“২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট জাতীয় সংসদে উত্থ্যাপন”


কভিড-১৯ মূল্যস্ফীতি বৈদেশিক ঋণ সবই অর্থমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রন!
অর্থনীতির ৩০ দিন ডেস্ক :
ইউরোপে মূল্যস্ফীতির হার ৮ শতাংশ ছাড়িয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গতকালই বাজারে মুদ্রাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ও সুদহার বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছেন ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের (ইসিবি) প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিনা লাগার্দে। তবে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির বর্তমান চিত্র বিবেচনায় এ পদক্ষেপ কতটুকু কার্যকর হবে, তা নিয়ে খুব একটা আশাবাদী হতে পারছেন না তিনি।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে একের পর এক পদক্ষেপ নিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড)। বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এসব পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দিহান অর্থনীতিবিদরা। তারা মনে করছেন, বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটি এখন সত্তর দশকের স্ট্যাগফ্লেশনে (উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মহীনতা ও শ্লথ প্রবৃদ্ধি) ফিরে যাচ্ছে। অনেকটা একই পর্যবেক্ষণ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) গীতা গোপীনাথেরও। আর তার সংস্থা আইএমএফ মনে করছে, গোটা বিশ্বই এখন দীর্ঘমেয়াদি স্ট্যাগফ্লেশনের দিকে এগোচ্ছে। একই বক্তব্য উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণেও।
এমন পরিস্থিতিতেও দেশের মূল্যস্ফীতির চিত্র নিয়ে আশাবাদ শোনাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। আগামী অর্থবছরে (২০২২-২৩) দেশে মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশে আটকে রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন তিনি। একই সঙ্গে তার প্রত্যাশা আগামী অর্থবছরে দেশের প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াবে সাড়ে ৭ শতাংশে।
অর্থমন্ত্রী হিসেবে গতকালই নিজের চতুর্থ বাজেট উত্থাপন করেছেন আ হ ম মুস্তফা কামাল। বাজেট বক্তৃতায় উঠে আসা তার এসব প্রত্যাশাকে অনেকটা সংখ্যাতাত্ত্বিক কুহেলিকা হিসেবেই দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের ভাষ্যমতে, কভিডের প্রাদুর্ভাবজনিত অভিঘাত কাটিয়ে ওঠার আগেই বিশ্বের প্রায় সব দেশেই অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে যুদ্ধের রিপল ইফেক্ট (এক স্থানের আলোড়ন থেকে গোটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় তোলপাড় ঘটে যাওয়াকে অর্থনীতিতে রিপল ইফেক্ট বলে অভিহিত করা হয়)। জ্বালানি থেকে শুরু করে খাদ্য ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্য, মূলধনি যন্ত্রপাতির বাজার—সবখানেই পণ্যের দাম বাড়ছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে। স্থানীয় পর্যায়ে ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল্যস্ফীতি নিয়ে বিপাকে বিশ্বের সব দেশ। অন্যদিকে জ্বালানি ও শিল্পপণ্যের বাজার অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক শিল্প উৎপাদন, চাহিদা ও ভোগের ওপর বড় আঘাত হেনেছে। বৈশ্বিক এ স্ট্যাগফ্লেশনের মধ্যেও বাংলাদেশে এর বিপরীত চিত্র প্রত্যাশা করছেন অর্থমন্ত্রী।
জাতীয় সংসদে গতকাল উত্থাপিত ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম—‘কভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবর্তন’। প্রস্তাবিত এ বাজেটের মোট আকার রাখা হয়েছে ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের চেয়ে বাজেটের আকার বেড়েছে ১২ দশমিক ৩১ শতাংশ।
