দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে দেশের অর্থনীতির চেহারা

খোন্দকার জিল্লুর রহমান
মহালুটপাট, অর্থপাচার, দুর্দশাগ্রস্ত নাজুক, ভঙ্গুর, অর্থনীতির পরিস্থিতির মাঝেও ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এক মহাকারিশ্মা দেখিয়েছেন। সম্প্রতি পদ পদত্যাগ করে পালিয়ে যাওয়া অযোগ্য সরকার দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে কিভাবে অপশাসন, লুটপাট, অর্থপাচার এবং দলীয়করণের মাধ্যমে দেশকে ধ্বংস ও মৃত্যু উপত্যকা বানিয়েছে বর্তমান জনগণ তা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর আস্বস্ত করেছেন, পরিস্থিতি প্রতিকূল থাকলেও আগামী এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির চেহারা পাল্টে ফেলতে পারব। আমাদের প্রথম দায়িত্ব দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা। যাতে মূল্যস্ফীতি ৫-৬-৭ শতাংশের মধ্যে রেখে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল এবং বাড়ানো। অতীতে নীতিগত ভুলভ্রান্তির কারণে মূল্যস্ফীতি কমার পরিবর্তে বেড়ে গিয়েছিল। আশাকরা যায়, এক বছরের মধ্যে অর্থনীতির চেহারা পাল্টে ফেলার সাথে সাথে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা যাবে এবং ২০২৫ সালের এপ্রিল-মের মধ্যেই লক্ষ্য পূরণের পরে ৬ অথবা ৫ শতাংশে আনার চেষ্টা চলছে। যদি মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা যায়, তাহলে অবশ্যই সুদহারও কমে আসবে। দেশে বিদ্যমান নীতিতে সুদহার ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট বাড়িয়ে নতুন সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে। এ মাসে সেটা ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে নিয়ে গিয়ে পরবর্তী মাসে ১০ শতাংশে নির্ধারণ করা হবে। কারণ মূল্যস্ফীতি বড়লোককে আরও বড়লোক করে, গরিবকে গরিব করে। যাদের সম্পদ আছে তাদের সম্পদের পরিমাণ বেড়ে যায়। যারা গরিব বা আয়ের ওপর নির্ভরশীল তাদের আয়টা কমে যাওয়ার সাথে সাথে ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। দেশের ইতিহাসে ৪-৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি কখনোই হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদি করতে পারে, এটি একটি বড় অর্জন হবে, সে লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি।
বৈধপথে প্রবাসী আয় বাড়ানোর বিষয়ে গভর্নর বলেন, ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার এখন ১২০ টাকা। তিন মাস ধরেই এটা স্থিতিশীল আছে। খোলাবাজারের সঙ্গে এখন আর পার্থক্য নেই। প্রবাসী আয়ে প্রণোদনা দেওয়ার পর ব্যাংকের ডলারের দাম খোলাবাজারে কম। বাংলাদেশের ইতিহাসে যা কখনো হয়নি। এখন বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠালে অবৈধ চ্যানেলের চেয়ে বেশি টাকা পাবেন, তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো রিজার্ভ আছে। দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানো একটা চ্যালেঞ্জ, একটি বড় শিল্প গোষ্ঠী ২০১৭ সাল থেকে সাত বছরে সবকটি ইসলামী ব্যাংকই নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ব্যাপক সম্পদ বিদেশে পাচার করেছে। তাদের সম্পদের একটা অংশ এখনো দেশে আছে। সূত্রের খবর, একটা পরিবার ১ লাখ ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছে। সঙ্গে আরও দুই-তিনটা গোষ্ঠী মিলে ২ লাখ কোটি টাকার মতো পাচার করেছে। এগুলো আমরা কীভাবে ফিরিয়ে আনতে পারি সেটাই চেষ্টা। ব্যাংক খাতের একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একাধিক নিয়ন্ত্রক হলে সমস্যা দেখা দেয়। আর্থিক খাতের সংস্কার হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শক্তিশালী করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে কোনো অর্থ ব্যয় না করেই দুই মাসে দেড় বিলিয়ন ডলার (১১৯ টাকা হিসেবে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা)দেনা পরিশোধ করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের।এর ফলে পণ্য আমদানিতে অনিশ্চয়তা কাটতেছে। ডিসেম্বরের মধ্যে সব দায় মেটানো শেষে অর্থনীতি ইতিবাচক ধারায় ফিরবে। বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি নিয়ে এখন ধৈর্য ধরাই জনগণের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। জ্বালানি তেল, গ্যাস, কয়লাসহ যাবতীয় পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রায় পুরোই আমদানি করতে হয়, যার পেছনে ব্যয় হয় প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার। এই বাস্তবতায় আদানি, কাফকোসহ, শেভরন ও বিপিসিকে সরবরাহকারীসহ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে বকেয়া পড়ে সোয়া দুই বিলিয়ন ডলার। গেল দুই মাসে রিজার্ভে হাত না দিয়েই বকেয়ার দেড় বিলিয়ন পরিশোধ করাসহ বাকি অংশও দুয়েক মাসের মধ্যে মিটিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা। বিগত সরকারের ২.৫ বিলিয়ন ডলারের অনিষ্পন্ন দায় কমিয়ে ৭০০ মিলিয়নে নিয়ে আনা হয়েছে। আগামী দুই মাসে দেনা জিরোতে নামিয়ে আনতে পারলে বাজারে লিকুইডিটি বাড়বে। সব বকেয়া পরিশোধের পর সার্বিক কর্মকান্ডে গতি বাড়াবে। বর্তমানে বিদেশি ঋণ পরিশোধের ধারাবাহিক কিছুটা চাপ থাকলেও অবস্থা সামাল দিতে প্রায় এক বছর সময় লাগবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আইএমএফ থেকে ২-৩ বিলিয়ন অতিরিক্ত ঋণ, বিশ্বব্যাংকের আরও ২ বিলিয়ন ঋণ পাওয়া যায় তা হলেই এই ৫ বিলিয়ন নিয়ে দুটো জিনিস করতে অর্থাৎ সরকার কিছু ব্যয় বাড়াতে পারবে, এতেকরে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বেশ গতিশীল হবে এবং বিনিয়োগ ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে, দীর্ঘ ১৬ বছরের অনিশ্চয়তার ঝুঁকি বছরের পর বছর জনগণকে বহন করতে হবে না তাও সেটা এক বছরেরই একটু কমবেশি হতে পারে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সফলতার দিকেই দেশের ১৮ কোটি জনগণের দৃষ্টি …