
দূর্নীতি পরায়নচক্র কি আবারো সক্রিয় হতে চলেছে….???
খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
বাংলাদেশ একটা উন্নয়ন মুখি দেশ, যার প্রধান রপ্তানি উপকরনই হল চা, পাট এবং চামড়া। পলিথিন অনেকটাই পাটের স্থান দখল করলেও চামড়া শিল্প প্রায় ধংসের মুখে,কিন্তু চাহিদা এবং রপ্তানির দিক থেকে ‘চা’ শিল্পের অবস্থা এখনো দেশের আর্থিক দিক থেকে শীর্ষে। দেশে বেশকিছু চা বাগান থাকলেও সরকারী প্রতিষ্ঠান হিসাবে ন্যাশনাল টি এর অবস্থান দেশীয় বাজার এবং রপ্তানি আয়ের সর্বোচ্চ অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি।
সরকারী হোক আর বেসরকারীই হোক একটা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থান ধরে রাখতে হলে তার জন্য দরকার সঠিক প্রশাসনিক অবকাঠামো। আর এই প্রশাসনিক অবকাঠামো যখন দুর্বল হয়ে যায়, এবং প্রশাসনিক লোকেরা দুর্নীতি ও স্বিয় সার্থ উদ্ধারে জড়িয়ে পড়ে তখন প্রশাসনিক ব্যাবস্তাও ভেঙ্গে পড়ে। এর সবটুকুর জন্য দায়ী প্রশাসনিক পদে যারা যারা আছেন তাদের কর্ম কৌশল, যোগ্যতা ও প্রশাসনিক দুরধর্ষীতা। এর কোনটার ব্যাত্যয় ঘটলে কোন অবস্তাতেই এসব প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখা যবেনা। আর এসব প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক পদের লোকেরা যদি দুর্নীতি ও লোভের স্বিকার হয় তাইলে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাও এসব প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখতে পারবে কিনা সন্দেহ।
সম্প্রতি ন্যাশনাল টি কোম্পানী লিমিটেড এর অবস্থা অনেকটা ভাল অবস্থানে থাকলেও গত ২/৩ বছরে (২০১৯এবং ২০২০) ন্যাশনাল টি কোম্পানী ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়ে। একটা জাতীয় প্রতিষ্ঠান পড়ে বললেও প্রকৃতভাবে বলতে গেলে স্বীয় সার্থ উদ্দারে একটা দূর্নীতি পরায়ন চক্র কেনা-কাটা, অনিয়ম ও বিভীন্ন কৌশলে ন্যাশনাল টি কোম্পানীকে ব্যাপক লোকসানের মুখে ফেলে দিয়েছে। তারা ন্যাশনাল টি কোম্পানীর ভিতর আরেকটি কোম্পানী খোলার পায়তারা নিয়ে পুনরায় সংঘবদ্ধ হতে না পারে সেজন্য পুর্ব প্রশাসনের কিছু কেনা-কাটা ও অনিয়মের চিএ প্রমানিক তথ্যসহএখানে তুলে ধরা হল যা ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করা চলবে….।
ন্যাশনাল টি কোম্পানী লিমিটেড এর পূর্ববর্তী দূর্নীতিূলক কার্যকলাপ ও অনিয়মের কিছু বিবরণ এখানে তুলে ধরা হলোঃ
১. অগ্রীম প্রদানের নিয়ম বহির্ভূতভাবে ঊনচল্লিশ লক্ষ টাকার সি আই শীট ও টুলি ক্রয় করা-
