ব্রেক্সিট গণভোট এবং বাংলাদেশের গনভোট, সংবিধান কি বলে

খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
ব্রিটেনের ব্রেক্সিট গণভোটের কথা সারা বিশ্বের সবার মনে আছে। যেখানে প্রদেয় ভোটের মাত্র ৫১.৯% মানুষ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে রায় দিয়েছিল। শুধুমাত্র ৩.৮ শতাংশের সামান্য ব্যবধান! অথচ সেই সামান্য সংখ্যাকেই ব্রিটেনের প্রশাসন তাদের ‘জনগণের পবিত্র রায় এবং পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে মেনে নিয়ে পুরো রাষ্ট্রের দিক পরিবর্তন করে ফেলেছিল, যা সারা বিশ্বের নিকট ব্রিটেনের অলিখিত সংবিধানের দলিল হিসাবে চালু রয়েছে। এটাকে একট জাতির সভ্যতার নিদর্শন বলে ধরে নেয়া যায়। ব্যাপারটা তুলে ধরা হলো এ কারনে যে, আমরা তুলনা দিতে গিয়ে সব সময় ফাষ্ট ওয়াল্ডের ঐসব দেশের সভ্যতা এবং আইন কানুনের সাথে, কিন্তু নিজেরা তা ধারন করি না এবং মানি না।
এবার একট মনোযোগ দিয়ে তাকান ২০২৬ সালের বাংলাদেশের দিকে। নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত গেজেট ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুযায়ী, আমাদের সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪,৮২,০০,৬৬০টি, যা মোট প্রদত্ত ভোটের প্রায় ৬৯% (৬৮.২৬%)! বিপরীতে ‘না’ ভোট পড়েছে মাত্র ৩১% (৩১.৭৪%) যা প্রদত্ত ভোটের অর্ধেকের চেয়েও বেশ কম। একটু ভেবে দেখুন এবং তফাৎটা কোথায় বোঝুন: ব্রিটিশরা যেখানে ৩% ব্যবধানে রাষ্ট্র বদলে দেয়, সেখানে আমরা ৩৭% ব্যবধানের এক বিশাল ‘ম্যান্ডেট’ দেয়ার পরও আমরা ব্যক্তি স্বার্থের অবস্থানে বসে আছি। এই ৬৯ শতাংশের মধ্যে মিশে আছে জুলাই ২০২৪-এর সেই তরুণদের স্বপ্ন, যারা আবু সাঈদের মতো বুক পেতে দিয়েছিল, মুগ্ধর মতো ‘পানি লাগবে পানি’ বলতে বলতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল। ব্রেক্সিটের চেয়েও ১২ গুণেরও বেশি শক্তিশালী এই জনমতকে যারা অগ্রাহ্য করার কথা ভাবে, তারা কি জানে তারা কার সাথে খেলছে?
যদি কোনো সরকার বা সংসদ এই গণরায়ের সাথে বেইমানি করে তা বাতিল করে, তবে সংবিধানের ৭(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাদের পরিণাম হবে ভয়াবহ।
সংবিধানের ৭(ক) অনুচ্ছেদে এটা পরিষ্কার বলা আছে:

১. কোনো ব্যক্তি যদি শক্তি প্রয়োগ বা অন্য কোনো অসাংবিধানিক পন্থায় অথবা যেকোনভাবে সংবিধানের কোনো বিধান (যেমন গণভোটে পাস হওয়া সংস্কার) বাতিল, স্থগিত বা রহিত করার চেষ্টা বা ষড়যন্ত্র করে, তবে তা হবে রাষ্ট্রদ্রোহিতা।
২. যারা এই কাজে প্ররোচনা দেবে বা সমর্থন করবে (যেমন সংসদে ভোট দেওয়া এমপি-রা), তারাও সমান অপরাধে অপরাধী।
৩. শাস্তি: এই অপরাধের শাস্তি হবে প্রচলিত আইনের ‘সর্বোচ্চ শাস্তি। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রদ্রোহিতার সর্বোচ্চ শাস্তি হলো মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ড।
জুলাইয়ের ছাত্রজনতার আন্দোলনে রাস্তায় রাস্তায় যারা রক্ত দিয়েছে, এই ৬৯% ‘হ্যাঁ’ ভোট এসব ছাত্র জনতার সেই রক্তের আমানত। যদি কোনো হীনস্বার্থবাদী সমালোচিত রাজনীতিবিদ বা সুবিধাভোগী এমপি মন্ত্রী যদি ভাবে এসি রুমে বসে তোমাদের এই রায়কে ফাইলবন্দি করে রাখবে, তবে তাদের মনে রাখতে হবে, সংবিধানের ৭(ক) ধারা কেবল কাগজে লেখার জন্য নয়, এটি বিশ্বাসঘাতকদের ফাঁসির রুজুতে ঝোলানোর হাতিয়ার বা সংবিধানিক দলিল।
মনে রাখতে হবে, জনগণের এই রায় বাতিল করার অর্থ হলো রাষ্ট্রের ওপর ক্যু করা। আর যারা ক্যু করে বা এ রায় বাতিল করে এমনকি বাতিল করার চেষ্টা করে, তারা কোন অবস্থাতেই ক্ষমার যোগ্য নয়…!