ভারত কি সেই পথে আগাচ্ছে?

খোন্দকার জিল্লুর রহমান

গনহত্যা এমন একটি জাতিগত নিধন পদ্ধতি যা যেকোন ছুতা ধরেই তৈরি করা যায়। আর এই পদ্ধতিতে যেকোন দুর্বল জাতি বা কোন দুর্বল জন গোষ্টিকে ইচ্ছা অনুযায়ী নিধন করা যায়। অনেক সময় প্রশাসনিক ভাবেও এর ব্যবহার করা যায়, যদি কেউ কোন নিছক এবং কতৃত্ত্ববাদি ক্ষমতার অধিকারি হয় তাইলে নিজেদেরকে যুগযুগ ধরে ক্ষমতার মসনদ আঁকড়ে থাকার এবং নিজেদের রামরাজ্য প্রতিষ্টার মুল পদ্ধতিই হল এই গনহত্যার ব্যাবহার। আর এই গনহত্যার প্রক্রিয়া তৈরি হয় সুদুরপ্রসারি পরিকল্পনা ও নিদৃষ্ট কতগুলি শুক্ষ ধাপে ধাপে। বিভিন্ন দেশে গনহত্যার পুর্ব সময়ের ইতিহাস পর্যালোচনা করে গনহত্যার কতগুলি ক্রমান্ময়ীক ধাপ তৈরি করা যায়।
মার্কিন প্রখ্যাত মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ডক্টর গ্রেগরি স্ট্যানটন এর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাবনায় বিষধ আলাপ আলোচনা ও গবেষনার মাধ্যমে নিম্নোক্ত ধাপগুলি তৈরি করা হয়। আলোচিত এইসকল প্রস্তাবনার ওপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত রুয়ান্ডা এবং বুরুন্ডিতে গণহত্যার তদন্তেও একটি কমিশন গঠন করেছিল। কম্বোডিয়া, রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি ও রোহিঙ্গা গণহত্যা নিয়ে পর্যবেক্ষন, আলোচনা-পর্যালোচনা ও গবেষণায় উল্লেখিত ধাপগুলির ধারাবাহিকতা রয়েছে; যা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত, সমর্থিত ও সমাদ্রিত। বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন দেশ গুলিতে যেভাবে সংখ্যালগু সম্প্রদায় বা অবিভাসিদের উপর নির্যাতন নিপিড়ন এবং নির্মুলিকরন চলেছে এর ধারাবাহিকতারই বহি:প্রকাশ।

গনহত্যার ধাপ হিসাবে ধরা যায় প্রথমত জাতির মাঝে বা সমাজের মাঝে বিভাজন তৈরি করা। দ্বিতীয় ধাপ হল বিভাজিত ব্যাক্তিদের আলাদা করে তাদেরকে শুদ্ধি এবং অনাকাঙ্খিত হিসাবে তুলে ধরা। তৃতিয় ধাপ হল জাতিগত বা সংখ্যাগত বৈষম্য তৈরি করে তাদের নাগরিক আধিকার কেড়ে নেওয়া। চতুর্থ ধাপ অমানবিক আচরনকরা সহ ভুক্তভোগীদেরকে নিকৃষ্ট এবং বিভাজিত ব্যাক্তিদের নিকট হেয় প্রতিপন্ন করা। পঞ্চম ধাপ হচ্ছে গনহত্যা সংঘটনের জন্য এমন একটা সংস্থা, দল বা বাহিনি তৈয়ার করা যারা নির্ধিধায় উক্ত কাজগুলি করে যেতে পারে। ষষ্ঠ ধাপ হচ্ছে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে বিভাজিত ব্যাক্তিদেরকে বিভীন্নরুপে মেরুকরন করা। সপ্তম ধাপ শুরু হয় প্রস্তুতিমুলক পদ্ধতি। অষ্টম ধাপ অত্যাচার অবিচার নিপীড়ন মুলক পদ্ধতি। নবম ধাপ হল বিভাজিত ব্যাক্তিদের বিতাড়িত করা বা যেকোন উপায়ে হত্যাসহ স্বমুলে নির্মুল করা এবং সর্বশেষ ধাপ দুই অংশে ভাগ করা যেমন প্রথমত হল আইন, বিচার ব্যাবস্থা ও প্রশাসনকে নিজস¦ আদলে ব্যাবহার করার জন্য তৈরি করা এবং দ্বিতীয় অংশে এসব হত্যা-গনহত্যা, অত্যাচার-অবিচার, নির্মুলিকরন ও বিতাড়িতকরনকে অস্বীকার করাসহ নিজস্ব ইচ্ছা অনুযায়ী কতৃত্তবাদী কায়দায় রাষ্ট্র পরিচালনা করা।
পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকেই মানব সভ্যার ইতিহাস তৈরি হয়, সেসময় মানব সভ্যতা ছিল ভাষাগত, সভ্যতাগত, সাংস্কৃতিগত, এবং উন্নয়নগত অবস্থার সর্বনিম্ন পর্যায়ে, যার কারনে মানুষের লোভ-লালসা, আধিপত্ব বিস্তার, হিংসা-প্রতিহিংসা, ক্ষমতায় আরোহন, প্রয়োজন-অপ্রয়োজনেও সম্পদ প্রতিপত্তির কামনা, অন্যের অধিকার হরন করা এবং নিজেদেরকে আলাদা করে দেখানোর সংস্কৃতি ক্রমান্ময়ে বর্তমান মানব সভ্যতাকে আজকের পর্যায়ে উপনিত করেছে। বৈষম্য সে সময় থেকে চলে আসলেও বর্তমানে এর ধারাবাহিকতা ভয়াবহ রূপ ধারন করেছে এটা কোন ক্রমেই অস্বিকার করার কোন যো নেই। রোহিঙ্গা গনহত্যা ও অতিতের অনেক গনহত্যার ইতিহাসকে হার মানিয়েছে এবং রোহিঙ্গা গনহত্যা, উচ্ছেদকরন ও বিতাড়ন দেখে মনে হয় এটা মিয়ানমারের স¤পূর্ণ পরিকল্পিত যদিও আন্তর্জাতিক আদালতে সূচি অস্বিকার করেন, শুধু মিয়ানমার কেন নিকট অতীতে আফগানিস্থান, ইরাক, লিবিয়া সহ এসব দেশে যেভাবে মুসলিম হত্যাকান্ড (নিধন) চলছে এটাকে গনহত্যা হিসাবে গন্য করার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশে আশ্রয়ীত রোহিঙ্গা গনহত্যা নিয়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশ কোন অভিযোগ দায়ের করতে না পারলেও গাম্বিয়ার মত ক্ষুদ্র একটি মুসলিম দেশ কৃতিত্বের সাথে উক্ত কাজটি করেন বলে গম্বিয়াকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অশেষ ধন্যবাদ।
বর্তমানে ভারতে এন আর সির নামে যেভাবে জনগনের অধিকার হরন করা হছে, ৩৭০ ধারা বিলুপ্ত করে কাশ্মিরে
এবং দিল্লীতে যেভাবে মুসলিম নির্মুল চলছে,এবং মোদি সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ্ এর ঘোষনা অনুযায়ী ভারতে হিন্দুত্ত্ববাদ কায়েমের মাধ্যমে তারই পুর্ব পরিকল্পনা বলে অনেকেই মতামত দেন।

বাস্তবতার নিরিখে দেখা যায় অধীকৃত কাশ্মির, দিল্লী, ও আসামসহ প্রায় সবকটা রাজ্য জুড়েই মুসলমানদের উপর ভারত গনহত্যা শুরু করতে যাচ্ছে। গনহত্যা প্রতিরোধ ও বন্ধে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা জেনোসাইড ওয়াচের প্রতিষ্ঠাতা ডক্টর গ্রেগরি স্ট্যানটনও এরকম মতামত দেন। তিনি আরো বলেন গনহত্যা চালানোর জন্য প্রায় সব প্রস্তুতিই শেষ করে ফেলেছে ভারত এবং তিান নরেন্দ্র মোদিকে নাৎসী শাসন আমলে জার্মানের সাথে নরেন্দ্র মোদি সরকারের অধীনে ভারদের সাথে তুলনা করেন। এর আগেও প্রখ্যাত এই মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ জাতিসংগের নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাবনা তৈরি করেন। তার এই প্রস্তাবনার ভিত্তিতে রুয়ান্ডা ও বুরুন্ডিতে গনহত্যার তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। কম্বোডিয়া, রুয়ান্ডা ও রোহিঙ্গা গনহত্যা নিয়েও তার গবেষনা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। সিটিজেন্স ফর জাস্টিস অ্যান্ড পিসের সেক্রেটারি ও মানবাধিকার কর্মী তিস্তা সেটালভাদও মার্কিন কংগ্রেস কর্মকর্তাদের ওই অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, আসামে মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত করার জন্য জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকাকে (এনআরসি) ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত কিছু বিধি-বিধান এবং মান নির্ধারণকারী প্রক্রিয়া রয়েছে; কিন্তু সেসবের কিছুই মানা হয়নি। আমরা সংবিধানের নীতিমালার আলোকে এটি বাস্তবায়ন করার আহ্বান জানিয়েছি। ভারতের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের সমালোচনা করে তিনি আরো বলেন, এটা দেশজুড়ে মানুষের মাঝে প্রচুর দুর্ভোগ তৈরি করবে যা ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের বৈশিষ্ঠকে মৌলিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করবে। যার কারণে সচেতন সব নাগরিক সংবিধানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা না করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