মহামারী ও যুদ্ধের আঘাতে এরই মধ্যে বৈশ্বিক আর্থিক ও অর্থনৈতিক খাতে মারাত্মক আলোড়ন তুলে দিয়েছে। নিয়ন্ত্রণহীন মাত্রায় ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে খাদ্য ও সার্বিক মূল্যস্ফীতি। দেশে দেশে অর্থনীতির গতিপথকে ঠিক রাখাই এখন নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ নিয়ে অর্থমন্ত্রী নিজেও গতকালের বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, কভিড-১৯ সৃষ্ট গত দুই বছরের অপ্রত্যাশিত অভিঘাত কাটিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি যখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল, ঠিক তখনই মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর মাধ্যমে সৃষ্ট ও চলমান সংঘাতের ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নানাবিধ বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। করোনাপরবর্তী বৈশ্বিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের কারণে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ২০২১ সালের শেষভাগ থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য বাড়তে থাকে। রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটের কারণে এ মূল্য পরিস্থিতি আরো অস্থিতিশীল হতে শুরু করেছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও খাদ্যদ্রব্যের মূল্যে ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। গত বছরের মে মাসের তুলনায় চলতি বছরের মে মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বেড়েছে প্রায় ৬৫ শতাংশ। ইউরিয়া সারের দাম বেড়েছে ১১৪ শতাংশ। সয়াবিন তেলের ২৯ শতাংশ, গমের ৮৫ ও চিনির মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে ১৩ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বাড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জরুরি এসব পণ্যের মূল্য বাড়তির দিকে থাকলেও মূল্যস্ফীতিকে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে আটকে রাখার প্রত্যাশা করছেন অর্থমন্ত্রী। আবার গতকালই দেশের ভোজ্যতেলের বাজারে সয়াবিন তেলের মূল্য বেড়েছে লিটারে ৭ টাকা।
আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ বাজার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন অর্থমন্ত্রী। বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে আমদানীকৃত মূল্যস্ফীতি হিসেবে অভ্যন্তরীণ বাজারের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে চলতি বছর গুরুত্বপূর্ণ নয়টি পণ্যের (জ্বালানি তেল, এলএনজি, গম, রাসায়নিক সার, পাম অয়েল, সয়াবিন তেল, কয়লা, ভুট্টা ও চাল) আমদানির পরিমাণ অপরিবর্তিত রাখতে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হবে গত বছরের চেয়ে ৮ দশমিক ২ বিলিয়ন (৮২০ কোটি) ডলার বেশি। এসব পণ্যের বাইরেও আন্তর্জাতিক বাজারে শিল্পের কাঁচামাল ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের মূল্য এবং আন্তর্জাতিক পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে করে অভ্যন্তরীণ বাজারে আমদানীকৃত মূল্যস্ফীতির (Imported Inflation) চাপ অনুভূত হচ্ছে। তবে এ চাপ বশীভূত করা যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী।
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআর সংগৃহীত কর থেকে পাওয়া যাবে ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর বহির্ভূত কর থেকে আসবে ১৮ হাজার কোটি টাকা। কর ব্যতীত প্রাপ্তি ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬৪ কোটি টাকায়, যা জিডিপির ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। গত বাজেটে এ হার ছিল ৬ দশমিক ২। এ ঘাটতি পূরণের জন্য ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকার ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে। সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়া হবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। ৫ হাজার ১ কোটি টাকা আসবে অন্য উৎস থেকে। বিদেশী ঋণ থেকে আসবে ১ লাখ ১২ হাজার ৪৫৮ কোটি টাকা।
