নন-লাইফ বীমার ০% কমিশন নিয়ে কাদা ছোড়াছোড়ির শেষ কোথায়? (২য় পর্ব)

খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
নন-লাইফ বীমা কোম্পানীর ০% কমিশন নিয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এবং বীমা মালিকদের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ)‘র চলমান কমিশন বন্ধের বজ্রকঠোর সিদ্ধান্তের মাস দুই পার হতে না হতেই নিজস্ব উদ্যোগে নেয়া সিদ্ধান্তও ভিতরে ভিতরে কঠিনভাবে বিতর্কিত হতে শুরু করেছে, কিন্তু কেন..? আসলে ০% কমিশনের এই সুবিধা কারা বা কোন কোন কোম্পানীগুলো অবিভাবকহীন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষ(আইডিআরএ) কে ফ্যাসিশক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রকমফের পদ্ধতিতে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রিত কমিশন প্রদান করে করে। আইডিআরএ ও বিআইএ প্রাথমিকভাবে দু-মাস অর্থ্যাৎ জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এর হিসাব ১৫ মার্চ ২০২৬ এর মধ্যে নন-লাইফ কোম্পানীগুলোর ব্যবসায়ীক হিসাব জমা দেওয়ার নির্দেশ থাকরেও বেশিরভাগ কোম্পানী তা করেন নাই। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ৪৫টি কোম্পানী তাদেরও হিসাব জমা দিলেও বীমা খাতের গাদ্দারখ্যাত কোম্পানী গ্রীনডেল্টা ইন্স্যুরেন্সসহ প্রগতি ইন্স্যুরেন্স এবং পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্স তাদের হিসাব জমা দেয় নাই। যার কারনে হিসাব আপডেট করার জন্য মার্চ ২০২৬ এর হিসাব চাওয়া হলেও ২৮ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত বেশকিছু কোম্পানী তাদের ব্যবসায়ীক হিসাব জমা দেয় নাই। এ নিয়ে নন-লাইফ বীমা কোম্পানীগুলোর ভিতর একজন অন্যজনের ব্যবসা ছিনিয়ে নেওয়ার দ্বন্দ্ব একরকম বিস্ফোরক অবস্থায় বিরাজমান, যা দেশের বীমা খাতের জন্য অশনি সঙ্কেত বলে সংশ্লিষ্ট অনেকেই এমন বিরূপ মন্তব্য করেন এমনিতেই বাংলাদেশের বীমাখাত বেশ নাজুক অবস্থায় আছে।
একদিকে যেমন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীগুলোতে পুঁজি বিনিয়োগ করা মালিকদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, ঠিক তখনই অতীতের সকল হিসাব নিকাশ বাদ দিয়ে আইডিআরএ‘র উপর নির্ভর না করে বিআইএ কর্তৃপক্ষ নিজস্ব উদ্যোগে আইডিআরএ প্লাস বিআইএ ০% কমিশন বলবতের কঠিন সিদ্ধান্তে উপনিত হন, যা ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কঠোরভাবে কার্যকর করত সমস্ত নন-লাইফ বীমা কোম্পানীকে আইডিআরএ‘র মাধ্যমে আদেশক্রমে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এসব সিদ্ধান্তের দু-তিন মাস যেতে না যেতেই নিজস্ব উদ্যোগে নেয়া সিদ্ধান্তের ভিতরে ফাটল ধরতে শুরু করেছে, কিন্তু কেন…!!!

