমর্মিতার মাস।রমজান কারো কাছে ইবাদতের মাস। আর কারো কাছে বাড়তি মুনাফা হাতানোর মৌসুম। চক্রবিশেষের কাছে বাকি ১১ মাসের চেয়ে এই মাসটি বেশি লোভনীয়। এরা অপেক্ষাই করে মৌসুমটি ধরার। সফলও হয়। সরকারের দিক থেকে বরাবরের মতো এদের রোখার ব্যাপক চেষ্টা। হুমকি-ধমকি অবিরাম। বাস্তবটা কঠিন। সরকারের কাজ সরকার করে, এদের ধান্ধা এরা সারে। এটাই বরাবরের চিত্র। চাল, ডাল, চিনি, তেল, ছোলা, খেজুর, পেঁয়াজ থেকে শুরু করে ইফতারের প্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম বৃদ্ধি এখানে বড় দাগের ঘটনা নয়। তা রমজানের আধ্যাত্মিক প্রশান্তির পরিবর্তে সাধারণ মানুষকে চরম আর্থিক চাপে ফেলে। কিন্ত্র, এবারে প্রেক্ষিত ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন। মানুষের প্রত্যাশাও বেশি।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় বাজারে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব পড়ে, ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কথা বলে আগাম মূল্য সমন্বয় করেন। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দ্রব্যমূল্যের চাপে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ সময় কাটাতে হয়েছে। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেই চাপ কিছুটা কমে। বিশেষ করে গত বছরের রমযানে অতি জরুরি কয়েকটি পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসায় স্বস্তি ফিরেছিল বাজারে। কিন্তু এবার সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে রমযানের আগমুহূর্তে বাজার আবার অস্থির হয়ে উঠেছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, নির্বাচনী ছুটির প্রভাবে সরবরাহ কিছুটা কম ছিল। যদিও এই সময়ে চাহিদা বেড়েছে। তাদের দাবি, এ ঘাটতির সুযোগে পাইকারি পর্যায়ে দাম বেড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রমযানকে সামনে রেখে প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। সরবরাহে বড় ধরনের কোনো সংকট নেই। তাই অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ার সুযোগ নেই। তবে বাজারে ঘুরপাক খাচ্ছে আরেকটি প্রশ্ন। সরবরাহ ঘাটতির আড়ালে কোনো অসাধু চক্র বা সিন্ডিকেট কি দাম নিয়ন্ত্রণ করছে? বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে সন্দেহ বাড়ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় প্রতিটি পণ্যের ক্ষেত্রেই ২৫ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত মজুত রয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যমান চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত পণ্য দেশে রয়েছে। বাস্তবে তা মিলছে না। পর্যাপ্ত মজুত থাকলে বাজারে এভাবে অস্বাভাবিক দাম চড়ে না।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বাৎসরিক ২৫ লাখ টন পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। এর ৮০ ভাগ স্থানীয় উৎপাদন থেকে মেটানো সম্ভব হয়। ২০ ভাগ ঘাটতি পূরণের জন্য নির্ভর করতে হয় আমদানির উপর যার সিংহভাগ আসে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে। অপরদিকে, দেশের মোট চাহিদার ৯৫ শতাংশ ভোজ্য তেল বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। বিশ্বের শীর্ষ সয়াবিন তেল উৎপাদনকারী দেশ হলো চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণ হলো উক্ত দেশগুলোতে উৎপাদন তথা রপ্তানি বেড়েছে, আর একইসাথে ডলারের বিপরীতে দেশগুলোর মুদ্রা শক্তিশালী হয়েছে। এছাড়া তারা রপ্তানিশুল্ক বাড়িয়েছে। ফলে সব মিলিয়ে আমদানির ক্ষেত্রে ক্রয়মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। আর তাই স্থানীয় বাজারে বেড়েছে দাম।
