“বিদ্যুৎ খাত নিয়ে উদ্বেগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি”


অর্থনীতির ৩০ দিন ডেস্ক :
সবশেষ ২০১৯ সালের নির্বাচনে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, তার মধ্যে একটি ছিল প্রতিটি ঘরে বিদ্যুতের আলো পৌঁছে দেয়া। ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নির্বাচনী ইশতেহার বা সংকল্পপত্রে বলা হয়, প্রতিটি বাড়িতে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতা নেয়ার পর সে প্রতিশ্রুতি পূরণে অনেকটাই সক্ষম হয়েছিলেন মোদি। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে গিয়ে ভারত সরকারের ঘাড়ে চেপেছে দেনার বোঝা। বিদ্যুৎ উৎপাদন আর সরবরাহ, দুই প্রান্তেই বিপুল পরিমাণ দেনা সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে দীর্ঘ ছয় বছর পর নতুন করে বিদ্যুৎ সরবরাহে সংকটের মুখোমুখি হয়েছে ভারত। জম্মু-কাশ্মীর থেকে শুরু করে অন্ধ্র প্রদেশ—সব জায়গায়ই দিনে ২-৪ ঘণ্টা লোডশেডিং দেয়া হচ্ছে।
দেশের বিদ্যুৎ খাতের এ পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি মনে করেন, বিভিন্ন রাজ্য সরকার ও রাজনৈতিক দলের বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রতিশ্রুতির কারণে বিদ্যুৎ সমস্যা প্রকট হয়েছে। সম্প্রতি পরপর দুটি অনুষ্ঠানে নিজের বক্তব্যে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন তিনি।
নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ভারতের রাজনীতিতে বিনামূল্যে কিছু পাইয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতির সংখ্যা অত্যন্ত বেশি। এ প্রতিশ্রুতি হয়তো ভোট পেতে সহায়তা করে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দেশের উন্নয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দিনশেষে সেই ক্ষতির ভার বহন করতে হয় দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে।
দেশের উত্তর প্রদেশে নির্বাচনী প্রচারণায় সমাজবাদী দল, কংগ্রেস ও আম আদমি পার্টি বারবারই বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। মূলত এরই সমালোচনা করেন নরেন্দ্র মোদি।
চলতি বছর দাবদাহের কারণে ভারতের বেশির ভাগ রাজ্যেই বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। সবশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জুনে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ২১২ গিগাওয়াটে পৌঁছেছিল। ভারতের বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ সংকটে রয়েছে দিল্লি, হরিয়ানা, অন্ধ্র প্রদেশ, রাজস্থান, কেরালা, পাঞ্জাব ও বিহার। আর এ সংকটের কারণ হিসেবে রাজ্যের সরকারগুলোর জনগণকে দেয়া বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রতিশ্রুতির কথা বলা হচ্ছে। কেননা প্রতিশ্রুতি পূরণে প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুৎ কিনতে হয়েছে। কিন্তু সময়মতো বিদ্যুৎ উৎপাদক ও বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূল্য পরিশোধ করা হয়নি। ফলে মে মাসের শেষদিন পর্যন্ত কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেই ভারত সরকারের দেনার পরিমাণ গিয়ে ঠেকেছে ১ ট্রিলিয়ন রুপিতে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের কাছে পাবে ৬২ হাজার ৯৩১ কোটি রুপি। আবার রাজ্য সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি হিসেবে বাকি রয়েছে আরো ৭৬ হাজার ৩৩৭ কোটি রুপি।