বাজেট প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অর্থমন্ত্রী যদি মনে করেন কভিড পার হয়ে গেছেন, সেটা অর্ধসত্য। কারণ কভিডের রোগ-ব্যাধির প্রাদুর্ভাব না থাকলেও আগের একাধিক ধাক্কার প্রভাবে যে অর্থনৈতিক ও আর্থসামাজিক অভিঘাত তৈরি হয়েছে; সেটি তো পিছিয়ে থাকা মানুষ এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আমার হিসাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের ন্যূনতম তিন বছর লাগার কথা। অথবা যাদের দায়-দেনা বেড়েছে তাদের প্রায় পাঁচ বছর লাগার কথা পুরনো অবস্থায় ফিরে যেতে। এ পাঁচ বছরে তাদের আরো উন্নতি হতে পারত। বিষয়টি বিবেচনায় নিলে পাঁচ বছর অনেক বেশি সময়, যা তাদের জীবন থেকে অর্থনৈতিকভাবে চলে গিয়েছে। এর সঙ্গে যে নব্য দরিদ্রগোষ্ঠী যুক্ত হয়েছে, তাদের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী কোনো সময়ই স্বীকৃতি দেননি। তার বিভিন্ন আর্থিক নীতিমালায় এটি প্রতিফলিত হয়েছে। পিছিয়ে পড়া বড় গোষ্ঠীটিই হলো অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের সীমিত আয়ের নিম্নবিত্ত মানুষেরা। এ মানুষগুলোর জন্য তিনি কর সুবিধাও দেননি। কোনো প্রত্যক্ষ আর্থিক প্রণোদনারও ব্যবস্থা নেই। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ভাসমান মানুষের জন্যও সামাজিক সুরক্ষা নেই। অর্থমন্ত্রীর হিসেবে এ বছর আমদানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে ধরা হয়েছে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। একদিকে অর্থমন্ত্রী বলছেন সব পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে তিনি প্রাক্কলন করেছেন ১২ শতাংশ। আবার আমদানি শুল্ক থেকে আয় বৃদ্ধির কথাও বলা হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের ভর্তুকি ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে বলে গতকাল বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে সরকারের ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাবদ ব্যয়ের প্রাক্কলন ছিল ৫৩ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারে ভর্তুকি বাবদ সরকারের ব্যয় বাড়ছে। এজন্য চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাবদ ব্যয়ের প্রাক্কলন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৬ হাজার ৮২৫ কোটি টাকায়, যা জিডিপির ১ দশমিক ৭০ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটের প্রাথমিক প্রাক্কলনে এ বাবদ ব্যয় আরো বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকায়, যা জিডিপির ১ দশমিক ৯০ শতাংশ। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের মূল্যের সাম্প্রতিক যে গতিপ্রকৃতি, তাতে ভর্তুকি ব্যয় আরো ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে, যা আগামী অর্থবছরের বাজেট ব্যবস্থাপনায় একটি চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে।
প্রস্তাবিত বাজেটে খাদ্য বাবদ ভর্তুকির জন্য রাখা হয়েছে ৬ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকিতে ব্যয় হবে ১৮ হাজার কোটি টাকা। অন্যান্য খাতে ১৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে মোট ভর্তুকির পরিমাণ ৪২ হাজার ৪৫ কোটি টাকা। এছাড়া কৃষিতে প্রণোদনার জন্য রাখা হয়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা। রফতানিতে নগদ প্রণোদনার জন্য বরাদ্দ ৮ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। পাটজাত দ্রব্যে প্রণোদনার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। প্রবাস আয় বা রেমিট্যান্সের প্রণোদনার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী অর্থবছরের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হবে—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা ও অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা; গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের মূল্যবৃদ্ধিজনিত বর্ধিত ভর্তুকির জন্য অর্থের সংস্থান করা; বৈদেশিক সহায়তার অর্থ ব্যবহার এবং মন্ত্রণালয়/বিভাগের উচ্চ-অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ করা; শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়ন; অভ্যন্তরীণ মূল্য সংযোজন কর সংগ্রহের পরিমাণ এবং ব্যক্তি আয়করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সন্তোষজনক পর্যায়ে রাখা।
