অনুভবে অপুর্ণতা (দুষ্টি কলম)

খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
তোমার সাথে ঘর করতে আমার আর এক মুহূর্ত ভালো লাগছে না। আমাকে একয়েক বছরে কি দিয়েছো, কি আছে তোমার কাছে, কি পেয়েছি বলো কি পেয়েছি, কি দিয়েছো আমাকে…? আমি মুক্ত স্বাধীনভাবে ঘুরতে চাই, যা খুশি তা করতে চাই, আমি আমার ইচ্ছানুযায়ী কাজ করবো আর যার সাথে খুশি তার সাথে মেলামেশা করব কোন বাধা দিতে পারবে না, কথাগুলো বলতে বলতে রুমের দিকে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয় নিশি। এই দুই তিন বছরে এরকম অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অনিরুদ্ধ কয়েকবার নিশির (সব ছদ্ম নাম ব্যবহার করা হয়েছে) সম্মুখীন হয়েছে, কিন্তু আজকের ব্যাপারটা একটু ভিন্ন রকম। ধীরস্থির এবং খুব শান্ত স্বভাবের বুদ্ধিমান ও সর্বদিক থেকে বহুগুনের অধিকারি একজন মানুষ অনিরুদ্ধ নিশির এই বচনভঙ্গিকে খুব সহজে না নিলেও একটু নিজেকে শান্ত করে এবার বলল কি চাও তুমি? গত দু-তিন বছরে তোমার কোন আশা-আকাঙ্খা এবং কোন বায়নাটা আমি পূরণ করি নাই বল। যা তুমি চেয়েছো তা দিয়েছি, যা করতে বলেছ তাই করেছি, তোমার জন্য স্পেশালি সময় দিয়েছি তোমার যা ভাল লাগে তা কিনে দিয়েছি, যেখানে ঘুরতে চেয়েছো অফিস ম্যানেজ করে তোমাকে সেখানে নিয়ে ঘুরিয়ে এনেছি, কিন্তু তুমি এমন ভাব দেখাচ্ছ যেন তুমি জীবনে কোন কিছুই পাওনি আর তুমি সবচেয়ে চরম অসুখী। আসলে সুখ কাকে বলে সেই জিনিসটা শুধু অনুধাবন করার মত! হয়তো তুমি করতে পেরেছো কিনা জানিনা, একবার চিন্তা করে দেখো সমস্ত পৃথিবীর সুখ কোথায়? প্রত্যেকটা মানুষেরই তার নিজস্ব একটা প্রয়োজনীতা আছে। চাওয়া-পাওয়ার ফারাক অনেক বেশি থাকলে মানুষ সুখী হতে পারে না। চাওয়া পাওয়ার এক্সপেক্টেশন বা আকাঙ্খা কম থাকলেই মানুষ সুখী হয়, কিন্তু কোন কাজটা করি নাই আমি তোমার জন্য? সবকিছুই করেছি কিন্তু এখনকার এই প্রতিক্রিয়াটা সেটা একটুও ভালো লাগেনি বলতে বলতে বেডরুমে অনেকটা এগিয়ে অনিরুদ্ধ নিজেকে এক পর্যায়ে রুমে দাঁড় করিয়ে রাখে।
বাস্তব জ্ঞানসমৃদ্ধ অনিরুদ্ধ শান্তভাবে নিশিকে বুঝাতে চেষ্টা করে ঠিক আছে, আসলে তুমি যেটা চেয়েছ, সেটা কোন জীবন নয়। উত্তেজনায় এবং মানসিক চাপের মুখে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মত অবলিলায় বলতে থাকে আমি তোমার সাথে আর থাকব না, আর এক মুহূর্তও ঘর করব না, আমি ডিভোর্স চাই, আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দাও!! ঠিক