এ মুহূর্তে রাজ্যগুলোর মধ্যে মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, অন্ধ্র প্রদেশ এবং তেলেঙ্গানার কাছে সবচেয়ে বেশি অর্থ পায় উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো। গত মে মাস পর্যন্ত উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোকে মহারাষ্ট্র সরকারের পরিশোধ করার কথা ছিল সাড়ে ২১ হাজার কোটি রুপি। এর পরই রয়েছে তামিলনাড়ুর অবস্থান, যাদের দেনার পরিমাণ ২০ হাজার ৯৯০ কোটি রুপি। অন্যদিকে বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে সবচেয়ে বেশি দেনা তেলেঙ্গানার। এর পরিমাণ ১১ হাজার ৯৩৫ কোটি রুপি। ৯ হাজার ১৩১ কোটি রুপি মূল্য পরিশোধ বাকি রেখে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মহারাষ্ট্র।
অতীত পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের বিতরণ-সঞ্চালন-উৎপাদন ব্যবস্থা এমন যে যদি কোনো একটি রাজ্যের বিদ্যুৎ খাত দুর্বল হয়, তাহলে তার রেশ গোটা দেশের ওপর পড়ে। সে কারণে রাজ্য সরকারগুলোর দেয়া প্রতিশ্রুতি বা কর্মকাণ্ডের দায়ও টানতে হয় ভারতবাসীকে।
এর আগে বিদ্যুৎ উৎপাদক ও বিতরণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে লেনদেনে স্বচ্ছতা আনতে কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় একটি ওয়েবসাইট খুলেছিল। যেখানে উৎপাদক ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর আয়-ব্যয়ের বিষয়গুলো প্রকাশিত হয়। পাশাপাশি আরো অনেক উদ্যোগ নিয়েছিল কেন্দ্র সরকার। কিন্তু মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ উদ্যোগই কাজ করেনি। ফলে মাথায় বিপুল দেনার বোঝা নিয়ে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে ভারত সরকারকে।
বিতরণ কোম্পানিগুলোর পাহাড়সম ঋণের এ সংকটের কারণ হিসেবে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন নরেন্দ্র মোদি। নরেন্দ্র মোদি এটাও জানিয়েছেন, সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন অফিসের কাছেও প্রচুর অর্থ বকেয়া রয়েছে। তিনি বলেন, ভারতের বিদ্যুৎ খাত দুই অংকের লোকসানে চলছে। অথচ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ তা এক অংকে নামিয়ে এনেছে।
নরেন্দ্র মোদি বলেন, এর অর্থ ভারতে প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে। যার কারণে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হচ্ছে। দিনশেষে যা লোকসান বাড়াচ্ছে। বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো উৎপাদন করেই যাচ্ছে, কিন্তু তার জন্য অর্থ পাচ্ছে না। একটি গাড়ি জ্বালানি ছাড়া চলতে পারে না, রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি না থাকলে বাড়িতে রান্না হয় না, অথচ অর্থ ছাড়াই বিদ্যুৎ উৎপাদন করে যেতে হচ্ছে কোম্পানিগুলোকে। যদি বিদ্যুৎ না থাকে তাহলে সবকিছু স্থবির হয়ে যাবে। সেজন্য এ খাতের দিকে নজর দেয়া অত্যন্ত জরুরি। সে কারণে বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া পরিশোধে রাজ্য সরকারগুলোকে অনুরোধ করেছেন তিনি।
ভারতে এ মুহূর্তে সঞ্চালন খাতে লোকসানের পরিমাণ ২০ শতাংশ। অন্যান্য উন্নত দেশে এ পরিমাণ ৫-৮ শতাংশের বেশি নয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লোকসানের পরিমাণ কমাতে অবকাঠামোগত উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। অন্যদিকে যথাসময়ে ভর্তুকি ও সরকার মূল্য পরিশোধ না করায় প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থের পরিমাণ এতটাই কমেছে যে তাদের পক্ষে সঞ্চালন লাইনে কোনো উন্নয়নকাজ করাও সম্ভব হচ্ছে না। ফলে লোকসানের রেশ দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ মুহূর্তে বিতরণ খাত ভারতের বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে দুর্বল অংশ। তার ওপর রয়েছে ভর্তুকি ও বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি। রাজ্য সরকারগুলো দেরিতে অর্থ পরিশোধের কারণে বিতরণ খাতের সংস্কার যেমন করা যাচ্ছে না, তেমনি ঋণের ফাঁদ থেকেও বের হতে পারছে না।
সুত্র : বনিকবার্তা