সেবাখাতে অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরে ঘুষ লেনদেন ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা: টিআইবি

থর্ধনীতির ৩০ দিন ডেস্ক :
২৫ জুন ২০২৬ বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি তাদের প্রতিবেদনে এ তথ্যগুলো প্রকাশ করে |
জরিপ বলছে, ২০২৩ সালের মতো ২০২৫ সালেও পাসপোর্ট সেবা নিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ ঘুষ ও দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। এ খাতে দুর্নীতির হার ৭৬ দশমিক ৬ শতাংশ। এর পরেই রয়েছে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের সেবা, যেখানে দুর্নীতির হার ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ। এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, কৃষি, ভূমি ও বিচারসংশ্লিষ্ট সেবার অবস্থান।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশের বিভিন্ন সেবা খাতে মোট ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির জরিপে পাসপোর্ট, সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, ভূমি ও বিচারসংশ্লিষ্ট খাতে দুর্নীতির উচ্চমাত্রার চিত্র উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। জরিপে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
টিআইবি জানিয়েছে, দেশের আটটি বিভাগের গ্রাম ও শহরাঞ্চল থেকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর নমুনাকাঠামো ব্যবহার করে দুই ধাপে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে এক হাজার ১৪৯টি এলাকা নির্বাচন করা হয়। জরিপে ১৮টি নির্দিষ্ট সেবা খাতের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের মতো ২০২৫ সালেও পাসপোর্ট সেবা নিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ ঘুষ ও দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। এ খাতে দুর্নীতির হার ৭৬ দশমিক ৬ শতাংশ। এর পরেই রয়েছে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের সেবা, যেখানে দুর্নীতির হার ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ। এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, কৃষি, ভূমি ও বিচারসংশ্লিষ্ট সেবার অবস্থান।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব খাতে পরিবারপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণও সবচেয়ে বেশি। তবে সার্বিকভাবে পরিবারপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কমে ৫ হাজার ১২৪ টাকায় নেমে এসেছে। জরিপে অংশ নেয়া ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার মনে করে, ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া কঠিন। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও বিচারিক সেবায় দুর্নীতির উচ্চহার মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে আছে। একই সঙ্গে কৃষি, স্থানীয় সরকার, ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পাসপোর্ট ও সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের সেবায় দুর্নীতির প্রবণতা বেড়েছে অথবা আগের মতোই রয়েছে।
দুর্নীতির শিকার হলেও ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবার কোনো অভিযোগ করেনি। তাদের মতে, পুরো ব্যবস্থাই দুর্নীতিগ্রস্ত। প্রায় অর্ধেক পরিবারই জানে না কোথায় এবং কীভাবে দুর্নীতির অভিযোগ করতে হয়। জরিপে দেখা গেছে, ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার দুর্নীতি দমন কমিশন সম্পর্কে জানলেও এবং মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার সরকারি অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা সম্পর্কে অবগত থাকলেও অভিযোগ করার হার খুবই কম। অভিযোগ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা গ্রহণ করা হয়নি অথবা কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।অংশগ্রহণকারীদের মতে, দুর্নীতির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ বিচারহীনতা, সচেতনতার অভাব এবং দুর্নীতিতে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির বদলে সুবিধা পাওয়া। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, গ্রামাঞ্চলের ৬৬ শতাংশ পরিবার ঘুষের শিকার হয়েছে, যেখানে শহরে এ হার ৫৮ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে ঘুষের পরিমাণের ক্ষেত্রে শহরের পরিবারগুলোকে তুলনামূলক বেশি অর্থ দিতে হয়েছে। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের আয়ের তুলনায় বেশি ঘুষ দিতে বাধ্য হয়।
টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নারী, আদিবাসী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য পরিস্থিতি আরো কঠিন। বিভিন্ন খাতে ডিজিটাল সেবা চালু হলেও তা দুর্নীতি কমাতে পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতাদের এখনো দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে ঘুষ ও দুর্নীতির সুযোগ বহাল রয়েছে।