আছে ঘর করবে নাতো ভালো কথা, একদিন সময় দাও তোমাকে আমি কোন বাধা দেবো না, কিন্তু আমাকে একটু বলবেতো, কেন ডিভোর্স চাচ্ছো, কোন অসুবিধার কারণে ডিভোর্স দিচ্ছো আমাকে? ঘরের মধ্যে অনিরুদ্ধর কথায় নিশির রাগের মাত্রাটা মনে হয় যেন আরেক ডিগ্রী বাড়িয়ে সে একাধারে বলে গেল, আমি আমার মত থাকতে চাই, আমার মত চলতে চাই, আমি সবার সাথে মিশতে চাই, ক্লাবে যেতে চাই, ক্লাবে গিয়ে মদ খাব, না হয় সিগারেট খাব এবং সবার সাথে ঘুরবো খেলবো আকাশে উড়ে বেড়াবো, আমাকে বাঁধা দিতে পারবে না। আমি আমার ইচ্ছামতে যা খুশি তাই করতে চাই আমি স্বাধীন ভাবে থাকতে চাই স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াতে চাই। হ্যাঁ ঠিক আছে তবে তুমি তোমার মতোই ঘুরে বেড়াবে এবং যা খুশি তাই করবে, তবুও আজকের দিনটা আর সামনের রাতটা কাটিয়ে আগামীকাল সকালে তুমি স্বাধীনভাবে চলে যাবে, আমি আর বাধা দেবো না, এই দুদিন আমাকে একটু সময় দাও আমার সাথে একটু ঘুরে বেড়াও। আমিও তোমাকে নিয়ে একটু ঘুরে বেড়াতে চাই হাত ধরে, আর আজকের রাতটা দুজনে একসাথে কাটাই, কালকে থেকে তুমি মুক্ত এবং স্বাধীন হয়ে যাবে কোন বাধা দেবো না। তুমি তোমার মতকরে সুখে থাকবে মুক্তবিহঙ্গের মতো খোলা আকাশে।
পড়ন্ত বিকেলে নিশিকে নিয়ে বের হতে গিয়েও আগের দিনের কথাগুলি যেনো মনে মনে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে, মনের সব সংকির্ণতাকে পেছনে ফেলে নিশিকে নিয়ে বের হই। পশ্চিম আকাশে সূর্য পাটে যাওয়ার আগে থেকে আকাশে আবীর রঙ্গের লালিমা মনের ভিতর যেনো একটু ভিন্ন অনুভুতির ছায়া ফেলছে, আমরা মানুষ তা উপভোগ করতে না পারলেও প্রকৃতি তো আসলেই সুন্দর এবং সুন্দরের পুজারি। হাত ধরতে না চাইলেও আমার পেছনে পেছনে ফলো করে আসার এবং নির্ভরতার মানসিক অবস্থান বুঝতে পেরে কিছুক্ষণ পরে আমি আবার নিশির হাত ধরে হাটতে চাই। সূর্যাস্তের পরপর পূর্বদিকে চাঁদটা যেন পূর্ণিমার ভরা যৌবন নিয়ে একবারে পৃখিবীটাকে আলো করে উপরের দিকে উঠতে যাচ্ছে। সূর্যের প্রখরতা যেমন সাধারন জীবনকে হাঁপিয়ে তোলে ঠিক সূর্যাস্তের পর পৃথিবীর এই অন্ধকারে ডুবে যাওয়ার কালিমা থেকে মানব মনের অপরূপ সৌন্দর্য উপলব্দি করার জন্যই এই ঠান্ডা সোনালী চাঁদের আলো মানব জীবনের রোমান্টিক অনুভুতিতে টোকা দিয়ে জাগিয়ে তোলার জন্যই মনে হয় আজকের এই পূর্ণিমা চাঁদের স্বার্থকতা। আজকের পূর্ণিমা চাঁদের এত সুন্দর হলুদের পাপড়ি মাখা ঠান্ডা সোনালী আলো অতীতে আমি আর কখনো দেখিনাই। হয়তো চাঁদটা আজকে