এখানে সমর্থিত এবং অসমর্থিত আলোচনা, সমালোচনা এবং অনুসন্ধান করতে গিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে (কোন দালিলিক প্রমান ব্যতিত) বেশকিছু কোম্পানীর নাম উঠে এসেছে, সেগুলি হল :- গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স, পাইওনিয়ার ইন্স্যুরেন্স, প্রগতি ইন্স্যুরেন্স, রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স, এশিয়া ইন্স্যুরেন্স, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স, ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স, প্রভাতী ইন্স্যুরেন্স, বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, রূপালী ইন্স্যুরেন্স, জনতা ইন্স্যুরেন্স, ফিনিক্স ইন্স্যুরেন্স, গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স, ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স, ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স, তাকাফুল ইসলামি ইন্স্যুরেন্স, ইসলামি কমার্শিয়াল ইন্স্যুরেন্স, ইসলামি ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ, নিটল ইন্স্যুরেন্স, অগ্রণী ইন্স্যুরেন্স, সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স, সিটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্স, প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স, এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্স, ঢাকা ইন্স্যুরেন্স ও শিকদার ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি। উল্লেখিত কোম্পানীগুলোর অভ্যন্তরীনভাবে ব্যবস্থাপনা পরিচালকগন ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে সুযোগ সুবিধা দিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে গিয়ে গোপন প্রতিযোগিতায় কাজ করে গেলেও সামনা সামনি কারো প্রতি কারো কোন অভিযোগের প্রমান দেন নাই। তবে বেশিরভাগ অভিযোগের তীর যাদের দিকে, তারা হল, গ্রীনডেল্টা ইন্স্যুরেন্স, ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স, প্রভাতী ইন্স্যুরেন্স এবং এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড। উল্লেখ্য তিন কোম্পানীর ব্যবসা বাড়লেও গ্রীনডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীর হিসাব ডাটা সময়মত পাওয়া যায় নাই। তবে অভিযোগে উঠে আসা কোম্পানীগুলোর বেশ কজন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সাথে কথা বলেও কমিশন দেয়ার ব্যাপারেও কোন রকম স্বীকৃতি বা সত্যতা পাওয়া যায় নাই।
দেশের জিডিপিতে অংশীদারিত্বের দাবীদার বীমা শিল্পের উন্নয়নে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)’ এর নিকট নন-লাইফ বীমা কোম্পানীর প্রায় শতভাগ ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের দাবী ছিল ০% মানে শুন্য কমিশন। অপরদিকে নন-লাইফ বীমা কোম্পানীর মালিকপক্ষের চাহিদা কারনে কোম্পানীর প্রায় শতভাগ সিইও/ব্যবস্থাপনা পরিচালকই নির্বাক এবং জিম্মি, যেহেতু ব্যবসায়ীরা খুঁজে, ব্যবসা! তাদের কাছে নীতি নৈতিকতা মূল্যহীন। আর এই মূল্যহীন অবস্থা চলতে চলতে বীমা শিল্পের আজ বেহাল দশা। মালিকপক্ষ ছাড়াও বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)ও ভিন্নতায় এগিয়ে আছে, অর্থ্যাৎ আইডিআরএ শুধু তর্জন গর্জনে আছে। বীমা শিল্পের বিকাশে আইডিআরএ বড় বাধা হল সংশ্লিষ্টখাতে নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষের প্রধান যারা হয়ে আসেন, বীমাখাতে তাদের অনভিজ্ঞতা, এবং রাজনৈতিক পদায়ন। ফ্যাসিবাদি সরকারের পতন এবং পলায়নের পর নতুন সদস্য (লাইফ, নন-লাইফ) যারা নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন, তারা কতটুকু কি করতে পারবেন এর উপরও অনেকে নির্ভর করতে পারছেন না বলে মত প্রকাশ করেন।
