অর্থনীতির ৩০ দিন ডেস্ক :
মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ নিয়ে কয়েক বছর ধরেই বিতর্কে বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্স। আট বছর ধরে কোম্পানির ওই শীর্ষপদটি শূন্য রাখা হয়েছে। জীবন বিমা খাতের পিছিয়ে পড়া বেসরকারি কোম্পানিটি আইন লঙ্ঘন করেও বহাল তবিয়তে রয়েছে। বারবার হুশিয়ার করেও বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) কোম্পানিটিকে আইন মানতে বাধ্য করতে পারেনি। অজুহাত আর নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে কোম্পানিটি।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, আট বছর ধরে বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে চলতি দায়িত্ব পালন করছেন ওমর ফারুক ভুঁইয়া, যদিও বিদ্যমান আইন মেনে ছয় মাসের বেশি চলতি দায়িত্বে থাকার সুযোগ নেই। মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগের শর্তপূরণে ব্যর্থতা ও কোম্পানিটির নিয়মবহির্ভূত ব্যয়সহ নানা বিতর্কের কারণে ওই পদে নিয়োগের অনুমোদন দেয়নি আইডিআরএ। এই সুযোগে চলতি দায়িত্ব নিয়েই একটানা আট বছর দায়িত্ব পালন করছেন কোম্পানিটির এই অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি)। তবে এরই মধ্যে স্বদেশ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সাবেক মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাকে বায়রা লাইফে একই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে তথ্য মিলেছে। তার নিয়োগও এখনও বৈধতা পায়নি।
বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান আবুল বাশার বলেন, ‘মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার পদ পূরণের জন্য আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। অন্তত পাঁচজনকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য অনুমতি চেয়েছি, কিন্তু বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে আইডিআরএ অনুমতি দেয়নি। আবারও স্বদেশ লাইফের সাবেক এমডিকে নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি কাজও শুরু করেছেন। ওই নিয়োগ অনুমোদনের জন্যও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমতি চাওয়া হয়েছে। এখন সংস্থাটির সিদ্ধান্তের ওপরে শূন্যপদ পূরণের বিষয়টি নির্ভর করছে।’
যদিও কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) ওমর ফারুক ভুঁইয়াই এখনও চলতি দায়িত্বে থাকা মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনি হজ পালনের জন্য সৌদি আরবে আছেন। এর মধ্যে নতুন করে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কি না, কোম্পানিটির দায়িত্বশীল অনেক কর্মকর্তাই বিষয়টি ‘জানেন না’ বলে দাবি করেছেন।
অন্যদিকে শুধু মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার পদই নয়, বায়রা লাইফের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) ও কোম্পানি সচিবের পদও এখন শূন্য। এর আগে ওই দুটি পদে একইসঙ্গে দায়িত্বে ছিলেন মনজুর আহমেদ। তিনি চাকরি ছাড়ার পর ওই দুটি পদের জন্য যোগ্য লোক খোঁজা হচ্ছে।
এদিকে মুখ্য নির্বাহীর পদ শূন্য রাখায় ২০১৬ সালের ৯ জুন বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্সকে শুনানিতে ডেকেছিল বিমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ। ওই শুনানিতে কোম্পানির পক্ষ থেকে ‘গত কয়েক বছরে পাঁচজনকে ওই পদে নিয়োগের অনুমতি চাওয়া হয়েছিল, কিন্তু অনুমোদন পাওয়া যায়নি’ বলে দাবি করা হয়েছে। তবে উভয়পক্ষের মধ্যে শুনানি শেষে পরবর্তী দুই মাসের মধ্যে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছিল সংস্থাটি। সেইসঙ্গে নির্দেশনা না মানলে বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পরিচালনা পরিষদ ভেঙে দিয়েছে। প্রশাসক নিয়োগের ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছিল। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষপদে রদবদলের পর ওই আদেশ ধামাচাপা পড়েছে।
বিমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগসংক্রান্ত প্রবিধান অনুযায়ী, কোনো কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ একাধারে তিন মাসের বেশি শূন্য রাখার সুযোগ নেই। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে শূন্যপদ পূরণের জন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে আরও তিন মাস সময় দিতে পারে আইডিআরএ। অর্থাৎ কোনোভাবেই ছয় মাসের বেশি মুখ্য নির্বাহীর পদ শূন্য রাখার সুযোগ নেই। অথচ ছয় মাসের বদলে আট বছর ধরে চলতি দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন ওমর ফারুক ভুঁইয়া। তবে মুখ্য নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করলেও আইডিআরএ’র অনুমতি না থাকায় অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবেই বেতন-ভাতা পাচ্ছেন তিনি।
এদিকে ছয় মাসের মধ্যে কোনো জীবন বিমা কোম্পানি মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার পদ পূরণ না করলে আইডিআরএ’র পক্ষ থেকে সেই কোম্পানিতে প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। সেক্ষেত্রে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার জন্য নির্ধারিত বেতন-ভাতা পাবেন সংশ্লিষ্ট প্রশাসক। তবে আইনে থাকলেও বায়রা লাইফের আইন ভঙ্গের বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সংস্থাটির গোচরেই শীর্ষপদ শূন্য রেখে পার পেয়ে যাচ্ছে কোম্পানিটি।
উল্লেখ্য, শীর্ষপদে শূন্যতা, গ্রাহক ভোগান্তি ও অনিয়মের অভিযোগের কারণে এক দশকে পিছিয়ে পড়েছে বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্স। ২০১৬ সালে বায়রা লাইফের প্রথম বর্ষ ও নবায়ন প্রিমিয়াম আয় প্রায় ১৮ কোটিতে নেমেছে। এর আগের বছরেও (২০১৫ সালে) ছিল প্রায় ২১ কোটি টাকা। নামমাত্র পলিসি হলেও সেগুলো দু-এক বছরের ব্যবধানে ঝরে পড়ছে। এ কারণে ব্যবস্থাপনা ব্যয় ও বিমা দাবি পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে কোম্পানিটি। ২০০০ সালে পথচলা শুরুর প্রায় দুই দশকেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি কোম্পানিটি, বরং বিভিন্ন অভিযোগে গত কয়েক বছরে বেশ কয়েক দফায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার ‘চোখ রাঙানি’র মুখে পড়েছে।