প্রথমত উল্লেখ্য যে, ন্যাশনাল টি কোম্পানী পরিচালনা নীতিমালা অনুযায়ী নিয়ম বহির্ভূতভাবে নির্বাহী কমিটি ও পরিচালনা পর্ষদের এবং কোম্পানীর ক্রয় নীতিমালা তোয়াক্কা না করে ২০২০ সালে ৩৯,২৪,৯২০(ঊনচল্লিশ লক্ষ চব্বিশ হাজার নয়শত বিশ) টাকার সি,আই শীট ও টুলি ক্রয় করা হয় যা পন্য ডেলিভারীর পর মূল্য পরিশোধের নিয়ম থাকলেও অবৈধভাবে সুবিধা নেয়ার স্বার্থে ৯(নয়) টি ওয়ার্ক অর্ডার এর টাকা পন্য ডেলিভারী দেয়ার পূর্বেই ১(একটি) চেকের মাধ্যমে পন্য প্রদান করা হয়েছে যা কোম্পানীর ইতিহাসে পুর্বে কখনও হয়নি। উক্ত বিষয়ে
কোম্পানীর বহিঃ নীরিক্ষক কর্তৃক নিদৃষ্ট ও জোরালো অভিযোগ রয়েছে।
২. অবৈধ পদ্দতিতে সোনারগাঁও ফ্লাওয়ার এন্ড মিলস্ লিমিটেড এর নিকট থেকে ২,০৮,৪৫,৫৮০ টাকার ময়দা ক্রয়। শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সুবিধা গ্রহণের বিনিময়ে কোম্পানীর পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ব্যতিত ইংরেজী ০৩/০৭/ ২০১৯ থেকে ১৭/০৬/২০২০ এ সময়ের মধ্যে সোনারগাঁও ফ্লাওয়ার এন্ড মিলস লিমিটেড নামক ময়দা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে ২,০৮,৪৫,৫৮০(দুই কোটি আট লক্ষ পঁয়তাল্লিশ হাজার পাঁচশত আশি) টাকার ময়দা অবৈধভাবে প্রতিবার ভিন্ন ভিন্ন চেক এর মাধ্যমে ক্রয় করা হয়।এখানে বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য যে, ৫(পাঁচ) লক্ষ টাকার উর্ধ্বে চেক ইস্যু করার ক্ষমতা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নেই। এক্ষেত্রে এর মারাতœক ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছে। এখানে বর্ণিত ক্রয়ের বিবরণ, তারিখ, এবং টাকর পরিমাণ ধারাবাহিক ভাবে উল্যেখ করা হল…
৩.০৭.২০১৯ ইংরেজি তারিখে ১৮,০৩,৮২৫ (আঠার লক্ষ তিন হাজার আটশত পচিশ) টাকা।
২৯.০৭.২০১৯ ইংরেজি তারিখে ১০,৪২,৩২৫ (দশ লক্ষ বেয়াল্লিশ হাজার তিনশত পচিশ) টাকা।
০৯.০৯.২০১৯ ইংরেজি তারিখে ১৪,৩৯,৬৩৫ (চৌদ্দ লক্ষ উনচল্লিশ হাজার ছয়শত পয়ত্রিশ) টাকা।
১৯.০২.২০২০ ইংরেজি তারিখে ৩১,৮৬,৪২৫ (একত্রিশ লক্ষ ছিয়াশি হাজার চারশত পচিশ) টাকা।
১৯.০৩.২০২০ ইংরেজি তারিখে ৩৪,১২,০০০ (চৌত্রিশ লক্ষ বার হাজার) টাকা।
১৮.০৫.২০২০ ইংরেজি তারিখে ৬৮,৯৫,০৫০ (আশট্টি লক্ষ পচান্নব্বই হাজার পঞ্চাশ) টাকা।
১৭.০৬.২০২০ ইংরেজি তারিখে ৩০,৬৬,৩২০ (ত্রিশ লক্ষ ছেষট্টি হাজার তিনশত বিশ) টাকা।
মোট পরিমান ২,০৮,৪৫,৫৮০ (দুই কোটি আট লক্ষ পঁয়তাল্লিশ হাজার পাঁচশত আশি) টাকা।
৩. সিলেট পরিবেশ অধিদপ্তর কে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ব্যতিত অর্থ প্রদান:- ন্যাশনাল টি কোম্পানীর পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ব্যতিরেকে শুধুমাত্র ভাগ-বাটোয়ারা করার উদ্দেশ্যে ২২,০০,০০০(বাইশ লক্ষ) টাকা পরিবেশ অধিদপ্তর, সিলেট এর নামে লাক্কাতুড়া চা বাগান এর তৎকালীন ব্যবস্থাপকের মাধ্যমে প্রদান করা হয়।