এখন প্রশ্ন হল, সম্প্রতি ১ জনুয়ারি ২০২৬ হতে কার্যকরি হওয়া আইডিআরএ এবং বিআইএ’র যৌথভাবে শক্ত সিদ্যান্তে নন-লাইফ বীমা কোম্পানীর ০% কমিশন দু-মাস যেতে না যেতেই ব্যাবসায়িক বাস্তবতায় সাময়িক বাধা খাওয়াতে নন-লাইফ বীমা কোম্পানী গুলোর এমডি/সিইওদের একজন অপরজনের দিকে সন্দেহের তীর নিক্ষেপ ও কাদা ছোড়াছোড়ি যে পর্যায়ে রূপ নিয়েছে, তা দেশের বীমা খাতের জন্য অশনি সঙ্কেত এবং নতুন করে হাতে নেওয়া নন-লাইফ বীমা কোম্পানীর ০% কমিশন প্রকল্পকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে যাচ্ছে, যদিও বেশকিছু কঠিন শাস্তির ঘোষনা বিআইএর।
মুলত: বীমা খাতকে শিয়ালের মুখ থেকে বাঘের মুখে দিতে না চাইলে এক কথায় বীমা খাতকে ব্যবসা বান্ধব এবং জিডিপির অংশীদার হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হলে বারবার আইন সংশোধন না কওে সুদুর প্রসারি চিন্তাভাবনার সাথে লিগেল সমর্থিত আইন পরিপালন(ইপ্লিমেন্ট) করাটাই জরুরী, যাতে করে মানুষ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে। কারন, দূরদর্শী চিন্তা ভাবনা না করে বারবার আইন পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন এবং বিয়োজন করলে আইনের প্রতি মানুষ শ্রদ্ধাশীল না। বিশেষ করে বিআইএ এবং আইডিআরএ‘র যৌথ উদ্যোগে নেয়া নন-লাইফ বীমা কোম্পানীর ০% কমিশন প্রথা চালু রাখার মোক্ষম পদ্ধতি হিসেবে এমডি/সিইওদের কমিশন নিয়ে অনৈতিক প্রতিযেগিতার কাদা ছোড়াছোড়ি না করে নিম্ন উল্লেখিত পদ্ধতি গুলির সঠিক প্রয়োগ এবং পরিপালন করার মাধ্যমে বীমা খাতের সুফল অর্জন করা সহজ হবে বলে আশা করাটা কোন ব্যাপার বলে মনে হয় না।
১) প্রত্যেক নন-লাইফ বীমা কোম্পানী গুলোর গঠনতন্ত্রের অর্গানোগ্রাম একই রেখে এমপ্লয়ীদের সেলারি স্ট্রাকচার ১৫%এ ফিক্সড রাখতে হবে।
২) অন্য কোন উপায়ে অর্থ্যাৎ যে মালিকদের বীমা কোম্পানী ছাড়া ও অন্যকোন ইন্ডাস্ট্রি আছে তা থেকে এমপ্লয়ীদের সেলারি বা কমিশন সমন্ময় করা যাবে না।
৩) প্রত্যেক নন-লাইফ বীমা কোম্পানী গুলোর চেয়ারম্যান, পরিচালক এবং সিইওদের জেন্টেলম্যান এগ্রিমেন্ট ঠিক রাখা এবং কারো ব্যবসা কেউ নিবে না।
৪) আগামী ২ বৎসর কোন ডেভেলাপমেন্ট অফিসার কোন কোম্পানী পরিবর্তন করতে পারবে না এবং প্রতি মাসের আয় ব্যয়ের হিসাব পরবর্তী মাসের ৫ তারিখের ভিতর আইডিআরএ এবং বিআইএতে জমা দিতে হবে । এতেকরে কোম্পানীগুলোর সঠিক হিসাব বেরিয়ে আসবে।
আইডিআরএ’র যদি স্বদিচ্ছা থাকে তবে প্রতিটি বীমা কোম্পানীর জন্য ০% কমিশনসহ এক ও অভিন্ন বেতন অবকাঠামোর নজির তৈরী করে দেখানো ক্ষমতার অপব্যবহার নয় সেইসাথে এমডি/সিইওদেও সরকারী চাকুরির মত নিশ্চয়তা বিধান বা স্থায়ীপদ তৈরি করে দেখানোই মুল ব্যাপার, আর এটা করে দেখানোই প্রকৃত প্রশাসনিক যোগ্যতা ও দুরদর্শিতা, যা বীমা খাতকে সুদুর প্রসারি অবকাঠামো তৈরি এবং জিডিপিতে অবদান রাখতে সহায়তা করবে। যেহেতু একজন সিইও’র উপর নির্ভর করেই একটা কোম্পানী চলে।
আইডিআরএ’র প্রশাসনিক দক্ষতার কথা বলতে গেলে আইডিআরএ গঠনের সময়ে প্রবীণ বীমা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি “এডভাইজরী বোর্ড” গঠনের কথা থাকলেও আজ পর্যন্ত তা পরিলক্ষিত হয় নাই। এখন এই দুর্যোগপূর্ণ পরিবেশে বীমা জ্ঞানে সমৃদ্ধ বীমা পেশাজীবিদের নিয়ে অতিসত্ত্বর বীমা “এডভাইজারী বোর্ড” গঠন করা উচিত, যা বিআইএ‘র সার্ভিলেন্স টিম গঠনের চেয়েও দরকারি ছিল। তাহলে আইডিআরএ’র অনৈতিক ও আইন অমান্যকারী সিদ্ধান্ত থেকে বীমা শিল্প কিছুটা রক্ষা পাবে এবং আইডিআরএ কিছুটা হলেও নিয়মতান্ত্রিকতায় আসবে, সেই সাথে কোম্পানীগুলো সঠিকপথে চলতে পারবে বলে খাত সংশ্লিষ্ট সকলের ধারনা।
আমাদের অনুসন্ধানী টিম এ নিয়ে কাজ করছে এবং খুব সহসাই কোম্পানীগুলোর কার্যক্রম প্রকাশের অপেক্ষায়…
তৃতীয় পর্বে আসছে বিআইএ’র দেওয়া ২০২৬ সালের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারী, মার্চসহ ব্যবসায়ীক হিসাব নিয়ে কমিশন প্রতিযোগিতার মুল বিষয় …