ব্যাংক খাতে মন্দাদশা
অর্থনীতির ৩০ দিন প্রতিবেদক :
পুঁজিবাজারের মন্দার হাওয়া লেগেছে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের কোম্পানিতে। শেয়ারদর কম হওয়ার পাশাপাশি এর মূল্য আয় অনুপাত হাতের নাগালে থাকলেও এ খাতের প্রতি আগ্রহী হতে পারছেন না সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। বাজেটে ট্যাক্স সুবিধা দেওয়ার পরও খাতটির প্রতি দৃষ্টি ফেরেনি তাদের। ফলে দিন দিন এ খাতের কোম্পানিগুলোর পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।
মন্দার হওয়ায় সম্প্রতি খাতটির দুই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর অভিহিত দরের নিচে নেমে গেছে। পূর্বে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের শেয়ারদর অভিহিত দরের নিচে থাকায় বর্তমানে এরকম কোম্পানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তিনটিতে। ঝুঁকিতে রয়েছে আরও চার প্রতিষ্ঠান। এসব শেয়ারদর ১২ টাকার নিচে অবস্থান করছে। যে কোনো সময় তা অভিহিত দরের নিচে নেমে আসার শঙ্কা রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, পতনের ধাক্কায় অভিহিত দরের নিচে নেমে গেছে ন্যাশনাল ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের দর। সম্প্রতি এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার অভিহিত দরের নিচে নেমে যায়। অন্যদিকে অভিহিত দরের নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে খাতটির আরও চার প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে এসব শেয়ারদর ১২ টাকার নিচে অবস্থান করছেন। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে এবি ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক।
এদিকে ২০ টাকার নিচে অবস্থান করছে এ খাতের আরও ১০ প্রতিষ্ঠান। এগুলো হচ্ছে: আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, ঢাকা ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, এসআইবিএল, সাউথইস্ট ব্যাংক ও ইউসিবিএল। এসব শেয়ার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা।
ব্যাংক খাতে বিনিয়োগকারী টানার জন্য বাজেটে এসব প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের কর হ্রাস হয় দুই দশমিক ৫০ শতাংশ। পূর্বে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করহার ৪০ শতাংশ ছিল। চলতি অর্থবছরে দুই দশমিক ৫০ শতাংশ কমিয়ে ৩৭ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হবে। এছাড়া তালিকাভুক্ত নয়Ñএমন ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করহার ৪২ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশ করা হয়। কিন্তু এতেও বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি ফেরেনি এ খাতে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কয়েক বছরে ব্যাংক খাতে নানা অনিয়মের কারণে এ খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে গেছে। পাশাপাশি সর্বশেষ বছরে অধিকাংশ ব্যাংকের রিটার্ন শেয়ারহোল্ডারদের মনোনীত হয়নি। যার প্রভাব পড়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদরে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ব্যাংক খাতের কিছু কোম্পানির বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের খবর রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অবস্থা ততটা সন্তোষজনক নয়, যে কারণে ক্রেতা টানতে পারছে না খাতটি। সম্ভবত এ কারণেই খাতটিতে ভগ্নদশা চলছে।
গত বছরের শুরুতে সন্তোষজনক মুনাফা দেখানোর কারণে এ খাত থেকে ভালো লভ্যাংশ পাবেনÑএমনটি ভেবেছিলেন বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু বছর শেষে এসে সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। কারণ পরিচালন মুনাফা থেকে ঋণের বিপরীতে নির্ধারিত হারে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণ ও করপোরেট কর পরিশোধের পর অনেক ব্যাংকের নিট মুনাফা কমে গেছে। এ বছর যদি এমন পরিস্থিতি হয়Ñসে শঙ্কায় রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।
জানা যায়, ২০১৭ সালজুড়ে ব্যাংকে আগের তুলনায় ঋণ প্রবৃদ্ধি বেশি ছিল। আমদানি ও রফতানি কার্যক্রম থেকেও ভালো কমিশন আয় হয়েছে। তবে ফারমার্সসহ কয়েকটি ব্যাংকের জালিয়াতির তথ্য ফাঁস ইস্যুতে অস্বস্তি ছিল আমানতকারীদের মধ্যে। যার জেরে শেষ ছয় মাসে আমানতের সুদ বেড়েছে। পুঁজিবাজার থেকেও ভালো আয় হয়নি। সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতের নিট মুনাফায় মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো ব্যাংকগুলোর অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০১৭ সালে ব্যাংকগুলো ২৪ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা করেছে। আগের বছর যা ছিল ২১ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পরিচালন মুনাফা বেড়েছে তিন হাজার ৭৯ কোটি টাকা। আর এক বছরের ব্যবধানে নিট মুনাফা ৯৮৯ কোটি টাকা বেড়ে ৯ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা হয়েছে। কিন্তু খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির ফলে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা আগের তুলনায় বেড়েছে। এ কারণে অনেকের আশানুরূপ মুনাফা হয়নি।
জানতে চাইলে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ ওয়াসেক মো. আলী বলেন, বর্তমানে পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কম। যার প্রভাব পড়েছে ব্যাংক খাতে। তবে ব্যাংকের এ পরিস্থিতি থাকবে না। এটা সাময়িক। আশা করছি অচিরেই এ খাত ঘুরে দাঁড়াবে।