৪. চিকিৎসা ব্যয় দুর্নীতি: ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অনুমোদন ব্যতিরেকে ইংরেজী ২০২০ সালের ৩১শে মে চিকিৎসা ব্যয় বাবদ উপ-মহাব্যবস্থাপক(অর্থ ও হিসাব) মোঃ কেরামত আলী পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার এর নামে ১,০০,৫১৯(এক লক্ষ পাঁচশত উনিশ) টাকার ভুতুড়ে বিল দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।
৫. কোম্পানীর কর্মকর্তাদের সন্তানের শিক্ষা ভাতা : নিয়ম বহির্ভূতভাবে এবং বোর্ডের সিদ্ধান্ত অমান্য করে কমিশনের বিনিময়ে কয়েকজন কর্মকর্তার তৃতীয় সন্তানের শিক্ষা ভাতার নামে ন্যাশনাল টি কোম্পানীর আনুমানিক
১৬(ষোল) লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
৬.একই বেতনভুক্ত হয়েও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আয়কর খাতে আয়কর ফাঁকি দেয়ার প্রমান: দু’জন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা মোঃ লোকমান হোসেন, সাবেক কোম্পানী সচিব ও মোঃ কেরামত আলী, উপ-হাব্যবস্থাপক(অর্থ ও হিসাব) এর মূল বেতন একই হলেও মোঃ লোকমান হোসেন এর আয়কর বাবদ মাসিক বেতন হতে কর্তন করা হয় ১১,৫০০(এগারো হাজার পাঁচশত) টাকা কিন্তু সম্পূর্ণ নিয়ম বহির্ভূতভাবে মোঃ কেরামত আলীর মাসিক বেতন থেকে মাত্র ৬,০০০(ছয় হাজার) টাকা কর্তন করা হয়েছে। এখানে সরকারের আয়কর ফাঁকির বিষয়টি সুস্পষ্ট প্রমান পাওয়া যায়।
৭. গাড়ীর ট্যাক্স প্রদানের নামে ও ৩০,০০০/=টাকা আত্মসাৎ। কোম্পানীর ‘কার লোন স্কীম’ অনুযায়ী তিন বছর চাকরী করার পর কোম্পানী থেকে গাড়ী ক্রয়ের জন্য ঋণ পাওয়ার নিয়ম থাকলেও এ নিয়মের অনুসরন না করে কোম্পানীর পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ব্যতিরেকে মোঃ কেরামত আলী কোম্পানীতে যোগদান করে তিন মাস চাকরী করার পরই ক্ষমতার অপব্যবহার করে গাড়ী ক্রয় করার জন্য ঋণ নেন। শুধু তাই নয় গাড়ীর ট্যাক্স ঋণগ্রহীতা কর্তৃক নিজে পরিশোধ করার নিয়ম থাকলেও নিয়ম বহির্ভূতভাবে গাড়ীর ট্যাক্স প্রদানের নামে দুই বছরে তিনি কোম্পানীর ৩০,০০০(ত্রিশ হাজার) টাকা আত্মসাৎ করেন।
৮. অনুমোদনহীন ভাবে সার্ভিস রুল ভায়োলেট করে জনবল নিয়োগ দেয়া। ন্যাশনাল টি কোম্পানীর পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ব্যতিরেকে এবং সার্ভিস রুল ভায়োলেট করে ও পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশ না করে দাপুটে প্রভাব খাটিয়ে মোঃ কেরামতআলী, উপ-মহাব্যবস্থাপক(অর্থ ও হিসাব) নিজের ভাগ্নে জনাব ইব্রাহিমকে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কোম্পানীতে নিয়োগ প্রদান করেন।
৯. বাগানের কেন্দ্রীয় গুদামঘর(Central Store) থেকে মালামাল উধাও হওয়া প্রসঙ্গে: এখানে উল্লেখ করার মত একটি ব্যাপার হলো অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী কোম্পানীর পাত্রখোলা চা বাগানের কেন্দ্রীয় গুদামঘর(Central Store) হতে ২০১৯ সালে ১৪(চৌদ্দ) কোটি টাকার এবং ২০২০ সালে ৩৪(চৌত্রিশ)কোটি টাকার মালামাল উধাও হয়েছে যার কোন হদিস পাওয়া যায়নি। সুতরাং যদি ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত শুধুমাত্র কোম্পানীর পাত্রখোলা ও চন্ডিছড়া চা বাগানের কেন্দ্রীয় গুদামঘরের(Central Store) নিরীক্ষা করা হয় তাহলে আরো অনেক কিছু উদঘাটিত হবে।
