অর্থনীতির ৩০ দিন ডেস্ক :
বিরল রোগ উয়ের উল্ফ সিনড্রোমে
প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষা-গবেষণা ছাড়াও দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য, আন্দোলন-সংগ্রামে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে স্বর্ণোজ্জ্বল ভূমিকা। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অনেকের কাছেই এই ক্যাম্পাস প্রিয় ও নিরাপদ। তবে গত কয়েক বছর ধরে ঘটা কিছু ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তা নাজুক কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের রাস্তা পর্যবেক্ষণের জন্য বসানো হয়েছে ক্লোজড সার্কিট টেলিভিশন (সিসিটিভি) ক্যামেরা। কিন্তু এর পরও চুরি, ছিনতাই হচ্ছে। এমনকি ক্যাম্পাসে দুর্বৃত্তদের হাতে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল, চত্বর, মোড় মিলে অর্ধ শতাধিক রাস্তা রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি ব্যস্ততম। সেসব রাস্তা প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক-শিক্ষার্থী ছাড়াও বহিরাগতরা ব্যবহার করেন। এসব রাস্তা হয়েই যেতে হয় চানখাঁরপুল, নীলক্ষেত ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এ ছাড়া দোয়েল চত্বর, নীলক্ষেত যাওয়ার রাস্তাটি কম-বেশি সবাইকে ব্যবহার করতে হয়। এসব রাস্তায় একটু সুযোগে স্বার্থ হাসিল করছে দুর্বৃত্তরা।
ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পলাশী মোড়, দোয়েল চত্বর, জহুরুল হলের সামনের রাস্তা, উপাচার্য ভবনের সামনের রাস্তা, রোকেয়া হলের সামনের রাস্তা, জগন্নাথ হলের সামনের রাস্তা, কবি জসীম উদ্দীন হলের সামনের রাস্তা ও বাংলা একাডেমির সামনের রাস্তায় বেশি অপরাধ সংগঠিত হয়েছে।
গত চার বছরে এসব রাস্তায় সংঘটিত হয়েছে ৩০টিরও বেশি ছিনতাই। শনাক্ত না হওয়ায় এসব ঘটনায় অপরাধীরা ধরা পড়েনি।
শুধু হামলা বা ছিনতাইয়ের পাশাপাশি ক্যাম্পাসে লাশ উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে দুটি লাশ পাওয়া গেছে বিশ্ববিদ্যালয় এলকায়।
২০১৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের পুকুর থেকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগের বছর ২০১৬ সালের ২১ মার্চ সকালে ক্যাম্পাসের ভেতর পরমাণু শক্তি কমিশনের সামনের রাস্তায় অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়।
ক্যাম্পাসে এত নিরাপত্তার থাকার পরও কীভাবে ঢুকেছিল সেই লাশ দুটি, তা নিয়ে সে সময়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়।
২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও লেখক হুমায়ুন আজাদকে কুপিয়ে জখম করা হয়। পরে ১২ আগস্ট তার মৃত্যু হয়। এর প্রায় ৯ বছর পর ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে টিএসসির কাছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ফটকে চাপাতির কোপে নিহত হন মুক্তমনা লেখক অভিজিৎ রায়।
থামেনি ছিনতাই
অভিজিৎ হত্যার পরও বিভিন্ন সময়ে নিরাপত্তাজনিত অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। ২০১৬ সালের নভেম্বরে পলাশী থেকে চা পান করে হলে ফেরার পথে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবদুল্লাহ আল যুবায়ের ভূঁইয়ার মোটরসাইকেল আটকে দাঁড়ায় একটি প্রাইভেটকার। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছিনতাইকারীরা গাড়ির ভেতর থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে।
একই বছরের ২১ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের একটি অনুষ্ঠানে নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত লিওনি মারগারিটা কুলেনারার হাতব্যাগ খোয়া যায়। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় বেশ লজ্জায় পড়ে গিয়েছিলেন। পরে অবশ্য প্রশাসনের সহায়তায় সেই ব্যাগ উদ্ধার করা হয়।
২০১৭ সালের ৩১ জানুয়ারি সকালে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল থেকে ক্লাসে যাওয়ার পথে দুই ছিনতাইকারী চাকু দেখিয়ে রাজীব নামের এক শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোন ছিনতাই করে পালিয়ে যায়।
একই বছরের ৯ অক্টোবর দূর্গাপূজা দেখতে আসার পথে নীলক্ষেত গেটের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক ছাত্রের স্ত্রীর গলা থেকে সোনার চেইন ছিনিয়ে নেয় দুই ছিনতাইকারী।
চলতি বছরের ৯ এপ্রিল দুপুরে দোয়েল চত্বরে রিকশা দিয়ে যাওয়ার সময় আজম উদ্দিন নামের এক পোশাক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ডিবি পরিচয়ে সাত লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। একই জায়গায় ২০১৬ সালের ৯ এপ্রিল সন্ধ্যায় রিকশায় বাসায় যাওয়ার পথে ল্যাপটপসহ ব্যাগ হারান এনসিসি ব্যাংকের কর্মকর্তা একরাম হোসেন। ছিনতাইকারীরা তার ব্যাগ টান দিলে একরাম নিজেও চলন্ত রিকশা থেকে নিচে পড়ে যান। এ ঘটনায় ওই কর্মকর্তার হাত ভেঙে যায়।