ভারত কীভাবে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে উদ্দেশ্য করে ধাপে ধাপে গণহত্যার মঞ্চ তৈরি করছে তা উল্যেখিত ধাপগুলিতে বর্ণনা করা যায়। গণহত্যার প্রথম ধাপ হচ্ছে সমাজে বিভাজন তৈরি করা আর এজন্য মোদি সরকার হিন্দুত্তবাদের মাধ্যমে ‘আমরা বনাম তারা’ ধারণা সৃষ্টি করেছে। দ্বিতীয় ধাপ বাকিদের থেকে তাদেরকে আলাদা করে অনাকাঙ্খিত হিসেবে তুলে ধরে মুসলমানদেরকে ‘বিদেশি’ হিসেবে পরিচয় দেয়ার চেষ্টা চালিয়েছে। তৃতীয় ধাপ হচ্ছে বৈষম্য সৃষ্টির মাধ্যমে ভারতে মুসলমানদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে তাদেরকে সকল নাগরিক বা মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। ফলে তাদের প্রতি বৈষ্যম্য করা হলেও কোন আইনগত ভাবে বৈধ হবে। চতুর্থ ধাপ অমানবিকীকরণ করা; এই ক্ষেত্রে যেকোনো ভাবে ভুক্তভোগীদের ‘নিকৃষ্ট’ হিসেবে প্রতিপন্ন করা। যা ভারতে মুসলমানদের ‘সন্ত্রাসী’, ‘উইপোকা’ অথবা ‘ক্যান্সারের মতো রোগ’ বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে, যা তাদের সমাজের অন্য সবাই তাদেরকে ‘ক্ষতিকর কারণ’ হিসেবে ‘নির্মূল’ করা জরুরি মনে করে। পঞ্চম ধাপে গণহত্যা সংঘটনের জন্য সংস্থা তৈরি করা যেমন ভারতের ‘আরএসএস’, কাশ্মীরে এই ভূমিকায় আছে ইন্ডিয়ান আর্মি, এবং আসামে পুলিশ ও এনআরসি বাস্তবায়নকারীরা। ষষ্ঠ ধাপ হচ্ছে মেরুকরণ, ভারত যা করতে ব্যপক প্রচারণা চালিয়েছে। সপ্তম ধাপে শুরু হয় প্রস্তুতি। অষ্টম ধাপ থেকে নিপীড়ন চালানো শুরু হয়। বিভিন্ন আইন ও পদ্ধতিতে ভুক্তভোগীদের অবরুদ্ধ ও বিচ্ছিন্ন করে নেতাদের জেল দিয়ে বা আটক রেখে ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়ে তাদের প্রতিবাদের ভাষা কেড়ে নেয়া হয়। বর্তমানে আসাম এবং কাশ্মীরসহ বিভিন্ন রাজ্যে এই ধাপের ব্যাপক প্রয়োগ হচ্ছে, এর পরেই শুরু হবে নবম ধাপ নির্মূলকরণ, গণহত্যা ও বিতাড়নের মাধ্যমে এই ধাপ সম্পন্ন করা, যেমনটি হয়েছে রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে এবং দশম বা সর্বশেষ ধাপ হচ্ছে প্রথমেই আইন বিচার ব্যাবস্থাকে নিজেদের মত করে তৈরি করার মাধ্যমে প্রশাসনকে ঢেলে সাজিয়ে পরবর্তিতে অপরাধ অস্বীকার করা যা ভারত মুখে মুখে স্বীকার না করলেও কার্যক্রমে তা প্রতিফলিত হচ্ছে বলে দেখা যায়। এত কিছুর পরও ৯২% মুসলমানের একটা ইসলামিক রাষ্ট্রের বাঙ্গালি জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষীকিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে মন্ত্রণ অনেকে ভিন্নচোখে দেখছেন।
সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনকে ঘিরে ভারতে চলমান সহিংসতা, জম্মু-কাশ্মীরের অচলাবস্থা, দিল্লীতে মুসলিম নিপীড়নের ঘটনায় সম্প্রতি ওয়াশিংটন ডিসিতে কংগ্রেস সদস্য এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের নিয়ে দেশটিতে বসবাসরত ভারতীয় মুসলিম-হিন্দুদের তিনটি সংগঠন এসব আলোচনা করেন। এই তিন বেসরকারি সংগঠন হলো, ইন্ডিয়ান আমেরিকান মুসলিম কাউন্সিল (আইএএমসি), এমগেইজ অ্যাকশন ও হিন্দুস ফর হিউম্যান রাইটস (এইচএফএইচআর)। সূত্র : সিয়াসাত।
লেখক : সম্পাদক প্রকাশক, অর্থনীতির ৩০ দিন ও মানবাধিকার কর্মী।











