
অর্থনীতির ৩০ দিন সংবাদ :
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বীমাখাত জিডিপির প্রায় ১৭% পর্যন্ত অবদান রাখলেও বাংলাদেশের বীমাখাত এর ধারে কাছেও নাই। বাংলাদেশের বীমাখাত জিডিপিতে মাত্র ০.৪% অংশিদারিত্ব রাখতেই হিমশিম খাচ্ছে, যা একেবারে হতাশাব্যঞ্জক। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এবং বীমা মালিকদের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েসন (বিআইএ) বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েও মালিক পক্ষের ব্যাবসায়িক অনৈতিক লোভ লালসার কারনে এসব পদক্ষেপ কোন কাজে লাগাতে পারে নাই। কারন ব্যবসায়িরা তাদের ব্যবসায়ী মনোভাবের কারনে নানা কুটকৌশল অবলম্ভন করে নিজেদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে, আর এর প্রভাব পড়ছে পুরো সেক্টরের উপর। একটা প্রবাদে আছে, “প্রশাসন যদি চলে শাখায় শাখায়, দুর্বৃত্তরা চলে পাতায় পাতায়।” সুতরাং একের পর এক আইন না করে আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা করাই কার্যকর পরিক্রমা।
দেশের নন-লাইফ বীমা খাতে মোটর বীমা ইস্যু করার ক্ষেত্রে ট্যারিফ ও বিধিমালা লঙ্ঘন করে অনৈতিকভাবে ‘নো ক্লেইম বোনাস’ (এনসিবি) সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নুনতম ১৮টি বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই ছাড়ের হার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী, পূর্ববর্তী বছরে কোনো ক্লেইম না থাকলে কেবল পরবর্তী পলিসি নবায়নের সময়ই এনসিবি প্রযোজ্য।
বীমা দলিল, প্রিমিয়াম জমার রশিদ, চেকসহ সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স, গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সসহ একাধিক লিডিং কোম্পানি নতুন বীমা পলিসিতেই এই ছাড় দিয়েছে, যা বীমা বিধিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন। এর ফলে একদিকে যেমন সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে বীমা খাতে চরম অসুস্থ প্রতিযোগিতা ।
৫টি পলিসিতে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সে
বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের অন্তত পাঁচটি মোটর বীমায় বিধিবহির্ভূত এনসিবি দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ থেকে শুরু করে একটি পলিসিতে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হয়েছে। শান্তিনগর, গুলশান, মতিঝিল ও হেড অফিসসহ একাধিক শাখা থেকে এসব পলিসি ইস্যু করা হয়।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের পল্টন ব্রাঞ্চের অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. রাশেদুর রহমান বলেন, ‘আগের গাড়ির বীমা ইতিহাস থাকলে পরবর্তী গাড়িতে এনসিবি দেওয়া হয়ে থাকে।’ তবে তিনিও স্বীকার করেন, ‘প্রথম বছর থেকেই এ সুবিধা দেওয়া নিয়মসিদ্ধ নয়।’
গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স
গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধেও অন্তত পাঁচটি পলিসিতে বিধিবহির্ভূত এনসিবি দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। যা অধিকাংশই কমলাপুর ব্রাঞ্চ থেকে ইস্যু করা হয়েছে। এসব পলিসিতে ৪০ ও ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হয়েছে। গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের কমলাপুর ব্রাঞ্চের ইনচার্জ ইভিপি কামরুন নাহার (বিনা) বলেন, প্রথম বছর থেকেই নো ক্লেইম বোনাস দেওয়ার নিয়ম নেই। নিয়ম না থাকা সত্ত্বেও কেন দেওয়া হয়েছে এ প্রশ্নে, পরে জানাবো বলেন এড়িয়ে যান।’
অনিয়মের নথিতে ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্সে
বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করে ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ছয়টি মোটর বীমায় বিধিবহির্ভূত এনসিবি দেওয়ার সত্যতা মিলেছে। ডেমরার মো. জুয়েল রানার গাড়ির ৪৫ লাখ বীমায় ৩০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়। একইভাবে হাবিবা খাতুন ও ফরিদা ইয়াসমিনের ৩৫ লাখ টাকার বেশি মূল্যের পলিসিতে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত এনসিবি দেওয়া হয়। গুলশান ও দিলকুশা ব্রাঞ্চের আরও কয়েকটি পলিসিতে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একাধিক ক্ষেত্রে রেকর্ড ৫০ শতাংশ এনসিবিও রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে গুলশান শাখার অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড আন্ডাররাইটিং) মো. ইসমাইল শাহ বলেন, ‘তাদের শাখা থেকে ইস্যু করা পলিসিটি একটি মাইক্রোবাসের বীমা। মোট বীমা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ লাখ টাকা।’ তিনি জানান, গাড়িটি ২০২০ সালের মডেলের হওয়ায় গ্রাহককে ৩০ শতাংশ বোনাস সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। গ্রাহকের চাহিদার ভিত্তিতে এ ধরনের বোনাস দেওয়া হয়ে থাকে এবং অন্যান্য বীমা কোম্পানিতেও অনুরূপ সুবিধা চালু রয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, ‘প্রথম বছরের ক্ষেত্রে নো ক্লেইম বোনাস প্রদান করা বিধিসম্মত হয়নি।’
অন্যান্য কোম্পানির বিরুদ্ধে যতো অভিযোগ
এশিয়া প্যাসিফিক জেনারেল ইন্স্যুরেন্স অন্তত ৪টি মোটর বীমায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত অবৈধ বোনাস দিয়েছে। প্রাইম ইন্স্যুরেন্স ৩টি বীমায় এবং রূপালী ইন্স্যুরেন্স ২টি বীমায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নো ক্লেইম বোনাস দিয়েছে। সাউথ এশিয়া ইন্স্যুরেন্স এবং ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্সও ২টি করে বীমায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিয়েছে।
এছাড়া আরও ১০টি কোম্পানি অন্তত একটি করে বীমায় এই অবৈধ সুবিধা দিয়েছে। কোম্পানিগুলো হলো গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স (৫০%), ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স (৫০%), প্রগতি ইন্স্যুরেন্স, রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স (৩০%), ইসলামী ইন্স্যুরেন্স (৩০%), নিটল ইন্স্যুরেন্স (৫০%), ইউনাইটেড ইন্স্যুরেন্স (৩০%), ফিনিক্স ইন্স্যুরেন্স (৫০%), সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স (৫০%) এবং রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্স।
বীমা আইন অনুযায়ী, নো ক্লেইম বোনাস কেবলমাত্র পূর্ববর্তী বছরে কোনো ক্লেইম না থাকলে পরবর্তী নবায়নের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। নতুন বীমা গ্রহণের সময় এই ধরনের কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ আইনগতভাবে নেই। বীমা আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভুয়া এনসিবি প্রদান বীমা আইন ২০১০-এর ধারা ৪৯ অনুযায়ী রিবেট বা কমিশন নিষিদ্ধকরণের সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়।
আইনে এ ধরনের অনিয়মের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ড, অনিয়ম অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন অতিরিক্ত জরিমানা আরোপ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করার ক্ষমতা, এমনকি গুরুতর ক্ষেত্রে দায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অপসারণ এবং ফৌজদারি মামলা দায়েরের সুযোগও রয়েছে। বীমা খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল নজরদারির কারণে এ ধরনের অনিয়ম বাড়ছে। এতেকরে ভাল কোম্পানিগুলো প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারার কারনে পুরো বীমাখাত ঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। তাদের মতে, দ্রুত তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা না নিলে দেশের বীমাখাতের জন্য্য অশনি সঙ্কেত।
এ বিষয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি জানান, লোকবল সংকটে পরিদর্শনে কিছুটা বিগ্ন হচ্ছে, তবে অডিটে অনিয়ম ধরা পড়লে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’