আমার জন্য, শুধু আমারই জন্য এত সুন্দর প্রস্তুতি নিয়ে গাছ গাছালির ফাঁক দিয়ে উঁকি ঝুঁকি মেরে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। এরই মাঝে দু-এক টুকরো সাদা মেঘের ভেলা হাওয়ায় ভেসে এসে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে প্রার্থিব সূখানুভুতি প্রকাশ করে আবার হাওয়ায় ভেসে চলে যাচ্ছে, যেনো কারো প্রতি কারো কোন অভিযোগ বা অনুযোগ কিছুই নাই। চারি দিকের সবুজে ঘেরা প্রকৃতি যেনো এক মায়াবী আকর্ষণের টানে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আপন করে নিয়ে সুখের সাগরে ডুবে আছে। আসলে প্রকৃতি মানুষকে আনুভব করে না, শুধু জানান দেয় আর মানুষই প্রকৃতিকে অনুভব করে, যা সৃষ্টির এক অপার লীলা। অনিরুদ্ধের মাঝে নিশি যেনো আজকে অন্য একটা মানুষ খুঁজে পায়।
হেঁটে হেঁটে কিছুদূর এগিয়ে যেতেই অফিসের একজন আয়া শেফালীর সাথে দেখা; বাড়িতে যাওয়ার জন্য চায়ের দোকান বন্ধকরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার কাহিনী বলতে গিয়ে হঠাৎ আমাকে দেখে হতচকিত হয়ে যায়। আমি জিজ্ঞাসা করতেই সে যেন কাছে এসে নিজের কথাগুলো অবলীলায় সব বলতে শুরু করে, স্যার কেমন আছেন ভাবি বোধ হয়, হ্যাঁ; জিজ্ঞাসা করতে চা দোকান করেছ, তোমার দোকান খোলা, নাকি বন্ধ করেছো। স্যার, আপনি চা খাবেন, আমি এখনি আবার চুলা জ্বালিয়ে দিয়ে আপনাদের চা তৈরী করে খাওয়াবো, অনিরুদ্ধ শেফালীকে থামিয়ে দিয়ে শেফালী ও তার স্বামী এবং দুই ছেলে মেয়ের কথা জিজ্ঞাসা করতে করতে অনিরুদ্ধর অফিস থেকে মোবাইলে ফোন আসে। অনিরুদ্ধ নিশিকে শেফালীর দোকানে বসিয়ে একটু দুরে গিয়ে অফিসের বসের সাথে কথা বলতে বলতে বেশ কিছু সময় কেটে যায়। শেফালীর দিনরাত একটানা কঠোর পরিশ্রম, সংসার সামলানো, দুই ছেলে মেয়ের লেখাপড়া, পঙ্গু স্বামী এবং বৃদ্ধ শাশুড়ির ঔষধপত্রসহ কোন কিছুতেই কমতি নেই, এর পরেও শেফালীর চোখে-মুখে একরকম দারুন প্রশান্তির ছাপ লেগে আছে, যেনো তার মতো সুখী মানুষ দুনিয়াতে আর কেউ নাই, এ রকমের সহমর্মিতা দেখে নিশির মনে নানা রকম প্রশ্নের উদ্রেক হয়।
শেফালীর কথা শুনতে শুনতে নিশি শেফালীর স্বামী কি করে জানতে চাইল। স্বামীর নাম মুখে না নিয়ে বলল, স্বামী শহরে ভ্যান চালাইত, একটা এক্সিডেন্টে লোকটা আজ পঙ্গু হয়ে ঘরে বসে আছে। ভাইয়াতো খুব ভালো মানুষ, আপনাকে দেখলেই বুঝা যায় আপনারা বেশ সুখেই আছেন। শেফালির কথায় নাকে মুখে একটা কাশির ঝাঁটকা উঠলেও নিজেকে সামলে নেয় নিশি। শেফালীকে জিজ্ঞেস