অর্থনীতির ৩০ দিন ডেস্ক :
বীমা কোনো অজানা বিষয় নয়। আমাদের দেশে বীমা ছাড়া গাড়ি যেমন চালানো যায় না, তেমনি বিশ্বের অনেক দেশে বীমা ছাড়া কাজ, পড়াশোনা, চিকিৎসা প্রভৃতি কোনো কিছুই করা সম্ভব হয় না। যদিও এক্ষেত্রে আমাদের দেশের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। যেমন একজন গাড়ির মালিক এক বছরের জন্য বীমা করেন। এক বছরের মধ্যে অনাকাক্সিক্ষতভাবে কোনো দুর্ঘটনার মুখোমুখি হলে বীমা কোম্পানি থেকে ক্ষতিপূরণ পেয়ে মানসিক প্রশান্তি লাভ করেন। কিন্তু সে ব্যক্তি যদি ওই এক বছরে কোনো ধরনের দুর্ঘটনার শিকার না হন, তাহলেও তাকে বীমা প্রিমিয়াম জমা দিতে হয়। গত বছর (কিংবা কয়েক বছর) কোনো দুর্ঘটনায় পড়েননি বলে প্রিমিয়াম ফেরত পাওয়ার দাবি ছাড়াই ব্যক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থে বীমা চালিয়ে যেতে হয়। অন্যদিকে জীবন বীমার উদ্দেশ্য কিন্তু একই রকম অর্থাৎ ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যদিও এক্ষেত্রে বীমাগ্রহীতা প্রায়ই বীমাকে ব্যাংকের সঙ্গে তুলনা করে অসন্তুষ্ট হন। এ পরিস্থিতির পরিবর্তন আনা ও জীবন বীমা সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১৫ সাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাজ করছে ‘মিসির গুরু’।
জীবন বীমার নানা উপকারী দিক তুলে ধরে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য দৃষ্টিনন্দন পোস্ট ও কমিকের মাধ্যমে সহজ ভাষায় জীবন বীমা কি,
তা বোঝানোর কাজ করে যাচ্ছে মিসির গুরু। ফেসবুক পেজে এর ফ্রেন্ড অ্যান্ড ফলোয়ারের সংখ্যা প্রায় এক লাখ ৬৫ হাজার। বাংলাদেশে বর্তমানে ৪৬টি সাধারণ ও ৩২টি জীবন বীমা কোম্পানি রয়েছে। এর অনেকগুলোই সামাজিক মাধ্যমে উপস্থিত থাকলেও এদেশে শুধু সচেতনতা সৃষ্টিকারী উদ্যোগ এটিই প্রথম। শুরুতে জীবন বীমার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কিত পোস্ট দিয়ে শুরু করা হয়েছে। ধীরে ধীরে মিসির গুরু কীভাবে সঠিক পলিসি বেছে নিতে হবে, কী কী বিষয়ে লক্ষ্য রাখা দরকার, বীমা দাবি, শিক্ষা বীমা, অবসর বীমা, তাকাফুলসহ নানা বিষয়ে পোস্ট প্রকাশ করছে যেন বীমাগ্রহীতা তার প্রয়োজন বুঝে সচেতনভাবে বীমা করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং তার বীমা পলিসিটি সম্পর্কে সঠিক ও পরিপূর্ণ ধারণা রাখতে পারেন।
বীমা সম্পর্কে অনেক সময় পত্রপত্রিকায় বীমা গ্রাহকের অসন্তুষ্টি ও তিক্ত অভিজ্ঞতার খবর ছাপা হয়। কঠিন পরিস্থিতিতে বীমা করা ছিল বলে গ্রাহক যে লাভবান হয়েছেনÑসেরকম ঘটনাগুলো রয়ে যায় আড়ালে। ফলে বেশিরভাগ সময় জীবন বীমার নেতিবাচক খবরই শোনা যায়। যেমন কোনো ব্যক্তি ব্যাংক আর বীমা একই রকমভাবে সঞ্চয় ও মুনাফা দেয় ভেবে একটি বীমা করলেন, যেখানে তার মূল উদ্দেশ্য ছিল অর্থ বিনিয়োগ করা। ফলে দু-তিন মাস পর যখন তিনি যে পরিমাণ অর্থ বীমা প্রিমিয়াম হিসেবে দিয়েছেন, সে পরিমাণ অর্থ ফেরত চান। না পেলে অসন্তুষ্টির সূচনা হয়। অন্যদিকে বীমা করার কিছুদিনের মধ্যই যদি কোনো ব্যক্তি কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার সম্মুখীন হন এবং বীমা কোম্পানির কাছ থেকে চুক্তিভিত্তিক অর্থ গ্রহণ করেন, তবে তা বেশিরভাগ সময়ই নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে খুব বেশি মানুষ বীমার সুফল সম্পর্কে জানতে পারে না। এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, ওই বীমাগ্রহীতা হয়তো দুবছরে প্রিমিয়াম হিসেবে এক লাখ টাকা দিয়ে বীমা দাবি হিসেবে পেয়েছেন দুই লাখ টাকা, যা তার দুর্দিনের জন্য সহায় হয়ে ওঠে। বীমা যে একটি সুচিন্তিত বিনিয়োগ ও দুর্দিনের সহায়, তা সহজভাবে মানুষকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করছে মিসির গুরু।
২০১৭ সালে বাংলাদেশের জিডিপিতে জীবন বীমার অবদান ছিল মাত্র (লাইফ ইন্স্যুরেন্স পেনেট্রেশন) শূন্য দশমিক চার শতাংশ। একই সময় ভারতে দুই দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, জীবন বীমা সম্পর্কে আমাদের সচেতনতা প্রায় নেই বললেই চলে। এশিয়ায় ভারত বা জাপানের মতো দেশগুলোয় ব্যক্তিগত সচেতনতা থেকে মানুষ যেখানে নিজে থেকেই বীমা করার আগ্রহ প্রকাশ করে, সেখানে আমাদের দেশে বীমা-সচেতনতা এতটাই কম যে, মানুষ এখনও জানেই না বীমা কেন করতে হয়?
এ কথা সত্য যে, জীবন বীমা দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিতে রাখতে পারে ভূমিকা। এজন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে বীমার সুফল সম্পর্কে জানানো। বীমা খাতকে পরিচিত করে তোলার মাধ্যমে বীমার ওপর আস্থা সৃষ্টি করা। এ লক্ষ্যে মেটলাইফের একটি অভিনব বা ইনভেটিভ প্রচেষ্টা হচ্ছে এই মিসির গুরু। মেটলাইফের সিঙ্গাপুরভিত্তিক ইনোভেশন ল্যাব ‘লুমেন ল্যাব’র সহায়তায় কাজ শুরু করে মিসির গুরু। অ্যাপটি বিশ্বাস করে বীমা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজভাবে জানাতে পারলে একজন মানুষ যে কেবল ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হন তা না, সে সঙ্গে তিনি বীমার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখেন। বিভিন্ন পেশার মানুষের কাছ থেকে আসা প্রশ্নের উত্তরটি আবার অনেকেরই সংশয় ও জিজ্ঞাসার উত্তর। সে কারণে ‘মিসির গুরু’ সবার কাছ থেকে আসা প্রশ্নগুলো অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করে। সবার কাছ থেকে আসা জিজ্ঞাসার ভিত্তিতে মিসির গুরু ফেসবুকের নানা তথ্যকণিকাও তৈরি করে। এটি মেটলাইফের একটি উদ্যোগ। তবে এটি একটি বীমা সম্পর্কিত নিরপেক্ষ ও উম্মুক্ত আলোচনা এবং প্রশ্ন-উত্তরের প্ল্যাটফর্ম। এটি কখনই এর মূল উদ্দেশ্য অর্থাৎ বীমা পণ্য ও সেবা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির বাইরে কাজ করে না।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) সম্পর্কে মানুষকে জানানো এবং তাদের কাজ ও তাদের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য দিয়েও সহায়তা করে মিসির গুরু। বীমাগ্রহীতা, বীমাকর্মী, ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাসোসিয়েটসহ অনেকে মিসির গুরুর ফেসবুক পেজ নিয়মিত ভিজিট করেন এবং আলোচনায় অংশ নেন। সচেতন ব্যক্তি ও বীমার সুফলপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ারের মাধ্যমে ধীরে ধীরে
বীমা-সচেতনতার হার বৃদ্ধি পাবে। বীমা খাত একটি দৃঢ় অবস্থান থেকে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবে বলে আশা করে মিসির গুরু।












