জীবন বীমার প্রতি মানুষের আস্থাহীন কেন

অর্থনীতির ৩০ দিন সংবাদ :
দেশে জীবন বীমা পলিসি গ্রহনের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে মানুষের আস্থাহীনতা। বীমার দাবি নিষ্পত্তিতে কোম্পানিগুলোর প্রক্রিয়াগত জটিলতা, গ্রাহকদের দীর্ঘমেয়াদে আর্থিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে অনীহা ও প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাব এবং বীমা কোম্পানির এজেন্ট বা প্রতিনিধিদের কাছ থেকে সন্তোষজনক সেবা না পাওয়ার কারণগুলোও বীমা খাতের বিকাশে বড় বাধা হয়ে আছে। এ ছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকরী পদক্ষেপ না থাকায় এখাত থেকে অর্থ আত্মসাৎসহ অনিয়মের সুযোগ নিচ্ছে একটি চক্র। ফলে বিকশিত হতে পারছে না জীবন বীমা খাতটি।
জানা গেছে, গত আড়াই বছরে দেশে জীবন বীমার সক্রিয় পলিসি কমেছে ১০ লাখ ২৬ হাজারেরও বেশি, যা এ খাতের জন্য এক অশনিসংকেত তথা হতাসা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সর্বশেষ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর গ্রাহকসংখ্যায় ১৩ শতাংশের বেশি পতন হয়েছে।
আইডিআরএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে দেশে জীবন বীমা খাতে চালু পলিসির সংখ্যা ছিল ৭৮ লাখ ৯ হাজার ১২১টি। ২০২৪ সালের শেষে এই সংখ্যা নেমে আসে ৭০ লাখ ৮৯ হাজার ৭৭৭টিতে, অর্থাৎ এক বছরে কমে ৭ লাখ ১৯ হাজার ৩৪৪টি। ২০২৫ সালের জুন শেষে চালু পলিসির সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৭ লাখ ৮৩ হাজার ১৯৭টি, অর্থাৎ চলতি বছরেই ঝরে গেছে আরও ৩ লাখ ২৫ হাজার ২৬৬টি। সব মিলিয়ে আড়াই বছরে জীবন বীমা খাত থেকে গ্রাহক হারিয়েছে মোট ১০ লাখ ২৫ হাজার ৯২৪টি পলিসি, যা শতাংশের হিসাবে ১৩.১৪% পতন। এই পতনের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বীমা দাবির টাকা পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা, তহবিল সংকট এবং আস্থাহীনতা।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বীমা কোম্পানিগুলোর অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়মের কারণে তহবিল ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে গ্রাহকরা সময়মতো দাবির অর্থ পান না। তারা বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকেন নিজের পাওনা অর্থের জন্য। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পলিসি মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বীমা গ্রাহকরা মাসের পর মাস কোম্পানির অফিসে ঘুরেও দাবি নিষ্পত্তির নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না। আইডিআরএর কাছে জমা দেওয়া অভিযোগের সংখ্যা গত দুই বছরেই বেড়েছে দেড়গুণের বেশি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এগুলোর নিষ্পত্তিও বিলম্বিত হচ্ছে। নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, দেশের জীবন বীমা খাতে ৩ হাজার ৬২৮ কোটি ২৩ লাখ টাকার বীমা দাবি বকেয়া রয়েছে।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে একাধিক জীবন বীমা কোম্পানিতে হাজার কোটি টাকার তহবিল তছরুফ হয়েছে। শুধু তিনটি কোম্পানি- ফারইস্ট ইসলামী লাইফ, সোনালী লাইফ ও হোমল্যান্ড লাইফ থেকেই আত্মসাৎ হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। এই অনিয়মের ফলে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে দীর্ঘ বিলম্ব দেখা দিয়েছে, যার প্রভাবে বাজারে ইসলামী ও প্রচলিত উভয় জীবন বীমা খাতে আস্থাহীনতা দেখা দিয়েছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ অভিযোগ পেয়েও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারায় গ্রাহকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। বীমা বিশেষজ্ঞদের মতে, আইডিআরএর মানবসম্পদ ও আইনগত কাঠামো শক্তিশালী না হলে দীর্ঘমেয়াদে গ্রাহক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বিশ্বাস হচ্ছে সবচেয়ে বড় জিনিস। বীমা নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। এ ছাড়া ছোট অর্থনীতির জন্য এত বীমা কোম্পানি দরকার আছে কিনা তা দেখার সময় এসেছে। তিনি বলেন, ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট রেগুলেটরি অথিরিটিকে আন্তর্জাতিক চর্চার মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। খোদ বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান ড. এম আসলাম আলম সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সময়মতো বীমা দাবি পরিশোধ না করায় এ খাতের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা বেড়েছে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ছাড়া আস্থা বাড়বে না। নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের প্রধানের এমন মন্তব্য নিয়ন্ত্রন সংস্থার প্রশাসনিক অযোগ্যতার প্রমান ছাড়া কিছুই নয় যেমন একদিকে, অপরদিকে জীবন বীমাখাতের প্রতি আস্তহীনতা বাড়িয়েছে বলে খাত সংশ্লিষ্ট অনেকেই মতামত ব্যাক্ত করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শহিদুল ইসলাম জাহীদ আমাদের সময়কে বলেন, গ্রাহকদের আস্থায় আনতে কোম্পানিগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। কিন্তু এখানে যেটা দেখা যায়, কোম্পানিগুলো নিজের জন্য ব্যবসা করে। গ্রাহকদের বিষয়ে তেমন উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না। ব্যবসা বৃদ্ধির জন্য শহর, গ্রাম-গঞ্জে বীমা ব্যবসা ছড়িয়ে দিতে হবে। শহরে ব্যাংকের শাখা খুলতে হলে গ্রামে অধিক শাখা খুলতে হয়। এমন উদ্যোগ বীমা খাতেও নেওয়া দরকার বলে মনে করেন।