করে জানতে চাইল, দুই ছেলে মেয়ে ও পঙ্গু স্বামীকে নিয়ে খুব কষ্টে আছো তাই না? শেফালীর উত্তরে, না না, বলেন কি ভাবি, আমার মত সুখী দুনিয়াতে আর কেউ নাই। কি এক অদৃশ্য চররা গুলিতে নিশির সমস্ত শরীর ঝাঁঝরা হয়ে গেলেও নিজের চোখ কানকে অবিশ্বাস না করে নিজেই যেন একটা মানব মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে শেফালীর সামনে।

শেফালী অবলিলায় বলে যাচ্ছে, লোকটাকে আমি ভালোবেসে বিয়ে করি, সেও আমাকে পাগলের মত ভালোবাসতো, আমি প্রথমে ভাইয়ার অফিসে কাজ নেয়ার পর প্রতিদিন অফিসে যাওয়া-আসার সময় আমাকে দেখার জন্য দাঁড়িয়ে থাকত, মাঝে মাঝে শিষ দিয়ে গুনগুনিয়ে গান গাইত। প্রথম দিকে ভয়ে ভয়ে লোকটাকে কিছু না বললেও আস্তে আস্তে লোকটার প্রতি আমারও একটা দুর্বলতা তৈরি হয়, কিন্তু কারো পরিবার থেকে সম্মতি না দেয়ায় এক সময় আমরা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে ফেলি। সময় যেতে থাকে, আমাদের সংসার হয়, আমাদের ঘরে এক ছেলে এক মেয়ের জন্ম হয়, তাদেরকে নিয়ে কিন্তু আমাদের সুখের কমতি হয় নাই। দুইজনে সারা দিন পরিশ্রম করে বেশ ভালো আছি আমরা। জানেন লোকটা বাসায় ফেরার সময় সাংসারিক জিনিসপত্রের কমতি হলেও লুকিয়ে লুকিয়ে আমার জন্য পছন্দের একটা খাওয়ার জিনিস নিয়ে আসতে ভুল করত না।
দুই ছেলে মেয়েকে সরকারি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেই। রিকশা ভ্যান চালিয়ে ও আমি কাজ করে পরিবারের ২ বাচ্চাকে নিয়ে খুব সুখেই সময় চলে যাচ্ছিল, একদিন বাসায় নাস্তা করে বের হয়ে একটা সিগারেট টানতে টানতে রিক্সা ভ্যান নিয়ে রাস্তা দিয়ে মনের সুখে গান গেয়ে বেরিয়ে শহরের দিকে যাওয়ার সময় হঠাৎ পিছন থেকে দ্রুতগামী একটা ট্রাক ভ্যান গাড়িকে ধাক্কা দিলে সে সামনের দিকে ছিটকে পড়ে পা দুটো পিষ্ট হয়ে যায়, আশপাশের লোকজন হাসপাতালে নিয়ে যায় এবং দুই পায়ের উপর দিয়ে ট্রাকের চাকা চলে যাওয়াতে দুটি পা-ই কেটে ফেলতে হয়। স্বামীকে হাসপাতালে ভর্তি করায় স্বামীর সেবা করতে গিয়ে অফিসে না থাকাতে আমার অফিসের চাকরিও চলে যায়। এতসব কষ্টের সময় কাটার পরেও তার কাজে কোন ক্লান্তি ছিল না, ওই ক্লান্তিকে মেনে নিয়ে সে নিজে নিজেই আবার উদ্যোগী হয়ে কাজ করতে শুরু করে কয়েকটা বাসায়, বাসায় কাজ করেই সংসারের চাহিদা মিটায়। তার স্বামীর প্রতি অগাধ বিশ্বাস, কারণ সে এই স্বামীকে প্রেম করে বিয়ে করেছিল। পঙ্গু হলেও লোকটার ভালো দিক ছিল তাকে বেশ আদর করত, কখনো বিরক্ত