আবার, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্য রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত এক বছর যাবতই তেলের বাজার অস্থিতিশীল। বর্তমানে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৮২.৫ মার্কিন ডলার। ফলে আমদানি নির্ভর দ্রব্যের পরিবহন খরচ বেড়েছে। রমযান ঘিরে আমদানি নির্ভর খাদ্যপণ্যের বাজারে প্রতি বছরই বাড়তি চাপ তৈরি হয়। বিশেষ করে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মসুর ডাল, এঙ্কর ডাল, পেঁয়াজ, আটা ও খেজুরের চাহিদা এ সময় বেড়ে যায় কয়েক গুণ। এবারও আগের ইতিহাসের কিছুটা পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। শুধু রমযান মাসেই সয়াবিন তেলের চাহিদা প্রায় ৩ লাখ টন। একই সময়ে চিনির চাহিদাও ৩ লাখ টন। ছোলার চাহিদা ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টনের মধ্যে। মসুর ডালের প্রয়োজন ২ লাখ ৫ হাজার টন। পেঁয়াজের চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় ৫ লাখ টন। আর খেজুরের চাহিদা ৬০ থেকে ৮০ হাজার টন পর্যন্ত পৌঁছায়। প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, প্রত্যেকটি পণ্যেরই চাহিদার তুলনায় মজুদ কম আছে। ফলে সিন্ডিকেট চক্র দাম নিজেদের মতো বাড়িয়ে ভোক্তাদের পকেট কাটছে।
এবার রমজানের ঠিক একদিন আগে শুরু হয়েছে নতুন সরকারের কার্যক্রম। সরকার সর্বোচ্চ অ্যাটেনশন দিয়েছে নিত্যপণ্যের বাজারের দিকে। আবার রমজানে নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখার অঙ্গীকারও করেছে সরকার। সেই দৃষ্টে চেষ্টাও করছে। বিক্রেতা, পাইকার, উৎপাদক, আড়তদারসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের সঙ্গে দেনদরবার করেছে, করছে। লেবু, শষাসহ কয়েকটি দেশীয় কয়েকটি পণ্যে সফল না হলেও আমদানি নির্বর বেশ কিছু পণ্যে ফল ভালো। বলার অপেক্ষা রাখে না- বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও আমদানি-নির্ভর অনেক ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ওঠানামা, ডলার সংকট, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি—এসব বাস্তবতা থাকলেও রমজান এলেই হঠাৎ করে যে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে অসাধু ব্যবসায়ী, মজুতদার ও সিন্ডিকেট চক্রের কারসাজিই বড় কারণ। তারা চাহিদা বাড়ার আগেই কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, গুদামে পণ্য আটকে রাখা কিংবা পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে অযৌক্তিক মুনাফা যোগ করা—এসব প্রবণতা বহুদিনের। মানুষও অভ্যস্ত। রমজানে একটু বেশি দামে খাদ্য ওভোগ্যপণ্য কিনতে হবে-মানসিক এ প্রস্তুতি মানুষ নিয়েই রাখে। অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন একটি সরকার আমলে মানুষ এর কিছুটা ব্যাতিক্রম আশা করে। এছাড়া দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ কেবল অর্থনৈতিক ইস্যু নয়; এটি সামাজিক স্থিতি, রাজনৈতিক স্থায়িত্ব এবং মানুষের জীবনমানের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। গেল বছরটিতে এসময় ছিল অনির্বাচিত, অন্তর্বর্তী সরকার । গত রমযানে ব্যবহৃত জিনিসপত্রের দাম কিছুটা স্বাভাবিক ছিল। এবার দ্বিমুখী চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে কিছু পণ্যের দাম কমেছে। আবার বেশ কয়েকটির ক্ষেত্রে বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।
রমযানে নিত্যপণ্যের দাম স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রাখতে সরকার কঠোর বাজার তদারকি, অসাধু সিন্ডিকেট ভাঙা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠতি মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে। নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, সিন্ডিকেট করে কেউ নিত্যপণ্যের দাম বাড়ালে ছাড় দেয়া হবে না। সিন্ডিকেট সংশ্লিষ্টরা এতে ভয় পেয়েছেন কি-না, সেই তথ্য এখনো অস্পষ্ট। রমযানকে উপলক্ষ করে সবজি বাজারে দামের অস্বাভাবিক ওঠানামা নতুন নয়। বিশেষ করে বেগুন, লেবু ও কাঁচামরিচ, ইফতার টেবিলের অপরিহার্য এই তিন পণ্যে প্রায় প্রতি বছরই বড় পরিবর্তন দেখা যায়। চলতি বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে গোল কালো বেগুন বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৮০ টাকায়। গত বছর রমযান শুরুর একদিন আগে একই বেগুনের দাম ছিল ৭০ টাকা। অর্থাৎ কেজিতে বেড়েছে ১০ টাকা। কালো লম্বা বেগুন ও সাদা গোল বেগুনের দামও ঊর্ধ্বমুখী। গত বছর ৫০ টাকায় পাওয়া গেলেও এবার তা ৬০-৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁচামরিচের দাম আরও বেশি বেড়েছে। গত বছর রমযানের শুরুতে প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। বর্তমানে রাজধানীর বাজারে তা ১৪০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেগুন, পেঁয়াজ, আলু