সন্তানের অনিশ্চিৎ ভবিষ্যতের জন্য দায়ী কে, কেন এত বিয়ে বিচ্ছেদ?

খোন্দকার জিল্লুর রহমান
সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসে রাজধানিতে দৈনিক ৫০-৬০টি দম্পতির বিচ্ছেদের আবেদন করে, এমন সংবাদে সচেতন মহলে আতঙ্ক দেখা দেয়। বিয়ে বিচ্ছেদ এখন আমাদের সমাজে একটা সংক্রমক ব্যধি হিসাবে দেখা দিয়েছে, যার ছোবল থেকে আমাদের পরের প্রজন্মকে রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
ইসলামে নারীর যথেষ্ট মর্যাদা দেয়া হয়েছে। সমাজে প্রচলিত আছে, সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে, গুণবান পতি যদি মিলে তার সনে। কথাগুলো অনেক মূল্যবান। নারী মাতা, নারী সুখ, নারী ভালোবাসা, নারী অনুপ্রেরণা। এমন অনেক সুন্দর সুন্দর গল্পগাথা, আছে স্বপ্ন বাস্তবতা, আছে এগিয়ে চলার সাহসিকতা। অনেকে বলে, নারী অবলা, নিরীহ এবং সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার। এটা কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছুটা সত্য হলেও বাস্তবে আমাদের দেশে নারীদের অগ্রযাত্রা অনেক বেশি লক্ষণীয়। যে দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রধানবিরোধী দলসহ দুই বিরোধীদলীয় নেতাই নারী সে দেশের নারীর অগ্রযাত্রা কম নয়। আমাদের দেশের নারীরা এখন শিক্ষা-দিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রতিরক্ষা বাহিনীতে কার্যকর ভূমিকাসহ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে ও সফলভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। জাতিসঙ্ঘের শান্তিরক্ষী হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের দেশের নারীরা পিছিয়ে নেই, শ্রম মেধা দক্ষতার পরিচয় দিয়ে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তারা। বর্তমানে দুঃসাহসী ও চ্যালেঞ্জিং কর্মকাণ্ডে সফলতার স্বাক্ষর রাখছে আমাদের নারীরা। পুরুষের পাশাপাশি নারী সদস্যরা সেনাবাহিনীতে সুনামের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। সাহসিকতা ও দক্ষতার জন্য আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনীতে অনেক বাংলাদেশী নারী সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। এটা সমস্ত নারী সমাজের অনুপ্রেরনা ও নারীদের ঘঠনমুলক দায়িত্ত্বশীলতার বহিঃপ্রকাশ তা কোন মতে অস্বিকার করার কথা নয়। নারীর অগ্রযাত্রা এখন সারা বিশ্বে সেই সাথে আমাদের দেশে ও পিছিয়ে নেই, নারী শিক্ষা, নারী জাগরণ ও নারী নেতৃত্ব। কিন্তু যে হারে বাড়ছে চাকরিজীবী নারীর সংখ্যা ঠিক সে হারে পরিবর্তন হয়নি পিতৃতান্ত্রিক বা পুরুষতান্ত্রিক পরিবেশের অবস্থা। বাইরের কাজ, ঘরের সব দায়িত্ব পালন করেও নারীকে শুনতে হচ্ছে অনেক কথা। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের পুরুষদের সহযোগিতা না পেয়ে দু’দিকে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একপর্যায়ে নারীরা হাঁপিয়ে উঠছেন।


বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, গত সাত বছরে ঢাকা শহরে বিয়ে বিচ্ছেদের প্রবণতা বেড়েছে ৩৪ শতাংশ। স্বল্প শিক্ষিত দম্পতিদের চেয়ে শিক্ষিত দম্পতিদের মধ্যে বিয়ে বিচ্ছেদ হচ্ছে বেশি সাথে এটাও পরিলক্ষীত যে গ্রামের দম্পতিদের ছেয়ে শহরে দম্পতিরা এ ক্ষেত্রে বেশি এগিয়ে। এ জন্য অনেকেই শিক্ষিত নারীর জীবিকাকে দোষারোপ করছেন, কিন্তু এর পেছনের গল্প বা ভিতরগত তথ্য অনেকেই খুঁজেন না বা খুঁজতে চান না। একজন চাকরিজীবী পুরুষের চেয়ে একজন চাকরিজীবী নারী চাকরির প্রয়োজনেই বাইরে বেশী সময় দিলে, এই নিয়ে শুরু হয় নানান রকম তর্ক বিতর্ক অশান্তি এবং এর পরিণাম অনেক সময় বিয়ে বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়ায়। এ বিচ্ছেদের ফলে তারা নতুন জীবন বেছে নিলেই তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। মতের অমিল, সমঝোতার অভাব, শ্রদ্ধাবোধের ঘাটতি, পুরুষের আধিপত্য ও পরকীয়ার কারণেই বিয়ে বিচ্ছেদ বেশি হচ্ছে। তবে শারীরিক দুর্বলতা, প্রত্যাশা পূরণের অভাব, পরিবারের সদস্যদের অনধিকার চর্চা, ধৈর্য ও সমজোতার অভাব, হিংসা-লোভ, উচ্ছাভিলাসিতা, অনৈতিক স্বদিচ্ছা পুরণ, নিজেদের কূকর্ম ঢাকতে গিয়ে সন্তারে বলি দেয়া এবং ক্যারিয়ার নিয়ে সমস্যা হওয়ার ফলেও বিয়ে বিচ্ছেদের মত অনেক ঘটনা হচ্ছে।
সারাবিশ্বে ক্রমান্ময়ে বিয়ে বিচ্ছেদের প্রবনতা বাড়লেও নিকট অতিতে ঢাকা সিটি করপোরেশনের তথ্যানুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত রাজধানীতে বিয়ে বিচ্ছেদের সংখ্যা প্রায় বায়ান্ন হাজার যা মাসে গড়ে ৭৩৬টি, দিনে ২৪টির বেশি এবং ঘণ্টায় একটি বিচ্ছেদের আবেদন হচ্ছে। বিচ্ছেদের যেসব আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে তার মধ্যে ৮৭ শতাংশ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে পরকীয়ার জেরে। কোনো ক্ষেত্রে স্বামীর, কোনো ক্ষেত্রে স্ত্রীর পরকীয়া হলেও বিশ্লেষনে দেখা গেছে বিচ্ছেদে নারীরা এগিয়ে। জরিপে উঠে আসে ৭০.৮৫ শতাংশ বিয়ে বিচ্ছেদের আবেদন নারীর এবং ২৯.১৫ শতাংশ বিয়ে বিচ্ছেদের আবেদন করছেন পুরুষ।


মনোবিজ্ঞানীদের মতে সাধারণত নারীরা বেশি নির্যাতিত হওয়ায় তারাই বিচ্ছেদের পদক্ষেপ বেশি নিচ্ছে, তবে এর সাথে ভিন্ন মতামত য়াছে। অনেকে বলেন, মেয়েরা বর্তমানে অধিকার সচেতন। সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুই দিক থেকেই বেশি অধিকার পেয়ে বিয়ে বিচ্ছেদে আগের চেয়ে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। মূলত বিয়ে বিচ্ছেদের সবচেয়ে বড় কারণ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ‘বনিবনা না হওয়া এক স্ত্রী ও সন্তানের কথা গোপন রেখে আবার বিয়ে করা’। স্ত্রীর করা আবেদন গুলোর মধ্যে রয়েছে স্বামীর সন্দেহ মনোভাব, পরনারীর সাথে সম্পর্ক, যৌতুক, দেশের বাইরে গিয়ে আর ফিরে