২০১৭ সালের ২৩ মে সকালে রোকেয়া হলের সামনে ছিনতাইয়ের শিকার হন ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী ইশরাত জাহান। ৪ জুন জগন্নাথ হলের সামনে ল্যাপটপ ছিনতাইয়ের হন রিকশায় থাকা ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী গিয়াস উদ্দিন। এর তিন সপ্তাহ পর কবি জসীম উদ্দীন হলের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম সুজন টিএসসি থেকে হলে ফেরার পথে ভিসি চত্বরের কাছে এলে ছিনতাইকারীরা তার ল্যাপটপ ছিনিয়ে নেয়।
একই বছরের ২৭ অগাস্ট রাতে পলাশী থেকে চা পান করে ফেরার পথে বিশ্ববিদ্যালয়ের এ এফ রহমান হলের সামনে ছিনতাইয়ের শিকার হন ছাত্রলীগের নেতা আবদুল আলীম ও জাহিদ হাসান।
গত মাসে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে একদল দুর্বৃত্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। এ ঘটনায় সন্দেভাজন কয়েকজনকে আটক করা হলেও মূল হোতারা রয়ে গেছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
সর্বশেষ গেল ৯ মে, দোয়েল চত্বর থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাওয়ার পথে হাসপাতালটির চিকিৎসক সামিউল সোহানকে শহীদুল্লাহ হলের সামনে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে আহত করে। পরে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
চিকিৎসকের ওপর হামলার ঘটনায় বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব জাহিদ হোসেন বলেন, ‘তার ওপর এমন হামলা দুঃখজনক। সেদিনের ঘটনা প্রমাণ করে, এটি ছিল একটি পরিকল্পিত হামলা। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যেন এ রকম হামলার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তার জন্য কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া প্রয়োজন।’
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য
নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের তৃতীয় বর্ষের বর্ষের ছাত্র মোস্তাক আহমেদ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার প্রতিটি রাস্তায় কম-বেশি সিসি ক্যামেরা থাকার পরও ছিনতাই ও হামলার ঘটনা দুঃখজনক। শুধু আমাদের নয়, রাস্তা ব্যবহারকারী সকলের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানাচ্ছি।’
রোকেয়া হলের আবাসিক শিক্ষার্থী লোপা আক্তার বলেন, ‘সন্ধ্যার পরই বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্তাগুলো অনিরাপদ হয়ে যায়। রাস্তায় আলো থাকার পরও ঘটছে নানা দুর্ঘটনা। বিষয়গুলো সত্যি ভাববার মতো এবং উদ্বেগজনক।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু রাস্তা দেখভাল ও নিয়ন্ত্রণ করে সিটি করপোরেশন। এসব রাস্তায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সিসি ক্যামেরা বসায়ও তারা।
জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান প্রকৌশলী আলী আহমেদ বলেন, ‘আমরা সব রাস্তা দেখাশোনা করি না। এর মধ্যে যেগুলো প্রধান প্রধান রাস্তা, সেগুলো আমাদের দায়িত্বে। এসব রাস্তায় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সিসি ক্যামেরা বসানো রয়েছে। তবে কতটি সিসি ক্যামেরা রয়েছে, তা জেনে বলতে পারব।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস চারদিক খোলা। এ কারণে খুব সহজেই দুর্বৃত্তরা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারে ও অপরাধ করে দ্রুত পালিয়েও যেতে পারে। আর এসব কারণেই তাদের আটক বা শনাক্তও করা সম্ভব হয় না।
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান বলেন, ‘সর্বশেষ চিকিৎসকের ওপর হামলায় ওই চিকিৎসকের পক্ষ থেকে এখনো কোনো অভিযোগ করা হয়নি। এ কারণে আমরাও কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছি না। তবে ঘটনার দিন সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছিল। ঘটনার সময়কালে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা দুটি বাসের কারণে অপরাধীদের শনাক্ত করা যায়নি।
বিশ্ববিদ্যায়ের নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে ছিনতাই বা অপ্রীতিকর ঘটনা ঠেকাতে ক্যাম্পাসে টহল বাড়ানো হয়েছে। যেসব স্থানে ছিনতাই বা অপ্রীতিকর ঘটনাগুলো ঘটছে, সেখানে সিসি ক্যামেরা লাগানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অনুরোধ করা হয়েছে।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার খোলা জায়গাগুলোতে এখনো সিসি ক্যামেরা বসানো হয়নি। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এ বিষয়ে প্রক্টরিয়াল বডির সাথে আলাপ আলোচনা হয়েছে। যেহেতু এই ক্যাম্পাসের রাস্তা ব্যবহার করে অনেকে চলাফেলা করেন, সে কারণে নিরাপত্তায় সবার সহযোগিতা দরকার।’