হত না। শেফালী জানায় অফিসে চাকরি চলে যাওয়ার পরে যখন শেফালী প্রায় দিক-বিদিক শূন্য অবস্থায় ঘুরতে থাকে তখন অনিরুদ্ধ তাকে বেশ কিছু টাকা দিয়েছিল কোন কিছু করে খাওয়ার জন্য। ৩ হাজার, ৪ হাজার বা ৫ হাজার টাকার মত দিয়ে সে নিজে একটা চা দোকান করে সারাদিনে যা বিক্রি হয় এতে তার মোটামুটি চলে যায় এবং দুই বাচ্চার লেখাপড়া সহ চলতে থাকে, কোনরকম একটু বিরক্তি হয়নি। পঙ্গু স্বামীকে রেখে চলে যায় নাই কেন বলতেই শেফালী খুবই নির্বরতার সহিত বলে, কি যে বলেন ভাবি, এই যে এই লোকটা আমাকে এত আদর করে এবং আমাকে এত সুখে রাখে, এত ভালবাসে, নিজে কষ্ট করে হলেও আমাকে অনেক ভালো রেখেছে, এখন তার অসুবিধার সময় আমি তাকে কিভাবে ছেড়ে চলে যাব! আবার যখন আমার বাচ্ছারা দৌড়ে এসে মা মা বলে জড়িয়ে ধরে, তখন যে কি ভালো লাগে, বলে বুঝাতে পারব না আপনাকে।
অনিরুদ্ধ ফোনে কথা শেষ করে বেরিয়ে যাওয়ার সময় শেফালী চা দিতে চাইলে অনিরুদ্ধ ফোনে কথা বলতে বলতে শেফালির বেশ কথা হয় নিশির সাথে। শেফালী বলে যে এত ভাল মানুষ পৃথিবীতে আছে তা অনিরুদ্ধ ভাইয়াকে না দেখলে জানতেই পারতাম না। অফিসে কাজের সময় বা রুম মুছে দিতে গেলে কাজের সময়ও বাচ্চাদের স্কুলে দিয়ে আসা এবং লেখাপড়ার জন্য আমাকে সহযোগিতা করতেন, বিভিন্ন সময়ে একটু আমার সুবিধা ও অসুবিধা বা কাজের জন্য আমাকে কিছু হেল্প করতেন এবং বাসায় বাজার আছে কিনা, খাবার-দাবারসহ অন্যান্য সব বিষয়ে উনি আমাকে সাহায্য করেছেন। ভাইকে কোন দিন রাগ করতে দেখি নাই। ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেনো ঝলসানো রুটি, পংক্তি দুটি জানা না থাকলেও পঙ্গু স্বামী, সংসার, খাওয়া-দাওয়া, বাচ্চাদের স্কুল, লেখাপড়া এবং পঙ্গু স্বামীর অকৃত্রিম ভালোবাসায় ক্ষুধার রাজ্যকে জয় করা শেফালীর সংগ্রামী জীবনের স্বপ্নময় কাহিনী নিশির নিজের জীবনের প্রতি নিজের ঘৃনার জন্ম দিয়ে অন্যএক নিশির জীবন সূচনা শুরু হলো। অতীত জীবনের ইতি টেনে চৈত্রের প্রখরতায় জলসানো সূর্যরশ্মি পালিয়ে গিয়ে কখন যে পুর্ণিমা চাঁদের ঠান্ডা সোনালী আলোয় আলোকিত হয়ে গেল নিশির জীবন। নিশি ভাবতেই পারে না, এত অভাব অভিযোগ, টানা পোড়ন, আর্থিক অনটন এবং এত স্বল্পতম চাহিদা নিয়ে শেফালীদের জীবনে এত সুখের অর্জন কিভাবে। শেফালীর এই সংগ্রামী সুখগাথা জীবন নিশির কানে কল্পলোকের গল্পকথার মত হলেও নিশির পাথর হৃদয়ে ঠান্ডা ঝরনা ধারার নহর বইতে থাকে।
