অর্থনীতির ৩০ দিন ডেস্ক:
অনলাইন (২ দিন আগে) জানুয়ারি ৫, ২০২২, বুধবার, ৩:৩১ অপরাহ্ন | সর্বশেষ
এক ব্যক্তি একজন পুলিশ অফিসারের কাছ থেকে একদিন একটা ফোন পায়। তাঁকে বলা হয় যে, তিনি অপরাধমূলক কিছুই করেননি, তবে তার সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টগুলি কাউকে অসন্তুষ্ট করেছে। তাই অপরাধমূলক নয় এমন ঘটনা হিসাবে পুলিশ আপাতত সেগুলিকে রেকর্ড করেছে। ভবিষ্যতে সেগুলি ক্রিমিনাল রেকর্ড হিসেবে প্রদর্শিত হতে পারে। শুধু তাই নয় পুলিশ অফিসার ওই ব্যক্তিকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যদি তিনি তাঁর পোস্টগুলি চালিয়ে যান, তাহলে পুলিশ তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থাও নিতে পারে।
ওপরের বিষয়টি দেখে মনে হতেই পারে এটা কোথাকার ঘটনা। আপনাদের জানিয়ে রাখি,২০১৯ সালে ব্রিটেনে এটি ঘটেছিল। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
মামলার সময়ে হাইকোর্টের বিচারক হাম্বারসাইড পুলিশ বাহিনীর এই ক্রিয়াকলাপকে বেআইনি বলে রায় দিয়েছিলেন। প্রসিকিউশন প্রেসের কাছে জানায়, হ্যারি মিলার এর বিরুদ্ধে অপরাধের কোনো প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও, পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ নিয়েছিল। তাঁর মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ করা হয়েছিল।
ক্রিসমাসের ঠিক আগে, একটি যুগান্তকারী রায় দিয়েছিল কোর্ট। যা মানবাধিকারের পক্ষে লড়াই করা আইনজীবীদের বিশেষভাবে আকর্ষিত করেছিল। আদালত তার পর্যবেক্ষণে জানিয়েছিল পুলিশিং – এর নামে যা করা হচ্ছে তা আসলে নাগরিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর একটি বেআইনি আক্রমণ। সেই সমস্ত ঘটনাগুলিকে ইচ্ছাকরে রেকর্ড করা হচ্ছে যা কোনোভাবেই বিদ্বেষমূলক বা অপরাধমূলক নয়। আমরা কীভাবে এমন অবস্থানে পৌঁছলাম যেখানে একজন ব্যক্তিকে বেআইনি পুলিশি পদক্ষেপের মুখে পড়ে আইনতভাবে তার মত প্রকাশের অধিকার রক্ষা করার জন্য আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি নিতে হয়েছিল? এর আগে ১৯৯৯ সালে ম্যাকফারসন রিপোর্টে নথিভুক্ত ১৯৯৩ সালের স্টিফেন লরেন্সের হত্যাকাণ্ড থেকেই মেট্রোপলিটন পুলিশের অ-অপরাধমূলক কার্যকলাপ রেকর্ড করার একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদের দিকে অঙ্গুলি নিক্ষেপ করে। ম্যাকফারসন পুলিশকে সুপারিশ করেছেন , কোনো ব্যক্তিকে অপরাধের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আগে তদন্ত করে দেখা উচিত অপরাধের গুরুত্ব কতখানি। উদ্দেশ্য ছিল পুলিশকে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদ কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা।
