

খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
দীর্ঘদিনের চড়াই উতরাই এরপর বীমাখাতের অভিভাবক হিসেবে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) পেল প্রথমবারের মতো নতুন একজন নারী চেয়ারম্যান। দেশের বীমা খাতে প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার হিসাব মিলাতে গিয়ে নারী নেতৃত্বের প্রত্যাশা না থাকলেও তীব্র সমালোচনার নতুন দীগন্তে এসে দেশের জিডিপিতে ০.০৪ পার্সেন্টেরও অবদান রাখা বীমাখাত একরকম হযবরল অবস্থায় অতিক্রম করে চলেছে। যেখানে বিশ্বেও অন্যান্য উন্নত দেশের জিডিপিতে বীমাখাতের অবদান প্রায় ১৭ থেকে ২১ পার্সেন্ট পর্যন্ত।
বাংলাদেশের বীমা খাত দীর্ঘদিন ধরেই নানা সংকট, অনিয়ম, আস্থাহীনতা ও কাঠামোগত দুর্বলতার সঙ্গে লড়াই করে চলেছে। এই বাস্তবতায় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মীর নাদিয়া নিভিন- এর দায়িত্ব গ্রহণ নিঃসন্দেহে একটি অনাকাঙ্খিত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। আমাদের লোকালয়ে একটি প্রবাদ চালু আছে, “কিছু ধারে কাটে আবার কিছু ভারে কাটে।” দেশের বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো একজন নারী চেয়ারম্যানের আগমন কাকতালিয় হলেও এটা শুধুই প্রতীকী অর্জন নয়, এটি একটি সম্ভাবনার দারও খুলে দিয়েছে। কারন নারীর অগ্রগতি এখন দেশ হতে দেশান্তরে। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই দেশের কয়েকটি লাইফ ও নন-লাইফ বীমা কোম্পানি ফুলেল শুভেচ্ছা, সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং অভিনন্দন বার্তার মাধ্যমে নতুন চেয়ারম্যানকে স্বাগত জানিয়েছেন, আবার অনেকে এর থেকে কিছুটা দুরে রয়েছে। কিন্তু…, প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক আলোচনা-সমালোচনার তীর ছুড়লেও একই সঙ্গে সামনে এসেছে আরেকটি প্রশ্ন, সবাই কি একইভাবে এগিয়ে এসেছে? যারা এগিয়ে এসেছে, এরা কি শুধুই তার আগমনী শুভেচ্ছা জানিয়েছেন নাকি বীমাখাতের অভিজ্ঞতা অনভিজ্ঞতার বিবেচনা করে সাদর সম্ভাসন জানানো, আবার যারা এখনো শুভেচ্ছা জানায়নি, তাদের নীরবতার ব্যাখ্যা কী? সবকিছু মিলিয়ে যেনো এক প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থান?
বিষয়টি নিছক ফুলেল শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ কি না? কারণ, যে কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থায় নতুন কোন নেতৃত্ব আসলে খাতসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে সৌজন্য শুভেচ্ছা জানানোর কোন প্রথা বিশ্বের অন্য কোথাও তেমন একটা দেখা না গেলেও দেশের প্রথায় চালু আছে কি না, এটা কিন্তু ভাবনা-চিন্তার বিষয়। আর এটি যদি পারস্পরিক সম্মান, পেশাগত সৌজন্য এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কের বার্তা বহন করে, তাহলে প্রশাসন কি ইমোশানে চলে? একথাও বাদ দেওয়া যায় না যে, আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান হওয়ার সমস্ত ক্রাইটেরিয়া ফুলফিল করা হয়েছে কি না। আর এই ফুলেল শুভেচ্ছা কি যে কোন নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধানের যোগ্যতার মাপকাঠি হয়ে দাড়ায় কি না? যদি তা নাহয় তাহলে তিনিইবা কেন এসব সস্তা শুভেচ্ছা গ্রহন করবেন?? সম্ববত আমাদের বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে এটার একটা প্রথাগত গ্রহনযোগ্যতা আছে। আসলে নিজেকে প্রচার ও প্রসার করে দেখাতে কার ভালো না লাগে। তবুও বলতে হয়, বিশেষ করে এমন এক সময়ে তার দায়িত্ব গ্রহন, যখন বীমা খাত নানা প্রশ্নের সস্মুখীন, দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, আর্থিক দুর্বলতা, গ্রাহকসেবায় ঘাটতি, বাজার শৃঙ্খলার অভাব, রিজার্ভ ফান্ডের স্বল্পতা, স্বচ্ছতার সংকট এবং সুশাসনের দুর্বলতা এবং নীতি