

বীমা কোম্পানীগুলির দুর্ততার নিকট আইডিআরএ অসহায়, “বীমা পলিসি” স্কিমের নামে গোপন সঞ্চয়….
খোন্দকার জিল্লুর রহমান :-
একটা দেশের আর্থিক স্বক্ষমতা ও স্বনির্বরতা অনেকটাই নির্ভর করে ঐ দেশের ব্যাংক এবং বীমা কোম্পানীগুলির অবস্থা অবস্থানের উপর, আমাদের দেশেও তাই। আমাদের দেশের সমস্থ ব্যাংকগুলির অবিভাবক বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীগুলির অবিভাবক আইডিআরএ (ইন্স্যুরেন্স ডেভেলাপমেন্ট রেগুলেটরি অথরিটি) ব্যাংকগুলি পরিচালিত হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের রুলস্ এন্ড রেগুলেশন অনুযায়ী এবং বীমা কোম্পানীগুলি পরিচালিত হয় আইডিআরএ এর রুলস্ এন্ড রেগুলেশন অনুযায়ী। যেহেতু অবিভাবক দুই প্রতিষ্ঠানই সরকারী। ব্যাংকগুলির সঞ্চয় এবং ঋনের বিভিন্ন আকর্ষণীয় ও লোভনিয় অপার থাকলেও সঞ্চয় এবং ঋনের বিপরিতে সুদেব হার ক্রমান্ময়ে কম ও বেশী হওয়ার কারনে সাধারন জনগনের ব্যাংকের প্রতি আস্তা এবং আকর্ষনের ক্ষানিকটা ভাটা পড়ে, সেই সাথে বৈশ্বয়ীক দুর্যোগ করোনার প্রভাবও কম কার্যকরি নয়। অপরদিকে বীমা কোম্পানীগুলির প্রতি বিভিন্ন অনিয়ম, বীমার সঞ্চিত অর্থ সহজে ফেরত না পাওয়া, বিভিন্ন অজুহাতে পাওনা থেকে নির্ধরিত অর্থ কর্তনসহ সাধারন মানুষের আস্তাহীনতা অনেকটা বাড়লেও বৈশ্বয়ীক দুর্যোগ করোনার প্রভাব আয়-রোজগারের মাত্রা কমে যাওয়া সেইসাথে জীবন জীবিকা ব্যায় বেড়ে যাওয়ায় উপার্জন বাড়ানোর তাগিদে মানুষ প্রায় দিশেহারা। সেই সুযুগে বীমা কোম্পানীগুলি ( বিশেষ করে জীবন বীমা কোম্পানী) বীমা আইন এবং আইডিআরএ এর নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে কিছু কৌশুলি এজেন্ট নিয়োগ দিয়ে দুর্ততার মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে যাচ্ছে। আইডিআরএ ও আইন প্রয়োগে দুর্বলতা, জনবল স্বল্পতার অজুহাত, নিজেদের অযোজ্ঞতা ও অক্ষমতার কারনে কোন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বীমা কোম্পানীর লোকেদের কৌশলের নিকট পরাজিত।
প্রায় ৫৪হাজার বর্গমাইলের অতি জনসংখ্রার একটি ছোট দেশে অধীক সংখ্যক বীমা কোম্পানী (সাধারন ও জীবন বীমা) হওয়ায় মুনাফা নির্ভর নির্বর বেশ কয়েকটি বিমা কোম্পানি বেআইনিভাবে ব্যাংকের মতো আমানত সংগ্রহ করছে। আইনি জটিলতা এড়াতে এসব সঞ্চয়ী স্কিম বা পলিসির নামের সাথে ‘বিমা’ শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু মুনাফার হার, অর্থ জমাসহ পুরো প্রক্রিয়াটিই ব্যাংকের আদলে পরিচালিত হচ্ছে। মাঠপর্যায়ের বিমাকর্মীরা গ্রাহকদের কাছে বিমা পলিসির পরিবর্তে এসব ‘ডিপোজিট স্কিম’ কিনতে প্রলুব্ধ করছে। সাধারণ মানুষও উচ্চ মুনাফার লোভে ব্যাংকের মতো ডিপিএস (ডিপোজিট পেনশন স্কিম) মনে করে এসব স্কিমে বিনিয়োগ করছে। আর প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের সঞ্চয়ী প্রকল্পের দিকে আকৃষ্ট করতে নানান কৌশল আন্দনিক বিজ্ঞাপনের আশ্রয় নিচ্ছে। গত ৩১ মে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কেন্দ্রীয় টাস্কফোর্সের ১২তম সভা ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বীমা কোম্পানীগুলোর অবৈধভাবে আমানত সংগ্রহের বিষয়ে আলোচনা হয়। এর ভিত্তিতে বেশকিছু বীমা কোম্পানির ওয়েবসাইট খুঁজে আমানত সংগ্রহের সত্যতা পাওয়া গেছে। কয়েকটি কোম্পানীর ওয়েবসাইটে দেখা যায়, কোম্পানীগুলি তাদের ওয়েবসাইটে মানুষকে সঞ্চয়মুখী করতে নানা স্লোগানে আমানত সংগ্রহ করছে। এগুলো হচ্ছে ‘বেশি বেশি সঞ্চয় করি নিরাপদ জীবন গড়ি’; ‘এক এক করে সঞ্চয় করি নিরাপদ জীবন গড়ি’ এবং ‘ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় হোক আজ থেকেই’। এছাড়া তাদের হজ বীমা ও মেয়াদি বীমা নামে প্রকল্প রয়েছে। মেয়াদি বীমা প্রকল্পের শুরুতেই তারা লিখেছে ‘সঞ্চয় ও আর্থিক নিরাপত্তার জন্য ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়’। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির ডিপোজিট পেনশন স্কিম (এফডিপিএস-মুনাফাসহ) নামে একটি বীমা প্রকল্প রয়েছে। মাসভিত্তিক সঞ্চয় বীমা পরিকল্পক (এমএসপি) নামে তাদের আরও একটি প্রকল্প রয়েছে। আরেকটি লাইফ ইন্সুরেন্সের সঞ্চয়ী নামে একাধিক বিমা প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সঞ্চয়ী বীমা, মাসিক সঞ্চয়ী বীমা, একক প্রধান সঞ্চয়ী বীমা। আরোকটি ইন্সুরেন্স প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়ের আদলে বীমা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে আছে মাসিক সঞ্চয়ী অ্যাসুরেন্স প্ল্যান (মুনাফা ছাড়া)। সঞ্চয় ও বীমা নিয়ে তাদের রয়েছে তিনটি প্রকল্প।
অবশ্য টাস্কফোর্সের সভায় অংশ নেওয়া বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (আইডিআরএ) একজন নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘বীমা কোম্পানিগুলির আমানত সংগ্রহের এখতিয়ার নেই।’ এরই পরিপ্রেক্ষিতে বীমা কোম্পানিগুলি আমানত সংগ্রহের প্রকল্প পরিচালনা করতে পারে কি না, তা পর্যালোচনা করতে আইডিআরএ-কে নির্দেশ দেওয়া হয়। জানতে চাইলে বীমা কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সংগঠন ইন্সুরেন্স বাংলাদেশ ফোরামের সভাপতি ও পপুলার লাইফ ইন্সুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিএম ইউসুফ আলী শনিবার বলেন, বীমা কোম্পানীগুলো কোনো ধরনের আমানত সংগ্রহ করে না। আমরা পলিসির বিপরীতে প্রিমিয়াম সংগ্রহ করি। কয়েকটি কোম্পানীর ডিপিএস স্কিম রয়েছে-এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই ডিপিএসগুলোও আমানত নয়, সঞ্চয়ী বীমা। এই সঞ্চয়ী বীমা অ্যাকচুয়ারি (বীমা আইন বিশেষজ্ঞ) এবং আইডিআরএ অনুমোদিত। তার মতে, এখানে আইনের কোনো ব্যত্যয় হয় নাই।