না আসা, মাদকাসক্তি, ফেসবুক আসক্তি, ব্যক্তিত্বের সংঙ্গাত, নৈতিক স্মৃঙ্খলন সহ বিভিন্ন কারণ। আর স্বামীদের আবেদনে অবাধ্য হওয়া, ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী না চলা, বদমেজাজ, সংসারের প্রতি উদাসীনতা এবং সন্তান না হওয়াসহ এমন অনেক কারণ। আমরা নারী উন্নয়নের কথা বললেও এখনো বেশির ভাগ নারী গৃহকাজে থাকেন এবং অধিক হারে নির্যাতিতও হচ্ছেন। একজন পুরুষ কম সময় ঘরে থাকেন বলে তিনি সংসারের অনেক ঝামেলাকে আড়াল করতে পারেন আর নারী সব অবহেলা নির্যাতন সয়ে সংসারেই কাজকর্ম করে সময় কাটিয়েও নিজের প্রতি বিশ্বাস হারাতে বসেন, ভাবেন নিজেকে দুর্বল, একপর্যায়ে কাউন্সিলিংয়ের অভাবে হতাসায় বিয়ে বিচ্ছেদের মতো কাজ করতেও ভাবেন না।
নারীরা সহজে তালাকের সিদ্ধান্ত নেন না বললেও আমাদের দেশে নারীদের পক্ষ থেকে তালাকের আবেদন বাড়ছে কেন তা নিয়ে অনেকেই চিন্তিত। ক্ষেত্র বিশেষ মেয়েদের মতামত ছাড়া অল্প বয়সে বিয়ে দেয়া, আবার,কোন কোন ক্ষেত্রে বেশি বয়সী লোকের সাথেও অভিভাবকেরা মেয়েদের বিয়ে দিচ্ছেন যা একটাপর্যায়ে বিয়ে বিচ্ছেদের কারণ হয়ে দাড়ায়। সন্তানরা চায়, মা-বাবার সাথে একসাথে একটি স্বাভাবিক ও সুখী পরিবার হয়ে থাকতে। অনেকে বিয়ে বিচ্ছেদের ঘটনাকে কিছু মনে না করলেও সন্তানদের ওপর এর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, তা অস্বীকার করা যায়না। আবার পারিবারিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি চিন্তা করলে সন্তানদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়ার অধিকার মা-বাবা কারোই নেই এবং সামাজিক ভাবেও বিয়ে বিচ্ছেদ মেনে নেয়া যায় না, তাই সন্তান জন্ম দেওয়ার আগেই আমাদের প্রতিটা দম্পতির ভাবতে হবে বিয়ের পর অন্তত দুই-চার বছর অপেক্ষা করে সন্তান নেয়া, নিজেদের মধ্যে বিশ্বাস-বন্ধন অটুট হলে বা দুজন দুজনকে বুঝে উঠতে পারলেই তারপর সংসারে সন্তানের কথা চিন্তা করা উচিত, একটা কথায় আছে আদর এবং শ্নেহের পরশেই মাতৃত্ব জেগে উঠে। তাই একটি সন্তানকে পৃথিবীর আলোর মুখ দেখাতে যেমন বাবা-মা দুজনের প্রয়োজন, তেমনি ওই সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে এই দুজনকেই সবচেয়ে বেশি ভুমিকা রাখতে হবে।
আমরা আশা করব আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে একটা শান্তিময় এবং নিরাপদ সুন্দর পৃথিবী দিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র ও পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের দায়িত্তশীল ব্যক্তি সহ প্রত্যেকের আচার আচরনে কাজে কর্মে শিক্ষাদীক্ষায় সহনশীলতার পরিচয়দিয়ে লোভ লালসা ঊচ্ছাকাঙ্খা অত্যাচার অনাচার পরিহার করে পারিবারিক শান্তি সৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কাজ করে যাবে বলে আজকের প্রত্যাশা।
লেখক : দফতর সম্পাদক,বাংলাদেশ মুসলিম লীগ
সম্পাদক ও প্রকাশক, অর্থনীতির ৩০ দিন।