আগামী অর্থবছরের জন্য সামাজিক সুরক্ষা খাতে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী, যা মোট বাজেটের ১৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং জিডিপির ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে গত অর্থবছরের তুলনায় ৫ শতাংশের বেশি।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, সার্বিক দৃষ্টিতে বাজেটে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তবে এবারের বাজেটের বেশকিছু ইতিবাচক দিক আছে। আমাদের অর্থনীতির সামনে দুটো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং এর ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর পড়া অভিঘাত—এ দুটো মোকাবেলার কথা বাজেটে থাকবে বলে প্রত্যাশা ছিল। বাজেটে বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে বেশ ভালোভাবে আলোচনা করা হয়েছে। তবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চাপ মোকাবেলায় কী করণীয় সে কথা বলা নেই। মূল ছয়টি পয়েন্টে এটি নেই, তার মানে এটি অগ্রাধিকারে নেই। বাজেটে বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, কিন্তু নিজের দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কথা নেই। এমনকি দারিদ্র্য হার যেটা বলা আছে সেটাও অনেক পুরনো একটা তথ্য। এ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের যে তথ্য দেয়া আছে, সেটি খুবই প্রশ্নবিদ্ধ ও দুর্বল। ভর্তুকির পরিমাণ রাখা হয়েছে জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ এবং বলা হচ্ছে এর পরিমাণ আরো বাড়তে পারে। ভর্তুকির একটা বড় অংশ যায় এলএনজি বা পেট্রোলিয়াম আমদানিতে। এটা ঠিক নেই। তবে আমি মনে করি, কৃষি খাতে যে ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে, সেটা ঠিক আছে। রেমিট্যান্সের ব্যাপারে আড়াই শতাংশ ভর্তুকিটা কমানোর সুযোগ ছিল। আমি প্রস্তাব করব, এটি ১ শতাংশে নামিয়ে আনা হোক। গার্মেন্টসের জন্য যে ভর্তুকি দেয়া হয়, সেটাও আরো কমানো হোক। ভর্তুকি আমাদের জন্য সামনের দিকে একটি বোঝায় পরিণত হতে পারে।
বাজেটে দেশের বাইরে পাচার হওয়া অর্থ বিনা প্রশ্নে আয়কর বিবরণীতে প্রদর্শনের সুযোগ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনো করদাতা বাংলাদেশের বাইরে কোনো সম্পদের মালিক হলে এবং সে সম্পদ আয়কর বিবরণীতে প্রদর্শিত না হলে আগামী অর্থবছরে নির্দিষ্ট হারে কর দেয়ার মাধ্যমে তা প্রদর্শনের সুযোগ পাবেন। কর দিয়ে এসব অর্থ বৈধ হয়ে গেলে এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবে না আয়করসহ যেকোনো কর্তৃপক্ষ।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাপী কভিডের প্রাদুর্ভাব ও চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দার পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। আগামী অর্থবছরে আমাদের কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হতে পারে। এ অবস্থায় আর্থিক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অধিক বিচক্ষণতা ও দূরদর্শী পন্থা অবলম্বন করতে হবে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সরকারি ব্যয় নির্বাহের জন্য একদিকে আমাদের অধিক পরিমাণে রাজস্ব জোগান দিতে হবে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনতে হবে।
এ অবস্থায় বিদেশে অর্জিত অর্থ ও সম্পদ অর্থনীতির মূল স্রোতে আনার মাধ্যমে বিনিয়োগ ও আর্থিক প্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিনি আয়কর অধ্যাদেশে নতুন বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব দেন। এ বিধান প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রস্তাবিত বিধান অনুযায়ী বিদেশে অবস্থিত যেকোনো সম্পদের ওপর কর পরিশোধ করা হলে আয়কর কর্তৃপক্ষসহ যেকোনো কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করবে না। বিদেশে অর্জিত স্থাবর সম্পত্তি বাংলাদেশে আনা না হলে এর ওপর ১৫ শতাংশ, বিদেশে থাকা অস্থাবর সম্পত্তি বাংলাদেশে আনা না হলে ১০ শতাংশ ও বাংলাদেশে পাঠানো (রেমিটকৃত) নগদ অর্থের ওপর ৭ শতাংশ হারে করারোপের প্রস্তাব করেন তিনি। এ সুবিধা ২০২২ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