নৈতিকতার অভাব, তখন নতুন চেয়ারম্যানকে ঘিরে যদিও পুরো খাতের সম্মিলিত ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার সুযোগ ছিল, তা কি নিশ্চিত করার কোন মানদন্ড এখানে প্রমানিত হয়েছে। তা না হলে নিছক এই ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো কি কোম্পানীগুলোর দন্ডমুন্ড ব্যক্তিদের অনৈতিক ব্যাবসাকে জায়েজ করা বা অনৈতিক সুযোগ সুবিধা আদায় করা নাকি এর সবগুলোই। আমাদের ব্যবসায়ীরা নৈতিকতাকে থোড়াই কেয়ার করেন। কারন ব্যবসায়ীরা বুঝেন ব্যবসা, তাদেও কাছে নীতি নৈতিকতা মুল্যহীন।

নয়তো নতুন চেয়ারম্যানের সম্ভাব্য সংস্কারমুখী অবস্থান, জবাবদিহিতা নিশ্চিতের উদ্যোগ এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান কিছু মহলে অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে কি না তাই বলেই এই দূরত্ব? তবে এ বিষয়টিও সত্য যে, কে ফুল দিল আর কে না দিল, এই প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসা হলে পুরো বিষয়টির মূল্যায়ন ব্যক্তিস্বার্থেও অর্জন ব্যতীত জাতীয় স্বার্থ শেষ হয়ে যায়। শুভেচ্ছা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো নতুন নেতৃত্বের প্রতি সংশ্লিষ্টদের বাস্তব সমর্থন। বীমা খাতকে সুস্থ ও টেকসই পথে ফেরাতে সুষ্ঠ নীতিমালা প্রনয়ন এবং দায়ীত্ববোধ ব্যতীত কেবল আনুষ্ঠানিক অভিনন্দন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন নীতিগত সহযোগিতা, নিয়ম মানার সংস্কৃতি, গ্রাহকবান্ধব আচরণ এবং বাজার শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি রক্ষার আন্তরিক অঙ্গীকার।
আবার এটাও বাদ দেওয়া যায় না যে, ব্যবসা যখন রাজনীতিবিদদের হাতে চলে যায়, বা ব্যবসায়ীরা রাজনীতির হাতিয়ারে পরিনত হয় অথবা প্রশাসন রাজনীতিবিদদেও প্রভাবিত হাতের ক্রিড়ানক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন ব্যবসা চলে যায় ব্যবসায়ীদের নীতি-নৈতিকতা ব্যতীত অসুস্থ প্রতিযোগিতার শিল্প হিসেবে। আর প্রশাসনিক দন্ডমুন্ড ব্যক্তিগন একদিকে যেমন রাজনৈতিক ব্যবসায়ীদের নিকট জিম্মি হয়ে পড়েন, অপরদিকে যদি প্রশাসনিক দন্ডমুন্ড ব্যক্তিগন যদি রাজনৈতিক ব্যবসায়ীদেও পৃষ্ঠপোষকতায় বা রাজনৈতিক প্রভাবের কারনে পদাইত হন, অথবা প্রয়োজনীয় সব নীতিমালা ডিঙ্গিয়ে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার চেয়ে অধিকতর পদধিকারী হন, তখন এসব দন্ডমুন্ড ব্যক্তিগন তার স্বর্বনিম্ন পদাধিকারীদের দ্বারস্ত হয়ে কাজ করে যেতে হয়। যার কারনে বীমাখাতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকার পরও আইডিআরএ’র সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোশারফ হোসেনকে নির্দিষ্ট মেয়াদ পুরনের পুর্বেই পদ পদত্যাগ করে বিদায় নিতে হয়েছে। একইভাবে সাবেক চেয়ারম্যান জয়নুল বারীকেও নিজকক্ষে অবরুদ্ধ থেকে মুচলেকা দিয়ে মধ্যরাতে লোকচক্ষুর অগোচরে কড়া পুলিশী প্রহরায় বিদায় নিতে হয়েছিল। পরবর্তিতে গত সাবেক চেয়াম্যান ড. আসলাম আলমকেও কলঙ্কিত হয়ে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে বিদায় নেয়ার প্রায় দুমাস পর পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়।
অর্থ্যাৎ গত বেশ কবছর ধরে ড. মোশারফ হোসেন, জয়নুল বারী এবং সর্বশেষ ড. আসলাম আলমসহ কেহই তাদের অযোগ্যতা ও অদূরদর্শীতার কারনে পদের মেয়াদের পুর্বেই আইডিআরএ’র চেয়ারম্যানের চেয়ারকে অলঙ্কিত না করে কলঙ্কিত করে বিদায় নেওয়ার ব্যাপার দীর্ঘ দিন ধরে খাতসংশ্লিষ্ট সকলের টক অব দ্যা ল্যাঙ্গুয়েজ‘এ পরিনত হয়, যার রেশ এখনো কাটে নাই।
সুতরাং, নতুন নেতৃত্বের নিকট দেশের বীমাখাত নব দিগন্তের ধার উন্মোচন করে দেশের জিডিপিতে গ্রহনযোগ্য অংশিদারিত্ব রাখতে পারবে বলে দেশের সুশীল সমাজসহ খাতসংশ্লিষ্ট সকলের প্রত্যাশা…
চলবে…