চা দেওয়া লাগবেনা বলে একদিকে অনিরুদ্ধর কথা শেষ করতে করতে শেফালীর স্বামীর ভালোবাসা, বাচ্চাদের স্কুলে আনা নেয়া আবার চা দোকান করে সারাদিন মানুষদেরকে মনের মত করে চা বানিয়ে খাওয়ানোর মত এত সুন্দর উদ্যোগ মনে মনে একটা আনন্দের রেস একই সাথে ভাবিকে পেয়েও কাহিনীগুলি এই অবলীলায় বলা, তার মত সুখী, রাগ নাই কিন্তু স্বামীর প্রতি তার কোন রকম অনিহা নেই এসব দেখে নিশি যেন নিজেকে একটু অনুভবের তুলিতে নিয়ে যায়। এদিকে প্রকৃতি যেনো আপন রূপের উন্মাদনায় একে অপরকে জড়িয়ে ধরে নিজেদের সুখ উপভোগে মত্ত। ভরা পূর্ণিমার চাঁদটাও যেন পুর্ণ আলো দিয়ে প্রকৃতির সুখকে আগলে রেখে পাহারা দেয়ার কাজে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছে। চাঁদের সোনালী আলোয় নিজের মনের ভিতর একটা আলোর সঞ্চার অনুভব করতে থাকে নিশি। অনিরুদ্ধ কথা শেষ করে আসতে আসতে দুজনে আবার একটু হেটে যায় শেফালী চা দোকান ছেড়ে। জীবনের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের সোনালী আবর্তে অনিরুদ্ধ নিশিকে আবদ্ধ করে নিলে নিশির যোগ-বিয়োগের ফলাফল যেন শুন্য খাতায় মিলিয়ে যায়।
চাঁদের আলোতে দুজনে হাত ধরে আরেকটু এগিয়ে গিয়ে মাদ্রাসার পাশে দেখতে পায় একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। অনিরুদ্ধ ছেলেটাকে বাইরে এসে দাঁড়ানোর কথা জিজ্ঞেস করতেই আমাকে দেখে যেন পা ছুঁয়ে সালাম দিয়ে জড়িয়ে ধরে বলে স্যার আপনি আমাকে এত সুন্দর জীবন দিয়েছেন যেটা আমি নিজে ভাবতে পারিনি, জিজ্ঞাসা করতে তুমি কিছু খাবে? এখন বাইরে কেন তখন বলল যে একটু বাইরে এসেছি মাদ্রাসায় পড়ার ফাকে। তুমি কিছু খাবে? না স্যার, মাদ্রাসায় খাওয়া দাওয়া সব আছে। আপনি আমাকে এখানে ভর্তি করিয়ে দিয়ে আমার সারা জীবনের জন্য যে উপকার করেছেন, সারা জীবন আপনাকে ভুলব না। আমার যেখানে রাস্তার পাশে ঘুমোতে হতো বৃষ্টির মধ্যে ঘুমাতে হতো দিনের পর দিন খেয়ে নাখেয়ে আমাকে থাকতে হয়েছে সেখানে আপনি আমার লেখাপড়া এবং খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন আমার পড়তে যাওয়ার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও যেখানে ভর্তি হতে পারি নাই সেটা আপনি করে দিয়েছেন এটা আমার ভুলার নয়, আপনাকে আমি কি বলে ডাকব আমি নিজেই বুঝতে পারি না। দুর কোথাও থেকে একটা হালকা গানের সুর যেনো শোনা যায়, আমার বেলা যে যায় সাঁঝ বেলাতে… তোমার সুরে সুরেই সুর মেলাতে…