যদিও আজও অ-অপরাধমূলক ঘটনা রেকর্ড করার একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে যেখানে সোশ্যাল মিডিয়ায় এতো ধরণের রিপোর্ট থাকে , মন্তব্য থাকে। সেখান থেকে কোনটি অপরাধমূলক বা কোনটা নয় সেটা বিবেচনা করা পুলিশের পক্ষে কার্যত অসম্ভব। কারণ পুলিশের কাছে এই ধরণের ঘটনাগুলির তদন্ত করার জন্য সংস্থান নেই। এখানেই সামনে আসছে নানা ধরণের কারসাজি। যা মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর খাঁড়ার মত নেমে এসেছে ।কেউ কিছু বললে সেটি পছন্দ না হলে পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে পারেন সেই ব্যক্তি । ফৌজদারি অভিযোগের যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়াই পুলিশ আগেই এটিকে ঘৃণামূলক ঘটনা হিসাবে ধরে নেবে এবং রেকর্ড করবে এমনভাবে যা হয়তো ওই নিরপরাধ ব্যক্তির ক্যারিয়ারের ক্ষতি পর্যন্ত করতে পারে । শুধু তাই নয় , একজন পুলিশ অফিসারের কাছ থেকে আপনাকে আপনার গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করা থেকে সতর্ক করার জন্য ফোন কল -ও যেতে পারে।
শুধু মিলার নয় , আরও বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে যেখানে পুলিশ লোকদের সঙ্গে অনুপযুক্ত আচরণ করেছে।গত ফেব্রুয়ারিতে, মার্সিসাইড পুলিশ ভুলভাবে একটি রেকর্ড নথিভুক্ত করেছিল। তাদের দাবি ছিল , ” কারুর কাছে আপত্তিকর হওয়াও একটি অপরাধ” । ২০১৮ সালে ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ার পুলিশ এক ব্যক্তিকে ফেসবুক পৃষ্ঠায় “অপমানজনক” বার্তা পোস্ট করলে তার বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দিয়েছিল। .সবথেকে বড় কথা হল , পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ হতে হবে। কারণ যৌন এবং লিঙ্গ বিতর্কে পুলিশ বাহিনীর সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক পক্ষ নেওয়ার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। যদিও সম্প্রতি লিঙ্গ বৈষম্যের উর্ধে উঠে কাজ করার জন্য লাঙ্কাশায়ার পুলিশের প্রশংসা করেছেন দেশের পুলিশ উপদেষ্টা পল জিয়ানাসি। রাজনৈতিক চাপকে উপেক্ষা করেও বেশ কিছু পুলিশ বাহিনী এলজিবিটি দাতব্য সংস্থাগুলিকে প্রশিক্ষণের জন্য অর্থ প্রদান করেছে।
মিলারকে পুলিশের হুমকির দেয়ার কোনো কারণ ছিল না। মিলার সোশ্যাল মিডিয়ায় এটুকুই লিখেছিলেন যে একটি ভ্রুনের দৈহিক গঠন ছেলের মত হলেও , তার মস্তিষ্কের চিন্তাশক্তি মেয়েদের মত হতে পারে। তিনি একটি ট্রেনিংয়ের সময় বিষয়টি জেনেছিলেন। গ্রেটার ম্যানচেস্টার পুলিশের মতে , মিলারের বক্তব্য মহিলাদের ক্ষেত্রে অবমাননাকর। গত বছর থেকে বেশ কয়েকটি ভয়ঙ্কর হত্যা মামলা সামনে এসেছে , যেখানে বেশ কিছু পুলিশ বাহিনী প্রাতিষ্ঠানিক দুর্ব্যবহার, বর্ণবাদ এবং হোমোফোবিয়া দ্বারা কলঙ্কিত হয়েছে। কিন্তু সব নাগরিকই চান পুলিশ তার কাজ করার সময়ে বৈষম্যবাদকে দূরে রাখুক। অ-অপরাধমূলক ঘৃণার ঘটনা রেকর্ড করে পুলিশ আসলে নিজেদের নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা ছাড়া গণতন্ত্র থাকে না ।২১ শতকের ব্রিটেনে রাজনৈতিক বিতর্ক বন্ধ করার জন্য পুলিশ যে বেআইনিভাবে কাজ করেছে তা আসলে মানুষের মৌলিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপের সমান।
সূত্র : www.theguardian.com
কলমে : সোনিয়া সোধা , একজন অবজারভার কলামিস্ট
অনুবাদে : সেবন্তী ভট্টাচার্য












