রোহিঙ্গা গণহত্যা ও মানবিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস

Khandaker Zillur Rahaman

—— জাতিসংঘ কি ঠুঁটো জগন্নাথ
খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
সময়ের সাথে সাথে আরাকানের সেনাবাহিনীর রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিধন অভিযান ব্যাপকভাবে জোরদার করে চলেছে। অত্যাচার, গণহত্যা ও অমানবিক নিপীড়ন ও বিতাড়নের কারনে লাখ লাখ রেহিঙ্গা বাড়িঘর ছেড়ে বন-জঙ্গল পাড়ি দিয়ে, নদ-নদী পেরিয়ে ক্ষুধার্ত অবস্থায় পরিবার পরিজনদের হারিয়ে সহায় সম্বলহীন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের মধ্যে পুরুষ সদস্যই বেশি। উপরন্তু নারীরা ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার, আবার কেউ কেউ ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হচ্ছেন। আগুন দিয়ে পুড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করা হচ্ছে মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ ও ইসলামিক প্রতিধ্বনি; যাতে সেখানে মুসলিম পরিচয়ের কিছুই না থাকে। আবার মিয়ানমার থেকে নৌপথে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার সময় নৌকা ডুবিতে অনেকেই প্রাণ হারাচ্ছেন। যার প্রমাণ সমুদ্র সৈকতে ভাসছে বহু নারী ও শিশুর লাশ। সেই সাথে বন-জঙ্গলেও অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে। আবার যারা যারা অত লাঞ্ছনা-বঞ্চনার শিকার হয়ে বাংলাদেশে এসেছে তারা যাতে আর ফিরে যেতে না পারে তার জন্য সীমান্তের পথে পথে পুঁতে রাখা হয়েছে হাজার হাজার স্থল মাইন। এভাবে কষ্টকরে আসার পথে মাইন বিস্ফোরণে বহু নারী পুরুষ প্রাণ হারাচ্ছেন এবং অনেকে হচ্ছেন মারাত্মক আহত ও চরম পঙ্গু। আর এসব কিছুর অর্থই হচ্ছে একটাই, যে, মিয়ানমারে কোন মুসলমানই থাকবে না বা থাকতে পারবে না। মিয়ানমার হবে সম্পূর্ণ একটা বৌদ্ধ রাষ্ট্র।


গত বেশকিছু দিন থেকে মিয়ানমারে চলমান রোহিঙ্গা নিধনের সে নানা নিপীড়ন নির্যাতনের লোমহর্ষক কাহিনী গণমাধ্যম, ইলেকট্রনিক মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সারাবিশ্বে যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে তা আর লুকিয়ে রাখার কোন উপায়ই আর থাকছে না। সেই নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া গণতন্ত্রের মানসকন্যা অং সান সু চি এখন চরম মিথ্যাচার করে চলেছেন। বলা হচ্ছে মিয়ানমারে কোন রোহিঙ্গা নির্যাতন হচ্ছে না এবং কোন রোহিঙ্গা মারা হচ্ছে না। যা হচ্ছে এগুলি মিডিয়ার মিথ্যা ও অপপ্রচার এবং যারা বাংলাদেশে চলে গেছে মিয়ানমার তাদের কাগজপত্র পর্যন্ত ফেরত নেবে না। এর প্রমান স্বরূপ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সু চির পুরস্কার ফেরত নেওয়া,সার্টিফিকেট কেন্সেল সহ মুরাল প্রত্যাহার করা।
রোহিঙ্গা সংকট ক্রমান্বয়ে কঠিনভাবে মানবিক বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে জাতিসঙ্ঘের ধারণা। সংস্থাটি আরো বলছে মিয়ানমারের রাখাইনে গুলি অত্যাচার ও নিপীড়ন থেকে জীবনরক্ষার জন্য প্রায় দশ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসতে পারে বলে ধারণা। কিন্তু বাস্তবে এর সংখ্যা আরো অনেক বেশি। আর এই অবস্থা চলতে থাকলে পরিস্থিতি মানবিক বিপর্যয়ে নেমে আসতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিয়ো গুতেইরাস। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির কর্মকর্তারা বলেছেন, শরণার্থী যেভাবে বাড়ছে এতে করে সহসাই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে সঙ্কট দেখা দিতে পারে। আবার গত ৭ সেপ্টেম্বর দুই বিদেশী সাংবাদিক পুলিশি নিরাপত্তায় রাখাইনের কতগুলি গ্রাম পরিদর্শন করে এসে জানিয়েছেন, তারা যা দেখতে পেয়েছেন তা সরকারীভাবে ঘোষণার সম্পূর্ণ উল্টো।
গত কয়েকদিন আগে জাতিসংঘের মহাসচিব বলেছেন বাংলাদেশ যেন রোহিঙ্গাদেরকে আশ্রয় দেন। জাতিসংঘের কর্তাব্যক্তিরা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন যেখানে মিয়ানমারে কোন দেশের সাথে কোন যুদ্ধ নেই, নেই দেশে কোন আন্তর্কোন্দল, নেই কোন সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা। তাইলে কেন বিনা কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেবে? জাতিসংঘ কেন মিয়ানমারকে এই হত্যা ও নির্যাতন বন্ধ করে কোন লোক যাতে দেশ ত্যাগ না করে এবং তাদের নিরাপত্তা দেয়ার কথা বলেনা, সংস্থাটি তাইলে ক্ষমতাহীন “ঠুঁটো জগন্নাথ”। গত প্রায় দুবছর ধরে মিয়ান মারের বিভিন্ন পর্যায়ের ঊচ্ছ পদস্ত কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ আলোচনায় তাদের ফেরত নেয়াসহ বহু প্রতিশ্রুতি দেয়ার পরও আজ পর্যন্তও তা কোন কার্যকরি হয়নাই।অদুর বভিষ্যতে ও রুহিঙ্গাদের ফেরত নেয়া সহ কোন প্রতিশ্রুতি কার্যকরের কোন লক্ষন দেখা যায় বলে দয়িত্তশীল ব্যক্তিসহ সূশীল সমাজের কেহই মনে করেন না বলে যানা যায়।
মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিধনের কর্মকান্ড বাস্তবায়নের জন্য মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর যেবাভে চড়াও হয়েছে এতেই একটি বিপর্যয় অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মহল থেকে এই সতর্কবানী দেওয়া হলেও বিপর্যয় ঠেকাতে জাতিসংঘও আন্তর্জাতিকমহল অলৌকিকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করছে। সমস্যা সমাধানে কোন কার্যকর ভূমিকা পালন করছে না। আমরা আশা করি জাতিসংঘ কোন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন না করে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সকল মহলকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত কার্যকর ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসবে।
লেখক : দফতর সম্পাদক, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ। সম্পাদক ও প্রকাশক, অর্থনীতির ৩০ দিন