এবারের বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫৯ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা। উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) খরচ করা হবে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৬৬ কোটি টাকা। এডিপিবহির্ভূত বিশেষ প্রকল্পে ব্যয় হবে ৭ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচিতে ২ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা খরচ করা হবে।
পরিচালনসহ অন্যান্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৩১ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকার। এ ব্যয়ের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় করা হবে ৭৬ হাজার ৪১২ কোটি টাকা। পণ্য ও সেবার জন্য ব্যয় করা হবে ৩৮ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা। ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হবে ৮০ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। ভর্তুকি প্রণোদনা ও নগদ ঋণ বাবদ ১ লাখ ৭৭ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয় হবে।
বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) চেয়ারপারসন নিহাদ কবির বলেন, আমি মনে করি এ বছর বেশ চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতির মধ্যে বাজেট তৈরি করতে হয়েছে। কভিড-পরবর্তী সময়ে যখন আমরা অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছি, তখনই আবার আমরা ইউক্রেন যুদ্ধ ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গেলাম। এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বলতে হয়, বাজেট এ চ্যালেঞ্জগুলোকে মোকাবেলা করার মতো করেই তৈরি করা হয়েছে। দেখতে পাচ্ছি করপোরেট করহার কমানো হয়েছে। এটি একটি ভালো দিক। আমরা বলছি, এগুলো কমিয়ে এমন পর্যায়ে আনতে হবে যে ২০২৬ সালের পর যেন আমরা প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে থাকি। সরকার সেটিই করছে। প্রণোদনার ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, সব রফতানি খাতকে সমানভাবে দেয়া হয়েছে। এটা ভালো দিক। তবে বাজেট বাস্তবায়নে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে সরকারি প্রকল্পগুলোয় অযাচিত যে ব্যয় বৃদ্ধি হয়, সেগুলো কমিয়ে রাখা, রাজস্ব আহরণ ও প্রশাসনকে স্ট্রিমলাইনে রাখতে হবে। করজালের ব্যাপ্তি ভালোভাবে বাড়াতে হবে যেন বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি না হয়।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমার মনে হয় মোটা দাগে বাজেটের সামগ্রিক আকার ঠিকই আছে। তবে আমাদের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা তৈরিরও প্রয়োজন রয়েছে। চাহিদা কমানোর মাধ্যমে আমাদের মূল্যস্ফীতি কমাতে হবে। এসব দিক বিবেচনায় এটা অনেকাংশে সংকোচনমূলক বাজেট হবে। অর্থাৎ আকারটা ছোট হয়ে যাচ্ছে এটা ভালো একটা দিক। তবে এখানে অনেক অনিশ্চয়তা রয়েছে। একটা অনিশ্চয়তা তো অর্থমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন, যে ভর্তুকি ধরা হয়েছে তা ১৫-২০ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে। এখানে অনিশ্চয়তা হলো, আমরা জানি না যে বিশ্ববাজারে দাম কত হবে, কী পরিমাণ অর্থায়ন বাড়ানো লাগবে এবং ঠিক কখন বাড়াতে হবে। তাছাড়া আমরা জানি না যে খাদ্য, সার ইত্যাদিতে কী পরিমাণ ভর্তুকি লাগতে পারে। এসব অনিশ্চয়তার কারণে ভর্তুকি অনুমান খুবই সংবেদনশীল। বাস্তবতা হলো এটা বাড়বে, কমার সম্ভাবনা নেই। এটি এখনই অনেক বেশি। আমাদের মোট ব্যয়ের একটি বড় অংকই এখানে। এটি কিন্তু দীর্ঘ সময়ের ক্ষেত্রে টেকসই না। অস্থায়ীভাবে আমরা হয়তো এক বছর করলাম। তবে দীর্ঘ সময়ের ক্ষেত্রে করতে গেলে আমাদের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে। এখানে অভ্যন্তরীণ অর্থায়ন বড় একটি ব্যাপার। ব্যাংক খাতের অবস্থা কিন্তু ভালো না। মুদ্রাবাজার খুব কঠিন অবস্থায় রয়েছে। আমানতের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না। বাইরের খাতে যেহেতু ঘাটতি আছে, সেহেতু টাকার সরবরাহ কমে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার যদি এতগুলো টাকা নিয়ে যায়, তাহলে ব্যক্তি খাতের ঋণ অবশ্যই ব্যাহত হবে। এটি বিনিয়োগেও প্রভাব ফেলবে।
সুত্র : বনিকবার্তা