কৌশলগত অংশীদারিত্বের সব ধাপ সম্পন্ন করেছে ডিএসই

অর্থনীতির ৩০ দিন প্রতিবেদক :
কৌশলগত অংশীদারের কাছে শেয়ার হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জ ডিমিউচুয়ালাইজেশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সমাপ্ত করল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) লিমিটেড। ব্লকড অ্যাকাউন্টে রক্ষিত ২৫ শতাংশ শেয়ারের দাম ও স্ট্যাম্প ডিউটি হিসেবে সোমবার প্রায় ৯৬২ কোটি টাকা বুঝে পাওয়ার পর গতকাল শেনঝেন সাংহাই কনসোর্টিয়ামের অনুকূলে শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন করে দেশের প্রধান স্টক এক্সচেঞ্জটি।
সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ডিএসই কর্তৃপক্ষ। সেখানে এক্সচেঞ্জটির পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা ছাড়াও চীনা কনসোর্টিয়ামের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
স্বাগত বক্তব্যে ডিএসই চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবুল হাশেম বলেন, আজকের দিনটি বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিবস। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দুটি স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে এ কৌশলগত অংশীদারিত্ব ডিএসইকে একটি আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজার হওয়ার পথে এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেএএম মাজেদুর রহমান জানান, কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে পাওয়া ৯৬২ কোটি টাকার মধ্যে স্ট্যাম্প ডিউটি হিসেবে ১৫ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকারের কোষাগারে জমা হচ্ছে। বাকি ৯৪৭ কোটি টাকার মালিক ডিএসইর সদস্যরা। দ্রুতই এ অর্থ তাদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়া হবে। শেনঝেন-সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের কৌশলগত অংশীদারিত্ব ডিএসইকে একটি আন্তর্জাতিক স্টক এক্সচেঞ্জে রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
কনসোর্টিয়ামের প্রতিনিধি হিসেবে এরই মধ্যে ডিএসইর পর্ষদে যোগ দিয়েছেন শেনঝেন স্টক এক্সচেঞ্জের টেকনোলজি ম্যানেজমেন্ট কমিটির উপমহাপরিচালক শি ওয়েনহাই। বক্তব্যে অর্থনৈতিক ও পুঁজিবাজার সম্পর্কিত বিষয়গুলোয় দুই দেশের সম্পর্কের নানা দিক উল্লেখ করার পাশাপাশি তিনি বলেন, কনসোর্টিয়াম ডিএসইর কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কী কী ভূমিকা রাখতে চায়, তার বিস্তারিত শেয়ার ক্রয়-সংক্রান্ত চুক্তিতে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে। কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বর্তমানে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিয়ে গভীর গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ করছে কনসোর্টিয়াম। এর আলোকে পারস্পরিক সহযোগিতা ও পরামর্শের ভিত্তিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করবেন তারা।
চীনা কনসোর্টিয়ামের অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্বমানের তথ্যপ্রবাহ, ফাইলিং ও ডিসক্লোজার নিশ্চিত করা, স্টক এক্সচেঞ্জের ট্রেডিং সিস্টেম থেকে শুরু করে সার্বিক প্রযুক্তি অবকাঠামোর উন্নয়ন, কার্যকর সার্ভিল্যান্স সিস্টেম প্রবর্তন এবং আধুনিক ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর মতো মানবসম্পদ উন্নয়ন তাদের প্রাথমিক অগ্রাধিকার। এছাড়া ফিক্সড ইনকাম সিকিউরিটিজ ও অন্যান্য পণ্যের প্রচলন, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবসা উন্নয়ন, তালিকাভুক্তি ও বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়গুলোতেও কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রাখবে কনসোর্টিয়াম।
‘বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সম্ভাবনা অপার, তবে চ্যালেঞ্জও অনেক’ উল্লেখ করে কনসোর্টিয়ামের আরেক প্রতিনিধি লিউ ফুঝং জানান, চীনের তহবিল ব্যবস্থাপকরা বাংলাদেশের বাজারে বিনিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহী। এক্ষেত্রে সেতুবন্ধের জন্য প্রাথমিক গ্রাউন্ড ওয়ার্কগুলো করছে কনসোর্টিয়াম।