১০.শেয়ারহোল্ডারদের উৎকোচ দেয়ার নামে বেরিয়ে আসে বিষাল দুর্নীতির আরেক চিত্র, এখানে প্রায় ২৭(সাতাশ) লক্ষ টাকা আত্মসাৎ এর ঘঠনা। বিভিন্ন দুর্নীতির ঘঠনা কিছু শেয়ারহোল্ডারের দৃষ্টিতে আসায় ২০১৮ সালের কোম্পানীর বহিঃনিরীক্ষকদ্বয় যথাক্রমে মেসার্স আর্টিসান, চার্টার্ড এ্যাকাউন্ট্যান্টস এবং মেসার্স মসিহ মুহিত হক এন্ড কোং, চার্টার্ড এ্যাকাউন্ট্যান্টস এর রিপোর্ট অনুযায়ী শেয়ারহোল্ডারদের উৎকোচ দেয়ার নামে ২৭(সাতাশ) লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করার চিত্র বের হয়। এ ব্যাপারটি তাঁদের প্রাথমিক অডিট রিপোর্টে উপস্থাপন করা হয়, পরবর্তীতে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ আব্দুল আউয়াল এবং উপ-মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) মোঃ কেরামত আলী উক্ত টাকা ফেরত প্রদান করেন। তাই ব্যাপারটি চূড়ান্ত রিপোর্টে উল্লেখ না করে সেই সময়ের বার্ষিক সাধারণ সভা সামাল দেয়া হয়।
একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল টি কোম্পনী লিমিটেডের আর্থীক বছর হিসাব করা হলে ২০১৬-১৭, ২০১৭-১৮, ২০১৮-১৯,এবং২০১৯-২০ সাল সময় পর্যন্ত বিশেষ বহিঃনিরীক্ষক দ্বারা নিরীক্ষা করানো হলে আরো অনেক তথ্য, কোম্পানীর কোটি কোটি টাকার লোকসানের চিত্র ও নেপথ্যে কারা জড়িত তা বেরিয়ে আসবে।
উপরোক্ত দূর্নীতিমূলক কার্যকলাপ ও অনিয়মসমূহ করা সম্ভব হয়েছে ভূতপূর্ব ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ আব্দুল আউয়াল ও উপ-মহাব্যবস্থাপক(অর্থ ও হিসাব) মোঃ কেরামত আলীর পরস্পরের যোগসাজশে ও নিজেদের অবৈধ সুুবিধা হাসিলের উদ্দেশ্যে। এসব দূর্নীতিমূলক কার্যকলাপ ও অনিয়মের ব্যাপারে ভূতপূর্ব ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ আব্দুল আউয়ালের সাথে যোগারেযাগ করতে চাইলে তাকে খুঝে পাওয়া যায় নাই, এবং উপ-মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) মোঃ কেরামত আলীর সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নাই। উল্ল্যেখিত দুর্নীতি ও অবৈধ কার্যকলাপের পরিণতিতে ইংরেজী ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ন্যাশনাল টি কোম্পানী লিমিটেড এর ৩৭ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। চক্রটির অল্প কয়েকটি দূর্নীতির ঘটনা প্রকাশ করা হলো। আরও দূর্নীতি ও অনিয়মের বিবরণ ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ চলমান থাকবে……..।