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমানে ব্যাংকগুলোর সঞ্চয়ী প্রকল্পের মুনাফার হার কম। যে কারণে বীমা কোম্পানীগুলো ব্যাংকের চেয়ে বেশি মুনাফা দিয়ে সঞ্চয়ী প্রকল্পের আদলে বিমা প্রকল্প চালু করছে। মাঠপর্যায়ের বিমাকর্মীরাও গ্রাহকদের সঞ্চয় বা ডিপিএস নামে গ্রাহকদের বুঝিয়ে এগুলোয় বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে। ব্যাংকগুলোয় যেসব সঞ্চয় প্রকল্প রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রকল্প হচ্ছে ডিপোজিট পেনশন স্কিম (ডিপিএস)। প্রায় সব ব্যাংকেই এই প্রকল্পটি রয়েছে। সাধারণ সঞ্চয়ীরাও ডিপিএস নামটির সাথেই বেশি পরিচিতি। এ কারণে সঞ্চয়কারীদের আকৃষ্ট করতে বীমা কোম্পানিগুলোও ডিপিএস নামে বিভিন্ন প্রকল্প চালু করেছে। এর মাধ্যমে তারা গ্রাহকদের কাছ থেকে বীমা পলিসির নামে আমানত সংগ্রহ করছে। কিন্তু গ্রাহকদের কাছে প্রচার করছে ডিপিএস নামে। ব্যাংক কোম্পানী আইন অনুযায়ী, শুধু ব্যাংকগুলোরই গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহের বিধান আছে বলেই ব্যাংকগুলো সঞ্চয় প্রকল্পও চালু করতে পারবে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি আইন অনুযায়ী ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো এবং সমবায় আইন অনুযায়ী কো-অপারেটিভ সংস্থাগুলো কেবল তাদের সদস্যদের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করতে পারবে। আর বীমা কোম্পানীগুলো পলিসির আওতায় গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রিমিয়াম নিতে পারবে। কিন্তু তারা কোনো সঞ্চয়ী স্কিম চালু করতে পারে না। একই সঙ্গে গ্রাহকদের কাছ থেকে কোনো আমানত সংগ্রহের একতিয়ার নাই।
নিকট অতিতে বেআইনিভাবে আমানত নেওয়ার দায়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের আমানত সংত্রহ প্রকল্প বন্ধ করে দিয়েছে। এর মধ্যে ২০০২ সালে ইসলামিক ট্রেড অ্যান্ড কমার্স লিমিটেড (আইটিসিএল) নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, ২০০৫ সালে যুবকের সঞ্চয় প্রকল্প এবং ২০১০ সালে ডেসটিনির সঞ্চয় প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া হয়। এছাড়া আরও কিছু প্রতিষ্ঠানের সঞ্চয়ী প্রকল্প বন্ধ করা হয়েছে। যেসব কো-অপারেটিভ সোসাইটি সদস্যদের বাইরে থেকে বেআইনিভাবে আমানত সংগ্রহ করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সমবায় অধিদপ্তরকে কয়েক দফা চিঠি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, বীমা খাত এখনো শৃঙ্খলার মধ্যে আসেনি। বীমা কোম্পানীগুলো পলিসি বিক্রি করতে মাঠপর্যায়ে অনেক কর্মী নিয়োগ দিয়েছে। যেগুলো শাখা থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। বীমাকর্মীরা গ্রাহকদের কাছে ডিপিএস নামে বীমা পলিসির প্রচার চালায়। তারা আমানত সংগ্রহ করলে এবং এগুলো পরিশোধ করতে না পারলে ভবিষ্যতে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। এ বিষয়ে খুব তড়িৎ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, আইনত বীমা কোম্পানী ব্যাংকের মতো আমানত সংগ্রহ করতে পারে না। যেহেতু বিএফআইইউসহ অন্য সরকারি সংস্থাগুলো বিষয়টি নিয়ে ওয়াকিবহাল আছে, সেহেতু তারা এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।