নয়-এবার বিশেষ করে লেবু নিয়ে এবার কাণ্ডকীর্তি বেশি। এবার রোজার আগেই রাজধানীর কাঁচাবাজারে লেবুর দাম বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। বাজারভেদে প্রতি হালি লেবুর দাম ৭০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত ওঠানামা করছে, যা ছোট সাইজ থেকে বড় জাম্বুরা সাইজের লেবু পর্যন্ত প্রযোজ্য। এর ফলে প্রতি পিস লেবুর দাম প্রায় ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত পড়ছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, এখন লেবুর সিজন না হওয়ায় সরবরাহ কম থাকায় দাম বেশি। এছাড়া কিছু বাগান মালিক রমযান শুরু হওয়ার আগে গাছ থেকে লেবু না পাড়ায় বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এ চক্রের কাছে রমজান একটি মৌসুম। সারা বছরই এর জের বা রেশ থাকে। তাই রমযান ঘিরে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এখনই সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে কার্যকর পদক্ষেপ দরকার। জাতীয় নির্বাচনের প্রভাবে বাজার ব্যবস্থায় যে ব্যত্যয় তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত ঠিক করা জরুরি। ফাঁক-গলদও ধরতে হবে। চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় অসামঞ্জস্য নেই। তবুও বাজারে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে মূলত বিতরণ ও বাজারজাতকরণ পর্যায়ের সমস্যার কারণে।
কয়েকটা উৎপাদনস্থল, কারখানা ও গুদাম থেকে রোজার পণ্য সরবরাহে বিশেষ নজর দিলে সুফল মিলবে। সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখা এবং বাজার মনিটরিং জোরদার দিলে সুফল আসতে বাধ্য। বাংলাদেশের বাজার সংশ্লিষ্টরা কোনো নিয়ম মানতে চান না। লাভ তোলাই তাদের প্রধান কাজ। অর্থনীতি অনুযায়ী, সাধারণত কোনো দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পায় যখন এর চাহিদার অনুপাতে যোগান সীমিত থাকে। এছাড়া যেসব দ্রব্য আমদানি নির্ভর, সেগুলোর মূল্য বৃদ্ধির সাথে সম্পর্ক থাকে রপ্তানিকারক দেশে দ্রব্যটির চাহিদা ও যোগান, বাহ্যিক কোনো কারণে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, রপ্তানির উপর নিয়ন্ত্রণ বা নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি বিষয়ের।
রমজান মাস মানব জীবনের জন্য একদিকে যেমন সৌভাগ্যের তেমনি সংযম ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন আমাদের যেন আপন করে নেয়।
তাই রমজান মাসে সব ধরনের পেশার মানুষের জন্য বাজারমূল্য অবশ্যই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে হবে। সব পেশা-শ্রেণির মানুষের প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। টিসিবিকে শহর নগর গ্রামে আরও জোরদার করতে হবে। রমজানের ফজিলত বরকত মাগফিরাত নাজাত প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে সবাইকে একযোগে কাজ করা দরকার। ব্যবসায়ীদের ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের কথা মাথায় রেখে ভেজালমুক্ত দ্রব্য সরবরাহ, অধিক মূল্য উপার্জন থেকে হাত গুটিয়ে নিতে হবে। দুনিয়ার সকল দেশে রমজান মাসে দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণ ও হ্রাস হলেও, বাংলাদেশের ব্যবসায় এর বিপরীত অবস্থা সর্বত্র বিরাজমান! নতুন সরকারকে দেশের খেটে খাওয়া মানুষের কথা মাথায় রেখে সব ধরনের নিত্যপণ্য সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে।
এখানে সরকারে করার কিছু থাকে না-ধরনের কথা মানুষ আর শুনতে চায় না। জনবান্ধব দৃষ্টিতে চাইলে এখানেও সরকারের করার অনেক কিছু আছে। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে অবশ্যই প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে সরকারকেই। সামগ্রিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় সরকারের নজরদারি জোরদার করতে হবেই। কৃষক বা মাঠ পর্যায় থেকে বাজার পর্যন্ত আসার যাত্রায় মাঝপথে যে হাতগুলো কাজ করে সেদিকে নজরদারি থাকলেও বড় রকমের সুফল মিলবে। তা নাহলে, নতুন সরকারের ঘোষণা,”শাসক নয়, সেবক হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার” শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে!
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
rintu108@gmail.com