কৌশলগত অংশীদারিত্বের প্রতিটি ধাপে সমর্থন ও সহযোগিতার জন্য দুই দেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাংলাদেশের বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ সব পক্ষকে অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জানান বক্তারা। অনুষ্ঠানে ডিএসইর পর্ষদ সদস্যদের মধ্যে বিচারপতি সিদ্দিকুর রহমান মিয়া, শরীফ আতাউর রহমান, রকিবুর রহমান, মিনহাজ মান্নান ইমন, হানিফ ভুইয়া। চীনা প্রতিনিধিদের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট বিভাগের উপপরিচালক ইয়াং জিনঝং ও লি কিংইয়ু।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ১৪ মে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ডিএসইর ২৫ শতাংশ শেয়ার কিনতে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর করে শেনঝেন-সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের সম্মিলিত কনসোর্টিয়াম। গত ২৬ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক ডিএসইর কৌশলগত অংশীদার হিসেবে চীনা কনসোর্টিয়ামকে নন-রেসিডেন্ট ইনভেস্টরস টাকা অ্যাকাউন্টের (নিটা) মাধ্যমে বাংলাদেশে টাকা পাঠানোর অনুমতি দেয়। এরপর ৩ সেপ্টেম্বর ব্যাংকিং চ্যানেলে সব অর্থ ডিএসইর অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ার পর কনসোর্টিয়ামের বিও হিসাবে ২৫ শতাংশ শেয়ার জমা করে ডিএসই।
এদিকে ডিএসইর শেয়ার বিক্রি করে পাওয়া ৯৪৭ কোটি টাকার ওপর উদ্ভূত মূলধনি মুনাফায় ১৫ শতাংশ হারে ১৪২ কোটি টাকার ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স দিতে হবে ডিএসইর শেয়ারহোল্ডারদের। তবে বাজারের স্বার্থে মূলধনি মুনাফার অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের শর্তে ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্সে অব্যাহতি চাইছেন এক্সচেঞ্জটির সদস্যরা। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর কাছে ডিএসই ব্রোকারেজ অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
প্রসঙ্গত, এ বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি কৌশলগত অংশীদারদের প্রস্তাবসংবলিত টেন্ডার বাক্স উন্মোচন করে ডিএসই। দরপত্র প্রক্রিয়ায় কৌশলগত অংশীদারের জন্য সংরক্ষিত ডিএসইর ১৮০ কোটি ৩৭ লাখ ৭৬ হাজার ৫০০ শেয়ারের এক-চতুর্থাংশ বা ৪৫ কোটি ৯ লাখ ৪৪ হাজার ১২৫টি শেয়ার কিনতে দুটি কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাব জমা হয়। এর মধ্যে শেনঝেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের চীনা কনসোর্টিয়াম ডিএসইর প্রতি শেয়ারের জন্য ২২ টাকা হারে ৯৯২ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব করে। এর বাইরে তারা ডিএসইকে বিনামূল্যে বিভিন্ন কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, যার মূল্য উল্লেখ করা হয় ৩০৮ কোটি টাকা। তবে মধ্যবর্তী সময়ে সর্বশেষ হিসাব বছরের জন্য বর্তমান শেয়ারহোল্ডারদের নগদ লভ্যাংশ দেয়ায় ডিএসইর প্রতিটি শেয়ারের ভ্যালুয়েশন ১ টাকা কমে যায়, যা চূড়ান্ত শেয়ার ক্রয় চুক্তিতে (এসপিএ) সমন্বয় করা হয়।
চীনা কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাবিত কারিগরি সহায়তার মধ্যে ডিএসইর ট্রেডিং ও সার্ভিল্যান্স সিস্টেমের আধুনিকায়ন, বিজনেস প্রসেস ম্যানেজমেন্ট (বিপিএম) সিস্টেম কনসাল্টিং প্ল্যান, বন্ডের টেন্ডার সিস্টেমের জন্য কনসাল্টিং সার্ভিস, ইনফরমেশন ডিসক্লোজার সিস্টেমের জন্য কনসাল্টিং সিস্টেম প্ল্যান, ডাটা সেন্টার ও কো-লোকেশনের জন্য কনসাল্টিং সার্ভিস প্ল্যান, এফডিইপি ও ফিন্যান্সিয়াল ক্লাউড টেকনোলজি স্থানান্তর পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। এসব কারিগরি প্রযুক্তির জন্য ১০ বছরের লাইসেন্স এবং তিন বছরের ট্রেনিং ও কনসাল্টিং সার্ভিস সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেবে কনসোর্টিয়াম। এর বাইরে তারা আরো বেশকিছু নতুন পণ্য প্রচলন ও বাজার উন্নয়নে পদক্ষেপ নেয়ারও প্রস্তাব দিয়েছে।