সকালে অফিসে যাবার প্রস্তুতি নিতে নিতে, তুমি তো আজকে চলে যাওয়ার কথা যাও নাই কেন নিশি তার কোন উত্তর না দিয়ে সে নিজে নিজে নির্বোধের মতো দাঁড়িয়ে আছে। সে যেন বাকরুদ্ধ, ভেবে পায়না অনিরুদ্ধকে বলার জন্য অনেক কিছুইতো আছে মনের মধ্যে জমানো, কিন্তু টু শব্দটাও মুখ দিয়ে আনতে পারছে না। অনিরুদ্ধ নিজের কিছুটা দাবি নিয়ে বুঝতে পারে যে, নিশি তার ন্যূনতম উপলব্ধিটাকে টের করতে পেরেছে। এই বুঝতে পারাটা তার জীবনের গতিটা আবার ভিন্নভাবে ঘুরে যেতে পারে। অনিরুদ্ধ কিছু না বলে অফিসে বেরিয়ে যাবার জন্য এগুতে থাকে, তার আগে থেকেই মনে আছে, আজকে তাদের বিবাহ বার্ষিকী। বিবাহ বার্ষিকীর দিনে যেকোনো ভাবে একটু খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করবে নিশি। নিজেকে বুঝতে পেরে অনিরুদ্ধকে জড়িয়ে ধরে বলে আমি..আমি… ভুল অবস্থায় ছিলাম যা তুমি আমাকে বুঝিয়ে দিলে, শিখিয়ে দিলে, তুমি আমার জীবনের পরিবর্তনটা বদলিয়ে দিলে।
দেখ নিশি, মানুষ এত অল্পতে খুশি যেটা তুমি কখনো ভাবতে পারনি। একজন তরকারি বিক্রেতা মাত্র ২ হাজার ৪ হাজার ৫ হাজার টাকা দিয়ে রোদ-বৃষ্টিতে সারা দিন বিক্রি করে দিন শেষে পরিবার নিয়ে সুখে রাত কাটায়, একইভাবে আবার একজন ফল বিক্রেতা, একজন চা বিক্রেতাসহ এমন হাজারো মানুষের জীবনে এত কম চাহিদায় পরিবার নিয়ে কত রকম স্বপ্ন সুখ অনুভব করে জীবন কাটায়। যে মানুষের চাহিদা যত কম থাকে সে মানুষের জীবন তত বেশি সুখী হয়। আর যখন মানুষের চাহিদা খুব বেশি থাকে এবং চাওয়া পাওয়ার আকাঙ্খা বেশি থাকে, তারা ততবেশি অসুখী থাকে। একটু অনুভব করে দেখ, জীবনের মূল্যবোধ এবং প্রাপ্তি বা প্রত্যাশা কোনোটার সাথে কোন সম্পর্ক না থাকে তাহলে জীবনে কখনো সুখী হওয়ার আর কোনো উপায় থাকে না।
তোমার কি বিশ্বাস হয় না? মানুষের প্রয়োজনে সুখ খুঁজে নিতে হয় পরিশ্রম করে। আর তুমি, তোমার এত কিছু থাকতে এতো কিছু পাওয়ার পরেও তোমার কাছে সুখ মনে হয় নাই, একবার তুমি তোমার আশেপাশের এইসব মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখ।
নিশি অনিরুদ্ধকে জড়িয়ে ধরে, আসলে আমি তোমাকে ভালবাসি, আমি তোমাকে প্রচন্ড ভালোবাসি। তোমাকে আমি আমার মত করে অনেক বড় মনের মানুষ হিসাবে দেখতে চাই সারা জীবন। অনিরুদ্ধ তার নিজেকে ফিল করতে পেরেছে, একজন আলোচিত ব্যক্তি হিসেবে নিজে আজ সফল। দেখ…আমিও তোমাকে অনেক ভালবাসি, ঠিক তুমি যেমনটা…, ও হ্যাঁ, আজকে আমাদের বিবাহ বার্ষিকী, তুমি রেডি থাকবে। আমরা দুজন আজকে বাইরে ঘুরতে যাব এবং বাইরে ডিনার করে নেব…
লেখক : প্রতিবাদি কবি, কথাসাহিত্যিক, সব্যসাচী লেখক,
সম্পাদক প্রকাশক, অর্থনীতির ৩০ দিন